‘কারি’ শব্দটার ছত্রচ্ছায়াতলে বহুকিছুর জায়গা হয়ে যাবে, এই যেমন ফরাসিদের ভাষায় যা রেঁধে ফেলা গরম খাদ্য, যা আমাদের তরকারি, যা তামিলদের কাড়হি কিংবা অন্য কোথাও সালান বা সালুন...। একটু আমিষকে বা নিরামিষকে মসলাযোগে, ঝোলযোগে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে অনেকটা করে নিয়ে খাওয়ার উপায় হচ্ছে কারি বানানো। এই সংজ্ঞা বইয়ের নয়, এ অধম ভুক্তভোগীর, কিংবা বলা ভালো কারিভোগীর (তবে এতে একটু ফাঁক রয়ে গেছে, সব কারিতে ঝোল হয় না, আমিষও থাকে না)। রাঁধতে রাঁধতে একদিন হঠাৎ মনে হলো— কারি আসলে গরিব দেশের খাওয়া, এ হলো মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বর্ণিত সেই ‘ঝোলের ঝোলের ঝোল’, এইটুকু মাছ-মাংসকে অনেকক্ষণ সিদ্ধ করে আমিষগন্ধী ঝোল সেবনের নাম কারি খাওয়া। বিলেতের লোকে যেমন এক ফালি মাংসকে বা মাংসের ছিটে লাগানো পায়াকে বার্লি আর সবজি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিদ্ধ করে সেই ঝোল খেয়ে বিশ্বযুদ্ধ পাড়ি দিয়েছে— সেই রকম একটা কিছু। কারির জন্মস্থল তাই এমন সব দেশে, যেখানে কল্যাণীয় প্রাণদায়িনী সস্তা শর্করা বা শ্বেতসারকে সামান্য আমিষের ইন্ধনে ডুবিয়ে নিয়ে খেলেই চলে, অনটন ঢাকা পড়ে যায় সুস্বাদ আর সুবাসে। সেই সুবাসে খ্রিস্টের জন্মেরও আড়াই হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোতে হামানদিস্তায় ছেঁচে নেয়া শর্ষে-মেথি-তেঁতুল-জিরের ঝাঁজ রয়ে গেছে।
কারির উল্লেখ আছে ফরাসি শব্দে মধ্যযুগের রান্নার বইয়ে, ১৭ শতকের পর্তুগিজরা কারিকে জনপ্রিয় করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। পর্তুগিজদের পিছু পিছু এল ব্রিটিশরা, সারা পৃথিবীর কাছে মসলার স্বাদ পৌঁছে দিতে এবং বাছাই করা কিছু অঞ্চলে মসলার চাষাবাদ করতে। ১৭৪৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কারি রান্নার রেসিপি বুক, লেখক হ্যানা গ্লাস। সেখানে কারি বলতে মোরগা কিংবা বুনো খরগোশের স্টু, তার সঙ্গে খানিকটা ভাত। মৌলিক খাদ্য হওয়ার বদলে ভাত সেখানে সাইড ডিশ। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মরিচ আমদানি হওয়ার সুবাদে ভারতীয় উপমহাদেশে তদ্দিনে কারির চেহারা আরেক রূপ নিয়েছে। আগেই বলেছি, চার হাজার বছর আগের সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাসে প্রাথমিক কারির উদ্ভব, মানুষের দাঁতের নমুনায় সেখানে মিলেছে সিদ্ধ আদা এবং হলুদের ভগ্নাংশ, এই তরকারি তারা ভাত দিয়েই খেত সেই হদিসও মিলেছে। রাঁধা খাবারের ভেতরে হয়তো এই কারিই সবচেয়ে পুরনো খাদ্য, অবশ্য এতে লংকামরিচ কিংবা গোলমরিচ (কালো সোনা) যুক্ত হয়েছে শত শত বছর পরে। কারির ইতিহাস লিখতে গেলে আসলে অজস্র তন্তুসহ নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস উঠে আসবে, সেই বিহারি হাতুড়ে শেখ দীন মুহম্মদের খোলা হিন্দুস্তানি কফি হাউজে ছিলিম টানা ভুঁইফোড় ব্রিটিশ নবাবদের কথা আসবে, লস্করদের ব্রিটেনে এসে ভাত না পেয়ে পাস্তার টুকরো সিদ্ধ করে ভাতের বিকল্প গড়ে তোলার কথা আসবে, ‘পি অ্যান্ড ও’ ফেরির মেনু আসবে, আসবে মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন’-এ হালাল করা মুরগির অভাবে ইহুদি কসাইয়ের কাছ থেকে মুরগি কেনার গল্প, বার্মিংহামের কারি হাউজের ‘এখানে লাস্যময়ী মেয়েরা পানীয় পরিবেশন করে’ বিজ্ঞাপনের কথা আসবে। এই আজকের চোখ ধাঁধানো কারি-অ্যাওয়ার্ড অব্দি কতটা পথ পেরোলে তবে কারি চেনা যায়! এখানে বলে রাখা ভালো, দীন মুহম্মদের পোর্টম্যান স্কয়ারের সেই বেতের চেয়ার আর চীনা ছবিযুক্ত কফি হাউজেরও আগে ১৭৭৩ সালে মেনুতে কারি এনেছিল হে’মার্কেটের নরিস স্ট্রিটের একটি কফি হাউজ। এই রেস্টুরেন্টকে ‘কফি হাউজ’ ডাকাটাও প্রাচ্যের আবহ তৈরির ভেক, যে প্রাচ্য তাবৎ বিলাস সামগ্রীতে গিজগিজ করছে অভূতপূর্ব সব ব্যসনে ভরে দিচ্ছে পশ্চিমাদের চোখ-কান-মন। দুষ্টু লোকে বলে, প্রাচ্যর কাছে পৌঁছানোর সিংহদরজা ছিল অটোমানদের তুরস্ক (টার্কি), এমনি তার জাদু যে উত্তর আমেরিকার বড়সড় মোরগ গোত্রের পাখি এনে নাম ‘টার্কি’ দিলে সেটাই ইংরেজদের কাছে তৃপ্তিকর ঠেকত।
একটু পিছিয়ে যাই। শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব আদতে ছিলেন নব-মুন্সি, ইংরেজকে পলাশীর যুদ্ধে সহায়তা দানের পর হলেন রাজা। কোম্পানির কর্মচারীদের সংবর্ধনা দেয়ার জন্য পলাশীর যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে ১৭৫৭তেই তিনি তার সাত-খিলানের দালানে সূচনা করেন দুর্গোৎসবের। তিনিই প্রথম দুর্গোৎসবে সাহেবসুবো নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন, ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে ঢালাও মদ্যপান-কবিগান-বাইজিদের নাচগান— সিদ্ধ নিষিদ্ধ সব গোত্রের মাংসর ন্ধন (বিফ স্টেক-মাটন চপ-বাছুরের মাংস, যা যা সাহেবরা খান)— মাদারির দল— সঙ এবং বাজিকরের খেলা ইত্যাদি মিলিয়ে-ঝিলিয়ে সেটাকে একটি মিলন মহোৎসবের রূপ দিয়ে আত্মোন্নতি এবং সিদ্ধির পথ সুগম করে নেন। লর্ড ক্লাইভ ছাড়াও সে যুগের বহু মান্যগণ্য সাহেব ততদিনে অনুভব করতে শুরু করেছেন, এ দেশের যাবতীয় ধর্মাচারের পৃষ্ঠপোষক তারাই, ১৮৪০-এর দশনম্বুরী আইন হওয়ার আগ অব্দি তারা তাই ভাবতেন। সাহেবরা দুর্গাপূজার লাগামহীন ঘটাপটা দেখে বিস্মিত হতেন, নিজেদের ভেতর হাসাহাসি করতেন, মেমসাহেবের অভাবে দিশি মেয়েদের বিয়েও করতেন তারা। নেটিভরাও ভাবতেন এরা মোগল শাসন থেকে তাদের ত্রাণ করেছেন, এরাই নতুন যুগের শুভসূচক। এইভাবে কবে কখন অন্তঃপুরের রান্নায় আদান-প্রদান ঘটেছে, তার দিনক্ষণ অনুমানও করা যায় না। ইংরেজদের পুডিং, জ্যাম, কুকি, স্টু, রোস্ট, কাটলেট ইত্যাদি নানাভাবে অভিযোজিত হয়েছে বাঙালির খাদ্যতালিকায়। ইংরেজদের পুডিং এসেছে দিশি কুদ্রুমের জ্যাম, কুকির সঙ্গে মুগপাকন দূরসম্পর্কের আত্মীয়তা করে হয়েছে রোজ-কুকি,
নুন-গোলমরিচ-তেজপাতার লেশমাত্র মাখা ইংলিশ স্টু আরেকটু সঙ্গ ভাগ্যের শিকার হয়ে পরিণত হয়েছে ব্রাউন স্টুতে। ক্লাইভের নামের সঙ্গে ‘বম্বে ডাক’ বা লইট্টা শুঁটকির গল্প জড়িয়ে গেছে। রোস্টেড মিটের স্বাদ লেগেছে বাঙালির জিভে, ঝালফরায়েজি, দো-পেঁয়াজা, মাংসের গ্লাসি, ডিমের কারি আর কোফতা কারির স্বাদ লেগেছে বিলিতি জিভে। পূর্ণিমা ঠাকুর তার ঠাকুরবাড়ির রান্নায় ডিমের কারির যে পাকপ্রণালি দেখিয়েছেন, তা নেহাত ডিমের ডালনা, নামিয়ে নেয়ার আগে খানিকটা ভিনেগার দেয়াটুকু ছাড়া। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা ‘বেকিং বাক্সে’ পুডিং-ডিশে ভরে আস্ত ভেটকি বেক করেছেন নুন-গোলমরিচ-রাই আর মাখন মেখে, ক্রাম্ব ছড়িয়ে, সঙ্গে আলু-গাজর-বিটসিদ্ধ। মাছের কারি বলতে কেরালান কারি, তাতে দই-কাঁচা আম আর কারিপাতা, মাংসের কারি বলতে মাদ্রাজি কারি, তাতে নারকেল বাটা যোগ করা কেবল। কিন্তু তদ্দিনে বাঙালি স্টু চিনেছে, মাটন স্টু, আইরিশ স্টু, ব্রাউন স্টু, ডুমো করে কাটা আলু, শালগম, কপি, গাজর, মটরশুঁটি ইত্যাদির সঙ্গে আদা-নুনে সিদ্ধ মাংসের পদ, নামানোর আগে দুধে ময়দা গুলে দিয়ে দিতে হয়। দীঘাপতিয়ার অকালপ্রয়াত রানী কিরণলেখা লিখে গেছেন, ‘ভিন্ডালু প্রকৃতপক্ষে কোর্মারই রূপান্তরমাত্র, কোর্মা মোগলাই আর ভিন্ডালু পর্তুগিজ। কোর্মাতে দধি অম্লরস রূপে ব্যবহূত হয়, ভিন্ডালুতে ভিনেগার (সিরকা) তত্স্থান অধিকার করে। কোর্মা পাকের মাংস মসলায় মাখিয়া অধিকক্ষণ রাখিয়া দেয়া চলে না, কিন্তু ভিনেগার থাকা প্রযুক্ত ভিন্ডালু পাকের মাংস মসলায় মাখিয়া এমনকি ১২ ঘণ্টা ঢাকিয়া রাখাও হইয়া থাকে। পক্ব ভিন্ডালু জলবর্জিত পাক করা হয় বলিয়া দুই-তিন দিবস পর্যন্তও রাখিয়া খাওয়া চলে।’ খাদ্যগ্রহণ এবং পাকপ্রণালিতে উদারনীতিসম্পন্ন এসব দিকপাল হাতা-খুন্তিতে করে বদল আসছে রান্নায় এবং সমাজে, আজো পড়লে ঠিকই টের পাওয়া যায়। ‘দেবে আর নেবে, মেলাবে মিলিবে’ করতে করতে উত্পত্তি হয়েছে নানা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পদের; তাদের নাম কান্ট্রি ক্যাপ্টেন চিকেন, রেলওয়ে মাটনকারি, ডাকবাংলো কারি, ডেভিল পর্ক কারি, বেঙ্গল ল্যান্সারস শ্রিম্প কারি, অক্সটেইল ভিন্দালু। নাশতায় এসেছে ক্যালকাটা কাটলেট/ কবিরাজি কাটলেট, বিফ পান্তারাস, আলুর চপ (যা আসলে আলুর দোলমা); স্যুপের পদ হিসেবে উদ্ভাবিত হয়েছে মুলিগাট’নি স্যুপ, আর্মি ক্যাম্প স্যুপ, ব্রাউন উইন্ডসর স্যুপ ইত্যাদি। সজনের ডাঁটা দিয়ে অ্যাংলোরা রেঁধেছে মিট অ্যান্ড ড্রামস্টিক কারি, এমনকি ‘ডিং ডিং’ নামের নোনা মাংসের শুঁটকিও তৈরি করেছে তারা, খেয়েছে মাছের শুঁটকির পিকলস। চাটনি-পিকালিলি-পিকলসের কথাই বা বাদ যায় কেন। অম্বল বা রসমের মতো করে এরা তৈরি করত ‘পেপার ওয়াটার’, উপাদান তেঁতুলগোলা-টমেটো-হলুদ-মরিচ-জিরে তাতে পরে পেঁয়াজকুচি-রসুনকুচি-শর্ষে-শুকনা মরিচের ফোড়ন। ভাতের চালে নারকেলের দুধ, কোরা নারকেল-কিশমিশ-কাজু-ধনেপাতা-পুদিনা বা ক্রান্তীয় ফলমূল যোগ করে অভিনব করা হয়েছে ভাতকে। চালে মুগডাল, নারকেলের দুধ, গুড় আর কিশমিশ দিয়ে তৈরি হয়েছে গুড-ফ্রাইডে রাইস কঞ্জি; চিকেন আর বার্লি মিশিয়ে তৈরি হয়েছে কেনি বয়েজ কঞ্জি— সর্দিগর্মির মহৌষধ। খিচুড়ি বা যাকে আমরা পড়তাম কেডগেরি, তা আসলে একটি হলদে ভাত-সিদ্ধ বা ভাঁপানো মাছ আর ডিমসিদ্ধর অ্যাংলো জগাখিচুড়ি বিশেষ, হলদে রঙটি জাফরান বা হলুদ বা ফুডকালারের অবদান, ডালের ভূমিকা নেই এতে। বিজয় গুপ্তের কাব্যে চাঁদ সওদাগর ঘিয়ে রাঁধা যে খেচড়ান্ন বা খিচুড়ির সুখ্যাতি করেছিল, তার থেকে বিলিতি ‘কেচড়ি/খিচড়ি’ যোজন যোজন দূরে। ইংরেজরা যে কেবল ভারতবর্ষে খিচুড়ি-তপসে মাছভাজা দিয়ে প্রাতরাশ করে ক্ষান্ত দিয়েছে তা নয়, ফিরে যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে তাদের কারিপ্রীতি। ব্রিটেনে সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালির কারি, কারি-বিজনেস কোটি টাকার বাণিজ্য। ইংরেজের অমলেট অক্লেশে বাঙালির লব্জে মামলেট হয়ে গেছে সেই কবে। বাঙালি তাতে যোগ করেছে পেঁয়াজকুচি-লংকাকুচি-হলুদ গুঁড়া-আস্ত জিরে ইত্যাদি। মাসকয়েক আগে টিভিতে দেখলাম নাইজেলা ল’সন অমলেটে পেঁয়াজ-মরিচ-ধনে গুঁড়া দিয়ে ভাজছেন, হাতরুটি মুড়ে খাবেন বলে। বিলেতি পাচক রিক স্টাইন আমাদের শর্ষে বাটা মাখা মাছপাতুরি দেখে ঠিকঠাকই পাতা মুড়ে ভাঁপা কড মাছ রাঁধেন ফ্রেঞ্চ মাস্টার্ড দিয়ে, ক্রিসমাসে আলু রাঁধতে গিয়ে, গর্ডন র্যামসি যোগ করে দেন অল্প হলুদ গুঁড়া। এইসব অভিস্রবণ দেখতে বেশ ভালোই লাগে।
দেশে থাকতে কেবল শুনেছি আমাদের কারি (‘চিকেন টিক্কা মাসালা’ ইত্যাদি) ব্রিটিশদের অতি প্রিয় খাদ্য, এতই প্রিয় যে ব্রিটিশরা ‘ন্যাশনাল কারি উইক’ পালন করে, ভোটাভুটি হয় যুক্তরাজ্যের ‘কারি ক্যাপিটাল’ কোন শহর তা নিয়ে, শ্রেষ্ঠ কারি পাব কোনটিতে তা নিয়ে, কিংবা কোন কারি ডিশটি কোন রেস্টুরেন্টের সিগনেচারডিশ তা নিয়ে। মণীষায় প্রায় অতুলনীয় স্টিভেন ফ্রাই তার একটি কমেডি ক্লিপে দেখিয়েছেন, ব্রিটিশরা সারা বেলা কী কী পূর্ণমাত্রায় এবং সত্যিকার অর্থে ব্রিটিশ, সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সন্ধ্যাবেলা ‘গুড ওল্ড ব্রিটিশ টিক্কা মাসালা’ খেয়ে আসতে যায়। জাতের সাড়ে বত্রিশ ভাজা হওয়ার পরে এই দ্বীপরাষ্ট্রে ‘আপনার’ বলতে অনেক কিছুই আসলে পরের কাছ থেকে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা। ২০১৩-এর পরিসংখ্যান মতে ৯ হাজার বাংলাদেশী, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি ‘কারি’ রেস্টুরেন্ট রয়েছে ব্রিটেনে এবং ২৩ মিলিয়ন লোক নিয়মিত এই কারি খায়। হয়তো গোলাপি কাচের ওপাশে ব্রিটিশরা আজো এসব খাদ্যকে দেখে তাদের ভারতবর্ষ আবিষ্কার আর জয়ের চিহ্ন হিসেবে, ঔপনিবেশিকতার কাল ফুরালেও সেকালের জাদু ফুরায়নি। মোটের ওপর কারি রেস্টুরেন্টগুলোর মেনু মুরগির মাংস, ভেড়ার মাংস, কদাচিৎ গোমাংস এবং চিংড়ি মাছ— এই আমিষগুলোর রকমফেরে প্রস্তুত কোর্মা, ভুনা, দোপেঁয়াজা, ধানশাক, ভিন্দালু, ঝালফ্রেজি, টিক্কা মাসালা, তন্দুরি, কড়াই, বালতি কারি ইত্যাদি। টিক্কা মাসালা বা বার্মিংহামের বালতি-কুকিংয়ের মতো অদ্ভুতুুড়ে উদ্ভাবন কখনো এদেরই কারো হাতে ঘটেছিল নিশ্চয়ই। কে ভেবেছিল চিকেন টিক্কার মতো একটি শুখা খাবারকে দই-ক্রিম-টমেটো সস আর দগদগে লাল ফুড কালারের সমুদ্রে নিক্ষেপ করে আরেকটি সুখাদ্য নির্মাণ করা চলে! একেই বলে সৃষ্টিসুখ।
ব্রিটেনে এসে কারি খাওয়ার ভাগ্য আমার হয়েছে, বাঙালি তথা বাংলাদেশীরা বাদে গুজরাটি-উত্তর ভারতীয়-পাঞ্জাবি-কেরালান-মারাঠি-রাজস্থানি-আফগানি-শ্রীলংকান-বর্মি-জাপানি-মালয়-থাই-ইথিওপিও কারি মিলবে এখানে। তবে কারি বলতে লোকে প্রধানত যা বোঝে, তা বাঙালি রেস্টুরেন্টের রান্না করা তরকারি, মোগলাই, পাঞ্জাবি, কাশ্মীরি— যা-ই ডাকা হোক না কেন। কোনোটা খুব করে কষিয়ে শুখা করে রাঁধা এবং টালা মসলার ফোড়ন দেয়া। কোনোটা বেশ খানিকটা ঝোল বা তার বা স্যুপরসে ডুবে থাকা। কোনোটা দই বা নারকেল দুধের ক্বাথে আধডোবা। চিকেন/ ল্যাম্ব/ বিফ/ ফিশ/ প্রণ ইত্যাদি সব আমিষেরই একটি সাধারণ ম্যাট্রিক্স তৈরি করা থাকে, সেটা মসলা আর টমোটো-ধনেপাতার ঝোল (আপনার দুর্ভাগ্য জোরালো হলে পাচক সেই ঝোলে ‘মাদ্রাজ কারি পাউডার নাম্মী এক বহুব্যবহূত চরিত্রহীনকে গুলে দিয়েছে), তাতে সিদ্ধ বা ভেজে ফেলা বা তন্দুরে পাকানো আমিষখণ্ডটি দিয়ে একটু সাঁতলে নিয়ে গরমাগরম পরিবেশন করা হয়। মূল আমিষটিকে দীর্ঘক্ষণ ঝোলে সিদ্ধ করে, মানে যেভাবে আমরা ‘আংসাইয়া’/ ভুনা করে বা কষিয়ে তারপর গরম পানি দিয়ে ঝোল বানিয়ে রাঁধি, সেভাবে এই কারি রান্না করা হয় না। এমনকি স্বনামধন্য মধুর জাফরীও এমনি করেই কারি রাঁধেন। শুধু তাই নয়, আপনার ঝাল-ঝোল-শুক্তো-চচ্চড়িতে মসলার যা কারিকুরি, এই যেমন একটিতে নামানোর সময় আদা বাটা দিলে আরেকটিতে হয়তো রসুনকুচি ভাজা দিতে হবে, অন্য একটিতে পাঁচফোড়নের সম্ভার দেয়ামাত্র ঢেকে দিতে হবে... এসব সূক্ষ্ম হিসাব ভুলে যেতে হবে। নানা দেশের মানুষের স্বহস্তে রাঁধা কারি খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তবে এই পাচকের তালিকায় সর্বনিম্নে স্থান পাবে পূর্ব ইউরোপীয়রা, কারি বলতে তারা বোঝে কারি পাউডারের সঙ্গে এমনকি ইনস্ট্যান্ট নুডলসের ভেতর পাওয়া পুরিয়ার মসলা অব্দি গুলে দিয়ে অতিরিক্ত সিদ্ধ করা আমিষ। কারি পাউডার ছাড়াও সুপারমার্কেটে পাওয়া যায় নানা রকম বোতলবন্দি কারি-সস, যেমন কোর্মা সস, ভিন্দালু সস, ভুনাকারি সস, মাদ্রাজ কারি সস, ঝালফ্রেজি কারি সস, বালতি কারি সস, টিক্কা মাসালা সস, রোগানজুশ সস। মাংস ভেজে এক বোতল সস ঢেলে ফুটিয়ে নিলেই তৈরি শুক্রবার রাতের আয়েশি কারি-ডিনার।
এই গেল কারি; বিরিয়ানি বলে যা বিক্রয় করা হয়, তা দেখতে হয় মাংস পরিবেশিত হওয়ার পরে পাতিল-মাখা ভাত খায় অনেকেই শখ করে— সেই রকমের একটা কিছু। কাচ্চির কৌলীন্য ভুলে যেতে হবে সেই ঘ্যাঁট খেতে গেলে, পাতে আপনি মটরশুঁটি-গাজর-শিমবিচি-সুইট কর্ন-ব্রডবিন-বরবটি ইত্যাদির খণ্ডও পাবেন, আর ছিটানো থাকবে মনভুলানিয়া সবুজ ধনেপাতাকুচি। যাই রাঁধুন, ধনেপাতা হচ্ছে সেই বস্তু, যা ‘সকলি সমান করে’। কয়েক বছর আগেও কাচ্চি বিরিয়ানির নাম এখানে শোনা যেত না, হায়দরাবাদি বিরিয়ানি এবং সেই যে পাতিলমাখা বিরিয়ানি... এই দুইয়েরই দাপট ছিল। বিয়েবাড়ির বনেদি রেজালা ভুলে যান, এখানকার রেজালাতে সিলেটের সাতকড়া-টমেটোসস- নারকেলের দুধ এসব দিয়ে নানা স্বাদের সমাহার বানানো হয় তাকে। কারি যেসব রেস্টুরেন্টে বিক্রি হয়, কিছু ব্যতিক্রম বাদে সেসবের নাম পর্যন্ত ভীষণভাবে ব্রিটিশরাজের হ্যাং-ওভারগ্রস্ত (বেঙ্গল ল্যান্সার), অথবা ভারতবর্ষের নদ-নদীর নাম, রাজবংশের নাম নইলে শালিমার কিংবা তাজমহল কিংবা লালকেল্লা কিংবা কোহিনূর। ভেতরে এন্তার বেজে যায় হিন্দি গান, দেয়ালে নানা দেশের অত্যুজ্জ্বল প্রাকৃতিক দৃশ্য। পরিবেশিত খাদ্যগুলো ভীষণভাবে ভারতীয় বা পারসি— দম আলু, শাগ পনির, ধানশাক, বাটার মাসালা। অথচ রেস্টুরেন্টগুলোর বেশির ভাগের মালিকানা বাংলাদেশী, একদা এগুলোর মালিক ভারতীয়রা ছিল বলে শোনা যায়, মালিকানা বদলেছে, উত্তরাধিকারে বদল আসেনি। নিজের দেশের রান্নার স্বাদ বা পাকপ্রণালি ধীরে ধীরে মূল রান্নায় ঢুকিয়ে দেয়ার প্রয়াস হিসেবে বিলেতের রেস্টুরেন্টগুলোর কষা মাংসের কারিতে সিলেটের আঞ্চলিক রান্নার সাতকড়া, মাছের কারিতে ডেফল ইত্যাদি দেয়া হয়। বাঙালি রান্নায় বহুল ব্যবহূত শর্ষের তেলের নামগন্ধ নেই কোনো রান্নায়। তবে একটি সহূদয় কর্ম তাদের, নিজের ঘরের খাওয়াটুকু সম্পূর্ণ বাঙালি রেখেছেন তারা। তাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণেই বিলেতের কাঁচাবাজারে কলমি শাক-ওলকচু-শাপলা আর বরফশয্যায় খলসে-ট্যাংরা-পুঁটি কি না মেলে! ব্রিক লেনের কিছু রেস্টুরেন্টে ঠিকই মেলে কচুর লতি দিয়ে রাঁধা কুচো চিংড়ি, মেলে জলপাই দিয়ে রাঁধা ছোট মাছের চচ্চড়ি, মেলে শাকের ঘণ্ট কিংবা শর্ষে ইলিশ। কিন্তু সেসব রেস্টুরেন্টের গ্রাহক কেবল বাঙালিরা নিজেরাই। নতুন স্বাদকে সাহসের সঙ্গে মেনুতে আনার পথিকৃৎ নেই তেমন, ব্যতিক্রম দেখেছিলাম একজনকে, তিনি মৃদুলকান্তি দাশ, সকলে ডাকে মনিদা, রেস্টুরেন্টের নামটি নিমাইয়ের উপন্যাস থেকে নেয়া, ‘মেমসাহেব’। রান্নাও ভীষণ প্রত্যয়ী রকমের বাঙাল। তার গুণমুগ্ধদের ভেতরে আছেন ডেলিয়া স্মিথের মতো পাঁড় ব্রিটিশ রাঁধুনিও। এই মানুষটিকে আমি এমনকি ‘পাক-রাজেশ্বর’ নিয়েও কৌতূহলী হতে দেখেছি এবং বিস্মিত হয়েছি।
রিক স্টাইন সরেজমিনে বাংলাদেশে এসে দেখে গেছেন কী করে পুরান ঢাকার লোকে অবলীলায় রাঁধে মহার্ঘ্য কাচ্চি বিরিয়ানি; হায়দরাবাদিরা কেমন করে শিশিরের জলে মিশিয়ে ক্রিম ফেটিয়ে সূর্যোদয়ের আগে ‘নমিশ’ তৈরি করে, সেটা রিক স্টাইন দেখানোর সময় আমার খুব করে মনে পড়েছে পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার লেনের ইতিকথা। নাদিয়া হুসেইন নাম্মী এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী পাচক, যিনি গ্রেট ব্রিটিশ বেক-অফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, তিনি ক’দিন আগে গোটা বিশ্বকে জানিয়েছেন, বাঙালির ঘরে মিষ্টান্নের চল নেই, চল নেই পনিরের। হায়, মিষ্টির রকমারি পদের কথা বাদই দিলাম, নেহাত অনটনের ঘরেও কি আমাদের মিষ্টি পদ নেই? আমাদের মুড়ি-খই-ঢ্যাপের মোয়া, ক্ষীর-নারকেলের ছাঁচ, সরের-তিলের-চিঁড়ের নাড়ু? সে কোন কালে ঝালের নাড়ু কিনে খেতে খেতে রঙ্গর সাথে হাটে যেত বাঙালি! সেকালের বাঙালি রমণী আত্মরক্ষার জন্যে কটোরায় লুকিয়ে রাখত ‘জড়ের লাড়ু’, বিষের নাড়ু! বাঙালির শিকায় বাঁধা থাকত দুধকলা, মোষের দুধের দই যোগে সবরী কলা আর শালিধানের চিঁড়া ছিল তার বন্ধুকে প্রলুব্ধ করার সুখাদ্য। এসব না জেনেই দিব্যি একটি জাতের রন্ধনশিল্পকে যথেচ্ছ অপবাদ দেয়া যায়, যেমন খুশি বলে বেড়ানো যায় তার রাঁধার সুবিশাল ইতিহাসের নামে, তাও রন্ধনশিল্পী হয়ে। কূপমণ্ডূকতা আর যার বেলায় ক্ষমার্হ হোক না কেন, রন্ধনশিল্পীর বেলায় তা ক্ষমার অযোগ্য। আর যে বাংলাদেশের পাকপ্রণালি নিয়ে বাণিজ্য, যে বাংলাদেশের ডিম ভুনায় সিদ্ধ ডিমকে কেন ভেজে নিতে হয়, তা বিবিসিতে দেখিয়ে আত্মপ্রসার, সেই দেশকে নিয়ে মূর্খের উক্তি করাটা বোধহয় আমরাই পারি। সিয়েরা মাদ্রের কোলে কত গাঁয়ে আজো এক হাজার বছর আগের রীতিতে দু’খানা গ্রানাইটের ভেতরে পিষে ভুট্টার নীল আটা তৈরি করা হয়— আমরা রান্নাবান্নার রীতি-রীতকার সব ভাসিয়ে দিয়েছি স্রোতে, বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া শুরুর অনেক আগেই এই আত্মবিস্মরণের শুরু। আমরা স্বাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করি না, গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করি কেবল, এই চেষ্টা আত্মবিনাশী। আপনাকে জানা আমাদের কবেই ফুরিয়েছে, তাই আমাদের কারি ব্যবসায়ের মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে এখন আমরা উল্লেখ করি উপযুক্ত শ্রমিক আমদানি করতে না পারাটাকে। ভুবনপল্লী বহু চমকে ঠাসা, সেখানে আরো চমকপ্রদভাবে আরো আধুনিকভাবে অথচ আরো স্বকীয়তায় নিজেকে বারবার তুলে ধরতে না পারলে সেটা বিশাল অপারগতা।






