মুন্নির সাথে আমার কোনো চেনাজানা ছিল না, হতো না শামসেত তাবরেজী ও ফারুক ওয়াসিফের সঙ্গী হয়ে মুন্নি সেদিন হবিগঞ্জ না এলে। এলেন আবার আমারই অতিথি হয়ে। শামসেত তাবরেজীর সাথে আমার পূর্ব বন্ধুত্বের সূত্রে।
মুন্নির সাথে বন্ধুত্বের তখনই সূত্রপাত। প্রথম দর্শনে মুন্নিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কোন ক্লাসে পড়ে, ও হেসে ফেলেছিল। ওর সন্তানের কথা শুনে অবাক হয়েছিলাম— এত বড় সন্তান আছে ওর!
বোঝাই যায় না। মুন্নি আমাকে তার কবিতার বই উপহার দেয়, আমিও দিই। আমরা একসাথে লাঞ্চ করি, আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়।
নিয়মিত দেখা না হলেও বইমেলায় ওর সাথে দেখা হতোই হতো। গল্পও হতো। কথা হতো লেখালেখি নিয়ে ম্যাসেঞ্জারে। ওর লাস্ট মেসেজটা ছিল মেয়ের এক্সিবিশন নিয়ে। কোনোদিন হয়তো আলাদা করে মাহির গল্প শোনা হয়নি।
কিন্তু এই আমাদের অনিবার্য নিয়তি আফ্রিদা তানজিম মাহি চলে গেলে আমি তার রঙ-তুলির আশ্চর্য জগৎসহ তাকে চিনি। বিস্ময়ে বিমূঢ় হই। অশ্রুতে ভেসে যাই। মেয়েটার সাথে যে কোনোদিন পরিচয় হতে পারত আমার কিংবা নাও হতে পারত। হলেই কী হতো, আরো গভীর থেকে গভীরতম বিষাদই গ্রাস করত কেবল।
এই যে মাহি চলে গেল আর মাহির মা ক্রমাগত তার শোকস্তব্ধ উন্মাদের মতো প্রলাপ ফেসবুকের টাইম লাইনে লিখে যাচ্ছে, আমরা তার সাথে সংযুক্ত প্রতিটি মানুষ কি ডুবে যাচ্ছি না বিষাদের অথৈ গহনে? আমরা কি গত পরশু থেকে কেউ ঘুমাতে পারছি? নিজেদের আত্মজার মায়াবী চেহারা হানা দিচ্ছে না মাহির মায়ের গল্পগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে?
অনেকেই বলছেন, মেয়েকে সময় দিন, কোয়ালিটি সময় দিন। মাহির মায়ের লেখা থেকে জানছি অপূর্ব বন্ধুত্ব ছিল মা-মেয়ের। পারস্পরিক ভাগাভাগি। আগের দিন মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে পাণ্ডুলিপি পড়ে শুনিয়েছেন মুন্নি। মেয়ের সলো এক্সিবিশন। সবাইকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছেন মা। যেতে অনুরোধ করছেন। লিখতে অনুরোধ করছেন। সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের নিউজ কাভার করতে অনুরোধ করছেন। মেয়েও তার পছন্দের মানুষদের লিখতে বলছে। মাহি চলে যাওয়ার পর কেউ কেউ লিখছেন সে কথা।
মাহির মা মুন্নি মেয়ের এক্সিবিশনের দিন স্ট্যাটাস দিয়েছেন— আমরা একসাথে আকাশ ছোঁব মা। আর তার পরই লিখছেন, আমার মেয়েটা ছিল, ছিল মানে ছিল এখন নেই। আহা! কী হূদয় বিদারক সেই আহাজারি হূদয় ছিঁড়ে-ফুঁড়ে ছিন্নভিন্ন করে চলে যায়। তারপর একের পর এক মেয়েকে উদ্দেশ করে কী গগনবিদারী, নাড়ি ছেঁড়া সন্তানের জন্য কী অন্তর চেরা এলিজি।
আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোনো মা আর কোনোদিন মেয়ের মরদেহ সামনে রেখে লিখে যেতে পারবে এমন অমূল্য পঙিক্তমালা। এক আত্মজার জন্য জননীর কান্না হয়ে সাহিত্য হয়ে উঠেছে অনবদ্য কথামালার সম্পদ।
মাহির মৃত্যুর পর সব মায়েরা নড়েচড়ে বসেছেন। সময়ের চাকা কি পেছনে ঘোরে? সমাজে পুঁজিবাদিতার সম্প্রসারণে, সামন্তচক্রের আধাআধি টিকে থাকার কারণে পিতা-মাতাকে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। আবার ছেলেমেয়ের যেকোনো অনর্থের কারণেই আঙুল তোলা হচ্ছে পিতা-মাতার দিকে। নারীরা-পুরুষরা কীভাবে মূল্য চুকাবে আর এই অস্থির ব্যবস্থার?
কেবল আহাজারি ছাড়া?
যতদূর জানি, আর্থিক টানাপড়েন ছিল না মেয়েটির, পারিবারিক কোনো আপত্তি ছিল না তার সৃষ্টিশীল কর্মে। অস্ট্রেলিয়ায় বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়ার কথা মেয়েটির। কলাকেন্দ্রে শুরু হয়েছে তার সলো প্রদর্শনী। ঠিক এই সময়টা সে বেছে নিয়েছে নিজেকে শেষ করার জন্য। কিন্তু কেন? কেউ জানে না এ প্রশ্নের উত্তর।
আমাদের সন্তানদের ক্ষরণটি ঠিক কোথায়? সব পাওয়ায় নাকি না পাওয়ায়? নাকি এই পারস্পরিক ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার উন্মেষ আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আমাদের এই মেধাবী ছেলেমেয়েগুলোকে স্বেচ্ছামৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে? কী বলেন মনোবিজ্ঞানীরা, সমাজতত্ত্ববিদেরা? উত্তর খুঁজে বের করার সময় এসেছে।
নইলে ঘরে নুন-পান্তার প্রয়োজন রেখে মায়েদের বলবেন, ঘরে থাকুন। সন্তানদের সময় দিন, এই পারস্পরিক সাংঘর্ষিক দায়ই বা কতদিন মায়েরা বহন করবে।
আসুন সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রকে চাপ দিই, আমার সন্তানের সুষ্ঠু শৈশব নিরাপদ কৈশোর আর স্বপ্নময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন জিইয়ে রাখার জন্য। আমাদের অনিন্দ্য জীবনের অধিকারী সন্তানদের এই হতাশাময় জীবনের আত্মবলিদান মোটেই কেবল পিতা-মাতার দায় নয়।
“আমাদের সন্তানদের ক্ষরণটি ঠিক কোথায়? সব পাওয়ায় নাকি না পাওয়ায়? নাকি এই পারস্পরিক ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার উন্মেষ আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আমাদের এই মেধাবী ছেলেমেয়েগুলোকে স্বেচ্ছামৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে? কী বলেন মনোবিজ্ঞানীরা, সমাজতত্ত্ববিদেরা? উত্তর খুঁজে বের করার সময় এসেছে”






