আমরা তোমার
শান্তিপ্রিয় শান্ত
ছেলে
তবু বিপদ
এলে অস্ত্র
হাতে লড়তে
জানি
তোমার ভয়
নেই মা
আমরা প্রতিবাদ
করতে জানি
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জনপ্রিয় এই গানের কলি বাঙালির সমর চরিত্র সম্পর্কে খুব ভালো একটা ধারণা দিতে পারে। বাঙালি এমনিতে শান্তিপ্রিয়; যুদ্ধবিগ্রহ পছন্দ করে না খুব একটা। নিজেদের মতো করে থাকতেই পছন্দ করে। দিনশেষে ‘মাছে-ভাতে’ কিংবা ‘দুধে-ভাতে’ পেটপুরে খেতে পেলে আর কোনো চাহিদা নেই। অন্যের রাজ্যের প্রতি তেমন কোনো লোভও নেই। ইতিহাস বলছে, বিশাল এই ভারতবর্ষে পূর্ব প্রান্তের এই জনপদের রাজারা কখনো সেভাবে হাত বাড়াননি পশ্চিমের দিকে, বরং উত্তর-পশ্চিম থেকেই বারবার এসেছে আক্রমণ। তবে সেই আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে বাঙালিরা আবার পিছপা হননি কখনো!
বাঙালির এই চরিত্রের গল্পটা সবচেয়ে আগে লিখিতভাবে তুলে ধরেছেন গ্রিকরা। গ্রিক বীর আলেকজান্ডার বিশ্বজয় করতে বেরিয়ে এসেছিলেন ভারতবর্ষেও। এই ভারতবর্ষের গঙ্গা নদীর তীরে এসে থেমে গিয়েছিল তার অভিযান। কেন? প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস লেখক ডায়োডোরাস (খ্রি.পূ. ৬৯-১৬ খি.) তার বিবলিওথিকা হিস্টোরিকা বইয়ের একাধিক স্থানে লিখেছেন, গঙ্গারিডাই রাজ্যের সামরিক সামর্থ্যের কথা। তিনি লিখেছেন, গঙ্গারিডাই রাজ্যের সেনাবাহিনীর মূল শক্তি ছিল তাদের হস্তীবাহিনী, প্রায় চার হাজার হাতি নিয়ে সাজানো এই সেনাদলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়নি রণক্লান্ত গ্রিক বাহিনী। কোথায় ছিল এই গঙ্গারিডাই রাজ্য, কোথায়ই বা ছিল এর রাজধানী গাঙ্গে, সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে ভৌগোলিক বিবরণের সূত্র ধরে এ কথা অন্তত বলাই যায় যে এই গঙ্গারিডাই রাজ্য ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় নদীর তীরবর্তী ছিল এবং পশ্চিম দিক থেকে আসা গ্রিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা শেষ হয়েছিল ভারতের পূর্ব প্রান্তেরই কোথাও। সেই বিবেচনায় গঙ্গারিডাই আর বাংলাকে অভিন্ন বলেই ধরে নেয়া অযৌক্তিক হবে না। ডায়োডোরাস তার এই বর্ণনা লিখেছেন মেগাস্থিনিসের বর্ণনার সূত্র ধরে। আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতবর্ষে আসা মেগাস্থিনিসের মূল বর্ণনা অবশ্য হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে; তবে ডায়োডোরাসের বর্ণনা থেকে এ কথা বলাই যায়, খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছর আগেই বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল, যাদের ছিল চার সহস্রাধিক হাতি নিয়ে গঠিত শক্তিশালী সেনাবাহিনী। এমন শক্তিশালী যে আলেকজান্ডারের বিশ্বজয়ী সেনাদলও তাদের সঙ্গে লড়তে চায়নি!
গ্রিক এই বর্ণনায় অবশ্য সরাসরি বাংলা নামটি নেই। বাংলাকে খুঁজে পেতে আমাদের লম্বা একটা লাফ দিয়ে চলে আসতে হবে চৌদ্দ শতকে, যখন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে বাংলায় মুসলিম সুলতানদের সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। ইলিয়াস শাহ-ই প্রথম শাসক, যিনি নিজেকে বাংলার শাসক, ‘শাহ-ই-বাঙালা’ হিসেবে দাবি করেছেন। তেরো শতকে মধ্য এশিয়া থেকে এসে যারা বাংলার শাসন-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তারা বাংলার স্থানীয় লোক ছিলেন কিনা, এ নিয়ে সম্প্রতি অনেক কথাবার্তা হচ্ছে স্কুলের পাঠ্যবইকে কেন্দ্র করে। তবে তারা বাইরে থেকে এসেছিলেন কিনা, এই প্রশ্ন ছাপিয়ে সম্ভবত চৌদ্দ শতকে তাদের উত্তরসূরি সুলতানদের ‘বাঙালি’ হয়ে ওঠার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। বাঙালির আত্মপরিচয় গঠনে সুলতানি বাঙলার শাসকদের নীতি যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর সেই নীতিরও অন্যতম অনুষঙ্গ তাদের সমরনীতি। দিল্লির সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিল্লিতে বসে লেখা ইতিহাস তারিখ-ই-ফিরোজশাহীতে ইলিয়াস শাহের পদাতিক বাহিনীকে নিয়ে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হোক, এই ‘পাইক-বরকন্দাজ’দের নিয়েই কিন্তু তিনি রুখে দিয়েছিলেন আক্রমণকারী ফিরোজ শাহ তুঘলকের ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে।
তাহলে দাঁড়াল কী? আড়াই হাজার বছর আগে বাংলার সেনাবাহিনীর মূল শক্তি ছিল তাদের হস্তীবাহিনী, আর মধ্যযুগে এসে দেখা যাচ্ছে যে বাংলার সুলতানরা নির্ভর করছেন তাদের পদাতিক বাহিনীর ওপর। এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় যোগ করে নিতে হবে, যার মূল্য হাড়ে হাড়ে বুঝেছিল আরো কিছুদিন পর ষোলো শতকে বাংলা জয় করতে আসা মোগলরা। তাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল নদীমাতৃক বাংলার নৌবাহিনী।
কিন্তু নৌকা বা হাতির পিঠে চড়ে কিংবা হেঁটে যারা যুদ্ধ করত, তাদের হাতে আসলে অস্ত্র বলতে থাকত কী? তেরো শতকে মধ্য এশিয়া থেকে এসে যে মুসলিম যোদ্ধারা ভারতবর্ষকে জয় করেছিলেন, তাদের রণকৌশল ছিল ঘোড়সওয়ারকেন্দ্রিক। ঘোড়ার পিঠে চড়ে যারা যুদ্ধ করতেন, তাদের অস্ত্র আর পদাতিক বা হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধ করার অস্ত্র কিন্তু এক রকম নয়। নৌবাহিনীর অস্ত্র তো অবশ্যই অন্য রকম।
প্রাচীন ভারতীয় পরিভাষায় অস্ত্র আসলে দুই রকম। অস্ত্র আর শস্ত্র। অস্ত্র হলো এমন হাতিয়ার, যা দূর থেকে ছুড়ে মারতে হয়। আর শস্ত্র হলো ব্যক্তিগত হাতিয়ার, যা হাতছাড়া করার সুযোগ নেই, মুখোমুখি দ্বৈরথে কাজে লাগানো হয়। মধ্য এশীয় যোদ্ধারাও এই দুই ধরনের অস্ত্রই ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ঢাল আর তলোয়ার। ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ঢাল-তলোয়ার এক অমোঘ অস্ত্র। সঙ্গে ছিল লম্বা ডাঁটের চোখা অস্ত্র, জ্যাভেলিন বা বর্শা। মধ্য এশীয়রা ঘোড়ার পিঠে চড়ে তীর ছোড়াতেও খুব দক্ষ ছিল। মজার ব্যাপার, ঘোড়সওয়ার ধনুর্বিদরা যে অস্ত্রটি ব্যবহার করে তীর ছুড়তেন, ফারসি ভাষায় তার নাম কামান! কামান আর ধনুক যে অভিন্ন অর্থে ব্যবহার হতো, মধ্যযুগের বাংলা কবিতা থেকেও তার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সুলতানি বাংলার বিখ্যাত কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা কাব্যগ্রন্থে যেমন লেখা হয়েছে,
দিব্য
ধনু বান
হাতে কনক
ভূষিত,
সুবলিত
সর্বতনু চন্দনে
চর্চিত \
টোন ভরি
দিব্য শর
হাতেত কামান,
হেমমুষ্ঠি
দিব্য খর্গ
বিজুত সমান
\
মোগলদের বর্ণনায়ও এই ‘কামান’-এর বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
মুসলিম বিজেতাদের মতোই বাংলার নৌবাহিনী ও হস্তীবাহিনীর কাছেও দারুণ জনপ্রিয় ছিল এই ‘কামান’। বাংলা নাম অবশ্যই ধনুক। সেই আলেকজান্ডারের যুগেই বাংলার সেনাবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারে এর গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। গ্রিক বর্ণনায় সরাসরি এই ধনুকের কথা বলা না হলেও বলা হয়েছে গঙ্গারিডাইর যোদ্ধারা যে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতেন, সেগুলো বাঁশের তৈরি ছিল।
বাঁশ দিয়ে ধনুক তৈরির কৌশল গ্রাম-বাংলায় আবহমান কাল ধরেই প্রচলিত। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে ধনুক তো বটেই, এর সাহায্যে ছোড়া তীরও বাঁশ দিয়েই তৈরি করার কৌশল বর্ণিত হয়েছে। এই তীরের সংস্কৃত নাম শর, যা তৈরি করা হতো বাঁশের কঞ্চি বা নলখাগড়ার টুকরোর অগ্রভাগকে সূক্ষ্ম ছুরির সাহায্যে কেটে তীক্ষ্ম ফলা তৈরি করে। বাঙালি যোদ্ধাদের তূণে এই শরের অভাব থাকত না, আর অগ্রভাগ সূক্ষ্ম হওয়ায় এই শর ছুটত ‘বিভ্রান্তিকর নীরবতায়’। জলা-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ছিপ-নৌকায় আরোহী ধনুর্বিদদের হাত থেকে কখন যে কোন দিক থেকে ছুটে আসত বিষমাখা তীর, অনভ্যস্ত আক্রমণকারীরা সেটা বুঝতেই পারতেন না।
বাঙালির ধনুর্বিদ্যা ছিল তাদের তিন ভিন্ন রেজিমেন্ট, পদাতিক, নৌবাহিনী আর হস্তীবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করার কৌশলে খুব দক্ষ ছিল না তারা, মধ্য এশিয়া থেকে আসা তুর্কি যোদ্ধাদের যেটা ছিল প্রিয় কৌশল। আরো একটা জায়গায় তুর্কি ঘোড়সওয়াররা এগিয়ে ছিল—তাদের তীরের ফলা ছিল ধাতব, তাই তুলনামূলক বেশি কার্যকর। তুর্কিদের কাছ থেকে এই কৌশল আত্মস্থ করতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি বাঙালিদের। বাংলার সুলতানদের সময় থেকেই যে তারা ধাতব ফলাযুক্ত তীর ব্যবহার করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে তীর ছুড়তেও তারা আগে থেকেই জানত বলেই মনে হয়, কারণ নবম শতকে তৈরি করা সোমপুর বৌদ্ধবিহারের গায়ে সজ্জিত পোড়ামাটির ফলকে আমরা দেখতে পাই ঘোড়ার পিঠে চড়ে তীর ছুড়ছেন এমন যোদ্ধার প্রতিকৃতিও।
বাঁশ দিয়ে তৈরি অন্য একটি অস্ত্র (প্রকৃতপক্ষে শস্ত্র) বাংলার পাইকদের প্রিয় হাতিয়ার ছিল। তারিখ-ই-ফিরোজ শাহীতে বলা হয়েছে শরকি, বাংলায় বর্শাফলক। বিভিন্ন রকমের বর্শার ব্যবহার জানত বাঙালিরা। এর ব্যবহার হতো অস্ত্র ও শস্ত্র, দুই ধরনের হাতিয়ার হিসেবেই। অর্থাৎ, দূর থেকে ছুড়ে মারা কিংবা হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষ আঘাত করা, দুই কাজেই এর ব্যবহার ছিল। অনেক বৈচিত্র্য এই বর্শাফলকের। তবে বাংলায় সবচেয়ে বেশি প্রচলন ছিল শূল আর শক্তি—এ দুই ধরনের বর্শার। এর মধ্যে শূল হলো মূলত একটি সুচি-সূক্ষ্ম ফলাযুক্ত অস্ত্র, যার অগ্রভাগ সুঁইয়ের মতো তীক্ষ্ম। আর শক্তির অগ্রভাগে যুক্ত করা হতো হীরকাকৃতির চারধারী ফলা, সাধারণত ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হতো সেটা। অস্ত্র হিসেবে শূল আর শস্ত্র হিসেবে শক্তির ব্যবহার বেশি জনপ্রিয় ছিল, যদিও উল্টোটাও করা হতো প্রায়ই। আর সুলতানি আমল থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল শূলের অগ্রভাগ হিসেবেও ধাতব ফলা যুক্ত করা। বাংলার শাসকদের দণ্ডবিধিতে ‘শূলে চড়ানো’ কথাটির অর্থ আসলে এই রকম একটি সুঁইয়ের মতো তীক্ষ্ম ফলাযুক্ত অস্ত্রের সাহায্যে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি।
খুব বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই, তবে বাংলায় আরেক ধরনের অস্ত্রের কথা বিভিন্ন সূত্রে প্রচুর উল্লেখ আছে, গদা বা মুদগার। লম্বা একটি বাঁশের অগ্রভাগে অনেক ভারী একটি কাঠের (কখনো কখনো ধাতব) গোলক যুক্ত করে তৈরি করা হতো এ অস্ত্র। এটি পরিচালনা সাধারণ যোদ্ধাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, এজন্য লাগত শক্তিমান যোদ্ধাদের।
বাংলার যোদ্ধাদের কাছে ঢাল মানেও কিন্তু আসলে ছিল বাঁশ দিয়ে তৈরি এক ধরনের প্রতিরোধক। আমাদের আধুনিক পুলিশ বাহিনীর হাতে এই ধরনের ঢাল এখনো ব্যবহার হয়। প্রাচীন যুগে ধাতব অস্ত্র-শস্ত্র বিশেষ করে সহজলভ্য লোহা ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করার আগ পর্যন্ত প্রতিরোধক ঢাল তৈরিতে বাঁশ, কাঠ আর শক্ত চামড়ার ব্যবহারই জনপ্রিয় ছিল। তবে তেরো শতকে মুসলমানদের আগমনের পর থেকে ধাতব ঢালের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ ততদিনে এই অঞ্চলে শুরু হয়ে গেছে সত্যিকারের লৌহযুগ।
ধাতু গলিয়ে ছাঁচে ফেলে প্রয়োজনীয় আকার-আকৃতির ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরির কৌশল আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আসলে আগুনের ব্যবহারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি। ভারতবর্ষে লোহার আকর মোটামুটি সহজলভ্য, বাংলায়ও লোহার আকর পাওয়া যেত। কিন্তু সমস্যা হলো সেই আকরকে ভেজালমুক্ত করে গলিয়ে লোহা বানাতে যে পরিমাণ তাপ লাগে, বাঙালি সেই তাপ উৎপাদনকারী চুল্লি বানাতে শিখেছে তুলনামূলক দেরিতে। তাই প্রাচীন বাংলায় লোহার বহুল ব্যবহার দেখা যায় না। বরং রান্না ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য মাটি দিয়ে আর শস্য সংরক্ষণসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য তৈজসপত্র তৈরি করা হতো বাঁশ-বেত দিয়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এনবিপিডব্লিউ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের চকচকে মৃৎপাত্র তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে গিয়েই এ অঞ্চলের মানুষ বিশেষ ধরনের আবদ্ধ চুল্লির ব্যবহার শিখেছিল, যে চুল্লির তাপে আসলে লোহার মতো ধাতুকে গলানো সম্ভব। তেরো শতকে মুসলমানদের আগমনের আগেই এ বিদ্যার প্রসার ঘটেছিল। আর মুসলিম শাসকদের চেনা অস্ত্র, ঢাল-তলোয়ার-কামান (ধনুক) তৈরিতে এ কৌশলের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছিল। ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসেবে প্রাক-মুসলিম যুগে কিন্তু হাল্কা ও সুতীক্ষ তরবারির ব্যবহার অতটা প্রচলিত ছিল না বাংলায়। বাংলার স্থানীয় অস্ত্র ছিল ‘দাও’, ‘খড়্গ’ ও ‘কৃপাণ’। কৃপাণ আসলে তরবারিরই এ-দেশীয় পূর্বসূরি। তবে দাও আর খড়্গ যতটা না যুদ্ধাস্ত্র ছিল, তার চেয়ে বেশি করে ব্যবহার হতো নানা ধরনের ধর্মাচারে, বিশেষ করে বলির অস্ত্র হিসেবে।
ইংরেজিতে যেটাকে বলে ড্যাগার, সেই ধরনের ছোট আকারের ব্যক্তিগত অস্ত্র অবশ্য ধাতব পদার্থ দিয়েই তৈরি হতো বাংলায়ও। বিভিন্ন ধরনের ড্যাগারের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে আকৃতি ও নামে যেসব ভিন্নতার দেখা পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই আসলে মুসলমানদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা। বাংলায় আগে থেকে ব্যবহূত আকৃতির দিক থেকে কাটারি নামের এক ধরনের ক্ষুদ্র অস্ত্রের কথা জানা যায় বিভিন্ন সূত্র থেকে। ইবনে বতুতার বর্ণনায়ও আছে যে, বাংলার হিন্দুরা কাতারাহ নামে এক ধরনের ক্ষদ্র আকৃতির তরবারি ব্যবহার করত। একে তরবারি বলার অন্যতম কারণ অস্ত্রটিতে তরবারির মতোই একটা বাঁক থাকে, এটি একেবারে সোজা আকৃতির ছুরি নয়।
ছাঁচে ঢালাই করে ধাতুর ব্যবহার শেখার পর থেকে আরো একটি বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করে বাংলার সমরবিদরা। সেটি হলো আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি। এতদিন কামান বলতে পরিচিত ছিল ধনুক, এবার আসল আগুনের গোলা ছোড়ার পদ্ধতি, মানে কামান তৈরির পদ্ধতি আত্মস্থ করে তারা।
ভারতবর্ষে কামানের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করার কৃতিত্ব মোগলদেরই দেয়া হয়। তবে বিদ্যমান প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করছে, আসলে মোগলরা আসার অন্তত ১০০ বছর আগে থেকেই বাংলা ও আশপাশের রাজ্য, মানে অসম ও ত্রিপুরায় কামানের ব্যবহার হয়েছে। শুরুর দিকের এই আগ্নেয়াস্ত্রের নাম ছিল নাল। ১৪০৬ সালে বাংলা ভ্রমণকারী চীনা পর্যটক মা হুয়ান লিখেছেন, বাংলা থেকে যেসব জিনিস বিদেশে রফতানি হতো, তার মধ্যে ছিল আগ্নেয়াস্ত্রও। এমনকি খোদ মোগল বাদশাহ বাবর পর্যন্ত লিখেছেন যে, ‘গোলাবারুদের ব্যবহারে বাঙালিদের খ্যাতি ছিল’ যদিও তিনি সমালোচনা করে বলেছেন, ‘বাঙালিরা গুলি ছোড়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু লক্ষ্য করে না ছুড়ে বরং এলোমেলোভাবে ছুড়ত।’ ত্রিপুরার ইতিহাস রাজমালায়ও উল্লেখ আছে যে, ত্রিপুরার রাজা ধন্যমানিক্য (১৫১৩-১৭) বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের কাছ থেকে একটি বড় আকারের কামান দখল করে নিয়েছিলেন। এসব সাক্ষ্যই নিশ্চিত করে যে মোগলরা বাঙলায় আসার তো বটেই, ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে মোগলদের জয়ের আগে থেকেই বাঙালিরা কামানের ব্যবহার জানত, তা তৈরি করার কৌশলও জানত। নৌকার গলুইতে কামান বসিয়ে গোলা ছুড়তে পারলে বাংলার জলা-কাদায় আক্রমণ করতে আসা যেকোনো শক্তিশালী বাহিনীকেই গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করে চমকে দেয়া সম্ভব ছিল; মোগলরা বাংলা দখল করতে এসে শুরুর দিকে যেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল!
ড. এ কে এম খাদেমুল হক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





