খুঞ্জা হুমায়ুন!

নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কেউ কেউ হয়তো আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকি এই মনে করে যে কোথায় যেন নামটি শুনেছি বা পড়েছি। কেউবা আলোছায়ার মতো একটি যোগসূত্র হয়তো খুঁজে পাই, আবার কেউ মেলাতে পারি না। আসলেই তাই! খুঞ্জা হুমায়ুন ইতিহাসের কোন মোড়ে জানি হারালেন। ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটলে কি এই সাহসী বীর মুসলিম নারী যোদ্ধার খোঁজ মিলবে? আবার এটিও সত্য, খুঞ্জা হুমায়ুনকে ঘিরে তথ্যের বেশ অপ্রতুলতা আছে বৈকি। তার পরও দেখি কতটুকু খুঁজে পাওয়া যায় দাক্ষিণাত্যের এই সম্রাজ্ঞীকে।

খুঞ্জা হুমায়ুনের একটি পরিচয় দিলে খুব সহজেই ইতিহাসের পাতায় তার হদিস অনুমেয় হবে। তিনি ছিলেন ভারতের দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর ও আহমেদনগর রাজ্যের রাজপ্রতিভূ এবং ভারতবর্ষের অন্যতম মুসলিম নারী যোদ্ধা সুলতানা চাঁদ বিবির মাতা। আহমেদনগর রাজ্য রক্ষার যুদ্ধে মোগল আগ্রাসন মোকাবেলায় খুঞ্জা হুমায়ুন ও তার কন্যা সুলতানা চাঁদ বিবির রয়েছে অসামান্য অবদান। সুলতানা চাঁদ বিবির পিতা ছিলেন আহমেদনগর রাজ্যের স্বাধীন সুলতান প্রথম হোসেন নিজাম শাহ।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-মধ্য ভারতের ডেকান মালভূমিতে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ একাধিক মুসলিম রাজ্যের অবস্থান। এ রাজ্যগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যোগসূত্র ছিল ইরান, তুরস্ক, পূর্ব আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে। শুধু বাণিজ্য নয়, দাক্ষিণাত্যের সংস্কৃতি, শিল্প, চিত্রকর্ম, কাব্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল ইরান, তুরস্ক ও ইউরোপের দেশগুলো।

১৫৬৫ সালে দাক্ষিণাত্যে এক যুদ্ধ হয়েছিল, যে যুদ্ধ তালিকোটার যুদ্ধ নামে পরিচিত। হোসেন নিজাম শাহ বিজয়নগর থেকে আহমেদনগরে তাঁর দরবারে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন। তালিকোটার যুদ্ধে বীভৎস রক্তপাত হয়েছিল। হোসেন নিজাম শাহ শত্রুর ধড় বর্শার মাথায় গেঁথে আহমেদনগর ফেরেন এবং প্রচুর স্বর্ণ ও রৌপ্য সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।

তবে হুসেন তার বিজয় উপভোগ করবেন বলে আশা করেননি রাজ্যের সদস্যরা। সে বছরই তিনি মারা যান এবং কেউ কেউ তার পরিণতির কারণ হিসেবে অতিরিক্ত মদ্য পানকে দায়ী করেছিলেন। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে গবেষকদের মাঝে দ্বিমত আছে। একজন পর্তুগিজ কাহিনীকার বলেন যে এটি বিষ ছিল; পানীয় ছিল না, যা নিজাম শাহ গ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিষপানকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হোসেন নিজাম শাহের মৃত্যু স্ত্রী খুঞ্জা হুমায়ুনকে রাজনীতির দিকে ধাবিত করে। কিন্তু ডেকানের রাজনীতি শুরু করা খুবই বিপজ্জনক ছিল। নিজাম শাহের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রী, মানে খুঞ্জা হুমায়ুনই দোষী হয়েছিলেন।

বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক জটিলতায় খুঞ্জা হুমায়ুন রাজসিংহাসনে উপনীত হননি, নিজের ছেলেকে বসিয়েছেন। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন সেই লোককে তিনি খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন, যে নিজাম শাহকে হত্যা করেছে। কিছু কিছু ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ খুঞ্জা হুমায়ুনকে দেবদাসী বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এই নারী যোদ্ধা কখনই দেবদাসী ছিলেন না, তিনি সর্ব অর্থেই অসাধারণ এক নারী ছিলেন।

নিজাম শাহের মৃত্যুর সময় আফতাবী স্তুতিকাব্য তারিফ-ই-হুসেন শাহ বাদশাহ-ই ডেকান রচনা করেন এবং এর অনেকটা অংশ জুড়েই ছিল খুঞ্জা হুমায়ুনের প্রতি প্রশংসাবাক্য।

কিছু সুন্দর তৈলচিত্রের (যেখানে দেখা যায় তিনি তার স্বামীর কোলে মাথা রেখা বসে আছেন) পাশাপাশি এই সাহিত্যকর্মটিতে খুঞ্জার প্রেমময়তা ও শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়।

খুঞ্জা হুমায়ুনের বংশ পরিচয় সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যায়। যেটুকু তথ্য ইতিহাসে রয়েছে তা হলো তিনি বাগদাদের একজন শাসকের বংশোদ্ভূত ছিলেন। খুঞ্জার পিতার ক্ষমতা পতনের পর বংশধররা অন্য পার্সিয়ানদের সৈন্যদলে যোগ দিয়েছিল। কিছুসংখ্যক আবার ভারতে পাড়ি জমায় চাকরি ও ভবিষ্যতের সন্ধানে। খুঞ্জাও তাদের সঙ্গে ভারতে চলে আসেন। খুঞ্জা ডেকান রাজ্যের এক মুসলিম রাজা নিজাম শাহের দরবারে যোগ দিয়েছিলেন এবং হোসেনের সঙ্গে খুঞ্জার বিয়ে হয়।

ডেকানের ইতিহাসের পুনর্বিবেচনায় যে কয়জন নারী যোদ্ধা জ্বলজ্বল করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম খুঞ্জা হুমায়ুনের মেয়ে সুলতানা চাঁদ বিবি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে তিনি অসম সাহসিকতায় মোগলদের প্রতিহত করেছিলেন এবং তার করুণ হত্যাকাণ্ডের কারণে তাকে রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

খুঞ্জা অবশ্য কোনো যুদ্ধে মারা যাননি। তার শক্তি ব্যর্থ ও সংযমিত হয়েছিল এবং কয়েক বছর পর কারাগারে মারা যান তিনি। তাকে নিয়ে লেখা হয়নি কোনো আকর্ষণীয় কবিতা। তার নিজের ছেলেই খুঞ্জাকে কারাগারে প্রেরণ করেন। অন্যদিকে মোগলদের প্রতিহত করার পরও চাঁদ বিবি মোগলদের দ্বারাই তার বীরত্বের জন্য মহিমান্বিত হয়ে আছেন আজও।

খুঞ্জার মতো সাহসী যোদ্ধার কেন ইতিহাসে জায়গা হলো না, তা এখনো অস্পষ্ট। পতনের সঙ্গে সঙ্গে খুঞ্জার সব গুণ যেন মিলিয়ে গেল সময়ের আবর্তে। গুটি কয়েক ইতিহাসবিদের লেখনীতে আলগোছে উঠে আসে খুঞ্জা হুমায়ুনের নাম।

সুলতান হোসেন বেঁচে থাকার দিনগুলোতেও খুঞ্জার রাজনীতিতে কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে খুঞ্জাকে নিয়ে একটি কবিতা লেখা হয়। এই কবিতাটিতে তাকে বিজয়নগরের বিরুদ্ধে হোসেনের যুদ্ধের মদদদাতা হিসেবে দেখানো হয়, যা সঠিক নয়।

অবশ্য ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধটি বহু প্রজন্মের কলহকে অনুসরণ করেই হয়েছিল এবং এর বিভিন্ন কারণ ছিল। পণ্ডিত সঞ্জয় সুব্রমনিয়ামের লেখা থেকে জানা যায়, ফাত নামা-ই নিজাম শাহ-এ একটি বাক্যের উল্লেখ আছে খুঞ্জা সম্পর্কে a potentially sexually loaded, কথাটির অর্থ দাঁড়ায় ‘যৌনতার বোঝা’।

দাক্ষিণাত্যের সুলতানরা প্রায়ই বিজয়নগরের সুলতানদের সঙ্গে অপমানজনক ব্যবহার করতেন। একটি উদাহরণে হয়তো সেটি স্পষ্ট হবে। আহমেদনগরের সুলতান খুঞ্জার স্বামী বিজয়নগরের অধিপতি হোসেনের কাছ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের দাবিতে একটি অপমানজনক চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে হীরা ও রুবির পাশাপাশি তার বেগমের মল উপহার হিসেবে পাঠাতে বলেন। বিজয়নগরের সুলতান উপহার পাঠাতে অসম্মতি জানালে বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়ে হোসেনকে আহমেদনগরে ডেকে আনা হয় এবং তাকে হত্যা করা হয়।

যাই হোক না কেন, সুলতানের মৃত্যুর পর আহমেদনগরে খুঞ্জার পুত্র রাজ্য চালাতে থাকেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তার পুত্রের মৃত্যু হয়। তারপর ছয় বছর খুঞ্জা রাজ্য চালাতে থাকেন। খুঞ্জা মনে করতেন তিনি বিশ্বস্ত পুরুষদের সহায়তায় পরিচালিত ছিলেন। কিন্তু খুঞ্জার শত্রু ছিল তার নিজের ভাই।

রাজ্য চালানোর সময় তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। এমনকি চাঁদ বিবির স্বামীর বিরুদ্ধে, যিনি পাশের একটি রাজত্ব শাসন করছিলেন, খুঞ্জাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে।

রাজ্যের অন্য পুরুষরা খুঞ্জার উত্থানকে ভালো চোখে দেখছিল না। নিজের রাজ্যের ১৫৬৭ সালের একটি অভ্যুত্থানকে খুঞ্জা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। তার নিজের ছেলে এতে জড়িত ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে তার মাকে এ চক্রান্ত সম্পর্কে জানায়। শেষে খুঞ্জা বিজয়ী হয়েছিল। তার মতো শক্তিশালী নারী চরিত্রদের অবশ্য সব সময় এই রকম কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে চলতে হয়েছে।

ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, দিল্লির সম্রাট রাজিয়া সুলতানাকে তার নিজের দরবারের লোকেরা হত্যা করেছিল। খুঞ্জার কন্যাকেও হত্যা করেছিল তার নিজের রাজ্যের বিশ্বাসভাজন সভাসদরা।

মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলেও চাঁদ বিবির হত্যাকারী আক্রমণকারী ছিল না, ছিল তার নিজের লোক। খুঞ্জাকেও প্রায় ছয় বছর বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে। খুঞ্জার সঙ্গে রাজ্যর পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিপর্যয় ঘটেছিল। বন্দি থাকা অবস্থায় খুঞ্জার পক্ষে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল না। তারপর এ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছিল: সেখানে ছিল একটি আফ্রিকান দল, একটি পার্সিয়ান দল এবং একটি স্থানীয় দল, তাদের সবক’টিই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল।

খুঞ্জা নিজের রাজ্যের পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত ও ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। তার জীবনের বাকি দিনগুলো বিস্মৃত হয়ে কাটাতে হয়েছিল।

খুঞ্জা হুমায়ুনের বীরগাথা কীভাবে যেন ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে যাওয়ার উপক্রম। তার কাহিনীটির কেবল কয়েকটি টুকরো রয়ে গেছে। তার সম্পর্কে যেটুকু শেষ জানা গেছে তা হলো খুঞ্জাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

ভারতের তরুণ ইতিহাসবিদ মনু এস পিল্লাই খুঞ্জা হুমায়ুনসহ আরো ডেকান মুসলিম নারী যোদ্ধাকে নিয়ে নতুন করে কাজ করছেন। আরো ইতিহাস হয়তো সামনে বেরিয়ে আসবে। ভারতের ইতিহাসে মুসলিম নারী যোদ্ধাদের নিয়ে লেখার সময় অবশ্যই খুঞ্জা হুমায়ুনের নাম স্মরণ করতে হবে। তাকে পাশ কাটিয়ে সেই ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।

 

সহায়িকা :

মনু এস পিল্লাইয়ের প্রবন্ধ Khunza Humayun: A woman ahead of her time

The feisty heroines of the Deccant মুম্বাই মিরর

 

এলিজা বিনতে এলাহী: পর্যটক ও শিক্ষক