বিশ্বের ইতিহাসে ফিলিস্তিনের মতো এতবার ও এত বেশি ঔপনিবেশিক শাসনের তলে আর কোনো দেশকেই পড়তে হয়নি। এমনকি আজকের দিনে অন্যান্য দেশে যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে, তখনো ফিলিস্তিনকে লড়তে হচ্ছে দখলদারের বিরুদ্ধে। সেই ইতিহাস জটিল, কুটিল ও কুিসতও বটে। আমরা সংগীতের দিকে চোখ রাখব।
সংগীত বহু আগেই নিজস্ব আবেদনের কারণে বিশ্বজনীন রূপ নিয়েছে। তাই বলে ইতিহাসের সময় ও ভূরাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংগীতের অবদান, স্থান অনুযায়ী বৈচিত্র্য উবে যায়নি। এ কারণেই আমাদের ফিলিস্তিনি সংগীতকে বিচার করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা ফিলিস্তিনের ইতিহাসের সঙ্গেই যুক্ত।
বহু শাসন, প্রভাব ও দখলের বাইরে বিশ শতকে বিশ্বায়নের বিস্তার বিশ্বের দেশ, জাতি, আঞ্চলিক ধারণা উপড়ে ফেলে উন্নত পুঁজির দেশের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছে। এর ধারায় ফিলিস্তিনেও দ্রুত হিপ-হপ সংগীতের বিস্তার ঘটিয়েছে। আমাদের মাথা ‘টাইপ’ হয়ে থাকা আরবের ধারণা নিয়ে প্রথম শ্রবণে ভূমি উদ্গত ফিলিস্তিন সংগীতের ধারা বোঝা যাবে না, তবে সংগীতের বিচিত্র চর্চা দিয়ে নিজস্বতা খোঁজার চেষ্টা, অভিব্যক্তির প্রকাশ যথেষ্ট পাওয়া যেতে পারে।
আরবের সংগীতের ইসলামীকরণের মতো ফিলিস্তিনে রাজনৈতিক ইসলামের একটা প্রভাব আছে। তাতে সংগীতের একটা বিশেষ রূপান্তর ঘটানোর পাশাপাশি বিরূপ প্রভাবও ফেলেছে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে শুরু হওয়া ‘ইসলামিক আন্দোলন’, ১৯৯০-এর দশকে হামাসের উত্থানের সঙ্গে নিখিল ইসলামী ধারণার জিহাদি চর্চার বিস্তার বহু মাজহাবের মুসলিম, বিভিন্ন গোত্র, অঞ্চল ও ধর্মের সীমারেখা উঠিয়ে একাকার করে দিয়েছে। খেলাফত গঠনের অভিপ্রায়ে মুসলিম উম্মার ঐক্যের জন্য শরিয়া আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে বহু আরব দেশের মতো ফিলিস্তিনে ইহজাগতিক আইন ও বহু সংস্কৃতির চর্চা হারিয়ে গিয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনের সুর, কথা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ফিলিস্তিনীয় ও ঐতিহ্যগত হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ইসলামিক হয়ে গিয়েছে। যে কারণে মিসর, সৌদি আরব, আফগানিস্তানের মতো ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চলের যে ‘আনাসিদ’ (গান) গাওয়া হয়, তাতে দেশগুলোর আলাদা করে সামাজিক-রাজনৈতিক বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশ্য হামাসের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনে যে ইসলামিক সংগীত, বিশেষত সংগীতে ইসরায়েল বিরোধিতা, তাকে ফিলিস্তিনি সংগীতের একটা বিশেষ ধরা হিসেবে ধরা যেতে পারে।
ইসলামীকরণের মতোই গত শেষ চার দশকে ফিলিস্তিনে আরবীকরণের বিরাট প্রভাব তৈরি হয়েছে। মিসর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, এমনকি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সংগীত ফিলিস্তিনের সংগীতের একটা প্রতিকল্প হিসেবে গড়ে উঠছে। এটা ঘটেছে প্রচারযন্ত্রের কারণে। প্রায় একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে নিজস্ব প্রচারমাধ্যম—রেডিও, স্যাটেলাইট স্টেশন গড়ে তোলা সহজ কথা নয়। এ সুযোগে আরবে স্যাটেলাইট সংগীত চ্যানেল—সৌদির ‘বোতানা’, মিসরের ‘মেলোডি’ ও ‘মাজ্জিকা’, দুবাইয়ের ‘নোজুম’ ফিলিস্তিনে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ১৯৪৮ সালের পূর্ব সময়ের কথা বলতে গেলে বিশেষত ১৯৩৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন মাধ্যমে রেডিও ‘কায়রো’ বা ‘লন্ডন’ শুনতে হতো। পরে স্থানীয় হিসেবে রেডিও ‘জেরুজালেম’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০০ সালের পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনে ‘মাইয়ানা’, ‘আতাবা’ ও বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত ‘জায়াল’ শোনা যেত। সে সময় দেশটির প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে সংগীতের নিজস্ব উদযাপন ছিল। শহরে থেকে নগর, সবখানে বিয়ে, মৃত্যু, বাগদত্তাকে আংটি পরানো, ফসল মৌসুমে জমি চাষের সময় বীজ রোপণ, ফসল কাটা, উৎসব, শিকারে নিজস্ব সংগীতের প্রচলন ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনে ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ, তথা নগরায়ণের সঙ্গে সংগীতের চাহিদা-চর্চাও বদলে যায়। সে সময় আর আরবি ধ্রুপদী সংগীত কেবল উচ্চবিত্তদের ঘরে ও ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁয় বাজত।
দেশীয় ও লোকসংগীতে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী সংগীত হিসেবে পাশ্চাত্যের হিপ-হপ একটা দুর্নাম এশীয় ও আরব অঞ্চলে আছে। তবে পরিবর্তিত বিশ্বে ফিলিস্তিনিরা একে অনেকটা শাপে বর অবস্থা তৈরি করছে। বিশেষ করে এ সংগীত কথা বহুল হওয়ায় সাংগীতিক ঢং ও বাণীর মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্ষোভ, হতাশা, পরিচয় তুলে দারুণ সচেষ্ট ফিলিস্তিন তরুণরা। এটা অনেকটা সংগীতের ভেতর দিয়ে বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়া ও প্রতিরোধ লড়াইয়ের অংশ।
ফিলিস্তিনে হিপ-হপ সংগীতের তিনটি কেন্দ্র আছে—গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম। ১৯৪৮ সালের পর জেরুজালেম অধিকৃত অংশে পরিণত করে ইসরায়েল। এর আগেই ফিলিস্তিনের ডিএএম নামে ত্রিমাত্রিক হিপ-হপ আল-লিড (লেইদ্দা) থেকে শুরু হয়। তবে ফিলিস্তিনিদের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে হিপ-হপ আবির্ভূত হয় ১৯৯৮ সালে।
মনে রাখা দরকার, ১৯৪৮ ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরায়েল ভয়াবহ আগ্রাসন চালায়, তাতে অন্তত আট লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। ফিলিস্তিনিরা একে অভিহিত করে ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) হিসেবে। বাস্তুচ্যুত মানুষের একটা বড় অংশ প্রায় তিন লাখ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (উত্তর আমেরিকা বা আমেরিকা) আশ্রয় নেয়। এর এক-তৃতীয়াংশ ষাটের দশকেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমে চালানো ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরেই এ ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ফিলিস্তিনি তরুণরা নিজেদের কথা তুলে ধরার জন্য হিপ-হপ শুরু করে।
তবে চিন্তার জায়গা থেকে, যুক্তরাষ্ট্রে ‘আরব আমেরিকান’ ও ‘ফিলিস্তিন আমেরিকান’ নামে হিপ-হপের দুই ধরনের ধারা আছে। আরব আমেরিকান হিপ-হপ শিল্পীরা আরবি ভাষা, প্রতীক, চিত্র ও গীতি দিয়ে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে থাকেন। তবে ফিলিস্তিন আমেরিকান শিল্পীরা একেবারে বিকল্প একটা পরিচয় তৈরির চেষ্টা করে। সেই থেকে তরুণ ফিলিস্তিনিরা আমেরিকায় বিদ্যমান—‘সাদা’ ও ‘কালো’ সংস্কৃতির মধ্যে ‘কালো’কেই বেছে নেয়।
একটা ভিন্ন ধারা থেকে জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিচয় প্রকাশের উপায় হিসেবে হিপ-হপ সংগীতগুলো দারুণ উপযোগী। তরুণদের কাছে এটা প্রতিরোধ ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য হাজিরের হাতিয়ার। বৈশ্বিক জায়গা থেকে গ্লোবালের বিপরীতে একে গ্লোকাল বলছেন সামাজবিজ্ঞানী রোল্যান্ড রবার্টসন। এর মধ্য দিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শব্দের মিশ্রণ ঘটে যাচ্ছে। সেদিক দিয়ে ফিলিস্তিন-আমেরিকান হিপ-হপ শিল্পীরা নিজেদের ‘আমেরিকায়নের’ বদলে ঐতিহ্যগত চিন্তার ঘরানাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। আর শিল্পীরা যেখানে নিজেদের প্রকাশ করার জন্য হিপ-হপ সংগীতকে বেছে নিচ্ছে, সেখানে বর্তমানে ‘বিশ্ব সংস্কৃতি’ হয়ে ওঠা ‘কালো সংস্কৃতি’কে গ্রহণ করে ফিলিস্তিন শিল্পীরা নিজেদের জানান দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আফ্রো-আমেরিকান হিপ-হপের অনুপ্রেরণায় নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে থাকতে পছন্দ করছে অভিবাসী তরুণ ফিলিস্তিনিরা।
উত্তর-ঔপনিবেশিক বিদ্যার অংশ হিসেবে ‘শঙ্কর বা দোঁআশলা সংস্কৃতি’ ধারণা থেকে আরেকটি শব্দের উত্পত্তি হয়েছে। তা হলো, ‘হাইফেনযুক্ত পরিচয়’ (হাইফেনেটেড আইডেন্টিটিস)। এদের মধ্যে বহু সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও ব্যবহারের ফলে তৃতীয় সংস্কৃতির জন্ম দেয়। একইভাবে হাইফেনযুক্ত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান শিল্পীরা তৃতীয় সংস্কৃতির প্রচারকের কাজ করছে। তবে সেই তৃতীয় সংস্কৃতি ফিলিস্তিনি মূল্যবোধ থেকেই উদ্গত হয়।
জানিয়ে রাখা ভালো, সেক্ষেত্রে অনেক হিপ-হপ শিল্পীই নিজেদের ‘ফিলিস্তিনি-আমেরিকান’ পরিচয়ের বাইরে শুধু ‘ফিলিস্তিনি’ বলে পরিচয় দিতে চান। এরও একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে।
লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, ২০০১ সালের কুখ্যাত ১/১১-এর পর আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধনীতি’ গ্রহণ ও প্রচারের কারণে বিশ্বের মুসলিমদের মতো, আমেরিকায় সেখানে বসবাস করা মুসলিম, আরব ও ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ফিলিস্তিন হিপ-হপ শিল্পীরা এর বাইরে একটা ‘নিজস্ব’ পরিচয় দাঁড় করানোর কাজ করেছে সংগীতের ভেতর দিয়ে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, এই ‘নিজস্ব’ পরিচয় তৈরির চেষ্টা, শেষ বিচারে আমেরিকান সংস্কৃতির আধিপত্য ধারণাকেই প্রসারিত করে।
যে কারণে কোনো পূর্ব ধারণা বা তকমা থেকে বেরিয়ে ‘নিজস্ব’ পরিচয় দাঁড় করাতে গিয়ে (ফিলিস্তিন-আমেরিকান) শিল্পী উইল ইয়ংম্যান মঞ্চে আবির্ভূত হচ্ছেন ‘আইরন শেখ’ নামে। একইভাবে র্যাগটপ ও বি-ডান ভ্রাতৃদ্বয় ফিলিস্তিন-আমেরিকান হলেও ভিন্ন নামে পরিচিত। তবে র্যাগটপ বলতে আরবের সংস্কৃতিকেই ধারণা করে আছেন।
প্রাচ্যতাত্ত্বিক এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ, কবি মাহমুদ দারবিশ বা ঔপন্যাসিক ঘাসান খানাফানির কথা মনে করা যায়। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, ফিলিস্তিনি পক্ষে জনমত গঠনে তাদের অবদান প্রতিরোধ যোদ্ধাদের চেয়ে কম নয়। সেই ধারাই এগিয়ে নিচ্ছেন ফিলিস্তিন হিপ-হপ শিল্পীরা। মজার বিষয় হলো, ফিলিস্তিন-আমেরিকান শিল্পীদের তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেই আর আরবিতে কথা বলেন না, পূর্বপুরুষের ভিটায় ফেরেননি, তবুও সংগীতে ওই পরিচয়ের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আজকের দিনে ফিলিস্তিনি শিল্পী, কবি, সংগীতজ্ঞ, সুরকাররা নিজ ভূমি ও প্রবাসে বন্দুকের ভাষার বদলে ফিলিস্তিনের মুক্তির কান্না অনেক বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ছোট্ট একটা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির প্রতীকও আন্দোলনের বড় ধারক হয়ে উঠতে পারে। ইয়াসির আরাফাতের মাথার সাদা-কালো ওড়না ফিলিস্তিনের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সামনে নিয়ে এসেছিল। ফিলিস্তিন ভবিষ্যতে কীভাবে দাঁড়াবে, তার ব্যাখ্যা করা হতো ওই ওড়না দিয়ে। ইহজাগতিক জাতীয়তাবাদীদের কাছে ফিলিস্তিনে প্রতিরোধ আন্দোলনে আল-মুসিকা আল-বিয়াব (লোকসংস্কৃতির গান ও নাচ) বিরাট উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। বিয়ে, বাগদানসহ সামাজিক ও বার্ষিক অনুষ্ঠানে লোকনৃত্য ‘দাবকে’ ব্যবহার আছে। তবে এখন এটা একই সঙ্গে ১৯৪৮-পূর্ব ফিলিস্তিন পরিচয়কে সামনে এনে ইসরায়েল প্রতিরোধ আন্দোলনের উত্তুঙ্গ প্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বে মার্ক্সবাদী বা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও পার্টি চর্চার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ফিলিস্তিন সংগীত লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মতো ‘তৃতীয় বিশ্বের’ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের কাতারে ওঠে। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) গঠন এবং ষাটের দশকে ফিদাই আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে ফিলিস্তিন লোকসংগীত প্রতিরোধ আন্দোলন জমিয়ে তোলার কাজ করে।
বিশ্বের প্রতিরোধ আন্দোলনের ঢেউয়ে ফিলিস্তিনেও ‘আসিফাহ’ (প্রতিরোধ বা গণ) সংগীতের জোয়ার আসে। প্রায় সামরিক কায়দায় কোরাসে গাওয়া ‘মিউসিকা আল-তাওরাহ’ (শহীদের জন্য বিশেষায়িত সংগীত) আরব দেশের রেডিওতে ফিলিস্তিনিদের অনুষ্ঠানে গত মধ্য আশির দশক পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে ছিল।
ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফিলিস্তিনে ‘শাবি’ (জনপ্রিয় লোক) ও ‘থাওরি’ (বিপ্লবী) ধরনের সংগীতের ব্যাপক উত্থান ঘটে। সেই সঙ্গে কিছু লোকসংগীত ও ইসলাম অনুপ্রাণিত সংগীত ‘আল-মুসিকা আল-ইসলামিয়া’ বা ‘আনাসিদ দিনিয়া’ সংগীত প্রায় একই সঙ্গে বেজেছে। যদিও সাংগীতিকভাবে ‘শাবি’ (লোক) এবং ‘ইসলামী’ (ধর্মীয়) দুইয়ের সময়গত পার্থক্য বেশ দূরের, নীতিগতভাবেও তাই। তার পরও ইতিহাসে দেখা যায়, ফিলিস্তিনিদের ‘ফাতাহ’ আন্দোলনের সময় লোকনৃত্য প্রধান সংগীতগুলো দারুণ উৎসাহের কাজ করেছে। এসব সংগীত ফিলিস্তিনিদের ‘আদিবাসিক নিজস্বতা’ ও ‘সংস্কৃতিক শিকড়কেই’ তুলে ধরে।
শেষ করা যায় শিশুদের কথা দিয়ে। সংবাদমাধ্যমের সুবাদে, ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে বড়দের যে চিত্র বিশ্ববাসী দেখে, তার চেয়েও বেশি দেখে সড়কে পাথর হাতে শিশুদের প্রতিরোধ। উর্দিহীন এসব শিশুকে বলা হয়, ‘আতফাল আল-হিযারাহ’ (শীলা/পাথরের শিশু)। ফলে এদের প্রাথমিকভাবে উর্দিহীন ‘ফিদাই’ (যোদ্ধা) হিসেবে পরিচিতি ছড়িয়েছে। শিশুদের এই ‘হাযর’ (পাথর) ও ‘মাকলা’ (গুলতি) ফিলিস্তিনের সংগীতে ‘কালশিম’ (কালাশনিকভ) ও আরপিজির অস্ত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। জাতীয় কাব্যিক ঢঙে গাওয়া লোকসংগীতে বলা হচ্ছে—
সেখানে নেই
কোনো
ভয়,
সেখানে
নেই
কোনো
ভয়
পাথরটা কালাশনিকভ
হয়েছে
বলে
ওহ দুনিয়া
একটু
দেখ,
মানুষেরা
দেখতে
আসো
আমাদের পাথরগুলো
কালাশনিকভের
চেয়েও
শক্তিশালী
এখন সময়
প্রতিরোধের
এবং
কোনো
ভয়
নেই
যারা আমাদের
বিরোধিতা
করেছে
তারা
ভীত
হবে।
তথ্যসূত্র
১.
Palestinian Music and Song:
Expression and Resistance since 1900; edited by Moslih Kanaaneh,
Stig-Magnus Thorsén, Heather Bursheh and David A. McDonald, Indiana University
Press, 2013
২.
Music in
the World of Islam: A Socio-cultural Study, by Amnon Shiloah, Wayne State
University Press.
অলাত এহ্সান: গল্পকার, সাহিত্য সমালোচক।






