বিষাদ সিন্ধুর অমর স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে। ফিকশন, নন-ফিকশনে বেশকিছু গ্রন্থ লেখার পাশাপাশি তিনি সম্পাদনা করেছেন আজীজন নেহার ও হিতকরী নামের দুটো পত্রিকা। এর মধ্যে ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয় আজীজন নেহার। এটি প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চুঁচুড়া থেকে। আর হিতকরী প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালে, কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে। সাধারণের হিত ও অসাম্প্রদায়িক ভাবনাকে এগিয়ে নিতে মীর সাহেব এ পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছিলেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার এর উদ্দেশ্য নিয়ে বলা হয়—

‘সকলের হিতকথা, যাহাতে সর্বসাধারণের হিতের আশা থাকে, সেই সকল কথাই হিতকরীতে প্রকাশ হয়। জাতিগত কি ধর্ম্মগত কোন পক্ষকে লক্ষ্য করিয়া কিছু প্রকাশ হয় না।...দুই দশ টাকা লাভের জন্য হিতকরী প্রকাশ হয় নাই। জীবিকা নির্ব্বাহের কোনো উপায় না পাইয়া এই কুটিল ও জটিলপথ আশ্রয় করা হয় নাই। ন্যায্য বলিব, সত্য প্রকাশ করিব। সত্যাশ্রয়ে থাকিব, সাধারণের হিতকরকার্য্যে অবশ্যই যোগ দিব।...যেখানে অন্যায়, সেইখানেই আমরা, যেখানে অত্যাচার, যেখানে অবিচার সেখানেই আমাদের কথা। আমরা প্রশংসার প্রত্যাশী নহি। আর্থিক সাহায্যের আশাও রাখি না। সুতরাং আমাদের ভয়ের কোন কারণ নাই। প্রথম সূচনায় বলিয়াছি, আমাদের প্রথম পূজনীয় ঈশ্বর, তত্পরেই রাজা; গ্রাহকমাত্র না থাকুক, সাধারণে হিতকরী পাঠ না করুন, ক্ষতি নাই। যাঁহার নিকট জানাইলে দেশের উপকার হইবে, অত্যাচার অবিচার কমিবে, অন্যায়ের সুবিচার হইবে, কেবল তাঁহাকেই জানাইব।...আর ভয় কি, কিসের আশঙ্কা?’

হিতকরী শুরুতে পাক্ষিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বর্ষে পত্রিকাটি ‘দাশহিক’ হয়ে যায়, অর্থাৎ ১০ দিনে পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশের তৃতীয় বর্ষে কর্মসূত্রে মীর মশাররফ হোসেন টাঙ্গাইল চলে যান। এরপর বেশ কয়েক বছর পরে ১৩০৬ সালে জ্যোতিপ্রসাদ সান্যালের সম্পাদনায় কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হয় হিতকরী।

১৮৯১ সালে লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত হিতকরীর পাতায় পাওয়া যায় আটজন নারীর ডাক্তার হওয়ার খবর। স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদের বাইরে নারী শিক্ষা বিষয়ে যে হিতকরী সচেতন ছিল তা খবরটি প্রকাশ এবং তার বিষয়বস্তু পাঠে ধারণা করা যায়—

‘এবার ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে নিম্নলিখিত ৮টি মহিলা ডাক্তারি শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণা হইয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে অধিকাংশই ব্রাহ্মিকা ও খ্রিস্টান। ইহারা ক্রমে ২/১টি করিয়া চিকিৎসাশাস্ত্রের দ্বার এদেশের নারীগণের জন্য প্রমুক্ত করিয়া দিতেছেন। স্ত্রী-ডাক্তার অভাবে এ দেশের একটি গুরুতর অভাব রহিয়াছে। শিক্ষিতা বঙ্গমহিলাগণ তাহা দূর করিবেন। স্ত্রীশিক্ষা বহুদিন হইল আশানুরূপ না হউক, এ দেশে ক্রমে প্রচারিত হইতেছে।...স্ত্রীলোকদিগের চিকিৎসা স্ত্রীলোক দ্বারা কতদূর বাঞ্ছনীয় তাহা কাহাকেও বুঝাইয়া বলিতে হাইবে না। অন্তপুরবাসিনী মুসলমান রমণীগণ তাহাদের ধন্যার্হা ভগিনীগণের কৃতকার্য্যের ও পরিশ্রমের ফলভোগ করিয়া অবশ্যই সুখী হইবেন। আমরা আশা করি তাঁহারাও সময়ে এই সদনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইতে কুণ্ঠিত হইবেন না। মেডিকেল কলেজে প্রথম বাবা মধুসূদন গুপ্ত মহাশয় শবচ্ছেদ করিয়া জাতিচ্যুত হয়েন; এখন শবচ্ছেদে পারদর্শিতা হিন্দুসমাজে একটি মহাগৌরবের কথা।’

হিতকরীর অগ্রদূত ছিল কাঙাল হরিনাথের গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। এটি মাসিক, পাক্ষিক ও সপ্তাহিক আকারে বিভিন্ন সময় নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৮৬৩ সালে কলকাতা থেকে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। এ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে সেকালের কুষ্টিয়ার সমাজ জীবনের জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায়।

১৮৭৩ সালের মার্চে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় ছাপা হয় একটি চিঠি, যার শিরোনাম ছিল ‘কি ভয়ানক অত্যাচার’। এ চিঠিতে কুষ্টিয়ার সাঁওতা গ্রামের আড়াইআনির জমিদার খোন্দকার আবদুল হকের বিরুদ্ধে প্রজা পীড়নের অভিযোগ জানানো হয়েছে। এ জমিদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ: ‘তিনি এই বারে জনৈক প্রজার একশত টাকা জরিমানা করিয়া আদায়ের হুকুম দেন। প্রজা টাকা দিতে অপারগ হইলে তাহার একশত টাকা মূল্যের অলংকার লইয়াছেন। কি আশ্চর্য্য! গবর্ণমেন্টের রাজ্যে এখনও এরূপ অত্যাচার! বিশেষ বিচারপতি অতি নিকট। অত্যাচারিত প্রজা আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। একে জমীদারের সঙ্গে মকদ্দমা প্রমাণ হওয়াই কঠিন। ইহার পরেও এ গ্রামের আংশিক জমীদার মীর মহসেন আলী আবদুল হকের পক্ষ হইয়া গরিব প্রজার সর্ব্বনাশের উপক্রম করিয়াছেন। না হবে কেন? জেতে-ভাই কি না? তবে সত্য ঘটনা, এই যাহা হউক। আমাদের গরীবের বন্ধু মহামান্য কেম্বেল বাহাদুর একবার মফস্বলের প্রতি দৃষ্টি করুন। ক্ষুদ্র তালুকদারগণ টাকার লোভে গরিবের প্রতি সময়ে সময়ে যেরূপ অত্যাচার করেন তাহা মনে করিলে কাহার না অশ্রুপাত হয়। অত্যাচারিদিগকে দমন করিতে কি কেহই নাই?’ (১৭ ফাল্গুন, ১২৭৯)

১৮৭৩ সালে জমিদার ও স্থানীয় প্রজাদের মধ্যে সম্পর্ক যথেষ্ট অবনতি হয়েছিল। নানা ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল কুষ্টিয়ায়। সে বছর নভেম্বরে যজ্ঞেশ্বর সাহা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক বরাবর এক চিঠি লেখেন, যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। চিঠিটি এখানে উদ্ধৃত হলো—

‘সম্পাদক মহাশয়! আজকাল কুষ্টিয়া মহকুমায় জমিদার ও প্রজাতে যে সদ্ভাব নাই বোধহয় আপনি তাহা জানেন। অনেকস্থানের প্রজারা যে জোটবদ্ধ হইয়া খাজানা বন্ধ করিয়াছে ও স্বীয় স্বীয় জমিদারের বিরুদ্ধে গবর্ণমেন্টে দরখাস্ত করিয়াছে, কুষ্টিয়াতে যাঁহাদের যাতায়াত আছে তাঁহারাই জানেন। কিন্তু কেবল আবেদন করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, অসদভিপ্রায়সাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। গত ২৩ এ কার্ত্তিক শুক্রবার রাত্রি ৪ দণ্ডের সময় আজমপুর নিবাসী বহুতর প্রজা তাহাদের জমিদার শ্রীযুক্ত হরলাল সাহা মহাশয়ের তত্রত্য কাছারি লুঠ করিয়াছে শুনিয়া আমরা একেবারে হতজ্ঞান হাইয়াছি। কৃষ্ণপক্ষ নিবন্ধন সন্ধ্যার পর অন্ধকার থাকাতেই বোধহয় দুর্ব্বৃত্তেরা তত সকালেই আক্রমণ করিতে সাহসী হাইয়াছিল। কাছারিতে ৫ জন মাত্র লোক ছিল ২ জন বাঙালি প্যাদা ২ জন পশ্চিমা বরকন্দাজ ১ জন গোমস্তা। সকলেই আপন আপন আহারের তদ্বিরে ব্যস্ত ছিল। এ প্রকার ঘটনা মনেও স্থান দেয় নাই। হঠাৎ বহুতর লোক একত্র হইয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিল। একে তাহারা পাকাদি কার্য্যে নিযুক্ত ছিল তাহাতে আবার অতর্কিত ভাবে আক্রান্ত হইল। লুঠকারিদিগকে কোনক্রমেই প্রতিরোধ করিতে পারিল না। প্রথমেই বাঙালী ২ জন পলায়ণ করে কেবল একজনের একখানা হস্ত লাঠির আঘাতে ভগ্ন হয়। দেশয়ালী ২ জন প্রাণপণে গোমস্তাকে রক্ষা করিতে চেষ্টা করে এবং অতি গুরুতররূপে আঘাত পায়। ইহাদের মধ্যে একজনের আঘাত অতীব শোচনীয় মস্তক ও শরীর সর্ব্বস্থানেই ক্ষতবিক্ষত। দেশয়ালীর হাড় বলিয়াই জীবিত আছে। গোমস্তা অল্পকিছু উপহার প্রাপ্ত হইয়া সুযোগক্রমে প্রাণ লইয়া পলায়ন করে এবং সমস্ত রাত্রি জঙ্গলে আশ্রয় লইয়া প্রাণ বাঁচায়। এদিকে প্রজারা সকলকে আহত ও পলায়ন পরতন্ত্র দেখিয়া হূষ্টচিত্তে কাছারিতে দ্রব্যাদি লুঠ করিয়া এদিক ওদিক প্রস্থান করিল।

‘কুষ্টিয়ার এলাকাতে শান্তিভঙ্গের এই প্রথম দৃষ্টান্ত। কর্ত্তৃপক্ষীয়গণ প্রথম সূত্রপাতেই উপায় অবলম্বন না করিলে প্রজারা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইবে। তাহা হইলে পাবনার মত ভয়ানক অনিষ্টের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। এই ভীষণ ব্যাপার শুনিয়া সকলেরই হূদকম্প উপস্থিত হইয়াছে। আবার শুনিতেছি স্থানে স্থানে শতাধিক লোক একত্র দলবদ্ধ হইয়া তাহাদের সহকারী হইবার জন্য ভদ্রলোকদিগের প্রতিও অত্যাচার করিতেছে। প্রজারা একে মূর্খ, তাহাতে আবার দলবদ্ধ, প্রশ্রয় পাইলে দেশে হুলস্থুল উপস্থিত করিবে। শুনিতে পাই আপনারা দেশের মঙ্গলাকাংখী এই সম্বন্ধে লেখনী ধারণ করিয়া দেশ রক্ষা করুন।’

উনিশ শতকে কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আরো কিছু পত্রিকার নাম এখানে তুলে ধরা হচ্ছে—

n   নব নলিনী (মাসিক); সম্পাদক: সুরেন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম প্রকাশ: ১৮৮৬

n   গার্হস্থ্য (মাসিক); সম্পাদক: অমৃতলাল বসু। প্রথম প্রকাশ: ১৮৮৬

n   চিকিৎসা দর্শন (মাসিক); সম্পাদক: রজনীকান্ত মুখোপাধ্যায়। প্রথম প্রকাশ: ১৮৮৮

n   সুরেন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা সমালোচক। প্রথম প্রকাশ: ১৮৯০।

n   শৈবী (মাসিক); সম্পাদক: শিবচন্দ্র বিদ্যার্নব। প্রথম প্রকাশ: ১৮৯৫। এটি ছিল তন্ত্রশাস্ত্রবিষয়ক একটি পত্রিকা।

n   কাহিনূর (মাসিক); সম্পাদক; এসকেএম মহম্মদ রওশন আলী। প্রথম প্রকাশ: ১৮৯৮। শুরুতে এটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হতো। এরপর কিছুদিন তত্কালীন ফরিদপুরের পাংশা থেকে। এ পত্রিকার নামপত্রে লেখা থাকত, ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে প্রকাশিত মাসিকপত্র ও সমালোচনা।’ অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিক-লেখক এ পত্রিকায় লিখেছেন—মোজাম্মেল হক, কায়কোবাদ, মীর মশাররফ হোসেন, শেখ ফজলুল করীম, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজী ইমদাদুল হক প্রমুখ।

শুধু পত্রপত্রিকা উদ্যোগ নয়, অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিকের জন্মস্থান এ কুষ্টিয়া। রামায়ণ বলতে বাঙালির আপন পাঠ হলো কৃত্তিবাসী রামায়ণ। বাল্মীকির রামায়ণকে প্রথম বাংলা ভাষায় রূপান্তর করেন কৃত্তিবাস ওঝা। কৃত্তিবাস নামেই তার খ্যাতি। পয়ার ছন্দে অনূদিত এ রামায়ণ ৫০০ বছর ধরে বাঙালির জনপ্রিয় পাঠ। কৃত্তিবাসের জন্ম কুষ্টিয়া সীমান্তের কাছে ফুলিয়া গ্রামে। বর্তমানে ফুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় অবস্থিত।

কিংবদন্তি লালন শাহ বা ফকির লালনের জন্ম কুষ্টিয়ায়। কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেনের নাম শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক-সম্পাদক জলধর সেন জন্মগ্রহণ করেন কুমারখালীতে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র জন্মস্থান সিমলা গ্রাম। তিনি কাঙাল হরিনাথের গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

লোক-কবি গগন হরকরা কুষ্টিয়ার মানুষ। গদ্য লেখক মোজাম্মেল হকের জন্ম শান্তিপুরে। বাংলা ভাষার বিশিষ্ট গদ্যকার জগদীশ গুপ্তের জন্ম কুষ্টিয়া শহরেই, ১৮৮৬ সালে। এমন আরো বহু কৃতী লেখক-কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক কুষ্টিয়ার সন্তান।

এস এম রশিদ: লেখক