লিবিয়ার জাওয়াইত
জানজুরে ১৮৫৮
সালের ২০
আগস্ট জন্মেছিলেন
ওমর আল
মুখতার। ‘ওমর
মুখতার, আপনার
শাস্তি প্রকাশ্যে
ঝুলিয়ে মৃত্যু’—জল্লাদগোষ্ঠীর
এ কথার
উত্তরে তিনি
জানান, ‘আমরা
সৃষ্টিকর্তার কাছ
থেকে এসেছি,
তার কাছেই
ফিরে যাব।’
এই ছিল
ওমর মুখতারের
উচ্চারিত শব্দ,
যখন তিনি
জানলেন মৃত্যু
নিশ্চিত। কিন্তু
কে ছিলেন
ওমর মুখতার?
তিনি ছিলেন
ইসলামী স্কলার
ও বিপ্লবী।
প্রায় ২০
বছর চাইরেনাইচা,
যাকে এখন
আমরা পূর্ব
লিবিয়া বলে
জানি, সেখানে
ইতালিয়ান আগ্রাসনের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
গড়ে তুলেছিলেন।
সাধারণ্যে ‘মরুভূমির
সিংহ’ নামে
খ্যাত ওমর
প্রথম জীবনে
ইসলামকে তন্নিষ্ঠভাবে
অধ্যয়ন করেন
এবং তারুণ্যেই
বিশেষজ্ঞ হয়ে
ওঠেন। তিনি
আল কোরআনের
শিক্ষক হিসেবে
নিয়োজিত করেছিলেন
নিজেকে, ১৯১১
সালে ৫৩
বছর বয়সে
স্বদেশে ইতালিয়ান
আগ্রাসনের বিরুদ্ধে
প্রস্তুত করলেন
নিজেকে প্রতিরোধ
যোদ্ধা হিসেবে।
শিক্ষকজীবনের নিশ্চিতি
ঘুরে গেল
প্রতিরোধ যোদ্ধার
অনিশ্চিতিতে। ওমর
তার অল্প
কয়েকজন অনুসারী
নিয়ে অসম
যুদ্ধে লিপ্ত
হলেন। তারা
কৌশলী তত্পরতায়
টহলচৌকি তছনছ
করে দেন।
সেনাদের অতর্কিত
হামলায় ফেলেন
আর প্রয়োজনীয়
পণ্য সরবরাহ
ব্যবস্থা ছিন্ন
করে দেন।
তার অর্ধেক
বয়সী ইতালিয়ান
রয়াল আর্মি
হতবাক হয়ে
যায়। ২০
বছর সশস্ত্র
যুদ্ধের পর
৭৩ বছর
বয়সে এক
যুদ্ধে আহত
অবস্থায় ধরা
পড়েন। তাকে
লুব্ধ করার
প্রভূত আয়োজন
বিদ্যমান ছিল,
কিন্তু তিনি
সব ক্ষেত্রেই
বলেছিলেন, ‘আমরা
কখনই আত্মসমর্পণ
করব না।
হয় জিতব
নয় মরব।’
লায়ন অব
দ্য ডেজার্ট সিনেমায়
আমরা দেখি,
ক্ষমতার সর্বোচ্চ
চূড়ায় বসে
থাকা মুসোলিনি।
এই সেই
মুসোলিনি যাকে
সারা পৃথিবী
চেনে উদ্ধত,
গোঁয়ারগোবিন্দ, উচ্চাভিলাষী
এক মানুষ
হিসেবে।
অলিভার রিড, জেনারেল গ্রাজিয়ানির চরিত্রের অভিনেতা ইতালিয়ান জেনারেলদের ভাবভঙ্গি অনুকরণ করে গিয়েছেন আগাগোড়া। ১৯৪১ সালে তাদের কপাল থেকে সৌভাগ্য উধাও হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এমনই ছিলেন। মুখতার ঐতিহাসিকভাবেই এমনকি তার সমকালীনদের মধ্যেও কম চেনা ছিলেন। তার বিদ্রোহ ত্রিশের দশকের বড় সব ঘটনার তলায় প্রায় বিস্মৃত, যেমন ইতালির ইথিওপিয়ায় আগ্রাসন ও অস্ট্রিয়া আর চেকোস্লোভাকিয়ায় জার্মান দখলদারি। এ সিনেমায় রীতিসম্মতভাবেই মুখতার অধিক সংবেদন অর্জন করেন দর্শকদের কাছ থেকে, সেরা সংলাপগুলো তার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছে। দুদিক থেকেই বিচার করতে গেলে চলচ্চিত্রটি কেমন? এখানে বলতেই হয়, লায়ন অব দ্য ডেজার্টের অন্যতম মহাভুল হলো, আরবরা কখনো এত ভালো ছিল না কিংবা ইতালিয়ানরা এত খারাপ নন, সিনেমায় আমরা যেমনটি দেখে উঠলাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইতালিয়ান আগ্রাসনকারীদের নিষ্ঠুর ও দুর্বল চরিত্রের লুটেরা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যারা কিনা লুটপাটে পারঙ্গম ও প্রতিরোধের সামান্যতম ইশারাতেই ল্যাজ গুটিয়ে পালায়। তারা কিন্তু পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সৈন্য আর জেনারেলদের মোকাবেলা করেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লিবিয়া শাসন করেছে। এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, মুখতারবিরোধী আন্দোলন ঘটিয়ে তুলতে সিনেমায় দেখানো দৃশ্যের মতো তারা নিয়ম-শৃঙ্খলাহীন অকর্মণ্য ছিল। জানার জন্যই বলা, লিবিয়ায় ইতালিয়ান আগ্রাসনের চেষ্টা দেখানো হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের মতো, যখন পাশাপাশি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ আর মরক্কোয় ফরাসিদের। ইতালিয়ানদের এমনভাবে উপস্থাপন শিশু ভোলানো ছড়ার মতো। লায়ন অব দ্য ডেজার্ট সিনেমায় বন্দিদের মাস কিলিং আর মেশিনগানারদের দেখিয়েই সিনেমার অর্ধেক হাপিস। অথচ অনেকের মনে পড়বে, ১৯৩৫ সালের সিনেমা দ্য ইনফর্মার ফ্র্যাংকি ম্যাকফিলিপের একটিমাত্র খুনের ঘটনা দেখিয়ে বিশের দশকে ডাবলিনের কালোদের বিষয়ে আমাদের জ্ঞাতব্য সব বলে দিতে পেরেছিল। লায়ন অব দ্য ডেজার্ট আরো সত্যের সন্নিকট ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারত, যদি পরিচালক এটা মনে রাখতেন।
একই রকম
সিনেমা প্রায়
শেষ হয়ে
আসার সময়
বিদ্রোহীরা মুখতারের
নেতৃত্বে প্রায়
অপরাজেয় হয়ে
ওঠে। আর
তারা কারণ
ছাড়াই শত্রুদের
প্রতি অপরিমেয়
দয়ালু হয়ে
ওঠে। কিন্তু
সে সময়ের
কথা যাদের
মনে আছে
তারা জানেন,
আরবরা আসলে
বাধ্যগতভাবেই ইতালিয়ান
বন্দিদের বিনাশ
ঘটিয়েছিল, ইথিওপিয়ানরাও।
কিন্তু এ
ধরনের কোনো
ইঙ্গিত সিনেমায়
নেই এবং
একইভাবে ইতালিয়ানদের
নিষ্ঠুরতারও কোনো
উদ্দেশ্য প্রদর্শিত
হয়নি। এসব
অতিসরলীকরণ ছাড়া
প্রযোজক-পরিচালক
মুস্তফা আকদ
প্রায় বিস্মৃত
এ ইতিহাসের
ব্যাপক বিচ্যুতি
ঘটাননি। তিনি
একজন আরব,
ফলে মুখতার
ও তার
অনুসারীদের জন্য
নিজস্ব সহানুভূতি
থাকবেই, যা
ঐতিহাসিক ঘটনার
ভিত্তিতে নির্মিত
চলচ্চিত্রের প্রামাণ্যতার
ভারসাম্য টলিয়ে
দিতে পারে।
তিনি আমাদের
জানান, কর্নেল
মুয়াম্মার আল
গাদ্দাফির নেতৃত্বাধীন
লিবিয়ান সরকার
যিনি কিনা
ফিলিস্তিন মুক্তিকামী
সংগঠনের অন্যতম
প্রধান আর্থিক
সহায়তাকারী, তিনি
এই ৩৫
মিলিয়ন ডলার
প্রযোজনায় ফুটো
পয়সাও সহযোগিতা
করেননি। যা
হোক, পরিচালক
এক সাক্ষাত্কারে
জানান, লিবিয়ান
সরকার লোকেশনে
তাদের স্বাগত
জানায়। কতিপয়
চলচ্চিত্রপ্রেমিক বিস্মিত
হয়ে ভাবেন,
সিনেমাটা আরব
প্রচারযন্ত্রের ধারকবাহক
হতে যাচ্ছে
কিনা! সুনির্দিষ্টভাবে
বলতে গেলে,
সিনেমাটি নির্মাণকালের
বাস্তবতার সাথে
তার কোনো
যোগাযোগ ছিল
না। লায়ন অব
দ্য ডেজার্ট খুবই
সুন্দর করে
সাম্রাজ্যবাদী তত্পরতার
বাহ্যিক জাঁকজমক
পুনর্নির্মাণ করে,
প্রচুর পয়সা
খরচ করে
মরুভূমিতে যুদ্ধের
দৃশ্যগুলোও স্মরণীয়ভাবে
তোলা হয়েছে।
গ্রাজিয়ানি
ছিলেন মরুভূমির
যুদ্ধে প্রথম
আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র
ব্যবহারকারী জেনারেল।
প্রথম প্রচেষ্টায়
পরাজিত ও
মুসোলিনির কাছে
তিরস্কৃত হয়ে
তিনি ট্যাংক,
আর্মার্ড কার
আর হালকা
বোম্বার ব্যবহার
করেন। তিনি
আকদের মতে
বিদ্রোহীদের দমন
করতে বিষাক্ত
গ্যাস আক্রমণ
চালান। সিনেমা
থেকে অবশ্য
এ দৃশ্য
বাদ গিয়েছে।
কেননা এমনিতেই
অত্যন্ত দীর্ঘ
হয়ে যাচ্ছিল
চিত্রমালার দৈর্ঘ্য।
ইতালিয়ানরা গ্যাস
ব্যবহার করেছিল
যুদ্ধে, আকদের
এ মত
বিশ্বাসযোগ্য। তারা
লিবিয়ানদের চেয়ে
সামান্য উন্নত
ইথিওপিয়ানদের বিরুদ্ধে
মারণ গ্যাস
ব্যবহার করেছিল।
গ্যাস হয়তো
আরব গ্রামগুলোতে
কার্যকর, কিন্তু
খোলা মরুভূমিতে
ছুটন্ত অশ্বারোহীর
বিরুদ্ধে প্রয়োগ
সমস্যাজনক। যুদ্ধের
দৃশ্য চমত্কারভাবেই
বাস্তবসম্মত। যুদ্ধের
বড় অংশটি
স্মরণ করুন—কুফরার
মরূদ্যানের দখল—গ্রাজিয়ানি
পূর্ণ সামরিক
পোশাকে বড়
আক্রমণ ঘটিয়ে
তোলেন। প্রথমে
ইতালিয়ান বাইপ্লেনের
বোম্বিং। তারপর
আর্টিলারি ব্যারেজ।
শেষ পর্যন্ত
মরূদ্যানটি হস্তগত
হলো এবং
ইতালিয়ান ট্যাংক,
আর্মার্ড কার,
সৈন্যদল মিলে
ধ্বস্ত করে
দিল। যুদ্ধ
দৃশ্য এতটা
বাস্তবোচিত হওয়ার
কারণ হলো,
প্রযোজক ইংল্যান্ডের
কর্নওয়েলের মিলিটারি
ভেহিকল লিমিটেড
মিউজিয়ামে গিয়ে
তত্কালীন সময়ের
প্রতি অনুগত
থেকে পুরো
সিনেমার সমরসজ্জা
ঘটিয়েছেন। কাকতালীয়ভাবেই
১৯৪১ সালে
ইতালিয়ান সৈন্যদল
একই বক্স
ফর্মেশনে অগ্রসর
হচ্ছিল, কিন্তু
ব্রিটিশরা ব্যাপারটার
হেস্তনেস্ত করতে
পারলেও সংখ্যায়
কম কুফরার
আরবরা পারেনি।
অসামান্য যুদ্ধ
দৃশ্য ছিল
ইতালিয়ান দুর্গে
রাতের হামলা,
গ্রাজিয়ানির ইতালিয়ান
সৈন্যদল আর
মুখতারের অশ্বারোহীদের
মরুভূমিতে যুদ্ধের
দৃশ্য বিপুল
সমরাস্ত্রসমৃদ্ধ শক্তির
বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধের
প্রকৃতি বাস্তব
করে তোলে।
মুখতারের সৈন্য
সংখ্যা কমতে
থাকে। একপর্যায়ে
তার ঘোড়াকে
গুলি করা
হয়, তিনি
আহত অবস্থায়
ধরা পড়েন।
তাকে গ্রাজিয়ানির
কাছে নিয়ে
যাওয়া হয়।
দৃশ্যমানভাবে প্রতিরোধযুদ্ধের
সংকল্প এখানেই
সমাপ্ত। কিন্তু
সিনেমা যা
বোঝাতে চেয়েছে
তা হলো,
ফ্যাসিবাদী অভিবাদন
আর যাবতীয়
স্বৈরাচারী যুদ্ধবিগ্রহের
পরও কোনো
প্রতিরোধ লড়াইই
পরিপূর্ণভাবে শেষ
হয় না।
ঠিক এ
জায়গাতেই চলচ্চিত্রটি
বিশেষ হয়ে
ওঠে। হয়ে
ওঠে আন্তরিক।
সৈকত
দে: কবি ও চলচ্চিত্র সমালোচক





