উনিশ শতকের
বাংলায় যে
কথিত রেনেসাঁসের
আলাপ ইতিহাসে
পাই—তার
বলয় কেবল
কলকাতাকে ঘিরেই।
আঠারো শতকে
কয়েকটি সামন্তবাদী
ও কৃষিনির্ভর
গ্রাম নিয়ে
যে নগরের
যাত্রা শুরু।
এ পর্ব
থেকেই বিপুল
আয়োজনে কলকাতাকে
গড়ে তোলেন
ইংরেজরা, যা
চারপাশের গ্রামগুলো
থেকে মানুষকে
টেনে আনে।
হিন্দু কলেজের
প্রতিষ্ঠা ঘটে।
কিছুদিন বাদে
ফারসির জায়গা
দখল করে
নেয় ইংরেজি।
চেষ্টার কোনো
অভাব দেখি
না সাহেবদের।
১৮৫৭ সালে
: মার্কস কথিত
ভারতের প্রথম
স্বাধীনতা যুদ্ধের
বছরই তৈরি
করা হয়
বিশ্ববিদ্যালয় ও
হাইকোর্ট। উদ্যম
ও প্রতিষ্ঠান
মিলে বাঙালিকে
নতুন করে
গড়াপেটা চলে।
অন্যদিকে পুরনো
একটি শ্রেণীর
ভোগাকাঙ্ক্ষাও ডালপালা
মেলতে থাকে—তাল
মিলিয়ে। তবে
তার ধারাটা
বেশ ক্ষয়িষ্ণু।
এগুলোর ফাঁক
গলে উঠে
আসতে দেখি
নতুন এক
মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে।
পাশ্চাত্যের বিদ্যা,
বুদ্ধি, করণকৌশলের
আমদানি যেমন
চলতে থাকে,
তেমনি খুঁড়ে
বের করার
চেষ্টা চলে
প্রাচীন ভারতের
ঐতিহ্যও। ফলে
রেনেসাঁসের অনিবার্য
শর্ত ইতিহাসের
ধারাভঙ্গ এখানে
ঘটে না।
ঐতিহ্যের সুতোটাও
ছিন্ন হয়
না কোনোভাবে।
বিলেতি দাওয়াইয়ে
কেবল তার
গায়ে রঙ
চড়ে মাত্র।
‘রেনেসাঁস’
নামের উচ্চাভিলাষী
শব্দটি ইউরোপে
যে নব-কিরণ
বয়ে এনেছিল—তা
পরকাল হটিয়ে
মানুষকে করে
তুলেছিল ইহজাগতিক।
মাথা নুইয়েছিল
ব্যক্তির সার্বিক
স্বীকৃতির কাছে।
ব্যক্তি স্বাধীনতার
কাছে। তার
লেশমাত্র ঘটে
না এখানে।
বরং সামন্ত
মানসিকতাই টিকে
থাকে বহাল
তবিয়তে। শিক্ষিত
মানুষদের চর্চার
মধ্যে দিয়ে
সাম্প্রদায়িকতাও পায়
নতুন মাত্রা।
একে ‘রেনেসাঁস’
বলা চলে
কোনো বিচারে?
যদি ‘রেনেসাঁস’
শব্দটির ব্যবহারিক
মাহাত্ম্যকে স্বীকৃতি
দিতে হয়!
তবুও এটি
মানি যে—কলকাতার
বিদ্যাচর্চা, সাংস্কৃতিক
ও যাপনিক
জীবনে উনিশ
শতক এক
জাগরণ এনেছিল।
কিন্তু কোনো
অর্থেই সেটি
রূপান্তর নয়,
নয় রেনেসাঁস।
এ জাগরণেরই
মানস সন্তান
রামমোহন থেকে
রবীন্দ্রনাথ। সারিটা
বেশ দীর্ঘ।
তর্কের সুযোগ
রেখেই বলা—নিজেদের
শ্রেণীটাকে উতরাতে
পারেননি তারা
কেউই, যা
করার করেছেন
ওই শ্রেণীর
মধ্যে থেকেই।
লক্ষণাক্রান্ত দেখা
দিলেও—যে
করাটা সর্বার্থে
সর্বমানব-কল্যাণের
সমার্থক হয়ে
ওঠেনি।
উনিশ শতকের
এ হাওয়াতেই
রামমোহন রায়
সতীদাহ নিবারণ
করেন, বাংলা
গদ্য সংস্কার
করেন : অনেকের
মতে ব্রাহ্মসমাজ
প্রতিষ্ঠা করে
বাঙালি মধ্যবিত্তের
সমীহ আদায়
করে নেন।
যদি প্রশ্ন
তোলা যায়—গ্রামের
প্রান্তিক সমাজের
চিত্রটা তখন
কী? সেখানে
কিন্তু এ
শহুরে জাগরণের
হাওয়া পৌঁছায়নি।
তবে সময়ের
দাবিতে সেখানেও
থেমে থাকেনি
জাগরণ। বিলেতি
জলযত্ন না
পেলেও আপনা
থেকেই মাটি
ফুঁড়ে বের
হয়েছে। তার
দৃষ্টিটা একেবারে
সমাজের তলার
দিকে, যা
মানুষকে বঞ্চিত
করে, নিষ্পেষিত
করে, দমিয়ে
দেয়—তাকে
নিয়েই এ
জাগরণের জিজ্ঞাসা।
কেবল জিজ্ঞাসা
নয়, বদলাবারও
চেষ্টা। এ
পথেই সামনে
পাই লালন
ফকিরকে। জন্ম
রাহমোহনের দুই
বছর বাদে।
১৭৭৪ সালে।
তবে এর
কোনো ঐতিহাসিক
ভিত্তি নেই
(অনেকে মনে
করেন লালনের
জন্মসাল ১৭৭২)।
থাকার কথাও
নয়। কারণ
তেমন কোনো
সমাজ ও
শ্রেণী থেকে
উঠে আসেননি
লালন। যেখানে
এ প্রত্যাশাটা
রাখা চলে।
এখান থেকেই
সমাজের সঙ্গে
তার আষ্টেপৃষ্ঠে
জড়িয়ে যাওয়ার
রেখাচিত্র পাই,
যা কাটে
না কোনোদিনই।
যতটুকু জানতে
পারি— কুষ্টিয়ার
কুমারখালীর ভাঁড়ারা
গ্রামের এক
কায়স্থ হিন্দু
ঘরের সন্তান
তিনি। তীর্থযাত্রায়
বসন্ত রোগে
আক্রান্ত হলে
অন্তর্জলীর খায়েশে
তাকে নদীতে
বিসর্জন দেয়
সঙ্গীরা। বসন্ত
ছোঁয়াচে ব্যারাম।
জলে না
ফেললে সবাই
উজার হয়ে
যাবেন। তাদেরই
বা অপরাধী
মানি কী
করে? এ
সে যুগের
এক বাস্তবতা।
কিন্তু বিসর্জনের
পরেও বেঁচে
যান লালন।
তাকে সারিয়ে
তোলেন তাঁতিদের
ঘরের এক
মুসলমান রমণী।
তার হাতের
ভাত খেয়েছেন
বলে হিন্দু-সমাজ
লালনকে মানে
না। তোলে
না ঘরেও।
সমাজের কারণেই
বেঁচেও পুরনো
জীবন আর
পান না
তিনি। পর
হয় মা,
বউও। দেখেন
এক কুিসত
পৃথিবী। ঘটে
তার নতুন
জন্ম। জন্ম
হয়তো জিজ্ঞাসারও—
মানুষ নিয়ে,
সমাজ নিয়ে,
জাত নিয়ে।
এ পর্বেই
সিরাজ সাঁইয়ের
কাছে দীক্ষা
নিয়ে বাউল
মতকে আশ্রয়
করেন। আসর
গেড়ে বসেন
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়।
ইতিহাসে পাই—সেটি
১৮২৩ সালের
ঘটনা। কলকাতায়
তখন ব্রাহ্ম
সমাজের, সতীদাহ
নিবারণ উদ্যোগের
ভিত পাকা
হচ্ছে। এই
নদীয়া-কুষ্টিয়া
অঞ্চলেই বাউল
গানের জন্ম।
অবশ্য তার
ভিত্তি গড়ে
ওঠে লালনেরও
জন্মের প্রায়
১০০ বছর
আগে। তবে
লালনের হাতেই
এর পত্র-পল্লবে
মেলে ওঠা।
তার শিষ্যের
সংখ্যা এ
অঞ্চলে ১০
হাজার বলে
জানতে পারি।
সেকালে কলকাতার
ব্রাহ্ম সমাজেও
কিন্তু এত
জনবল শামিল
হতে দেখি
না। এখান
থেকে লালনের
দর্শনের প্রভাব
অনুমান করা
চলে। অনুমান
করা চলে
প্রান্তিক জননায়ক
হয়ে ওঠার
বিষয়টিও। বুঝতে
পারি মানুষে
মানুষে বিভেদরেখা
নেই এখানে।
নেই বৈষম্য,
তাই এক
হওয়া।
এই যে
লালনের সমাজ
থেকে বিচ্যুত
হওয়া। সেটিই
তাকে নতুন
পথ দেখায়।
আধ্যাত্মিকতা ও
প্রান্তিক জীবন
অভিজ্ঞতা আশ্রয়
করে তিনি
বেরিয়ে আসেন
ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক
খোলস ভেঙে।
কলকাতায় ইংরেজি
জানা মধ্যবিত্তরা
যেটি করতে
পারেন না।
সেটি করে
দেখান অজ
পাড়াগাঁয়ের লালন
ফকির। সীমাবদ্ধতা
এখানেও ছিল।
হিন্দু ও
মুসলমান; দুই
পক্ষেরই চোখের
বালি হয়ে
দাঁড়ান তিনি।
তাকে প্রতিপক্ষ
ভাবতে আরম্ভ
করে জমিদার,
নীলকররাও। করবে
নাই বা
কেন? তিনি
তো ওদের
ভিত্তিভূমি ধরেই
নাড়া দিয়েছেন।
কারণ লালন
কেবল মানুষের
আধ্যাত্মিক মুক্তিই
চান না।
চান তাদের
সামাজিক মুক্তিও।
ব্যাপক অর্থে
শোষণমুক্তি। সে
দায় থেকেই
তিনি হয়ে
ওঠেন নিপীড়িত,
প্রান্তিক মানুষের
নেতা। আবার
আধ্যাত্মিক মুক্তিটাও
তিনি চান
ঠিক একেবারে
ভাবের পথে
নয়। সেখানেও
যুক্তি ছিল
বৈকি! সমাজের
জাত প্রশ্ন
তার আজন্মের
কাঁটা হয়েছিল:
‘সব
লোকে কয়
লালন কি
জাত সংসারে?’—এ
প্রশ্ন একদিনের
নয়। নয়
একবারেরও। ভাবের
কথা হলেও
এমন বহু
যৌক্তিক প্রশ্নের
দেখা লালনের
জীবনে জুড়ে
পাই। কবি
গান ও
খেউরের যুক্তি-ঐতিহ্য
তখন ফিকে
হয়ে এসেছিল।
লালনের মাধ্যমে
পথ পেয়ে
তা বাউল
দর্শনে জায়গা
করে নেয়।
দেখি—তিনি
বাহাসেও যোগ
দিতেন পুরোদস্তুর।
যাঁর মূলে
রয়েছে যুক্তি
ও তর্কের
মধ্যে দিয়ে
মানুষকে নিজের
চিন্তার মধ্যে
এনে ফেলা।
বলা চলে—সমাজ,
যাপিত জীবনের
যে বিস্তর
অসংগতি; যেগুলো
লালন অর্জন
করেছিলেন নিজের
দীর্ঘ জীবনাভিজ্ঞতার
ভেতর দিয়ে।
সেগুলোই ফুঁড়ে
ওঠে তাঁর
দর্শনে, গানে,
বলায়। তাঁর
গানগুলো উনিশ
শতকের প্রান্তিক
মহকুমা কুষ্টিয়ার
জীবনরসে সিক্ত।
কিন্তু কালের
মার পেড়িয়ে
তা আজ
হয়ে উঠেছে
সর্বমানবের ধ্রুপদি
সম্পদ। আধুনিক
যাপনেরও অঙ্গ।
একটা ঢেউ
যখন ওঠে,
তা নিষিমেই
মিলিয়ে যায়
না। বরং
চারপাশটা নাড়িয়ে
দিয়েই যায়।
উনিশ শতকের
কুষ্টিয়া সম্পর্কেও
এ কথা
চলে। এ
পর্বে এখানে
বহু কৃতী
মানুষের জন্ম,
বেড়ে ওঠা
ও কাজ
করা। কাঙাল
হরিনাথ মজুমদার
তাদেরই একজন।
হরিনাথের জন্ম
১৮৩৩ সালে
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতেই।
নিদারুণ জীবন
অভিজ্ঞতা ছোটবেলা
থেকেই তাকে
শক্ত মনের
ভিত দিয়ে
গড়ে তুলেছিল।
কাজ ও
চেষ্টার দ্বারা
তিনি নিজের
মধ্যে সঞ্চয়
করতে পেরেছিলেন
এমন এক
বুদ্ধিবৃত্তিক ও
সমাজভাবুকের সম্পদ,
যা কেবল
কুষ্টিয়াতে সীমাবদ্ধ
না থেকে
পুরো বাংলাকেই
নাড়া দিয়ে
গিয়েছিল। জন্মের
অল্পকাল পরেই
মা, বাবাকে
হারিয়েছিলেন তিনি।
জুটেছিলেন অন্যের
গলগ্রহ হয়ে।
তবে সেটিও
বেশিদিন টেকেনি।
অর্থের অভাবে
প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখাটাও
হয়ে ওঠেনি।
তবে আগ্রহটা
ছিল অদম্য।
এ কারণে
যেখানেই শিক্ষার
সুযোগ পেয়েছেন,
শুষ্ক বালুরাশির
মতোই তা
শুষে নিয়েছেন
হরিনাথ। নিজে
লেখাপড়া শিখতে
পারেননি। এ
তার জন্ম-আক্ষেপ।
তবে চেয়েছেন
অন্যে লেখাপড়া
শিখুক। আবার
চেয়েই থেমে
থাকেননি, সেজন্য
কাজ করেছেন।
সবটা উজার
করে দিয়ে।
দেখি—তিনি
কুমারখালীতে দুটি
স্কুল গড়েন:
একটি ছেলেদের,
অন্যটি মেয়েদের।
নিজেও শিক্ষকতা
করেছেন সেখানে।
বাল্যবন্ধু ভালো
স্কুলে পড়েন।
ছুটিতে বাড়িতে
এলে তার
কাছ থেকে
শিখে পড়িয়েছেন
অন্যদের। এমন
নজির খুব
পাব না।
সঙ্গে নিজেকে
মেলে ধরার
চেষ্টাটাও চলে
পুরোদমে। হরিনাথ
মজুমদার নাটক
লিখেছেন, উপন্যাস
লিখেছেন, কবিতা
লিখেছেন, লিখেছেন
প্রবন্ধও। বিষয়
হিসেবে হয়তো
সবটাই মানুষের
কাছে যায়।
তবে সেটাই
তো একমাত্র
পথ নয়।
কালের গণ্ডি
পেরিয়ে পৌঁছতে
হলে তাতে
আর্টেরও কিছু
উপাদান থাকা
চাই। এখানে
হরিনাথের ‘বিজয়-বসন্ত’
‘আলালের
ঘরের দুলাল’
বা ‘দুর্গেশনন্দিনী’র
কাছে মার
খায়। নইলে
তাকে তো
উপন্যাস লিখতে
দেখি—সেই
১৮৫৯ সালেই।
হরিনাথ সে
আসনটা পান
না, যেটি
জোটে টেকচাঁদ
ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্রের
কপালে।
তিনি লেখার
অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন
গুপ্ত কবির
কাছ থেকে।
যতদূর জানতে
পারি—তার
‘সংবাদ
প্রভাকর’-এ
হরিনাথের রচনার
হাতেখড়ি। তবে
ঈশ্বরগুপ্ত সর্বার্থে
তার আদর্শ
হয়ে উঠতে
পারেননি। কারণ
তিনি তো
হরিনাথের মতো
সমাজের প্রান্তটা
দেখেননি কখনো।
‘এবি
শিখে, বিবি
সেজে, বিলেতি
বোল কবেই
কবে’ বলে
যখন ঈশ্বরগুপ্ত
নার শিক্ষাকে
ব্যঙ্গ করছেন।
তখন হরিনাথ
মজুমদার পুরোদস্তুর
নারীশিক্ষার পক্ষে।
এমনকি তাদের
পড়ার জন্য
গড়ে তোলেন
স্কুল। সমাজের
একেবারে কাছাকাছি
থাকায় তিনি
অস্বীকার করতে
পারেননি যুগের
এ হাওয়াকে।
মেনেছিলেন একেবারে
অন্তর দিয়ে।
অগ্রমানবের মাহাত্ম্যে।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুষ্টিয়ায় ‘ব্রাহ্মসমাজ’-এর
একটি শাখা
গড়ে তোলেন।
এখানেই হরিনাথের
সঙ্গে পরিচয়
‘তত্ত্ববোধিনী
পত্রিকা’র।
ঈশ্বরগুপ্তের বাইরেও
আরেক প্রতিভার
আকর্ষণ তিনি
পান এখানে।
নাম তার
অক্ষয়কুমার দত্ত।
হরিনাথের তুল্যই
যার প্রাতিষ্ঠানিক
পড়ালেখা ছিল
না। কিন্তু
মাথায় ও
কলমে ছিল
মানুষকে চিন্তাশীল
করার অপার
শক্তি। মেধার
উনিশ শতকীয়
শাণ। হরিনাথের
মানসটা তার
কাছে ধরা
দেয় সহজেই।
দীনবন্ধু মিত্রের
‘নীলদর্পণ’
তার সামনে
ছিল। ছিল
বন্ধু মীর
মশাররফ হোসেনের
‘জমিদার
দর্পণ’।
কিন্তু হরিনাথ
রূপকের পথে
হাঁটলেন না।
ভণিতা করলেন
না। সরাসরি
প্রবন্ধের তরফেই
ভাষা দিতে
চাইলেন জমিদার,
মহাজন, কুঠিয়াল
ও গোরা
পল্টনের হাতে
কৃষকের অত্যাচারকে।
কেবল কৃষক
নয়—মহাজন
শ্রেণীর প্রতি
সামন্ত নির্যাতনের
ছবিও পাই
হরিনাথের কলমে।
কোথাও তিনি
শুনেছিলেন বাংলা
পত্রিকাগুলো অনুবাদ
করিয়ে সরকার
বাহাদুর মানুষের
দুর্দশার কথা
শোনেন। এ
মানুষের স্বরকে
শাসকের কাছে
পৌঁছে দেয়ার
অভিপ্রায়েই তিনি
খুলে বসেন
‘গ্রামবার্ত্তা
প্রকাশিকা’ নামের
পত্রিকা। সেটি
১৮৬৩ সালের
কথা, যা
আজ আমাদের
প্রান্তিক সমাজ-ইতিহাসের
এক অমূল্য
দলিল। এখানে
বহু বিষয়েই
লেখেন তিনি।
লেখেন অন্যরাও।
এমনকি সে
তালিকায় রয়েছেন—ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগরও।
এ পত্রিকা
করার কারণেও
নানা সংকটে
পড়তে দেখি
হরিনাথকে। প্রথমে
কলকাতাতেই পত্রিকা
ছাপাতেন। পরে
অর্থাভাবে পড়লেন।
তবু উদ্যোম
থামে না।
তখন কুমারখালীতেই
‘গ্রামবার্ত্তা
প্রকাশিকা’র
প্রেস গড়েন।
অর্থাভাবে অবশ্য
একসময় সেটিও
বন্ধ হয়ে
যায়। দীর্ঘকাল
চালু থাকার
পর বন্ধ
করে দিতে
হয় পত্রিকাও।
অবশ্য শেষদিকে—অক্ষয়কুমার
মৈত্রেয়, জলধর
সেন, দীনেন্দ্রকুমার
রায়ের মতো
শিষ্যরা এসে
তাকে টেকাতে
চায়। তবে
হরিনাথের দমটা
সেখানে ফুরিয়ে
আসে। কৃষক-অত্যাচার
নিয়ে লেখার
কারণে জমিদারদেরও
চোখের বালি
হয়ে ওঠেন
তিনি। ঠাকুর
এস্টেট থেকেই
তাকে মারার
জন্য পাঠানো
হয় পাঞ্জাবি
লেঠেলের দল।
তবে লালন
ফকির এসে
বাদ সাধেন।
নিজের শিষ্যদের
নিয়ে লড়াই
চালিয়ে বাঁচান
হরিনাথকে। কেবল
তাই নয়
ওদের সম্পর্কও
ছিল বেশ।
যাতায়াত ছিল
দুজনার বাড়িতেও।
হরিনাথই লালনকে
নিয়ে প্রথম
লিখেছিলেন। ‘গ্রামবার্ত্তা’র
পাতাতেই। এমনকি
শেষ বয়সে
সব ছেড়ে
বাউল গান
লেখা ও
প্রচারে শামিল
হয়েছিলেন। কাঙাল-ফিকিরচাঁদ
নামে গড়েছিলেন
বাউল দল।
অবশ্য লালনের
গভীরতা সেখানে
পাই না।
এ কারণে
হরিনাথ মজুমদারের
কপালে বাউল
নয়, জোটে
‘সখের
বাউল’ তকমা।
তিনি ছিলেন
এমন এক
মানুষ—যার
সবটাই উৎসর্গিত
সমাজ ও
মানবতার কল্যাণে।
মৃত্যুর সময়
লালন ২০০
টাকা রেখে
যেতে পেরেছিলেন,
যা তার
সাধনসঙ্গীনী বিশাখা,
ধর্মকন্যা ও
এক শিষ্যের
মধ্যে বেটে
দেয়া হয়।
হরিনাথ রেখে
যেতে পারেননি
সেটিও। কাঙাল
নামটা তিনি
হয়তো সাধ
করেই নিয়েছিলেন।
তবে সেটিই
তাকে সাধ্যের
জায়গায় পৌঁছতে
দেয়নি কখনো।
ভাবলে দেখি
অর্থের অভাবেই
হরিনাথের কোনো
কাজ, কোনো
দিন পূর্ণতা
পেল না
তার। তবু
চেষ্টা, সাহস,
পথ দেখানোটুকু
নিয়ে আজও
তার সমীহ
জোটে। কুমারখালীর
এ কাঙালকে
আমরা নমি।
লালন ও
হরিনাথ মজুমদারের
সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের
কালগত ও
শ্রেণীগত: দুই
দিক থেকেই
ব্যবধান বিস্তর,
যা কোনোভাবেই
কাটানোর পথ
নেই। তবে
কাজের জায়গাটা
তাদের মিলিয়ে
দেয়। সেটি
প্রান্তিক সমাজ
নিয়ে। সাধারণ
মানুষ নিয়ে।
মিলিয়ে দেয়
কুষ্টিয়া জায়গাটিও।
পূর্ব বাংলায়
ঠাকুর এস্টেটের
যে জমিদারি,
তার তিনটে
বড় আসন
ছিল: শিলাইদহ,
পতিসর ও
শাহজাদপুর। তবে
খুঁটিটা কুষ্টিয়ার
শিলাইদহেই পোঁতা।
রবীন্দ্রনাথ পাকাপাকিভাবে
জমিদারি দেখভালের
কাজে এখানে
এসেছিলেন ১৮৯০
সালে। অবশ্য
যাতায়াতটা ছিল
শৈশব থেকেই।
শিলাইদহ তার
মনে সেই
বয়সেই নাড়া
দিয়েছিল। ‘আমার
ছেলেবেলা’তে
সে উল্লেখ
পাই। তিনি
পাকাপাকিভাবে যখন
এলেন, ততদিনে
লালন মারা
গেছেন। হরিনাথও
মারা যান
বছর কয়েক
বাদে। সুতরাং
তাদের সঙ্গে
দেখা-সাক্ষাতের
কোনো সম্ভাবনা
ছিল না।
সেটি ঘটেও
নি। আবার
রবীন্দ্রনাথের মতো
স্রষ্টা-মানবের
জমিদারি দেখভালেরও
কোনো প্রয়োজন
দেখি না।
তবে পারিবারিক
দায় মেনেই
তাকে আসতে
হয়। বড়
ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ
দার্শনিক, সত্যেন্দ্রনাথ
সরকারি কর্তা,
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সংসারবিমুখ;
অন্য দুজন
বায়ুগ্রস্ত। সুতরাং
তার না
এসে উপায়
ছিল না।
তালুক রক্ষার
জন্য আসতেই
হলো। এটাই
পাকাপাকিভাবে তার
প্রথম বাইরে
আসা। ওই
যে ঠাকুরবাড়ি
ছেড়ে বেরুলেন—তারপর
সেখানে আর
ফিরলেন না।
শিলাইদহ থেকে
গন্তব্যটা শান্তিনিকেতন।
অবশ্য ১৯০১
সালের পর
থেকেই শিলাইদহের
সঙ্গেও তার
তাল কেটে
যায়। ১৯২২
সালে একবার
আসেন। তবে
এটি মানতেই
হবে শিলাইদহ
তার জীবনের
এক অক্ষয়
অধ্যায়। হয়তো
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও
বটে। দুদিক
থেকেই: সাহিত্যিক
দিক থেকেও
যেমন, তেমনি
জমিদারি পরিদর্শন
কাজের দিক
থেকেও।
রবীন্দ্রনাথ সামন্ত
শ্রেণীর। তবে
গড় জমিদারের
সঙ্গে ব্যক্তি
রবীন্দ্রনাথের তফাত
ছিল বিস্তর।
কারণ তার
চোখটা কেবল
জমিদারের নয়।
সেটি ডিঙিয়ে
স্রষ্টারও বটে।
এ কারণে
কেবল সম্পদ
নয়, সেটি
মানুষের দিকেও
স্থির। শিলাইদহে
জমিদারি দেখতে
এসেই তিনি
কৃষক জীবনকে
প্রথমবার কাছ
থেকে দেখেছিলেন;
সাধারণ মানুষদেরও।
প্রকৃতি ও
মানুষ : দুয়ে
মিলে শিলাইদহ
তার জীবনের,
সাহিত্য সৃষ্টির
এক উজ্জ্বল
পর্ব। তার
পত্রগুচ্ছে শিলাইদহ,
পদ্মার প্রকৃতি
তিনি অমর
করে গেছেন।
তেমনি গল্প
ও কবিতাতে
প্রকৃতির সঙ্গে
মিশে আসন
করে নিয়েছে
সাধারণ মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে
আসার আগ
পর্যন্ত সামন্তরাই
দখল করে
ছিল মূলধারার
বাংলা আখ্যান-গল্পের
ভুবন। বঙ্কিমচন্দ্রের
প্রবন্ধে বাংলার
কৃষকদের দুঃখের
কথা পাই।
তবে উপন্যাসের
জমিনে তাদের
তিনি মেলে
ধরেন না,
ব্রাত্য রাখেন।
রবীন্দ্রনাথই প্রথম
তা করেন।
সমাজের দ্রোহটাও
গোপন থাকে
না এখানে।
যাতে কেবল
পোস্টমাস্টার কিংবা
ছিদাম, দুখীরামের
মতো গড়পরতা
চরিত্রই ধরা
পড়তে দেখি
না। ধরা
পড়ে ‘সমস্যাপূরণ’-এর
অছিমদ্দির মতো
বিদ্রোহী চরিত্রও।
যে বলে
ওঠে— ‘প্রাণ
যাইবে তবু
আমার অধিকারের
এক তিল
ছাড়িয়া দিব
না’।
ভাষাটাও একেবারে
অছিমদ্দির নিজের।
সমাজ ও
প্রান্তকে এমন
করে দেখার
সুযোগ কলকাতায়
কই? সেটি
দেয় শিলাইদহ।
মানুষকে নিয়ে
রবীন্দ্রনাথের যে
সুপ্ত চিন্তা
তারও বিকাশ
ঘটে এখানেই।
তবে ওই
আর পাঁচজনের
মতো করে
নয়। জমিদার
বাড়ির পুণ্যাহ
অনুষ্ঠানে কৃষকদের
সঙ্গে এক
কাতারে বসেন
তিনি। এটি
আগে ছিল
না। প্রভু-ভৃত্যের
মাঝে যে
চির-চিকের
আড়াল, সেটি
ঘুচে যায়।
মানুষকে বড়
করে না
দেখলে, এ
ঘটে না।
তিনি ভাবেন
কৃষকদের চাষবাসের
উন্নয়ন নিয়ে।
তাকে যেমন
আলু চাষ
নিয়ে গবেষণা
করতে দেখি,
তেমনি দেখি
কৃষকদের জন্য
ঋণের ব্যবস্থা
করতেও। তার
কালের কোনো
জমিদার এমনটা
করেছেন বলে
জানি না।
রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা
থেকেই বড়
হয়েছিলেন ব্রাহ্ম-সংস্কৃতির
পরিমণ্ডলে। পিতা
দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন
সে সমাজের
বড় নেতা।
এ কারণে
ভাববাদের এক
সুপ্ত লহরি
তার অন্তরে
বয়েই চলেছিল।
শিলাইদহে সে
কাদা মাটিতে
সহজেই ছাপ
পড়তে দেখি
লালনের বাউল
দর্শনের। অবশ্য
বাউল গানের
সঙ্গে তার
পরিচয় আরো
আগে ঘটে।
কলকাতায় থাকতেই।
তবে সেটি
বাইরের খোলস।
অন্তরের যোগটা
এখানেই ঘটে।
স্মৃতিতে পাই
কালীমোহন ঘোষকে
নিয়ে তিনি
সংগ্রহ করেন
বাউল গান।
তা প্রকাশ
পায় ঠাকুরবাড়ির
পত্রিকাতে। মানুষের
আধ্যাত্মিক ও
সামাজিক যে
মুক্তি লালন
চেয়েছিলেন, সে
আবেদন কাটাতে
পারেন না
রবীন্দ্রনাথও। তাদের
দুজনার সাক্ষাতের
নানা কল্প-গল্প
পাই। তাতে
হাওয়া দিয়েছেন
মনসুর উদদীনের
মতো মানুষও।
তবে যুক্তি
ও তথ্যের
দাহ্যে ফেললে
তা গলে
যায়। কিন্তু
মৃত লালনও
তো কম
শক্তিশালী নন।
এ কারণে
প্রভাবটা রেখে
যান। কেবল
ব্যক্তিজীবন নয়,
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেও
সে আঁচ
পাই। গানে
সে পরিচয়
সবচেয়ে বিস্তর
মেলে। কথা
আলাদা—তবে
সুরটা লালনের,
বাউলের সম্পদ
বলে চেনা
যায়। আঞ্চলিক
সুর বৈশ্বিক
মহিমা পায়।
তিনি নিজেকে
উজার করেন
‘রবীন্দ্রবাউল’
নামে। কেবল
নামে নয়,
নন্দলাল বসুর
তুলিতে ছবিটাও
ভুলি না।
‘গোরা’র
আরম্ভে লালনের
সরাসরি উদ্ধৃতি
পাই। এই
আখ্যানে ভারতবর্ষের
যে সন্ধান:
বুঝতে পারি,
সেখানে রবীন্দ্রনাথ
লালনকে ভোলেন
না কিছুতেই।
এসব সঞ্চয়
তার কুষ্টিয়ার
শিলাইদহ থেকেই
সংগ্রহ করা,
যা কুবেরের
ধনের মতোই
ফুরোয় না।
আজীবনের হয়ে
থাকে। উনিশ
শতকে এ
তিন মনীষীর
জীবনে যা
পাই—সেখানে
কোনোভাবেই এড়ানো
চলে না
কুষ্টিয়ার স্থানমাহাত্ম্য।
কারণ এর
গর্ভ থেকেই
মেলে তাদের
সব কাজের
রসদ। এটুকু
বুঝি—কত
ঋদ্ধ ছিল
সেকালে আমাদের
প্রান্তিক জনপদগুলো!
সাংস্কৃতিক ও
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদে
টেক্কা দিতে
পারত নগরের
সঙ্গেও।
নাজমুল হাসান: লেখক






