কবিবর কহলন
আর নারী
অধ্যাত্মবাদী কবি
লাল দেদের
জন্মভূমি কাশ্মীর
থেকে পণ্ডিত
সম্প্রদায় উচ্ছেদ
হন গত
শতকের নব্বইয়ের
দশকে। তিন
দশক পেরিয়ে
গেছে তাদের
প্রস্থানের। তাদের
অনেকে এখনো
আছেন রিফিউজি
ক্যাম্পে। অনেকে
ছড়িয়ে পড়েছেন
ভারত ও
বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তে। কাশ্মীরের
বিশেষ সংস্কৃতির
ধারক, এমনকি
হিন্দু ধর্মীয়
পরিসরেও বিশেষ
এক গোষ্ঠী
এই পণ্ডিতরা।
উচ্ছেদের পর
পণ্ডিতদের অন্তত
কয়েকটি প্রজন্ম
তৈরি হয়েছে,
যারা তাদের
পূর্বপুরুষের জন্মভূমির
মাটিতে বড়
হয়নি। আবার
অনেকে শিশু
কিংবা কিশোর
বয়সে ছেড়ে
এসেছেন ঘর,
গলি-মহল্লা
আর প্রিয়
শিকারা। পানি
ছাড়া মাছের
পক্ষে বাঁচার
উপায় নেই,
নিজের মাটি
ছেড়ে সংস্কৃতি,
আত্মপরিচয় টেকানো
কঠিন। এক
রকম অসম্ভব।
প্রযুক্তির রূপকথার
এ যুগে
নিজ ভূমেই
মানুষ বিস্মৃতপ্রায়
আর যাকে
ছেড়ে আসতে
হয়েছে তার
আঙিনা তার
তো বিস্মৃতিই
একমাত্র গন্তব্য।
গবেষকরা দেখেছেন
অনেকটা তা-ই
হচ্ছে। তবে
তার পরও
উচ্ছেদ হওয়া
পণ্ডিতদের তরুণ
প্রজন্মের অনেকে
তাদের উদ্বাস্তু
জীবনের বেদনা,
ক্ষোভ আর
ঘরে ফেরার
হাহাকারকে ভুলে
যাননি, চেপে
রাখেননি। মূর্ত
করেছেন শব্দে,
কবিতায়, পরম
জ্ঞানে।
এ নিয়ে
লিখতে গেলে
প্রথমেই সচেতন
পাঠকের মনে
যে নামটি
আসবে তিনি
রাহুল পণ্ডিত।
যেদিন আরো
কয়েক লাখ
কাশ্মীরি পণ্ডিত
কাশ্মীর ছেড়ে
এসেছিলেন, তাদের
মধ্যে ছিল
রাহুলের পরিবারও।
আর রাহুলের
বয়স তখন
১৪। ২০১৩
সালে তাদের
কাশ্মীর ত্যাগের
স্মৃতিকথা প্রকাশ
করেন রাহুল।
সেই বইয়ের
নামটি কবিতার
চেয়ে কম
নয়—সহজ
বাংলায় ‘আমাদের
চাঁদে রক্তের
ছিটে’।
‘আওয়ার
মুন হ্যাজ
ব্লাড ক্লটস’-এর
আরো শুদ্ধ
অনুবাদ হয়তো
সম্ভব, তবে
সেটা অন্য
কেউ করবেন—সে
আশা রেখে
আমার চেষ্টায়
ইতি টানি।
রাহুল লেখেন,
‘আমাদের
পরিবার কাশ্মীরি
পণ্ডিত। সে
বছর কাশ্মীর
উপত্যকার শ্রীনগর
থেকে আমাদের
পালাতে হয়েছিল।
কয়েক হাজার
বছর ধরে
আমাদের পূর্বপুরুষরা
যে ভূমিতে
বাস করেছেন
সেই মাটি
থেকে আমাদের
বলপূর্বক উচ্ছেদ
করা হয়েছে।’
এ দুই
লাইনেই আমরা
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
যাবতীয় বেদনার
সমুদ্রের গভীরতা
আর বিস্তৃতি
দুটোই পরিমাপ
করতে পারি।
চতুর্দশ শতাব্দীর
কবি লাল
দেদ লিখেছিলেন:
ঈশ্বর সবকিছুতেই
ব্যাপ্ত, বিরাজমান
তিনি চেনেন
না কে
হিন্দু, কে
মুসলমান
এ কথা
বিশ শতকের
মানুষের কাছে
পুরনো হয়ে
গেছে।
একালে কাশ্মীরি-আমেরিকান
কবি আগা
শহীদ আলী
বিখ্যাত। তার
একটা কবিতা
আছে ফেয়ারওয়েল
নামে। শহীদের
কথায় তা
এ কবিতা,
‘একজন
কাশ্মীরি মুসলমানের
পক্ষ থেকে
তার প্রতিবেশী
হিন্দু পণ্ডিতের
প্রতি বেদনার্ত
ভালোবাসার চিঠি’—
কোনো একদিন
আমি আপনার
চিহ্ন হারিয়ে
ফেললাম
....
আপনি যা
হারিয়েছেন তা
আমি। আপনি
আমাকে ক্ষমা
করবেন না।
আপনি আমাকে
হারিয়েছেন। আপনার
নিখুঁত শত্রুকে।
আগা শহীদের
মতোই আরেক
কাশ্মীরি-আমেরিকান
একাডেমিশিয়ান কবির
নাম ললিত
পণ্ডিত। ইনি
আবার সরাসরি
কাশ্মীরি পণ্ডিত।
শহীদের ভাবনাকে
যেন এগিয়ে
নিয়েছেন তিনি।
তার অনন্তনাগ
কবিতায় লিখেছেন:
সেসব বলে
আর কী
হবে? এখন
তুমি
এক আগন্তুক,
এক শত্রু।
শিশুরা তাকায়
চোখে
সন্দেহ নিয়ে।
তারা ঘৃণা
করতে শিখে
গেছে,
তারা ভীত।
চোখ ছাড়া
ভূত
নাকি ঘুরে
বেড়ায় রাস্তায়।
সন্দেহ নেই
পূর্বপুরুষের ভূমি
থেকে উত্খাত
হয়ে কাশ্মীরি
পণ্ডিত তরুণদের
মধ্যে ক্ষোভ
আছে, উল্টোদিকে
আসে নিজেদের
আত্মপরিচয় হারানোন
ভয়, আর
আছে নিজেকে
টিকিয়ে রাখার
অসম এক
সংগ্রাম। ইতিহাসের
এই অর্বাচীন
ব্যঙ্গকে, তাদের
ওপর আক্রমণকে
নিজের স্নো ইন
শ্রীনগর
কবিতায় হাজির
করেছেন কবি
সুভাস কাক।
কে জানত
কয়েক দশক
পর শ্রীনগরে
এমন ত্রাস
নেমে আসবে
আর আমি
আমার জন্মস্থানকে
দেখার সুযোগ
পাব না
যেখানে সদ্য
নেমে আসা
বরফের ওপর
আমরা খেলতাম
সন্ত্রাসীরা চায়
আমাদের অতীতকে
কবর দিতে
আমরা যেন
পূর্বপুরুষদের কীর্তি
ভুলে যাই।
উচ্ছেদ হওয়ার
পর জম্মু
ও ভারতের
অন্যান্য প্রান্তে
পণ্ডিতদের জন্য
যে শরণার্থী
ক্যাম্পগুলোর ব্যবস্থা
করা হয়
সেখানকার আবহাওয়া,
পরিবেশ কোনোটাই
তাদের পরিচিত
ছিল না।
তার ওপর
ছিল জীবিকার
দুশ্চিন্তা, ক্যাম্পের
দুর্বিষহ অবস্থা,
আর সব
হারনোর বেদনা।
প্রবীণদের ওপর
এসব ট্রমা
তৈরি করেছিল।
অনেকে দুশ্চিন্তা,
স্মৃতিবিভ্রাটে ভুগছিলেন।
এ পরিস্থিতির
আঁচ পাওয়া
যায় পণ্ডিত
কবি কেএল
চৌধারির কবিতা
সামার
ইন এক্সাইল-এ:
পাগুলো আর
শরীরের ভার
নিতে চাইছে
না,
মন যেন
শূন্য হয়ে
গেছে,
শরীরটা ধরাশায়ী,
ফুসফুস যেন
ক্লান্ত,
আর হূিপণ্ড
কেমন ধীর
লয়ে ধুঁকছে।
উদ্বাস্তু জীবনে
পণ্ডিতদের জীবন
থেকে তাদের
চেনা অনুষঙ্গগুলো
হারিয়ে গিয়েছিল।
একসময় সেগুলো
স্মৃতি থেকে
হারাতে শুরু
করে। প্রাত্যহিক
জীবনে ফেলে
আসা কাশ্মীরের
স্মৃতি হানা
দেয়। সুভাস
কাক তার
‘ডিয়ার
ডিপার্টেড অ্যানসেস্টর’
কবিতায় লেখেন:
কিছুক্ষণ ধরে
ট্যাপের পানি
ফুরিয়ে গেছে
এই নির্বাসনে
বিতস্তা (নদী)
কেবল একটা
স্মৃতি।
পণ্ডিতদের অনেক
কবি তাদের
কবিতাকে বেছে
নিয়েছেন নিজের
পরিচয়কে টিকিয়ে
রাখার অলৌকিক
মাধ্যম হিসেবে।
সব মুছে
গেলেও শব্দ
তো মোছে
না। যে
প্রজন্মের স্মৃতি
নেই, তারা
এই শব্দেই
জানতে পারবে
পূর্বপুরুষের কথা।
স্মৃতি আর
শব্দের এই
যোগ পাওয়া
যায় সুভাস
কাকের দ্য রেকর্ডস অব আওয়ার
লাইভস
কবিতায়:
স্মৃতিকে রক্ষা
না করলে
আমরা কীভাবে
নিজেদের
চিনব? আমাদের
দায়িত্বই বা
কীভাবে
বণ্টন হবে?
...
কোথায় আমার
স্বাধীনতা?
ফেলে আসা
ঘরের প্রতি
আদম্য পিছুটানের
সুর বাজে
কেএল চৌধারির
কবিতা ‘কিজ’-এ:
নির্বাসনে এক
দশক কেটে
গেছে
আমার কোমরে
এখনো ঝোলে
এক গোছা
চাবি
বাড়ি ছেড়ে
পালানোর সময়
চাবিগুলো সঙ্গে
নিয়েছিলাম
আমার ঘরের
চাবি,
আমার সিন্দুকের
চাবি, আমার
ডায়েরির, আমার
গ্রন্থাগারের
গর্ভগৃহের চাবি
যেখানে আমার
দেবতার বাস।
সুভাস কাক
লেখেন, সেটাই
শ্রেষ্ঠ স্বর্গ
যেখান থেকে
আমরা বিতাড়িত
হয়েছি।
বাশারাত শামীমের
প্রবন্ধ মাইগ্রেশন, মেমোরি
অ্যান্ড অ্যান
এন্ডলেস লঙ্গিং:
দ্য পোয়েট্রি অব মাইগ্র্যান্ট কাশ্মীরি পণ্ডিতস অবলম্বনে
শানজিদ অর্ণব:
লেখক
ও অনুবাদক





