মনিরা কায়েস কম লেখেন। তারও চেয়ে কম প্রকাশ করেন। লেখালেখি করছেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। অথচ শিশুসাহিত্য, গবেষণা, আখ্যান ও ছোটগল্প মিলিয়ে তার গ্রন্থসংখ্যা সাকল্যে ১০। দীর্ঘবিরতির পর এবার বইমেলায় প্রকাশিত হলো স্বভাবসুলভ শিরোনামে তার পঞ্চম গল্প সংকলন, ‘অন্ধ কুলঙ্গির টীকাভাষ্য’, যার পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২০, অথচ গল্পসংখ্যা মাত্র ৬! গল্প ও পৃষ্ঠাসংখ্যার এ অসম অনুপাতেই অনুমেয় যে, তার গল্পগুলো আক্ষরিক অর্থে ঠিক ‘ছোট’ নয়, বরং ব্যঞ্জনার্থে তো বটেই, বাহ্যিকভাবেও এগুলো বেশ ‘বড়’ ও বৃহদাকৃতির। প্রতিটি পৃষ্ঠার আদ্যোপান্তজুড়ে ঘন নিবদ্ধ, ঠাস বুনট অক্ষর বিন্যাসে বয়ান করে যাওয়া এর কোনো কোনো গল্প যে শব্দসংখ্যার বিচারে, নানাবিধ ফাঁক ও ফাঁকিতে ভরপুর ইদানীংকালের অধিকাংশ তথাকথিত উপন্যাসকেও ছাড়িয়ে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মনিরা এভাবেই লেখেন বরাবরই এবং তিনি ঠিক প্রথাসিদ্ধ কাহিনীধর্মী গল্প লিখতে অভ্যস্ত, এমনকি আগ্রহীও নন। তার নিজের ব্যক্তিজীবন বা চেনা পরিমণ্ডলের কিংবা পঠিত সাহিত্যের কোনো চরিত্রের একটি খণ্ড মুহূর্তের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি অথবা অব্যবহিত সমাজ পরিপার্শ্বের কোনো একটি ছোট্ট পর্যবেক্ষণ কি ঘটনা সূত্রের উল্লেখে প্রায় আকস্মিকভাবে তার গল্প শুরু হয় এবং সেটি ঘটে ব্যতিক্রমহীনভাবেই একটিমাত্র বিচ্ছিন্ন কিন্তু বিপুল শক্তিধর সূচনাবাক্যের নান্দীপাঠ দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে অনেকটা ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের আদলে আলাপে ও বিস্তারে, বাদী ও সম্বাদী সুরে, আরোহণ ও অবরোহণের পথ বেয়ে সেটি একপর্যায়ে পৌঁছে যায় প্রত্যাশিত মোক্ষম মুহূর্তে এবং পরিপূর্ণতা লাভ করে আবারো একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র, তীক্ষ আবেশসঞ্চারী সমাপ্তিবাক্যের অভিক্ষেপে।
ধরা যাক, গ্রন্থের একেবারে প্রথম ভুক্তি, ‘হূত হেমন্তের দীর্ঘশ্বাস’ গল্পটির কথা। এটি শুরু হয়, ‘ওই বৃষ্টি ও রোদে জারানো হেমন্তকালীন দিনগুলোতেই আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম’-এর মতো একটি আপাত সাদামাটা কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ, কবিত্বময় বাক্যের মাধ্যমে। এরপর এক দীর্ঘ প্রশ্বাসসহযোগে লেখক আমাদের সঙ্গী করে নেন তার সুদূরপথের গল্পযাত্রায়, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে, হেমন্তের ঝরাপাতায় ঢাকা, নির্দয় শীতের আগমনী হাওয়ায় কম্পমান, কুলাক ও কসাক, ত্রয়কা ও সামোভার আর স্তেপ ও তুন্দ্রার দেশ সোভিয়েত রাশিয়ায়; গোর্কি, তুর্গেনেভ আর কুপ্রিন ও আন্দ্রেয়েভের পদচারণে মুখর, স্বপ্ন ও সংরাগ রঞ্জিত এক ভিন্নতর বৌদ্ধিক ভূগোলে, যেখানে ক্রমে নায়করূপে আবির্ভূত হন বুনিন, পরবর্তীকালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া লেখক ইভান বুনিন। তার দারিদ্র্য লাঞ্ছিত ভবঘুরে জীবন, তার প্রেম, যৌনতা, রিরংসা ও সর্বোপরি সৃজনের জগৎ সেই উথাল-পাথাল ঐতিহাসিক সময় পর্বের সবটুকু সৌরভ ও স্পন্দনসমেত উঠে আসে আমাদের দৃশ্যপটে, উত্তম পুরুষে বর্ণিত বুনিনেরই এক স্বঘোষিত প্রেমাস্পদতার বিশদ ও বিষণ্ন বয়ানে। তবে এ গল্পের সব খুঁটিনাটি, যাবতীয় পার্শ্বচরিত্র ও কাহিনীর অনুপুঙ্খ বর্ণনা ও বিবরণ ছাপিয়ে ওঠে আখ্যান বয়ানকারী বুনিনের সেই নির্বোধ প্রেমিকার অন্তর্গত বেদনা ও ক্ষরণ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের নির্বেদ এবং সবশেষে তার প্রগাঢ় আত্মোপলব্ধির শক্তিটুকু, যার জোরে সে, মনিরা কায়েসের অননুকরণীয় ভাষায়, সপাটে বলে উঠতে পারে, ‘কষ্ট ও দীর্ঘশ্বাসে জারিত হতে হতে অভিজাতদের ওই গর্ভস্রাবকে অশেষ করুণায় পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে আসি আমি।’ এর পর পরই গল্প শেষ হয়, লেখকের সেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছোট কিন্তু শাণিত উপসংহারবাক্যে, ‘একাকী এবং চরম নিঃশব্দতায়।’
এটিই মোটের ওপর মনিরা কায়েসের গল্পের সাধারণ কাঠামো ও ভঙ্গি, যা গ্রন্থভুক্ত অন্য পাঁচটি গল্পেও সমানভাবে লক্ষণীয়। তবে তার গল্পের নির্মিতির আরেকটি বিশেষ কারিগরি চারিত্রের ওপর কিছুটা আলোকপাত করাও কিছুটা জরুরি বোধ করি। কেননা তাহলে আমরা বুঝতে পারব, তার গল্পে আখ্যানের তেমন বিশেষ ও বিশদ ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও কী করে তা এমন বিস্তৃত পরিসরে পরিব্যাপ্ত হয়ে যেতে পারে, পারে প্রায় উপন্যাসের মাত্রা পরিগ্রহ করতে। গোড়াতেই বলেছি, মনিরা কায়েসের গল্পে ঠিক নির্দিষ্ট কোনো কালানুক্রমিক আদি-মধ্য-অন্ত কাঠামোয় আবদ্ধ কাহিনী পরম্পরার অস্তিত্ব থাকে না কখনই। থাকে কেবল কয়েকটি চরিত্র আর তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও অনুভূতির নির্যাসটুকু, যা বিধৃত থাকে মূলত তাদের মনোজগতের ভাবনাবলয়ে এবং কোনো এক অনুকূল মুহূর্তের প্ররোচনা ও প্রণোদনায় তা ক্রমে উন্মোচিত ও বিবৃত হতে থাকে এক ধরনের অনিঃশেষ আত্মোৎসারণের ভঙ্গিতে, সাহিত্যের পরিভাষায় যাকে আমরা ‘চেতনাপ্রবাহ রীতি’ নামেই চিহ্নিত করতে পারি। মনিরার গল্পে এরই প্রভাবেই হয়তো বা একটি অনুষঙ্গের জের ধরে ভিড় করে আসে সংলগ্ন, কখনো বা অসংলগ্ন, আরো অন্যবিধ অনেক অনুষঙ্গ; একটি সামান্য ভাবনার বীজ জন্ম দেয় আরো অসংখ্য চিন্তা ও চেতনার তরুপল্লব, একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কখনো কখনো প্রসারিত হয়ে যায় সামাজিক, রাষ্ট্রিক এমনকি বৈশ্বিক পরিসরেও। আর এভাবেই তার গল্পের অন্তহীন উলের বলটুকু গড়াতে গড়াতে পৌঁছে যায় তার লেখার টেবিল পেরিয়ে, আধভেজানো দরজার ফাঁক গলে উঠানে, অতঃপর উঠান থেকে রাজপথে এবং একপর্যায়ে উড়াল দেয় মহাবিশ্বের পানে। তবে তা নক্ষত্রলোকের সেই অব্যাখ্যাত কৃষ্ণবিবরের আগ্রাসী আকর্ষণে বিলীন হয়ে যাওয়ার আগেই তিনি দক্ষ অশ্বচালকের মতো তার রাশ টেনে ধরেন, গল্পের লাগাম গুটিয়ে নিয়ে ফিরে আসেন তার আদি ভাবনার কেন্দ্রে। তারপর এক লহমায় প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গিতে ছুড়ে দেন তার উপলব্ধির শেষ সারাৎসারটুকু, পূর্বকথিত সেই অমেয়, অমোঘ একটি মাত্র বাক্যের অপার বস্ফািরে। তবে এও সত্যি যে, মনিরার হাতে এ চেতনাপ্রবাহ রীতির প্রয়োগটুকু বুদ্ধদেব বসু, কি গোপাল হালদার এমনকি ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেয়েও আরেকটু ভিন্নতর মাত্রা পায়; অন্তর্জাগতিকতা কিংবা মনস্তাত্ত্বিকতার চৌকাঠ ডিঙিয়ে তা যখন আমাদের প্রাত্যহিক বহির্বাস্তবতাকে ধারণ করে অনেক বেশি সময়সংলগ্ন ও জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক— “নাসিমা কাঁচা সবজি ধুতে ধুতে শুনতে পায় তিন কন্যার আনন্দিত হাসি। তারা ঘরে বেডকভার পাল্টাচ্ছে, কুশনকভার পাল্টাচ্ছে। শাশুড়িমা পান চিবুতে চিবুতে তাদের বয়সী হয়ে গলা মেলাচ্ছেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথও যোগ দিয়েছেন এ আনন্দযজ্ঞে। এ পরবাসে রবে কে হায়...। শাফকাতের খুব পছন্দ হবে বলে মেয়েরা খুব জোরে ছেড়ে দিয়েছে। আর আমার? সে নিজেকে প্রশ্ন করলে রাজেশ্বরীর বদলে সুচিত্রা মিত্র এগিয়ে আসে কাছে। দেখো রান্নাটা কিন্তু আর্ট। কুটনো কোটাটাও। গলায় সুর আছে অথচ তোমার হাতে রন্ধন শিল্প হয়ে ফুটবে না, তা কিছুতেই চলবে না সংসারে। তাই শান্তিনিকেতনে ওই দুটোই চলছিল। আর এরই মধ্যে একদিন রামকিঙ্কর বেজ বললেন, ‘তোমার মুখটা তো বেশ মজার। চোখে জল লুকিয়ে দিব্যি হাসতে পারো। ওটা আনতে চাই ভাস্কর্যে।’ এবং একদিন ওটা তৈরিও হয়ে গেল। উনি নিজে এসে দিয়ে গেলেন। আলো-আঁধারির এক মুখ। হয়তো একদিকে গানের আনন্দ, অন্যদিকে দাম্পত্যের বিষাদ। কিন্তু ওটার আয়ু বেশি দিন ছিল না। তাই ঈর্ষার দাপটে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। অথচ জানো ওইদিন আমি খুব যত্ন করে পটলের দোলমা আর ভাপা ইলিশে সাজিয়েছিলাম আমাদের বিবাহবার্ষিকীর ভোজ...। নাসিমা সবজি ধুয়ে জল ঝরাতে দিয়ে হাঁসটা ধরবে কি, তার মাথায় ততক্ষণে ছুরির ফলার মতো গানের কথাগুলো গেঁথে যাচ্ছে... তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে... রান্নাঘরের এদিকটা তো এক প্রান্তরই, ওই যেখানে তার সবচেয়ে বেশি সময় কাটে। তেল-নুন-হলুদে গড়ানো সময়— কেটে যায় কেমন নিজস্ব একাকিত্বে।” (হেঁশেলের হালখাতা, পৃষ্ঠা ১০৮) এ দীর্ঘ উদ্ধৃতি অংশটুকুর মতো আরো অসংখ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে গ্রন্থের পাতায় পাতায়, যেখানে আমরা মনিরার এ নিজস্ব নির্ভার চেতনাপ্রবাহ রীতির বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করি, নানা তথ্য, স্মৃতি, উদ্ধৃতি, সংবাদ ও সংঘটনার শৈল্পিক সংমিশ্রণে ফুটে উঠতে দেখি একদিকে ব্যক্তির মনোজগৎ ও অন্যদিকে বৈশ্বিক ভুগোলের বিস্তৃত পাটাতন। আর যে গল্পটি থেকে এ উদ্ধৃতিটুকু চয়িত হয়েছে, সেটি এ গ্রন্থের সেরা গল্পও বটে। মনিরা কায়েস নিজেকে নারীবাদী লেখক বলতে স্বস্তিবোধ করেন না, কিন্তু বর্তমান নিবন্ধকারের বিবেচনায় গল্পটি নারীবাদী সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও শিল্পিত নির্দশন। গল্পের বিষয়ভিত্তিটিও বেশ প্রাসঙ্গিক ও আলোচিত— সাহিত্যিক কিংবা শিল্পী দম্পতি জীবনের বহুস্তর মানসিক, আবেগিক ও চিন্তার টানাপড়েন; বিশেষ করে নারীটির— বেদনা, বিক্ষোভ ও বঞ্চনার সংবেদী বিশ্লেষণ। এক্ষেত্রে অবগত পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন, তিনি ছায়া অবলম্বন করেছেন এ দেশেরই একজন অতি জনপ্রিয়, স্বনামধন্য লেখকের দাম্পত্য জীবনের ভাঙাগড়া ও নাটকীয় ঘটনা পরম্পরার। তবে গল্পের শরীরে চেতনে কি অবচেতনে গল্পকারের নিজের জীবনেরও কিছু সমগোত্রীয় অভিজ্ঞতার ছায়াপাত ও উপলব্ধির সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ যে ঘটেনি, সে কথা হলফ করে বলা যাবে না। এ গল্পের মোদ্দা কথা, লেখক-শিল্পীর মতো সৃজনশীল কিংবা যেকোনো সংবেদনশীল দম্পতির মধ্যে প্রায় সর্বদাই সমান কিংবা কখনো কখনো অধিকতর প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে অনিবার্যভাবে সঙ্গিনীটিই বাধ্য হয় আত্মত্যাগে, বঞ্চনার পথ বেছে নিতে হয় কেবল নারীকেই এবং হেঁশেলের ঘেরাটোপে আর সাংসারিকতার ঘানি ঠেলে অপচয় করতে হয় তার সকল সৃজন প্রতিভা, যা কেবল আমাদের এ দেশ কিংবা সমাজের সমস্যা নয়, প্রায় সর্বজনীন এক বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। সংকটের এ বৈশ্বিক আবহটুকুই প্রকাশ পায় সত্যজিৎ-বিজয়া রায়, কমলকুমার-দয়াময়ী মজুমদার, নবনীতা-অমর্ত্য সেন, কিংবা শ্যামল-ইতি গঙ্গোপাধ্যায়, আর বিদেশের তলস্তয়-সোফিয়া দম্পতির পার্শ্ব আখ্যানগুলোর শিল্পিত উল্লেখে। এ গল্পের মূল প্রতিপাদ্য ও প্রতিবাদটুকু বুঝি ভাষা পায় একেবারে শেষ বাক্যটিতে এসে, যেখানে গল্পের নায়িকা নাসিমা স্বগতকণ্ঠে আচমকা বলে ওঠে: ‘কেননা আর কেউ না জানুক, এখন সে জানে আজ কোনো রান্না হবে না এখানে। আজ অরন্ধন।’
এ নিবন্ধের শিরোনামটির অনুপ্রেরণাও এ গ্রন্থেরই একটি গল্প, ‘যেভাবে রাষ্ট্র ধনী হয়ে উঠতে পারে’, যাকে আমরা অনায়াসে একটি আদর্শ মনিরা কায়েসীয় গল্প বলেও আখ্যায়িত করতে পারি। এ গল্পের কাহিনী সূত্র তো আরো সামান্য। ওয়াসি, বরেন্দ্র অঞ্চলের এক কলেজ শিক্ষককে, একদিন পেশাগত কাজে চকরুস্তমপুর নামের গ্রামে যেতে হলে তার মা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন সেখানে শুয়ে থাকা তার ভাই, তথা ওয়াসির বড় মামার কবরটা, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে, মুক্তিযুদ্ধের এক সম্মুখ সমরে শহীদ হয়েছিলেন, একটু দেখে আসতে। তো মাতৃআজ্ঞা পালন করতে, ওয়াসি তার সহকর্মী আবু হানিফকে নিয়ে, রফরফ নামের অই অঞ্চলের এক বিশেষ ধরনের ত্রিচক্রযানে চড়ে, তার অকুতোভয় সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মামার কবর খুঁজতে বের হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের ধনী হওয়ার তোড়জোড়ে সেই কবরে ছায়া দেয়া প্রবীণ বটের গাছখানি শুদ্ধ হাওয়া হয়ে যাওয়ায় ওয়াসি তার মামার কবর আর খুঁজে পায় না; চতুর্দিকে শুধু দেখে কমলা রঙের আলোকিত প্লাস্টিকের খেজুর গাছ, মসজিদ-মাদ্রাসা, তারস্বরে হিন্দি গান ভেসে আসা আল হেরা হেয়ার কাটিং সেলুন, মোসলেম হার্ডওয়্যার, রুহ আফজা শরবতের দোকান। শহরতলি পেরোলেই চোখে পড়ে তার শিশু-মেহগনির সামাজিক বনায়ন প্রকল্প, কি হাইব্রিড পেয়ারা-বরই কিংবা ভাড়া করে আনা মৌমাছি দিয়ে মধু চাষের খামার এবং সবশেষে উধাও হয়ে যাওয়া তার মামার কবরের আশপাশজুড়ে, আরও ভয়ঙ্কর, সাদা পপি, তথা আফিম ক্ষেতের বাড়বাড়ন্ত; মনিরার ভাষায়: ‘যেদিকে তাকাও ইতিহাস মুছে দাঁড়িয়ে গেছে বিষকুণ্ডলী ধারণ করা পপির প্রাচীর।’ আর তার পরই তার সেই মোক্ষম সমাপ্তিবাক্য, ‘কোথায় এগোবে?’ এ গ্রন্থের আরো একটি উল্লেখযোগ্য গল্প, দীর্ঘতমও বটে, ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত মেধাবী কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দকে নিয়ে রচিত ‘শোকসন্তাপের দীর্ঘপাঠ’, স্থানাভাবে এটি নিয়ে এখানে বিশদ আলোচনা করার সুযোগ না থাকায় শুধু বলি, আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এ এক অনন্য ভিন্নপাঠ, মনিরার মায়াবি কলমে যা এক নতুন, মরমি মাত্রা পায়।
শেষ করার আগে ছোট একটি অনুযোগ। বলেছি, মনিরার গল্পে কাহিনী তথা গল্প তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেননা তিনি নিছক কোনো চিত্তচমত্কারী কিসসা কথনের জন্য কলম ধরেন না, যদিও গল্প তিনি বেশ ভালোই বলতে জানেন, জানেন কীভাবে চেতনপ্রবাহে ভেসে আসা নানা কথা ও উপকথা, তথ্য ও স্মৃতিকণার জালে পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে। আমরা জানি, মনিরার পঠনের জগত ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রটিও অনেক বেশি বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক, ফলত প্রাসঙ্গিক তথ্যের ঘাটতিও তার কখনই হয় না। কিন্তু পাঠককে তার এ বিপুল পঠনের ভাগ দিতে ও অভিজ্ঞতার অংশভাক করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, মাঝেমধ্যেই তিনি গল্পের তীর ছাপিয়ে নোঙর ফেলেন সাংবাদিকতা কিংবা নিবন্ধ রচনার কঠিন ডাঙায়, এতটাই যে, আখ্যান শরীরে তিনি প্রায়ই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর উদ্ধৃতি পর্যন্ত উত্কীর্ণ করে দিতে কসুর করেন না, যা তার গল্পের শিল্পরসকে ক্ষুণ্ন করে বলেই এ আলোচকের বিশ্বাস। গ্রন্থটির শিরোনাম নিয়েও কেউ কেউ আক্ষেপ জানাতে পারেন; কেননা তিনি গ্রন্থাভ্যন্তরে এ নামের কোনো গল্প না থাকা সত্ত্বেও এমন একটি দুর্বোধ্য ও আবেদনহীন শিরোনাম বেছে নিয়েছেন, যা কোনোভাবেই সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করার উপযোগী নয়, যদিও গ্রন্থটি সব পর্যায়ের পাঠকের কাছেই পৌঁছা উচিত বলে মনে করি এবং এর গল্পগুলো যেকোনো সচেতন পাঠকের কাছেই যথেষ্ট আদৃত হওয়ার কথা। আশা করি, গল্পকার এ দুটো আপাতসামান্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তার আশ্রয় নেবেন। উপসংহারে বলি, রাজধানী থেকে দূরে বসে, প্রচারের আলো ও পুরস্কারের প্রলোভন উপেক্ষা করে, দীর্ঘকাল ধরে সম্পূর্ণ প্রত্যাশাহীনভাবে সাহিত্যচর্চা করে যাওয়া আমাদের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক নিভৃতচারী মনিরা কায়েস; তবু তাকে পাঠের ভেতর দিয়েই কেবল আমরা জেনে নিতে পারি, গল্প কীভাবে ধনী হয়ে উঠতে পারে।






