১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ আইয়ুব খান করাচিতে চুক্তি স্বাক্ষর করেন সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটা বিতর্কের অবসান ঘটল। বিষয়টিকে ভারত ও পাকিস্তান সম্পর্কের জন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে তখন থেকেই। সিন্ধু চুক্তিকে ভারত ও পাকিস্তানের নদীগুলোর জন্য পরবর্তী চুক্তির দ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। সে সূত্র ধরে আলোচনায় আসে পাকিস্তানের পূর্ব প্রান্ত তথা আজকের বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। পঞ্চাশের দশকেই পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়। সিন্ধু পানি চুক্তির পর বিষয়টি আরো প্রবলভাবে সামনে আসে। যদিও সিন্ধুর পানি বিতর্ক যতটা গুরুত্ব পেয়েছে বিদগ্ধ মহলে, বাংলার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। তার পরও বাংলার পানি বিতর্ক ষাটের দশকের শেষ দিকে তীব্র ‍রূপ লাভ করে।

১৯৪৭ সালে উপনিবেশ শক্তির বিদায়ের পর কার্যত বাংলা অঞ্চল দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। পশ্চিম অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ও পূর্ব বাংলা পরিণত হয় পাকিস্তানের ইউনিটে। ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানোর সম্পর্ক জটিল। তবে তিক্ততা প্রথম দিকে ছিল কম। ১৯৪৭ সালের পর বাংলার সহিংসতা হয়েছে সত্য, কিন্তু সেটা পাঞ্জাবের তুলনায় নগণ্যই। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য কৃষির মতো পাট উৎপাদনও প্রথম দিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৪৯ সালে নিজস্ব মিল চালু করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে ভারতে পণ্য রফতানি কমিয়ে আনার জন্য। তার পরও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরেুর সঙ্গে আলোচনার সময় বাণিজ্যের ওপর গুরুত্ব দেন। যদিও আইয়ুব খানের সরকার ছিল এমন নীতির বিরোধী। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার সিন্ধু ও পাঞ্জাবকে অগ্রাধিকার দিতে থাকে বাংলার বিপরীতে। ক্রমে কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে না, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়। তৈরি হতে থাকে সম্পর্কের পার্থক্যও।

পূর্ব পাকিস্তানের নদীগুলোর বড় অংশ এসেছে ভারত থেকে। দুই বাংলার সাধারণ নদী হলো গঙ্গা। গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ভারত ঘুরে প্রবেশ করেছে পূর্ব পাকিস্তানে। গঙ্গা অববাহিকায়ই কাঠামো দিয়েছে উত্তর ভারতের জনজীবন। পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের আগে নদীটি দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। হুগলি হয়ে ভাগীরথী নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে একটা শাখা আর পদ্মা নামে পূর্ব পাকিস্তান প্রবেশ করেছে দ্বিতীয়টি। এ পদ্মা পরে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। তিব্বত থেকে উৎপন্ন হওয়া ব্রহ্মপুত্র ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ ঘুরে প্রবেশ করেছে পূর্ব পাকিস্তানে। এ পদ্মা আর ব্রহ্মপুত্রের মিলিত রূপ পরে মেঘনায় যুক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে গেছে। ঠিক এ কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের নদী বিতর্ক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা। পাঞ্জাবের মতো এখানে সে অর্থে পানির সংকট নেই। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় নিয়েই বাংলা নদীবেষ্টিত উর্বর ভূমি। পূর্ব পাকিস্তান কৃষিপ্রধান হলেও খালের দরকার, সে অর্থে হতো না বললেই চলে। নদী ও বিলই এখানকার জলাশয় হিসেবে যথেষ্ট।

পূর্ব পাকিস্তানে পানিবিষয়ক দুটি বিতর্ক বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথমটা কর্ণফুলীতে ১৯৫৭-৬২ সালে পাকিস্তানের নেয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং দ্বিতীয়টি ১৯৬১-৭৫ সালে গঙ্গায় নির্মিত ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। দুটি ঘটনাই পরবর্তী ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। প্রথম প্রকল্পটি চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর করা। নদীটি বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার আগে ভারত ঘুরে এসেছে। ঔপনিবেশিক শাসন সমাপ্ত হওয়ার ঠিক পর পরই পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এখানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে জোর দেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে সুলভে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়া বাঁধের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখা হয়। পাকিস্তানের নেয়া এ প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা ভারতে, বিশেষ করে আসামে পড়েছে। ভারতীয় প্রকৌশলীদের এক্ষেত্রে তেমন কিছু করার ছিল না আসলে। নেহরু সরকারও বিষয়টিকে সাধারণভাবেই নেন। সম্ভবত চীনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনে তিনি বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি, কিংবা হতে পারে অন্য কোনো পরিকল্পনা রেখেছিলেন।

কিন্তু ফারাক্কা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় তিক্ততা। ভাগীরথী-হুগলি অঞ্চলে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য ভারত নিয়েছিল প্রকল্পটি। মূলত দেশভাগের পর থেকেই ভারত ফারাক্কার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পশ্চিমবঙ্গে ভাগিরথী নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা থেকে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নেয়ার ভারতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চায়। তখনই গঙ্গার বিষয়টি সবার নজরে আসে। ১৯৫২ সালে প্রত্যুত্তরে ভারত জানায়, পরিকল্পনাটি মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানের উদ্বেগ সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর। এ ঘটনা থেকেই গঙ্গার জল বণ্টনসংক্রান্ত আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাসের সূত্রপাত। ১৯৬১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প ঘোষিত হয়, কাজ শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। নানা কারণে বিলম্বিত হয়েছে পরবর্তী সময়ে। কিন্তু প্রকল্প শুরু থেকেই সতর্ক ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিদগ্ধ সমাজ। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় দাবি করা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের পাশে বাঁধ নির্মাণ করতে চায়। এটা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে স্থবির করে দেবে। ঢাকার অন্য পত্রিকাও প্রায় একই সংবাদ প্রকাশ করে। প্রথম দিকে মার্কিন কূটনীতিকরা বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভেবেছিল। ভেবেছিল সরকারের ভেতরের টানাপড়েন থেকে নজর অন্যদিকে ঘোরাতে এমন খবর ছাপা হয়েছে। পরে ১৫ জানুয়ারি আরেক পত্রিকা আজাদ দাবি জানায়, ভারত তার ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা দিয়ে পাকিস্তানের ওপর প্রভাব ফেলতে চায়। পাকিস্তানকে ধ্বংস করাই তার উদ্দেশ্য। ১৯৬১ সালে আইয়ুব খান নেহরুকে চিঠির মাধ্যমে সতর্ক করেন, ‘গঙ্গা ও তিস্তার পানি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন’। ভারতীয় পণ্ডিত সমাজেও বিষয়টা আলোচনায় আসে। কিন্তু তাদের যুক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে অনেক পানির উৎস আছে। বিপরীতে ভারতের জন্য তেমন কিছু নেই। ফলে ভারতই পানির হকদার। অথচ এ কথা তখন প্রকৌশলীরাও স্বীকার করেছিল ফারাক্কা নির্মাণের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পানির প্রবাহ অর্ধেকে নেমে যেতে পারে।

কর্ণফুলী প্রকল্প সে অর্থে বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি ভারতের ওপর। কিন্তু ফারাক্কার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ফারাক্কা যেন সিন্ধুর ব্যাপারে ভারতের নেয়া সিদ্ধান্তকেই প্রতিধ্বনিত করে। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ফারাক্কার কাজ নানাভাবে আটকে থেকেছে। সে বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের সূত্র ধরে তিক্ততা নতুন মাত্রা পায়। ১৯৬৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিরা সরাসরি আলোচনায় বসে ফারাক্কা নিয়ে। তার পরের ইতিহাস পরবর্তী বাংলাদেশে মোটামুটি জানা। ভারত তার উজানে থাকার সুবিধাকে ব্যবহার করে এভাবে কেবল গঙ্গা না, অন্য নদীর দিকেও অব্যাহত রেখেছে আধিপত্য।

মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক