‘আমরা কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ। দুইশত বৎসর পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, আমাদের পূর্বপুরুষরা যশ ও ঐশ্বর্যের অনুসন্ধানে পর্বতের উপত্যকা হইতে সমৃদ্ধিশালী সমতল ক্ষেত্রে অবতরণ করেন। ঔরঙ্গজেব তখন মৃত, মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংসোন্মুখ, ফারুকসিয়ার তখন দিল্লির সিংহাসনে। আমাদের পূর্বপুরুষ রাজা কাউল সংস্কৃত ও পারস্য ভাষায় পণ্ডিতরূপে কাশ্মীরে খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। সম্রাট ফারুকসিয়ার যখন কাশ্মীরে যান, তখন তিনি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। সম্ভবত সম্রাটের অনুরোধে তিনি পরিবারবর্গসহ ১৭১৬ সালে দিল্লি চলিয়া আসেন।’ সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের তর্জমায় ‘আত্মচরিত’-তে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর এই প্রাচীন-পারিবারিক স্মৃতিতর্পণ বড্ড মধুর। তবে এর আড়াই শতাব্দী বাদে ১৯৯০ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের চার লাখ সদস্যের যে জন্মভূমি ত্যাগ: সেটি যথার্থই বেদনার, পূর্ণ অম্লতার ঘটনা। কারণ কর্মের প্রলোভন বা ক্ষমতাধর শাসকের আহ্বানে নয়, তাদের জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল ভিন্ন সম্প্রদায়ের মৌলবাদী একটি অংশের ক্রমাগত নির্যাতনের মুখে। হত্যা, লুণ্ঠন, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া: অত্যাচারের, অমানবিক পৃথিবী রচনার সব কু-উপাচারই ছিল সেখানে। কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের এ জন্মভূমি ত্যাগ কেবল ঐতিহাসিদের বিশ্লেষণেই নয়, গুরুত্ব অর্জন করেছে শিল্পী সাহিত্যিকদের ভাব-কল্পলোকেও। সেই ভাবনা অবলম্বন করেই সাহিত্য, চলচ্চিত্রসহ শিল্পের একাধিক মাধ্যমে উঠে এসেছে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নির্যাতনের বহুরৈখিক চিত্র: সকরুণ জীবন বাস্তবতা। সম্প্রতি এ বিষয়কে অবলম্বন করেই বলিউডের চিত্রপরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া নির্মাণ করেছেন ‘শিকারা: দি আনটোল্ড স্টোরি অব কাশ্মীরি পণ্ডিতস্’ চলচ্চিত্রটি। চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সাংবাদিক, লেখক রাহুল পণ্ডিতের ‘আওয়ার মুন হ্যাজ ব্লাড ক্লটস’ অবলম্বনে নির্মিত। এ প্রসঙ্গে মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে কিছু বিষয় ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে।

আমাদের অবিদিত নয়, আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ইতিহাস রচিত হয়েছে, নিরপেক্ষতার নজির সেখানে সামান্য: নেই বললেই চলে। আর এই অতিপ্রত্যাশিত নিরপেক্ষতা থাকারও কথা নয়। কারণ কোনো মানুষের পক্ষেই তার দেশ, কাল ও সমাজ পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা দৃষ্টিভঙ্গিকে অতিক্রম করা সম্ভবপর নয়। যারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। সুতরাং ইতহাস নিয়ে কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনাকে আশ্রয় করে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়, সেখানেও স্বভাবতই প্রবেশ করে দেশ, কাল, সমাজ, জাতীয়তার তুল্য অনুষঙ্গগুলো: সর্বোপরি ‘দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষপাত’ নামক খাদ। যার মিশেল ব্যতিরেকে কর্মটি শক্ত-পোক্ত হয় না, কিংবা পালে হাওয়ার দৌড় যায় কমে। বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘শিকারা’ও এই খাদ থেকে বিমুক্ত নয়। কারণ বিধু নিজেও ছিলেন নির্যাতনের মুখে উপত্যকা ত্যাগকারী চার লাখ কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের একজন সদস্য। ফলে যে ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি চলচ্চিত্রটিতে প্রকাশ করেছেন, সেটি হয়ে উঠেছে আদতে ‘কাশ্মীরি পণ্ডিতের চোখে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নির্যাতন।’ পরিচালক হিসেবে এটিকে যদি তার সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা যায়: তবে এ সীমাবদ্ধতাকে আমাদের জন্য উল্লেখ করতে হবে ‘শাপে বর’ হিসেবে। কারণ আমাদের আলোচনার পরিসর, পরিমণ্ডলও মৌলত বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জীবন বাস্তবতাকে তুলে ধরা, তার চরিত্রটা-স্বরূপটা প্রত্যক্ষ করা।

২.

‘চার্লির ঐ হাসির অন্তরালে রয়েছে সকরুণ জীবন সংবেদ’: বাক্যটিকে সত্য বলে বিবেচনা করলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতেই পারে যে আর্টের বাইরের জাঁকটাই কেবল সব নয়, এর ভেতরে কিংবা আড়ালেও থাকে আরো নানা কথা, অনুষঙ্গ। আড়ালকে অতিক্রম করলে নারকেলের মালা ভাঙার মতোই, সেটি আমাদের সম্মুখীন করে প্রকৃত জীবন বাস্তবতার: সন্ধান দেয় শিল্প-রসাস্বাদনের। বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘শিকারা’ ভারি আর্ট দরের কিছু, এটি ব্যক্ত করা আমার উদ্দেশ্য নয়: তবে আর্টের এ দ্বিস্তরীয় প্রবণতা এখানেও প্রত্যক্ষ করা যায়। কারণ ‘শিকারা’ চলচ্চিত্রে পণ্ডিত সম্প্রদায়ের শিবকুমার ধর ও তার স্ত্রী শান্তির মনোহর দাম্পত্য প্রেমের অন্তরালে বয়ে চলেছে হিংসার নীল রক্তস্রোত, বেদনার নীরব অশ্রুপাত, উদ্বাস্তু হওয়ার বহুরৈখিক ক্ষয়। এটি ঘটেছে ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসের একটি দিনে; এক কাপড়ে জন্মভূমি, পরম আশ্রয়, নিজ দেশ, কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে জম্মুর উদ্বাস্তু শিবিরে পরবাসী হওয়ার মাধ্যমে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চলচ্চিত্রটিতে বিধু বিনোদ শিবকুমার ধর কিংবা তার স্ত্রী শান্তির দুঃখকে ব্যক্তি, সম্প্রদায়ের রেখা অতিক্রম করে সর্বমানবের করে তোলার প্রয়াস দেখিয়েছেন: যাতে তাদের বেদনা, যাতনাটাকে সবাই উপলব্ধি করতে পারে।

৩.

‘শিকারা’ চলচ্চিত্রের ২ ঘণ্টার যে আখ্যান, সেখানে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নিজ দেশে পরবাসী হওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণা। ‘শিকারা’ উৎসর্গ করা হয়েছে এই বলে: ‘সেই চার লক্ষ কাশ্মীরি পণ্ডিত উদ্বাস্তুর উদ্দেশ্যে, যারা ৩০ বছর আগে কাশ্মীর উপত্যকায় গৃহহীন হয়েছিলেন।’ পরক্ষণেই জম্মুর উদ্বাস্তু শিবির থেকে ভেসে আসে টাইপ রাইটারের খটাখট শব্দ, সঙ্গে উদ্বাস্তু শিবিরের পাঠশালার শিক্ষক শিবকুমার ধরের ভরাট কণ্ঠধ্বনি: ‘জনাব রাষ্ট্রপতি, ভারতভূমে আপনাকে স্বাগত। আমি ২৮ বছর ধরে একটি উদ্বাস্তু শিবিরে রয়েছি। এ বছরগুলোয় আমি আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রপতিকে ১৬ হাজার ৬৬৪টি পত্র লিখেছি। এখন আমি আপনার নিকট ৫ মিনিট সময় প্রার্থনা করছি সাক্ষাতের অভিপ্রায়ে।’ আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকে মাতবর জ্ঞানের এই প্রবণতা, প্রথমে দর্শকদের একটু হোঁচট খাওয়ায়: তবে পরিচালক এখানে কিছু পরিষ্কার করেন না। এর পরই দেখা যায় শিবকুমারের কাছে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির একটি চিঠি আসে, সঙ্গে পাঁচতারা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট বুকিংয়ের একটি টিকিট। শিবকুমার ধর, দামি গাড়িতে করে অসুস্থ মরণাপন্ন স্ত্রী শান্তিকে নিয়ে সেই স্যুইটে গিয়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্রপতির সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকেন। বিধু বিনোদ চোপড়া ‘পূর্ব ঘটনা মন্থনে’র মাধ্যমে উপস্থাপন করেন তাদের ফেলে আসা জীবনের নানা ঘটনা।


সালটা ১৯৮৭, কাশ্মীর উপত্যকার, পণ্ডিত সম্প্রদায়ের তরুণ কলেজ শিক্ষক শিবকুমার প্রেমে পড়েছিলেন শান্তির। পারিবারিকভাবে বিয়ের পর, উপত্যকা শহর পত্নিতপে লাল রঙের ছোট্ট এক ডুপ্লেক্সে আরম্ভ হয়েছিল তাদের সুখের সংসার। তবে সুখ মানেই তো ক্ষণস্থায়ী। শিব-শান্তি দম্পতির জন্যও এটি সত্য হয়ে দেখা দিল। ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা কাশ্মীরের অশান্তি, হিংসা বিপন্ন করে তুলল তাদের সংসারকেও। এর আভাসটা পাওয়া গিয়েছিল কলেজ থেকে শিবকুমারকে একদিন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার মাধ্যমে। তাদের সঙ্গে শহরের অদূরে একটি ডেরায় গিয়ে শিবকুমারের সাক্ষাৎ ঘটে তারই বন্ধু লতিফের সঙ্গে। লতিফের বাবা কিছুদিন আগে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। লতিফ শিবকুমারকে পরামর্শ দেয় পরিবার নিয়ে কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। এতে সে নিজের পিতাকে বাঁচাতে পারবে: শিবকুমার এ প্রস্তাবে স্বভাবতই রাজি হয় না। এ ঘটনার পর থেকেই বিনষ্ট হতে আরম্ভ করে তাদের জীবনের স্বাভাবিক চালচিত্র। প্রত্যক্ষ করা যায়, শহরের রাস্তায় বাসে ফেরার পথে কিছু যুবকের কুিসত ইঙ্গিতের শিকার হতে হয় শান্তিকে, গোলাগুলির মধ্যে পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচে সে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গুলিতে নিহত হয় তাদের পারিবারিক চিকিৎসক। এসকবল ঘটনার দরুন নিজের ভেতরে খানিকটা ভেঙে পড়তে আরম্ভ করেন, পণ্ডিত সম্প্রদায়ের যুবক শিক্ষক শিবকুমার। অবশ্য তখনো তারা উপত্যকা শহর পত্নিতপ পরিত্যাগের চিন্তাও করেনি।

১৯৯০ সালের জানুয়ারি চলছে, উপত্যকার পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মানুষেরা লাল কালির একটি বিজ্ঞপ্তি সাঁটানো দেখতে পেল রাস্তার একটি খুঁটিতে, যেখানে তাদের উপত্যকা ত্যাগ করে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে: নইলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হুমকি। সকালবেলায় এখানকার জমায়েতের মধ্যে শিবকুমারও ছিলেন চিন্তিত মুখে। এখানেই মুসলমান সম্প্রদায়ের কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেল: কাশ্মীর উপত্যকা সবার, সবাই এখানে মিলেমিশে থাকব। তবে এমন সান্ত্বনার বাণীতে কাজ হয় না। কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাবনা তো এমন নয়। ক’দিন বাদেই প্রত্যক্ষ করা যায়, পুরো কাশ্মীর উপত্যকায় রীতিমতো আগুন জ্বলে উঠল: নির্বিচারে খুন হতে লাগল পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মানুষ। রাতের আঁধারেই শিবকুমার দৌড়ে যান বিপন্ন মানুষকে বাঁচাতে। আশ্চর্যজনকভাবে বিকল টেলিফোন নিয়ে বসে থাকা হাজি সাহেব তাকে আশ্বাস দেন কিছু করার: কিন্তু কাজ হয় না। ‘শিকারা’য় বিধু বিনোদ চোপড়া বাইরের সহিংসতা ব্যাপকভাবে দেখাননি। তবে এ সময়ে অনিরাপদ বাসায় হামলার মুখে শান্তির যে মানসিক সংকট তুলে ধরেছেন, তা যথার্থই নিদারুণ। যা হয়ে উঠেছে পণ্ডিত সম্প্রদায়ের প্রতিটি মেয়ের মানসিক যন্ত্রণার প্রতীক। তাদের তো এটি অজ্ঞাত নয় যে মৃত্যুও তাদের রেহাই দেবে না। কারণ এ উপত্যকাতেও রয়েছে সাদত হাসান মান্টোর ‘ঠাণ্ডা গোশত’ গল্পের শত শত দাঙ্গাবাজ ইশের সিং: বিপরীত পক্ষের মৃত নারী-মাংসও যাদের অভোগ্য নয়।

সেই আগুন জ্বলা রাতের পর থেকেই কাশ্মীর উপত্যকা আর আগের মতো থাকল না। চলচ্চিত্রের আখ্যানটাও কেবল শিব-শান্তি দম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না: তারা হয়ে উঠলেন বৃহত্তর নির্যাতিত পণ্ডিত সম্প্রদায়েরই দুজন সদস্য। হামলার মুখে গ্রামের বাড়ি পরিত্যাগ করে শহরে শিবকুমারের কাছে চলে এল তাদের পরিবারের সদস্যরা। এর ক’দিন বাদেই পণ্ডিত সম্প্রদায়ের লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে ট্রাক, বাস, মোটরের ক্যারাভানে তাদের প্রায় এক বস্ত্রে উপত্যকা ত্যাগ করে যাত্রা করতে হলো জম্মুর উদ্বাস্তু শিবিরের উদ্দেশে। সেখানে পরিচয়পত্র তৈরি করতে গিয়ে তারা লাঞ্ছিত হলেন। উদ্বাস্তু শিবিরে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলেন। শিবকুমার উদ্বাস্তু শিবিরের পাঠশালায় শিক্ষকতা আরম্ভ করলেন। জীবনটা আবার চলতে আরম্ভ করল: কিন্তু তাদের চোখজুড়ে কাশ্মীর উপত্যকায় ফেরার স্বপ্ন। অন্য প্রান্তে উপত্যকা ছেড়ে জম্মুর উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়ার পরও অবিচারের হাত থেকে মুক্ত থাকলেন না তারা। একদিন শিবকুমারের কাছে এক যুবক মুসলিম ব্যবসায়ী এসে উপস্থিত হলো: তার প্রস্তাব সে শিবকুমারের শহর ও গ্রামের দুটি বাড়িই কিনে নিতে চায় সাড়ে চার লাখ টাকার বিনিময়ে। শিবকুমার এতে রাজি হয় না; বরং জানিয়ে দেয় বাড়ি না বিক্রির সিদ্ধান্তের কথা। তবে সেই যুবকের গায়ে শিবকুমারের স্যুট জানান দেয়, এরই মধ্যে তার বাড়িটা দখল হয়ে গেছে। তবুও পরবাসী মানুষের উপত্যকায় ঘরে ফেরার স্বপ্নটা দখল হয় না।

এরপর সেনাবাহিনীর সহায়তায় একদিন শিবকুমার ও শান্তি শয্যাশায়ী বন্ধু লতিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কাশ্মীর গেলেন। সাক্ষাৎ শেষে ফেরার পথে পত্নিতপে তাদের পুরনো বাড়িতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করলেন বিপন্নতা ও দখলের চিহ্ন। তবে বাড়ি দেখভালের দায়িত্বে থাকা হাজি সাহেবকে শান্তি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিলেন, কাশ্মীরে তারা ফিরবেনই, কাশ্মীরে তাদের জন্ম; মৃত্যুও হবে কাশ্মীরেই। তবে শান্তির এ আশা-স্বপ্ন ফলবান হলো না। কারণ কাশ্মীরে ফেরার আগেই মরণ রোগ বাসা বাঁধল তার শরীরে। শান্তির চিকিৎসার জন্য শিবকুমার তাদের পত্নিতপের বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকার একটা অংশ দিয়ে নিজেদের ৩০তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের জন্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতির নাম করে ভাড়া করেন দিল্লির একটি হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি যে তাকে কোনো সময় দেবেন না, এটি ততদিনে শিবকুমার বুঝে গিয়েছিলেন, অসুস্থ স্ত্রীকে আনন্দ পাইয়ে দেয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। তাজমহলের পটভূমিতে নৌকায় যমুনা নদীতে স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শান্তি। শান্তির কাশ্মীর উপত্যকায় ফেরা হয় না। শিবকুমার তার চিতাভস্ম নিয়ে শিকারায় (নৌকা) চড়ে ফেরেন তাদের গ্রামের বাড়িতে। যেখানে আরম্ভ হয়েছিল তাদের প্রথম সংসার। তিনি আবেগমথিত হূদয়ে প্রয়াত শান্তির উদ্দেশ্যে লেখেন: ছাত্র পড়িয়ে আর তাকে প্রতিদিন চিঠি লিখে অবশিষ্ট জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। বিধু বিনোদ চোপড়া শিবকুমারের এ অসীম একাকিত্ব ঘিরেই পর্দা টানেন গল্পে।

৪.

‘শিকারা’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় দ্বীপান্বিতা মুখোপাধ্যায় ঘোষ লিখেছেন: “ছবির বিষয়বস্তুর ভার ধরে রাখতে কাহিনীতে যে ধার প্রয়োজন ছিল তা ‘শিকারা’য় অনুপস্থিত। কাশ্মীরি লেকের নিস্তরঙ্গ জলে শিকারা যেমন শান্তভাবে বয়ে যায়, ছবির চিত্রনাট্যও তাই। ঘর পোড়ার দুঃখ দর্শকের মন পোড়ায় না।” কিন্তু পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া যখন বলেন: তিনি কেবল কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দুঃখটাই দেখাননি, দেখিয়েছেন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোটাও। তখন শ্রীমতী ঘোষের বক্তব্য খানিকটা কমজোরি হয়ে যায়। কাহিনীতেও আমরা পরিচালকের বক্তব্যের প্রমাণ পাই। কারণ একটা বৃহত্তর, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে শান্তি ও শিবকুমারের জীবন কখনো থমকে দাঁড়ায়নি। হ্যাঁ, তারা কাশ্মীরে ফেরার স্বপ্নে বিভোর বটে। তবুও এরই মধ্যে জীবনও বয়ে যায়। শিবকুমার উদ্বাস্তু শিবিরের পাঠশালায় পড়ান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার উচ্চতর ডিগ্রি লাভের খবর আসে, দেখা দেয় সম্ভাবনা। শান্তিও দুঃখের মাঝে পুরনো দিনের মতো সামাল দিয়ে চলেন, নিত্যকার ঘরকন্না। আর ধারের কথাও যদি বলি, সেটিও কিন্তু একেবারেই নিরুপস্থিত নয়। আমেরিকার রাষ্ট্রপতির কাছে হাজার হাজার চিঠি লিখে ক্লান্ত শিবকুমার যখন মৃত শান্তির উদ্দেশ্যে চিঠি লিখতে বসে বলেন: ‘তুমি উত্তর না দিলেও আমার অসুবিধা নেই। কারণ আমেরিকার রাষ্ট্রপতির চিঠির উত্তর না পেয়ে পেয়ে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।’ এর অর্থ তো মার্কিন রাষ্ট্রপতির প্রাণহীনতাকেও নির্দেশ করে, যা যথার্থই ব্যঙ্গাত্মক।

‘শিকারা’র বিরুদ্ধে অনেক সমালোচক অভিযোগ তুলেছেন, ১৯৯০ সালের নির্যাতনে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক ভূমিকা এবং পণ্ডিত সম্প্রদায়ের ওপরে অত্যাচারের চিত্র সার্বিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন পরিচালক। তাদের এ অভিযোগ একেবারে বাতিলযোগ্য নয়। তবে এটিও অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে ‘যখন কোন এলাকা বা সমাজ হিংসায় জ্বলে ওঠে, তখন সেখানকার মানুষ নানাভাবে আক্রান্ত হন। সেখানে আসলে ধর্ম থাকে না। সে যন্ত্রণা ধর্মের রাজনীতির ঊর্ধ্বে।’ মূলত এই ধর্মের রাজনীতির ঊর্ধ্বের যন্ত্রণাকেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন বিধু বিনোদ চোপড়া। তবু তিনিও হিন্দু, মুসলমান তর্কের ঊর্ধ্বে ঋত্বিক ঘটকের তুল্য কেবল মানুষ দেখিয়েছেন: এটি জোর দিয়ে বলা যাবে না। আমাদের অজানা নয়, কাশ্মীর নিয়ে সমস্যা এখনো জারি রয়েছে। ‘শিকারা’য় শিবকুমার তার গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন বটে! তবে লাখ লাখ মানুষ যে আজও পরবাসী? এদের ভাগ্যের চাবিকাঠি যারা নাড়াচাড়া করেন, মধ্যপন্থীই বলি আর ডানপন্থীই বলি। সেই ক্ষমতাধর শ্রেণীটি কিন্তু স্বভাবতই নির্বিকার। ফলে অন্তত আজকের জন্য কবীর সুমনের গলায় কণ্ঠ মিলিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায় কই: ‘আমি চাই কাশ্মীরে আর শুনবে না কেউ গুলির শব্দ/ আমি চাই মানুষের হাতে রাজনীতি হবে ভীষণ জব্দ।’ সবার আগে এই জব্দ করার মানুষ প্রয়োজন। নইলে কেবল কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায় কেন, কোনো মানুষের ভাগ্যই বদলাবে না।

 

নাজমুল হাসান: লেখক