শুভাশিস সিনহার প্রথম কাব্যগ্রন্থ দশটি দীর্ঘশ্বাস পড়ার স্মৃতি আজ আর টাটকা নেই। কিন্তু তা যত ফিকেই হোক, একদিন যে পড়েছিলাম সেই পাতলা কাব্যগ্রন্থটি, এ কথা মনে করতে পারি। শুভাশিস তখন সদ্যযুবক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছেন সুদূর সিলেট থেকে। বইটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু লুকিয়ে রাখতেন। নিজেকে আর নিজের লেখাকে সঙ্গোপনে রাখার এক অদ্ভুত কৌশল ওর আছে, ছিল তখনো। সেই বই নিয়ে তার কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। মনে করতেন, সেখানে লেপটে আছে ওর কাঁচা হাতের ছাপ। যদিও পাঠক হিসেবে আমার কাছে একটু ভিন্ন স্বাদের লেগেছিল এজন্য, কোথায় যেন প্রচ্ছন্নভাবে হলেও মিশে ছিল বাংলা কবিতার প্রচলিত স্বরের বাইরের আবহ। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার কবিতার নিজস্বতা শুভাশিস তার বাংলা কবিতার কাব্য ভাষায় বইয়ে দিতেন। নিজের মাতৃভাষার যে স্বর আজন্ম ওর কানে বাজে, তার যেটুকু কোনোভাবে এড়ানো সম্ভব নয়, তাই বাংলায় লেখার সময়ে ওর হাতে স্বাভাবিকভাবেই ধরা দেবে। হয়তো সেটুকু তখন আমাদের কাছে শুভাশিসের স্বাতন্ত্র্য।
এরপর একটু বিরতি দিয়ে বের হয় শুভাশিসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ডেকেছিলাম জল। ততদিনে বাংলাদেশের দৈনিক ও সাময়িকপত্রে শুভাশিস অতিপ্রজ তরুণ কবিদের একজন। সেই থেকে হওয়া না হওয়ার গান পর্যন্ত যে শুভাশিসকে পাই, সেই ক্রমোত্তরণ নিয়মিত কবিতা পাঠকের কাছে ধরা পড়বে।
একই সঙ্গে নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক হিসেবে তার অগ্রযাত্রা, সেখানে নাটক রচনা ও নির্দেশনায় নিজস্বতার ছাপ এরই মধ্যে ওই জগতের বোদ্ধা ও সাধারণ দর্শকের কাছে একই সঙ্গে উপভোগের ও বিস্ময়ের। শুভাশিস তার কবিত্বশক্তির সঙ্গে নাটক রচয়িতার জোরকে জুড়ে দিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তার নাটকগুলোয় আমরা তা দেখেছি।
সম্প্রতি (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) প্রকাশিত হয়েছে শুভাশিস সিনহার দুটো কাব্য। কাব্য না বলে কাহিনী কাব্য বলা যুক্তিযুক্ত। একটি নয়নতারা অন্যটি দহনদয়িতা। দুটো কাব্যেই নাটকের আবহ আছে। কাহিনী কাব্যে সাধারণত তা থাকে। শুরুতে নয়নতারা পড়ি। একটু দ্রুতই। একইভাবে দহনদয়িতাও। কিন্তু একবার খুব দ্রুতগতিতে পড়ার পর মনে হলো, এ কাহিনীকে কাব্য ভাষায় রূপান্তরের বিষয়টা পাঠক হিসেবে একটু বেশি মনোযোগ দাবি করে। বুঝে নিতে চাইলাম শুভাশিসের লেখার কৌশল।
২.
দহনদয়িতা মায়া আর ভাসানের গল্প। যেমন গল্প জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ রূপাই আর সাজুর, কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘বিদায়-অভিশাপ’ দেবযানী আর কচের। নকশী কাঁথার মাঠ আখ্যান কাব্য। বিদায়-অভিশাপ আখ্যানের আঙ্গিকে লেখা কবিতা, পরস্পরের সংলাপ বিনিময়ে গতিশীল। নকশী কাঁথার মাঠ তা নয়। কাব্যেই পুরো আখ্যানের নির্মিতি দিয়েছেন জসীমউদ্দীন। সেখানে প্রয়োজনে সংলাপ আসতে পারে। দহনদয়িতা অনেকাংশে তাই। এ কথা এজন্য বলা, এটা দহনদয়িতার আলোচনা নয়। সে সুযোগ আর সাধ্য নেই। শুধু নিজস্ব মুগ্ধতাকে জানান দেয়া। ফলে এটি রচনা হিসেবে কোন ধরনের, তা জানানোর জন্য অনেকদিন আগে পড়া জসীমউদ্দীনের ওই অমর আখ্যান কাব্যটার কথা মনে এল। কোনোভাবেই জসীমউদ্দীনের কাব্যটির সঙ্গে তুলনা করছি না। কেননা দুটো দুই সময়ের। কলমের গতি ভিন্ন। রচয়িতার চোখ আলাদা। এমনকি আখ্যানের গতিকেও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে দুভাবে। জসীমউদ্দীন পল্লী বাংলা দুই তরুণ-তরুণী কাহিনী লিখলেও ওই আখ্যানে তার চোখ ইউরোপীয় অর্থে রোমান্টিক। দহনদয়িতা তা নয়। আর এ কথা কে না জানে, একটি কাব্যগ্রন্থ পড়ে ভালো লাগার স্বাদ আলোচনা করে অন্যের কাছে বইয়ে দেয়া যায় না। তার সবচেয়ে ভালো উপায় সেটি পড়ে ফেলা।
৩.
দহনদয়িতায় মায়া বেড়ে ওঠে আর দশটি গ্রামীণ জনপদের শিশুর মতো। দাবানলে গ্রাম পুড়লে মা-বাবার সঙ্গে গৃহত্যাগী হয়। নতুন আবাসে একদিন পরিচয় হয় এক নওলযুবক ভাসানের সঙ্গে। ভাসান বেহালা বাজায়। এটিকে সে বলে, ভেলা। সুরের ভেলা ভাসাতে ভাসাতে ভাসান ভেসে যায়। রাখাল সে। বড় অদ্ভুত। মায়া বিস্মিত। সে প্রেমে পড়ে। সেই প্রেমের কথা জেনে যায় মায়ার বাবা। তারপর ফিরে আসে নিজেদের জায়গায়। কিন্তু মায়া ভুলতে পারে না ভাসানকে। তার মনে হয়, সর্বত্রই সে শোনে ভাসানের বেহালার সুর। এমন প্রেম তাকে দগ্ধ করছে প্রতি মুহূর্তে। আর তাই সে একদিন যেন এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এরপর সালিশিতে বিচারক তাকে বলে, মেয়ে, তুই খুবই ছোট, না বুঝে এ কাজ করেছিস। মায়া বলে, না, আমি বুঝেই করেছি এ কাজ। হিংসায় কোনো ঘর পোড়াইনি আমি। পুড়িয়েছি প্রেম। শুভাশিস লিখেছেন:
‘না!’
আচমকা চিত্কার করে ওঠে মায়া।
বিচারকসহ
সকলে সেখানে কেঁপে ওঠে ভয় সেই চিত্কারে
আবার কথার প্রতিধ্বনি করে যেন মায়া:
‘আমি নাবালিকা নই।
আমার বয়স আঠারো হয়েছে পার
আমি সাবালিকা, আমি সব জানি, বুঝি
জেনে বুঝে সুস্থ মাথায়
সবকিছু ঠিক করে
আমি তবে পুড়িয়েছি ঘর,
শুধু বলি, ঘর আমি হিংসায় পোড়াইনি কোনো
পুড়িয়েছি প্রেমে।’
ফলে মায়াকে হাত-পা বেঁধে দূর পাহাড়ের উপরে রেখে আসা হয়। সেখানে সে চিত্কার করে জগেক জানায়:
কেবল প্রেমের দায়ে/ কেবল প্রেমের দায়ে/ কেবল প্রেমের দায়ে আমি—’ তার এ কথা শেষ হয় না, ‘কোনো এক ভাসানের সুরের ভেলায়/ ভেসে ভেসে তার সেই কথা-অবশেষ/ বয়ে চলে দূর-দূরান্তরে...’
এটুকুই কাহিনী। সাধারণত প্রেমের আখ্যান যেমন হয়ে থাকে। পাত্র-পাত্রীর প্রেম ও বিচ্ছেদ কিংবা বিচ্ছেদের পরে মিলন। এক্ষেত্রে বিচ্ছেদ। প্রাচ্যে এমন লোককাহিনী প্রচুর। শুভাশিস তারই একটি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আখ্যান কাব্যের রচয়িতা হিসেবে তার জোর অন্য জায়গায়। কাহিনীতে বিশেষত্ব খুঁজতে গেলে সে জোর ধরাও পড়বে না। তাছাড়া সম্প্রতি আখ্যানে কাহিনী বলে আর কিছু বিশেষ আছে বলে আর মনে হয় না অথবা সেটা আমলে নেয়ার প্রয়োজন কাহিনীকার মনেও করেন না। শুভাশিসও নেননি।
৪.
দহনদয়িতার শুরু থেকেই শুভাশিস লক্ষ্যাভিমুখী। কাহিনী সেখানে কোথাও টাল খায়নি। কাহিনী গদ্যেই যেখানে কাহিনীকারের হাতে কাহিনী ঝুলে যায় কিংবা বাহুল্য দেখা যায়, কাহিনী কাব্যে যা স্বাভাবিকই যেন, সেটি নেই। বরং বহুদিনের চর্চায় শুভাশিসের হাতে যে কাব্য ভাষা সহজে খেলে, তা দিয়ে গল্পের নাটকীয়তা রক্ষা করে গেছেন অনায়াস মুন্সিয়ানায়। মায়ার চোখে তার বাবা:
সারাটি জীবন, শুধু কাজ করে এল
মানুষটা, ঘামে নেয়ে, তেতে ওঠে, পায়ে ফোস্কা, নখে পুঁজ,
সারা গায়ে পিছে রোদে পুড়ে কালো কালো ছোপ
তবু কাজ চাই,
পৃথিবীতে মানুষ জন্মাল শুধু কাজের দায় নিয়ে
এ কেমন কথা, আহা, তার যে কেমন ইচ্ছে করে,
বাপের আঙুল ধরে একবার দূরে চলে যায়
আবার ভাসানের বেহালা বাজানো শুনে এসে যখন মায়া বাড়ি ফেরে:
মায়া দেখে এদিন সেদিন
কেউ নাই, কিছু নাই,
শুধু সেই সুর ভরে আছে চরাচর, পুরোটা পৃথিবী তার
আর নয়, এবার পালানো ছাড়া নিরুপায় মায়া
দহনদয়িতায় মায়া আর ভাসানের প্রেম ও বিচ্ছেদের বর্ণনায় শুভাশিসের কলম সবচয়ে সফল। কাহিনীর শেষের এ অর্ধেক যে ঘোরের ভেতরে ফেলে পাঠককে, আপাতভাবে তা থেকে কোনো মুক্তি ঘটে না। পাঠক এখানে শুধু পাঠকমাত্র। পাঠকমাত্র এ অর্থে, যেভাবে এ কাহিনীর ঘোরের ভেতরে যে ঢুকেছে, সেখানে নিজেই মায়ার প্রেমের আবহ যেমন উপলব্ধি করতে পারে, একই সঙ্গে তাদের বিচ্ছেদের ভারেও আক্রান্ত হয়। অথবা এর কিছুই ঘটে না। এ আখ্যান কাব্য শুধু এক ঘোরই তৈরি করে, যে ঘোরের ভেতর থেকে পাঠক বেরোতে পারে না। সেখানে এ অংশ কয়েকবার পাঠের ফলে আমার মনে হয়েছে, পাঠক যেখানে এ ঘোরের ভেতরে ঢুকছে, রচয়িতা হিসেবে শুভাশিস তার কলমসহ এ অক্লান্ত যাত্রার ভেতরে দিয়ে গেছেন। কোথায়ও পুনরাবৃত্তি নেই। সচল ও গতিশীল এক বিচ্ছেদের আখ্যানে লেখকও যেন কাহিনীতে নিজেকে সমর্পণ করে দেন। পাঠক তাই সেখানে সমর্পিত হয়। ভাসানের প্রেমে মায়ার এক উপলব্ধি পাঠকেরও ঘটে যেন:
আহা, সেই সুর বাজে না কোথাও
সুরের ভেলাটি আর শ্রুতির স্রোতের গতি বেয়ে
কানে এসে পৌঁছায় না তার
কেন ঘর পোড়ে, কেন জীবন টানিয়া নেয়
অন্য কোনো ঘর পোড়ানোর খেলায় ডোবাতে
সেই ঘর থাকে বুকের পাঁজরে
ভেলা আর বাজে নাকো ভাসানের ভাসান গানের সুর বেয়ে
মাগো, ঘুমের শয্যায় এত কাঁটা কেন
পিঠে এত কাঁটা কেন বিঁধছে আমার
পিঠ বেয়ে দর দর রক্ত ভেসে যায়
দেখো মা শয্যায়
রক্তের ভেতর আমি ডুবে গেছি
ভাসছি রক্তের প’রে
ভাসান! ভাসান!
এভাবে উদ্ধৃতি তো বাড়ানোই যায়। আবার এমন উদ্ধৃতির টানে পাঠক হিসেবে নিজেই আটকে যাচ্ছি। আর একটি। যেখানে ভাসানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মায়া যখন গোটা প্রকৃতিতে ভাসানকে খোঁজে:
মায়া বলে, পাখি, ভাসানের খবর কি জানো?
পাখি উড়ে যায়,
পাখিরা সন্ধান কারো জানে নাকো, শুধু তারা গান করে চলে
তাদেরও সন্ধান কে বা করে, আকাশের ওপারে আকাশে
সেইখানে নীড় এক আছে, আমরা দেখি না
সেইখানে পাখিদের অন্তরের নীড় বাঁধা আছে
মায়া দ্যাখে, কোথাও সে বটগাছ নাই, গরুগুলো কোথাও তো নাই
থাকবে ক্যামনে, সে তো তেপান্তরে সবাইকে এসেছে বিদায় দিয়ে
আর তারা আসবে না এ জীবনে আর
কাব্যভাষার এ টান গোটা কাব্যজুড়ে; আখ্যান কাব্যের যা সবচেয়ে বড় গুণ। প্রথম পাঠের শুরুতে সে শঙ্কা তো ছিলই, গোটা কাব্যে যদি কবি সে টান রক্ষা করতে না পারেন। দ্বিতীয়বার যে তা আবার খুঁজতে যাইনি তাও নয়। কিন্তু বিস্ময়ে ফিরে এসেছে শেষ পৃষ্ঠায়। এমন অভিযাত্রার সাহসের জন্য শুভাশিস সিনহাকে ধন্যবাদ; দহনদয়িতা পাঠের অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে থাকার!






