প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

 

(চতুর্বিংশ কিস্তি)

(তৃতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (চতুর্থ পর্ব)

ইউরোপীয় মহাদেশে শেক্সপিয়র অনুবাদ (শেষার্ধ)

 

আন্তর্জাতিক স্তরে ফরাসি অনুবাদগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করল। লে ত্যরনারের নয়, বরং দুসিসের ফরাসি সংস্করণগুলোর মাধ্যমে আরো অনেক সাহিত্য শেক্সপিয়রের থিয়েটারের সঙ্গে পরিচিত হলো। ফরাসি ট্র্যাজেডির মডেল— যা দুসিসের শেক্সপিয়র অনুবাদের মধ্য দিয়ে পুনরায় যৌবন লাভ করেছিল— তা একটা কূটাভাস বা প্রহেলিকার মতো, জার্মানি, পোল্যান্ড ও হল্যান্ডের মতো দেশে জাতীয় চেতনার উন্মেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। আলোকপ্রাপ্তিকালীন ইউরোপে ফরাসি সংস্কৃতির অগ্রগণ্যতা ফরাসি ইন্টারটেক্সটগুলো ব্যবহারের সহায়ক হয়েছিল, যেগুলো এরই মধ্যে প্রভাববিস্তারী নিওক্ল্যাসিক্যাল ছাঁচে ঢালা হয়েছিল, যদিও এসব মডেলের প্রভাব যতটা না সাহিত্যিক, তার চেয়ে বেশি থিয়েটারসুলভ ছিল। মূল ইংরেজি ভাষায় শেক্সপিয়র আবিষ্কার ছিল খুবই ধীর ও অমসৃণ, এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে বিচিত্র রকমের। লিখিত টেক্সট ও মঞ্চস্থ রূপের মধ্যে এবং ভূমিকাগুলো বা প্যাম্ফলেটে লেখা বৈপ্লবিক কথাবার্তা বা বিবৃতি আর প্রকৃত অনুবাদচর্চায় নেয়া ছাড়ের মধ্যে প্রায়ই নানা গরমিল লক্ষ করা যেত। ধীরে ধীরে ফরাসি নমুনাগুলো অপসারিত হয়ে যায় এবং সে প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করে নেপোলিয়নের বা রাজতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থার প্রতি রাজনৈতিক প্রতিরোধ।

এ সাধারণ বক্তব্যগুলোর বাইরে সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক এ দুদিক থেকেই সার্বিক চিত্রটি কিন্তু মোটেই সুস্পষ্ট নয়। ইউরোপের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র আঁকলে বেশকিছু ধূসর অঞ্চল নজরে পড়বে। পশ্চিম স্লাভিক সংস্কৃতিতে, যেমন স্লোভাকিয়ায়, লিখিত ও সাহিত্যিক ভাষা প্রমিতকরণেও অনুবাদ যথেষ্ট অবদান রেখেছিল।

জার্মানির উদাহরণ ফ্রান্সের উদাহরণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য নিয়তি নির্দিষ্ট ক্রিস্টোফ ভাইল্যান্ড Christoph Wieland, ১৭৩৩-১৮১৩), বিশেষ করে জোহান এশচেনবার্গের (Johann Eschenburg, ১৭৪৩-১৮২০) অনুবাদগুলো ছিল গদ্যে রচিত এবং সেগুলো জার্মান মঞ্চ নির্দেশকদের বিচক্ষণ পরিবর্তন-পরিবর্ধনের ফলে অনেক উপকৃত হয়েছিল। কোনো কোনো অনুবাদক সরাসরি মঞ্চের জন্য শেক্সপিয়র পুনর্লিখন করেছিলেন। গটফ্রিড অগাস্ট বোর্গার (Gottfried August Bürger, ১৭৪৭-৯৪) ও ফ্রিডরিখ শিলার (Friedrich Schiller, ১৭৫৯-১৮০৫) ছিলেন ম্যাবেথের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাষ্যকার: বোর্গার শেক্সপিয়রকে Volkdichter-এর বা ‘জনগণের কবি’র আদর্শ’ বলে মনে করতেন, যে ধারণাটিকে তিনি ও হার্ডার (Herder) জনপ্রিয় করেছিলেন; অন্যদিকে শিলার কাব্যে রচিত ট্র্যাজেডিকে বুর্জোয়া নাটকের একটা বিকল্প হিসেবে উপস্থিত করেছিলেন। অন্যান্য অনুবাদকও বিকাশমান সাহিত্যিক প্রবণতাগুলোর শক্তিবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিলেন এবং শেক্সপিয়রীয় থিয়েটারের সংস্পর্শে এসেই এ প্রবণতাগুলোর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল।

উইলহেম শ্লেগেলের (Wilhelm Schlegel, ১৭৬৭-১৮৪৫) উদ্যোগে শুরু হওয়া এবং লুদভিক টিয়েকের (Ludwig Tieck, ১৭৭৩-১৮৫৩) সুবাদে সম্পূর্ণ হওয়া বিপুল যজ্ঞটি ছিল রোমন্টিসিজম সম্পর্কে শ্লেগেলের তত্ত্ব ও জৈবিক কবিতা সম্পর্কিত ধারণা থেকে উত্সারিত। এক্ষেত্রে একটি তত্ত্বকে সমর্থন জোগানোর জন্য অনুবাদে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর সে কারণেই এ অনুবাদগুলো মঞ্চের উপযোগী করে পরিবেশনের ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা সময় লেগে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে নির্দেশক ও দর্শকরা সাধারণ গদ্য অনুবাদের প্রতিই তাদের পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন এবং সেগুলোকে তাদের কাছে ‘সমগ্র’ শেক্সপিয়রকে তুলে ধরা জটিল, প্রথানুসারী অনুবাদগুলোর চেয়ে বেশি উপযোগী বলে মনে হয়েছিল। অবশ্য ১৮৭০-এর দশক থেকে শ্লেগেল-টিয়েক সংস্করণগুলোকে মূল নাটকগুলোর চেয়ে উন্নত মানের বলে মনে করা হতে থাকে এবং একটি ‘জার্মান-শেক্সপিয়র’-এর ধারণা জাতীয়তাবাদী থিম হয়ে ওঠে।

অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে রাশিয়া, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোয় দুসিসের সংস্করণগুলো থেকে— বিশেষ করে হ্যামলেট থেকে— কাব্য ও গদ্য অনুবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। এ অ্যাডাপ্টেশনগুলোর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ঊনবিংশ শতকে নব্য সাহিত্যিক ধারণাসংবলিত নতুন কিছু সংস্করণ তৈরি হয়, যেগুলোকে মৌলিক বলেই গণ্য করা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়ায় সে শতাব্দীর গোড়ায় দুসিসের সংস্করণ থেকে যে চারটি ট্র্যাজেডি অনূদিত হয়েছিল— যেখানে দৃশ্যত নিওক্ল্যাসিক্যাল আদর্শগুলোকে রোমান্টিক আদর্শগুলোর সঙ্গে মেলানোর একটা প্রয়াস ছিল— তা তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। রোমন্টিকরা ওথেলো (ইভান ভেলিয়ামিনভ, ১৮০৮), কিং লিয়ার (নিকোলাই গ্নেডিশ, ১৮০৮), হ্যামলেট (স্তেপান ভিসকোভাতভ, ১৮১১) ও ম্যাকবেথের (পিওতর কোরসাকভ, ১৮১৫) সংস্করণগুলোকে তুলাধুনা করে ছাড়েন এবং তাদের উদ্ভাবিত অথবা শ্লেগেলের মতো কিছু জার্মান তাত্ত্বিকের কাছ থেকে ধার করা নতুন কিছু কৌশল পরীক্ষা করে দেখেন। তার পরও এসব নিওক্ল্যাসিক্যাল অনুবাদ মঞ্চে দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিল, যেমনটা ফ্রান্সেও হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ ইউরোপেও একই ধরনের ঘটনা লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ ইতালিতে দুসিসের ফরাসি অনুবাদগুলোর স্টেজ অ্যাডাপ্টেশনগুলোকে হঠিয়ে সেসব লিখিত ও মঞ্চ সংস্করণগুলো জায়গা করে নিয়েছিল, যেগুলো মূল টেক্সটকে বিবেচনায় রেখেছিল। পুনঃঅনুবাদগুলোর হাত ধরে এল অনুবাদের ক্রিয়াকলাপ ও কৌশলগুলো এবং ইতালিতে ভিনদেশী সাহিত্যের অবস্থা আর ইতালীয় নমুনা বা আদর্শগুলোর পুনর্নিরীক্ষণের ব্যাপারটি। সাহিত্যিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অনুবাদকদের অপরিহার্য ভূমিকার ব্যাপারে সচেতন হওয়ার পর আভাঁ-গার্দ রচয়িতারা শেক্সপিয়র অনুবাদের ব্যাপারটার মোকাবেলা করেন। একদিকে নিওক্ল্যাসিক্যাল সংস্করণগুলো আর অন্যদিকে ক্রিটিক্যাল বা সমালোচনামূলক নমুনা বা আদর্শগুলো ছাড়া তারা কাজটি করতে পারতেন না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যার অভিমত হয় ফরাসিতে পরিবাহিত হয়েছিল নয়তো অনূদিত হয়েছিল সেই ভলত্যেরের কাছ থেকে এ বিতর্কের মোদ্দা কথাটি পাওয়া গিয়েছিল। নতুন টেক্সচুয়াল ফর্ম সৃষ্টিতে অনুবাদগুলোর ভূমিকা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গতানুগতিকতার সঙ্গে উদ্ভাবনের মেলবন্ধন করার উদ্দেশ্যে অনুবাদকরা প্রায়ই এক শ্রেণীকরণ-অযোগ্য লক্ষ ভাষাকেন্দ্রিক টেক্সট তৈরি করেছিলেন। এটারই একটা প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হচ্ছে Verso sciolto (অমিত্রাক্ষর ছন্দ): ইংরেজি থেকে অনুবাদের সময় এটির সৃষ্টি এবং পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা, রোমন্টিকরা সেটা আক্ষরিকভাবেই ধার করেছিলেন।

 

পরবর্তী অধ্যায়: পক্ষ পরিবর্তন: আয়ারল্যান্ডের ঘটনা