প্রটোকল দিদির ধাতে ছিল না। আদরভরা কণ্ঠে তিনি বলে উঠতেন, শয়তান! এবং তারপর আপনাকে ধরে তার কোলে বসিয়ে দেবেন। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে রেহনুমা এবং আমার দুজনেরই বেশ বয়স হয়ে গিয়েছিল আর কারো কোলে বসার জন্য তো আমার ওজনও যথেষ্ট বেশি। কিন্তু এগুলো নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন না। তিনি মানুষের বয়সের বিষয়টা এবং অন্যরা কী ভাবছে, সেগুলো মোটেই পাত্তা দিতেন না। এসব বিষয় কখনই তাকে ভাবনায় ফেলতে পারেনি। আপনি যদি কাউকে ভালোবাসেন তো সে আপনার কোলে বসবেই। ‘আপনার কি তাতে কোনো সমস্যা আছে?’
আমি যত দূর পেছনে স্মরণ করতে পারি, তাতে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবী একজন পর্বতসম ব্যক্তিত্ব। ঝাঁসীর রাণী (১৯৫৬), হাজার চুরাশির মা (১৯৭৫) এবং সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে তার অনবদ্য উপন্যাস অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭)’র মাধ্যমেই আমরা এই বিখ্যাত লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্টকে চিনি। তিনি মজার মানুষ ছিলেন এবং গাইতে ভালোবাসতেন। নানা ধরনের কৌতুক নিয়ে তিনি কিছু মনে করতেন না, তার এই বৈশিষ্ট্য অপ্রকাশ্যই রয়ে গেছে। যেটা মূর্ত হয়েছে তা হচ্ছে তার মধ্যকার বিদ্রোহ; শোষিতের পক্ষে তার আপসহীন অবস্থান এবং ভেদরেখার কোন পাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা তিনি সবসময়ই পরিষ্কার রেখেছেন।
দৃক ইন্ডিয়ার শুভেন্দু চ্যাটার্জি দিদিকে ভালোভাবে জানতেন এবং তার ওপর একটি ফিল্ম তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি যখন ২০০৯ সালে আমাদের পক্ষ থেকে তাকে ছবি মেলা-৫ উদ্বোধন করার প্রস্তাব দিলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সম্মতি জানালেন। আমার মনে আরেকটা পরিকল্পনা ছিল। আমাদের সীমিত বাজেট সত্ত্বেও আমরা চেয়েছি ছবি মেলাকে মহান মানুষদের সাক্ষাতের উপলক্ষ করে তুলতে। তাই আমরা স্টুয়ার্ট হল, নোয়াম চমস্কি এবং দিদিকে (ঢাকায়) ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক কথোপকথনের জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এটা উত্সবের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হয়ে উঠেছিল। তারা সবাই সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু স্টুয়ার্ট অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর যোগ দিতে পারলেন না। আর নোয়ামের স্ত্রী ক্যারলও সে সময় মারা যান, দু’জনের দাম্পত্য জীবন ষাট বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে, এমন সময় নোয়ামকে আলোচনায় অংশ নেয়ার কথা বলা উচিত হবে কিনা। কিন্তু নোয়াম তার প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখাতে চাইলেন। আর আমার মনে হলো, এটা তাকে শোক কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। দিদি যেদিন এলেন, সেদিন আমাদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে বিদ্যুত্ ছিল না। অবিচলভাবে দিদি সিঁড়ি ভেঙে পাঁচতলা উঠে গেলেন। ঘরের ভেতরে বইয়ের স্তূপের মধ্যে বসে তিনি স্বস্তি ফিরে পেলেন। তিনি রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসতেন আর তাই রেহনুমার সঙ্গে তার তুমুল আলাপ জমে উঠল।
এই দুই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীর মধ্যকার আলাপের মডারেটর হিসেবে ভূমিকা পালন করা ছিল বেশ কঠিন, কিন্তু দারুণ আনন্দের। কলোনিয়াল প্রজেক্ট নিয়ে তাদের দুজনেরই কঠোর সমালোচনা ছিল। দুজনই ‘ওয়ার অন টেরর’ এবং দুনিয়ার অপর প্রান্তের যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করলেন। শিগগিরই এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, করপোরেট স্বার্থ এবং সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। দুজনের আলোচনা সময়সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এবার আমার কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছবিমেলা উদ্বোধনের সময় আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ফোন পেলাম। প্রধানমন্ত্রী দিদির সঙ্গে দেখা করতে চান। সাধারণত কেউই কোনো প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করেন না। আমরা একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গেলাম। শেখ হাসিনাকে দিদি খুব স্নেহ করেন এবং পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিলাম যে, প্রধানমন্ত্রীও দিদিকে দারুণ শ্রদ্ধা করেন। এমন পরিস্থিতিতে উত্সবে ফেরার জন্য দিদিকে তাগাদা দেয়াটা ছিল খুব অস্বস্তিকর কাজ।
তড়িঘড়ি করে বিদায় নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে গভীরভাবে দুঃখপ্রকাশ করলাম। এর পর আমরা যখন ধানমন্ডিতে অবস্থিত গ্যেটে ইনস্টিটিউটে পৌঁছলাম, তখন প্রায় ভিডিও কনফারেন্স শুরুর সময় হয়ে গেছে। আমাকে অবশ্য কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয়নি, কারণ এমআইটির প্রান্তে কিছু সমস্যা হচ্ছিল। দর্শকরা সবাই প্রস্তুত, আমরা সবাই বসে পড়েছি, কিন্তু পর্দায় আমরা কেবল কতগুলো শূন্য স্কুল বেঞ্চ দেখছিলাম। একটু পর নোয়াম আসলেন। এবার ছিল তার দুঃখপ্রকাশের পালা। এমআইটিতে ভিডিও কনফারেন্সের জন্য দুটি সুইট রয়েছে, প্রথমে তাকে ভুল সুইটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তারপর যখন ঠিকটায় প্রবেশ করতে যাবেন, তখন দেখা গেল সেটার দরজা-তালা দেয়া!
দিদি পার্টিতে যেতে না পরলেও এবার পার্টিই দিদির কাছে চলে এল। আমাদের ফ্ল্যাটে সারাক্ষণ অভ্যাগত, সাংবাদিক, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, এমনকি অনেক আত্মীয়স্বজনেরও ভিড় লেগে থাকল। দিদি পারিবারিক জীবনে খুব একটা সময় দেননি। পারিবারিক বিষয়ে আলোচনার চেয়ে বরং অনেক বেশি সময় দিয়েছেন রাজনৈতিক বিতর্কে। দিদি চলে যাওয়ার পর আমাদের ফ্ল্যাটে ভুতুড়ে নীরবতা নেমে আসে। কিন্তু শিগগিরই তিনি আবার এলেন। ২০১০ সালের মার্চে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ছিল আমাদের প্রদর্শনী ‘ক্রসফায়ার’। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল এই প্রদর্শনী উদ্বোধনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দুজন মানুষ হচ্ছেন, দুর্জয় মহাশ্বেতা দেবী এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী সম্পাদক নুরুল কবির। প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধায়ন করছিলেন পেরুর কিউরেটর হোর্হে ভিয়াকর্তা, প্রদর্শনীটা খুব ভালো দেখাচ্ছিল। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিদেশী অতিথিরা পৌঁছে গিয়েছিলেন। গ্যালারির আশপাশ ঘিরে ছিল গণমাধ্যম। কিন্তু সরকারের মনে ছিল অন্য কিছু। পুলিশ এসে পুরো দৃক অফিস বন্ধ করে দেয়। নিঃশঙ্ক দিদি এবং নুরুল কবির বাইরের রাস্তায় দর্শকদের উদ্দেশে উদ্বোধনী ভাষণ দিলেন। প্রতীকীরূপে কিছুটা নাটকীয়ভাবে দিদি আমার হাত থেকে হ্যান্ডকাফ খুলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন। সরকার আবারো নিজেই নিজেকে বিপাকে ফেললো। হাসিনার প্রতি স্নেহ থাকা সত্ত্বেও, দিদি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পার্টিজান রাজনীতিকে কাছে আসতে দিলেন না। আইনজীবী সারা হোসেনের সহায়তায় আমরা সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে গেলাম ও জয়ী হলাম এবং একদিন গ্যালারি উন্মুক্ত রাখলাম।
সে বছরের শেষদিকে ন্যায্য মজুরির দাবিতে ক্রমবর্ধমান বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুকে গ্রেফতার করে। মুহূর্ত মধ্যে দিদি এ ব্যাপারে ন্যায়বিচার চেয়ে শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠান আমার কাছে।
নিজের আদর্শের প্রতি দিদির অবিচল অঙ্গীকার তাকে আর অন্য সবার চেয়ে পৃথক করেছে। বিভিন্ন দ্বন্দ্বে সুবিধামতো শীর্ষস্থানীয় অনেক বুদ্ধিজীবী এবং অ্যাক্টিভিস্ট মৌনতা বজায় রেখেছেন। নৈতিক অবস্থান নেয়ার পরিবর্তে দলীয় সুবিধাকে বেছে নিয়েছেন। ক্ষমতার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে সুবিধাভোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিরুদ্ধাচরণের চেয়ে বশ্যতা স্বীকার করে সুবিধা নিয়েছেন। কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, সে বিষয়ে দিদি পরিষ্কার ছিলেন। এ কারণে অসংখ্য পুরস্কার কিংবা তার সেলিব্রেটি স্ট্যাটাস কোনোটাই তার নীরবতাকে কিনতে পারেনি। যখনই ধাক্কা এসেছে, দিদি তখনই রাজপথে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন, সবসময় নিজের মাটিতে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
ঢাকায় দিদির পরবর্তী সফর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আমন্ত্রণে। এটা ছিল ‘কনটেম্পোরারাইজিং ট্যাগোর অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী এবং ভারতের জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই সম্মেলন আয়োজন করে। তারা দিদিকে একটি হোটেলে রাখেন। হোটেল থেকে ফোন দিয়ে দিদি বলেন, সেখানে কাজ শেষ হলেই তিনি ‘ঘর’-এ ফিরবেন। কৌতূহলসহকারে রেহনুমা দিদিকে জিজ্ঞেস করল, ‘সম্মেলন কেমন হলো?’ দিদি একটু বাঁকা করে উত্তর দিয়ে বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কনফারেন্স; সারাদিন একটা কথাও বাংলায় না।’
দিদি ঘরে কৌতুক করতেন, রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং দুষ্টামি করতেন। ক্ষমতার রাজনীতি ঝাড়া দিয়ে উঠলেই দিদি সঙ্গে সঙ্গে টিপে ধরতেন। আর তাই একজন অ্যাক্টিভিস্টের বাসাই তার কাছে প্রিয় ছিল। রাস্তার ঘ্রাণ তার ধমনীতে উদ্দীপনা সঞ্চালন করতো। দিদি ছিলেন ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলার জন্য সদা প্রস্তুত একজন যোদ্ধা।
দিদি ফটোগ্রাফি এবং ফিল্ম ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, ‘স্থিরচিত্র কিন্তু কখনই স্থির নয়। স্থিরচিত্র আমাদের অনুপ্রাণিত করে, আবেগে ভাসায় এবং কিছু করতে বাধ্য করে।’ স্পষ্টভাবেই দেখা যায় কিছু করাই ছিল তার জীবন। দৃকের ব্যাপারে তিনি বলতেন, ‘জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে যেভাবেই হোক, দৃক একটি আন্দোলনের সূচনা করেছে। কবে আমার দেশে এমনটা হবে আমি সেই অপেক্ষায় আছি।’
দিদি, আপনি কিন্তু ভারতের লাখ লাখ আদিবাসী এবং অধিকারচ্যুত মানুষ; ভারতীয় গণতন্ত্রের করপোরেট রূপের দ্বারা পদদলিত; অন্যায্য দুনিয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মহত্যাকে বেছে নেয়া অভুক্ত কৃষকদের একটা আন্দোলন করছিলেন। আমার প্রত্যাশা আপনাকে অনুসরণ করার সততা এবং সাহস আমাদেরও হবে।
লেখক: আলোকচিত্রী, অ্যাক্টিভিস্ট






