অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে কুষ্টিয়া যেমন এলাকা হিসেবে বিশেষভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ, তেমনি এর ইতিহাসও কৌতূহলোদ্দীপক বটে। কুষ্টিয়ার ভূমিপুত্র কিংবা নানা সূত্রে কুষ্টিয়া থেকেছেন এমন সাহিত্যিকদের স্মৃতিকথায় বর্তমানের এ জেলা বা অতীতের মহকুমা সম্পর্কে যে বিবরণ পাই—তা যুগপৎ মজাদার ও ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ। তেমনই কয়েকটি খণ্ডচিত্র একালের পাঠকের সামনে এখানে তুলে ধরার প্রয়াস নেয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়ার ঠাঁইবদল

কুষ্টিয়ার কুমারখালী এলাকার জন্মগ্রহণ করেছিলেন লেখক-সম্পাদক জলধর সেন (১৮৬১-১৯৩৯), শ্রুতলিখনের মাধ্যমে প্রণীত আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থ ‘আত্মজীবনী ও স্মৃতি তর্পণ’-এ (১৯৫৬) তিনি খানিক টিপ্পনীসমেত জানিয়েছিলেন, ‘আমি যখন জন্মাই, তখন আমাদের গ্রাম [কুমারখালী] নদীয়া জেলার মধ্যে ছিল না, পাবনা জেলায় ছিল। আমার বয়স যখন আট কী নয় বৎসর, তখন নূতন করে জেলা গঠন হয়, সেই থেকে আমাদের গ্রাম নদীয়া জেলাভুক্ত হয়। আমার বেশ মনে আছে—আমার মেজদাদা পাবনায় ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। আর তার কিছুদিন পরে আমার বড়দাদা কৃষ্ণনগরে [নদীয়া জেলার প্রধান শহর] এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন।...’ মহকুমা হিসেবে কুষ্টিয়ার এ জেলা পরিবর্তন-প্রবণতার শুরু অবশ্য জলধর সেনের জন্মেরও বহু আগে। নবাবি আমলে কুষ্টিয়া ছিল নাটোর জমিদারির অধীনে। কোম্পানি আমলের গোড়ার দিকে তা পাল্টে যশোর জেলার অধিভুক্ত হয়। কিন্তু ১৮২৮ সালে পাবনা জেলার অন্তর্গত হয় কুষ্টিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের পর ফের বদল, এবার কুষ্টিয়ার ঠাঁই হলো নদীয়া জেলায়।

কিন্তু ঔপনিবেশিক জামানায় যে এলাকাকে কুষ্টিয়া বলে চিহ্নিত করা হতো তা কি আদৌ ‘আদি’ কুষ্টিয়া? এ প্রশ্ন তুলেছিলেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২), তার ছদ্ম-আত্মজৈবনিক উপাখ্যান ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’-য় (১৮৯০)। গ্রন্থের অষ্টম ‘তরঙ্গ’ বা অধ্যায় ‘তদারক’-এর গোড়াতেই তিনি লিখেছেন, ‘পাঠক! বর্তমান কুষ্টিয়া যে স্থানে স্থাপিত সে স্থানের যথার্থ নাম কুষ্টিয়া নহে। পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের উত্তরদিকে কুষ্টিয়া গ্রাম আজি পর্যন্ত বর্তমান আছে। এইক্ষণ তাহার নাম পুরাতন কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়ার থানা—পুরাতন কুষ্টিয়া হইতে উঠিয়া গৌরীনদীর [হালে পরিচিত গড়াই নদী] দক্ষিণপার আসিলে, সে থানার নামও কুষ্টিয়া এবং সেই নামেই মহকুমা ইত্যাদি ও রেলওয়ে স্টেশনের নাম হইয়াছে। এইক্ষণে যে-স্থানে কুষ্টিয়ার থানা বর্তমান, সে স্থানের নাম ‘মজমপুর’। এই প্রকারে বাহাদুরখালী, একপাড়া গ্রাম লইয়া কুষ্টিয়া।...’

কুষ্টিয়ার সমৃদ্ধি

কুষ্টিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা উনিশ শতকে বেশ শক্তিশালী যে ছিল, তার প্রমাণ মেলে জলধর সেনের লেখায়। তিনি লিখেছেন, তাদের এলাকায় ওই সময় হাতেগোনা কজন মানুষ ছাড়া আর কেউই চাকরি করতে চাইত না। কেননা কুষ্টিয়ায় তখন বেশির ভাগ অবস্থাসম্পন্ন মানুষই ধান-চালের ব্যবসা করতেন। আর যারা খানিক নিম্নবিত্তের, তারা চাষাবাদ বা পণ্য উৎপাদনের দিকেই মনোযোগী ছিলেন: ‘যাকে নিতান্তই চাকরি করতে হতো, সে কারও আড়তে বা মোকামে চাকরি করত।...’ তবে কুষ্টিয়ার চাল ব্যবসায়ীদের নাম তখনকার বাংলার রাজধানী কলকাতায় কেউ জানত না, যদিও আশ্চর্যের বিষয় এই যে তাদের ব্যবসা সেখানেও বিস্তৃত ছিল। কুষ্টিয়ার বেশির ভাগ চাল-ব্যবসায়ীরই আড়তও ছিল সেখানে। জলধর সেনের বয়ানে এই না-জানার কারণ হলো—‘যাঁরা ধনী মহাজন, তাঁরা কখনও কলকাতায় আসতেন না। চোর-ডাকাত ও পথের কষ্টের জন্য তাঁরা কর্মচারীদের উপরই কলকাতার আড়তের ভার দিয়ে রাখতেন। কলকাতার এই সব আড়তে আসল ধনীর নাম প্রচারই হতো না। যিনি প্রধান কর্মচারী বা গদীয়ান থাকতেন, তারই নাম চলত, তাঁদেরই মান-সম্ভ্রম-পশার-প্রতিপত্তি হতো। আমাদের গ্রামের [কুমারখালী] যে কয়টা আড়ত সে সময়ে কলকাতায় ছিল, সেগুলির গদীয়ান আমাদেরই গ্রামের লোক ছিলেন।...’

কুমারখালীর সমৃদ্ধির কথা পাই সাহিত্যিক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর (১৯০২-১৯৮১) ‘আমাদের কালের কথা’-তেও (১৯৬৮); দেশ ভাগের পরপর সৈয়দ মুজতবা আলীর এই বিশিষ্ট অগ্রজ সেখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন—‘কুমারখালী একটি প্রাচীন শহর। বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে এটি গড়ে উঠেছিল [শহর] কুষ্টিয়ার অনেক আগে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এখানে ছিল এক রেশম কুঠি। এখানে বাস করতেন কোম্পানির কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুমারখালীর কয়েকজন ব্যবসায়ী যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছিলেন।...’

‘কুষ্টিয়া বরাবরই বিশিষ্ট’

সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) ১৯৩০-এর দশকে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হিসেবে অবিভক্ত বাংলার একাধিক জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োজিত ছিলেন। কুষ্টিয়ায় তিনি বেশ কিছুদিন মহকুমা শাসক হিসেবে তখন দায়িত্ব পালন করেছেন। কুষ্টিয়া নিয়ে নিজের ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি’ (১৯৫৯) বইতে তার মন্তব্য: ‘মহকুমা হিসেবে কুষ্টিয়া বরাবরই বিশিষ্ট ছিল’। যদিও কুষ্টিয়ার বদলির কথা শুনে তার এক বন্ধু মন্তব্য করেছিলেন, ‘কুষ্টিয়া! ওখানে যা ম্যালেরিয়া!...পারেন তো বদলিটা এড়ান।’ তবে তার কথার তোয়াক্কা না করে তিনি ঠিকই সপরিবারে কুষ্টিয়ায় রওনা দেন। পরে জানিয়েছেন, ‘ম্যালেরিয়া একদিনও হয়নি।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা কুষ্টিয়ার বিবরণ পড়লে মনে হয়, সেকালে সেখানে সমৃদ্ধি ছিল—কিন্তু সংকীর্ণ ‘বড়লোকি’ ছিল না। তবে অন্নদাশঙ্কর খেয়াল করেছিলেন, বাণিজ্যকেন্দ্র কুষ্টিয়ার সেই গৌরব ইংরেজ শাসনের সায়াহ্নকালে খানিক ক্ষীয়মাণ। তার মনে হয়েছিল, ‘সম্ভবত গোরাই [গরাই] নদীর বহমানতার সঙ্গে তার সমৃদ্ধির একটা সম্পর্ক ছিল। গোরাই বর্ষাকালে বন্যাস্ফীত হলেও বারো মাস [এখন] স্টিমার চালনার উপযুক্ত নয়। অথচ এককালে কুষ্টিয়া থেকে স্টিমার ধরতে হতো।...’ অতীতে গড়াই নদী কতটা স্রোতময়ী ও বন্যপ্রাণীতে পূর্ণ ছিল, তা বলতে গিয়ে অন্নদাশঙ্কর এক সাহেবের নদীতে ডুবে কুমিরের ঘায়ে মৃত্যুবরণ করার গল্প শুনিয়েছেন, ‘কুষ্টিয়ায় রেনউইক কোম্পানির খানতিনেক লঞ্চ ছিল। ওরা আখ মাড়াইয়ের কল তৈরি করে গ্রামের চাষীদের ভাড়া দিতেন। সেই সূত্রে গোরাই ও অন্যান্য নদী দিয়ে লঞ্চেও চড়ে বেড়াতেন।...ছোটটা [ছোট লঞ্চ] ছোট সাহেব চ্যাপম্যানের।...একদিন লঞ্চ নিয়ে বেরিয়েছে, হঠাৎ ঝড় উঠে লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়।...পরে যাকে পাওয়া গেল সে চ্যাপম্যান নয়, চ্যাপম্যানের একটি বুটসুদ্ধ পা।...’

কুষ্টিয়া নিয়ে নিজের ভালো লাগার কথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছিলেন মনীষী কাজী মোতাহার হোসেনও। তার মাতৃকূলের আদিভিটা ছিল জেলার বর্তমান কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে। ‘কুষ্টিয়ার স্মৃতি’ শীর্ষক এক দীর্ঘ রচনায় (‘লোকসাহিত্য পত্রিকা’, জানুয়ারি ১৯৭৬) তিনি জানান, ‘[কুষ্টিয়ার] গ্রামগুলো সাহিত্যমোদী ও ধর্মপিপাসু লোকদের তীর্থক্ষেত্র বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাই আমি ভালোবাসি কুষ্টিয়ার স্কুল, কুষ্টিয়া শহর আর কুষ্টিয়া জেলা।...আমি যে কুষ্টিয়ায় কত আনন্দে কাল কাটিয়েছি, কতজনের স্নেহপ্রীতিতে সিঞ্চিত হয়েছিল... জোরের সঙ্গেই বলতে পারি আমি কুষ্টিয়ায় অবস্থান করে যত সুখানুভব করেছি, অন্য কোনোখানেই ততটা নয়।... তাই বাসনা করেছিলাম, কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করে শেষ জীবনে কুষ্টিয়াতেই বাস করব।...’ কুষ্টিয়াতে পূর্বোক্ত ইচ্ছা মোতাবেক বসবাসের নিমিত্তে জমিও কিনেছিলেন কবি নজরুলের প্রিয় বন্ধু ‘মতিহার’। কিন্তু পরে সে জমির একাংশ সরকার অধিগ্রহণ করায় ও আরেক অংশ নদীভাঙনে বিলীন হওয়ায় তা আর সম্ভবপর হয়নি। যদিও শেষ বয়সে এসেও কাজী মোতাহার হোসেনের মনে পড়ত কুষ্টিয়ার কথা। লিখেছেন, ‘তবুও এখন সতৃষ্ণ নয়নে কুষ্টিয়ার দিকে তাকাই।’

দেশভাগের পর

দেশভাগের পর কুষ্টিয়ার জায়গা হলো পাকিস্তান রাষ্ট্রে। সদ্য গঠিত দুই ভাগে বিভক্ত দেশের তত্কালীন পূর্ববাংলা প্রদেশে গিয়ে একালের মহকুমা কুষ্টিয়া থেকে জেলা হিসেবে ‘প্রমোশন’ পেলেও কুষ্টিয়া নামটি তখন কিছু সময়ের জন্য বিলোপ হয়ে গিয়েছিল! কারণ তখন জেলার নাম রাখা হয়েছিল নদীয়া। আগেই বলেছি, আজকের কুষ্টিয়া বা দেশভাগ-পরবর্তী ওই সময়পর্বের নদীয়ায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সৈয়দ মুর্তাজা আলী। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি তিনি জেলা প্রশাসনে যোগ দিয়েই দেখলেন হঠাৎ করে কুষ্টিয়া নামে এতদিনের পরিচিত এলাকার নাম নদীয়া রাখায় হয়েছে। মহামুসিবত! অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার যে খণ্ড ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পড়েছে, সেই জেলার নামকরণ করা হয়েছে নবদ্বীপ। আর পাকিস্তানে পড়া অংশের নাম কুষ্টিয়া রাখাই ছিল সংগত, তা না রেখে নদীয়া রাখা হয়েছে। ফলে ভারতের নবদ্বীপের চিঠিপত্র প্রায়ই ভুলে পূর্ব বাংলার কুষ্টিয়া বা নদীয়ায় চলে আসছে। আত্মজীবনীতে মুর্তাজা আলী লিখেছেন, ‘এই গোলযোগ মেটাবার জন্য আমি নদীয়া নাম পাল্টে কুষ্টিয়া নাম দেই।...’

 

শাকের আনোয়ার: নন-ফিকশন লেখক