অন্য সব দিন থেকে একটা, দুটা বা তিনটা দিন স্বভাব বদলে নিজেদের ছাড়িয়ে নিল স্বেচ্ছায় বা খেয়ালে, রহস্যে কিংবা ঔত্সুক্যে। মৃতপ্রায় গাছটির মৃত্যুসম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে শুষ্ক কাণ্ডের মাথায় উঁকি দিচ্ছিল একফোঁটা সবুজ বিন্দু। অথচ তার দিকে মনোযোগ দেয়ার বদলে তুলে নিলাম রোদ তাতানো সেই দুপুরে বাতাসের ঝাপটায় উড়ে এসে পড়া আগন্তুক পাতাটিকে।
কেন! কেন পাশে পড়ে রইল তোমার ঘুমন্ত মুখ!! কেন মুহূর্তের জন্য হলেও সূর্যগ্রহণের ছায়া ছুঁয়ে গেল চৌকাঠ!!! উত্তর জানা নেই। কতটা দূরত্বে গেলে তুমি জানা নেই। শুধু আয়নায় ছায়া ফেলে গেল আমার কিংবা আমাদের অন্য এক মুখ। হাঁটতে হাঁটতে কেমন পিছলে ঢুকে গেলাম অচেনা অন্ধ গলির ভেতর! সেই আগন্তুক বলেছিল:
— এ বড় রাস্তাটি হেঁটে গিয়ে কতগুলো স্যাঁতসেঁতে গলি পার হলেই বাঁয়ে একটা হলুদ শর্ষের ক্ষেত, ক্ষেত পেরোলেই আমরা পেয়ে যাব তেপান্তরের পথ।
ঘুমের উঠোনে হয়তো তুমি তখন কাঁধের ওপর জমা হয়ে থাকা বেড়াল ছানা।
‘আমি যে চিনি না সে পথ, হারিয়ে যাই যদি!’ বলতেই সে হো হো শব্দে হেসে উঠে বলল:
— আরে ধ্যাৎ, কে তোমাকে একা যেতে বলেছে! আমি তো সঙ্গে যাব তোমার।
তার হাসির রেশটুকু কেড়ে নিয়ে আমিও বোধ করি হেসে উঠেছিলাম। কাঁধের ওপর ঘুমন্ত বেড়াল ছানা কী হলো তোমার? তুমি অমন ডুকরে উঠলে কেন? দুঃস্বপ্ন দেখলে বুঝি? সে তো তোমার পুরনো বাতিক। কেমন শিশুটির মতো দুঃস্বপ্নে চিত্কার করে উঠে আমাকেই আঁকড়ে ধরো। সত্যি কি তুমি স্বপ্নের ভেতর ডুকরে উঠলে, নাকি জেনে গেলে তেপান্তরের পথ ধরে ছুটে আসা অশ্বারোহীর কথা!
তুমি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছ। আবার অন্ধকারে স্পষ্ট হলো অশ্বারোহী আগন্তুক।
—কি হে বাঁধা পড়ে গেলে!
কটাক্ষের সুর তার কণ্ঠে। কী অদ্ভুত তার কণ্ঠ। যেন জাগতিক নয়; হিম ধরানো শীতল।
—তুমি কি মানুষ নও?
অচেতনেই বলে উঠি। আবার হেসে ওঠে সে। একটু কি ছমছমে বোধ হয়? অজ্ঞাতেই বুঝি বা তোমাকে সজোরে চেপে ধরি।
—কী হলো, যাবে না তেপান্তর?
তোমাকে আঁকড়ে থাকা হাতটা আলগা হয়ে গেল কি অশ্বত্থ! নাকি মনের ভুল? কিন্তু আমি তো বললাম। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট শুনেছি আমি বলেছিলাম:
—চলো যে পথে তোমার অশ্বক্ষুরের ধ্বনি বেজে ওঠে ঘুঙুরের মতো করে, সেই পথে আমিও আরোহী হই।
কী হলো, হঠাৎ অমন নীল হয়ে গেলে কেন অশ্বারোহী? কাঁধের ওপর জমে থাকা বেড়াল ছানা খসে পড়ল!
—কী হলো? কী হলো তোমার অশ্বারোহী??
ঘুম ছিঁড়ে ক্রোধ আর বিস্ময়ে তুমি আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলে। তোমার চোখে জমে উঠছে খুচরো খুচরো নুড়ি পাথর। নুড়ি পাথরগুলো ধীরে ধীরে কেমন প্রকাণ্ড পর্বত হয়ে উঠছে! তুমি কেমন পাথরের চাঁই হয়ে উঠছ!! তোমার চোখে আমি তাকাতে পারছি না।
‘ওভাবে পাথরের তরঙ্গে তলিয়ে যেয়ো না অশ্বত্থ, অমন নুড়ি পাথরের স্তূপ হয়ো না; আজই মৃতপ্রায় গাছটির শুকনো কাণ্ড ফুঁড়ে বেরোনো সবুজ বিন্দুটি পাতা হয়ে উঁকি দেবে। রেলিংয়ে জমে থাকা বৃষ্টিফোঁটাটি গলে সমুদ্র হয়ে উঠবে দেখো’— বলতেই ঝনঝনিয়ে ছিটকে পড়তে থাকল রাশি রাশি প্রস্তরখণ্ড। দুমড়ে-মুচড়ে গেল সৌম্য সৌধচূড়া। তোমার মামড়ি ওঠা শুকনো ঠোঁট নড়ে উঠল বোধ করি। অস্পষ্ট... খুব অস্পষ্ট স্বরে যেন বললে, ‘তেপান্তরে কি বাহারি রঙের ছানাছানি? অশ্বত্থ কি ঘরকন্নার মতো একরঙা?’ চিত্কার করে বলতে চাইলাম, ‘ভুল, তুমি ভুল। বড় রাস্তার পর গলিগুলোর কোনো গন্তব্য নেই, গলি পেরিয়ে কোনো হলুদ শর্ষেক্ষেত নেই, কোনো তেপান্তর নেই। ওটা তো অন্ধগলি।’
বলা হলো না। নাকি বলেছিলাম সশব্দে? প্রস্তরখণ্ডের ছড়িয়ে পড়ার শব্দের চেয়েও সজোরে? তুমি যে মিইয়ে গেলে! ঘুমানোর আগে হাস্নাহেনা গাছটায় ফোটা প্রথম ফুলের সৌরভ তোমাকে দিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো, এখনো বোজানো মুঠোর ভেতর তুমি তাকে আগলে রেখেছ। আবারো বলতে চাইলাম, ‘অশ্বত্থ, তোমার মুঠোর ভেতর রঙিন প্রজাপতি, তুমিই রঙ ছেনে হও রামধনু। তুমি মুঠোয় জমিয়ে রাখো হাস্নাহেনা, বসন্তের প্রথম বাতাস।’
বলা হলো না। অথচ তুমি শুনে নিলে ঠিক। নুড়ি পাথরগুলোর ভেতর দিয়ে ঝরনা বইয়ে দিল। তোমার চোখে জেগে উঠল সবুজ শ্যাওলা আর অজস্র ঘাসফুল।
ঝরনার জলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বলতে চাইলাম, বুনো অর্কিড দেখব বলে আবারো আমরা একদিন পাহাড়ি লাল রাস্তায় হারিয়ে যাব। আমাদের খুঁজে নেবে সেই স্বাপ্নিক রথ। চাকায় আটকে থাকা লাল মাটির চিহ্ন নিয়ে রথটি তারাফুলের বাগানে পৌঁছলে তোমার করতল থেকে নির্ঘুম হাওয়া আমার কপালে ছুঁইয়ে বলবে, ‘আমরা পৌঁছে গেছি ফাল্গুনী!’






