সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিনির্মাণের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনের গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এমনকি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্যও তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ করে থাকে। ইতিহাসবিদ নূপুর দাসগুপ্ত মনে করেন ‘সামাজিক ইতিহাস রচনায় নারী, জেন্ডার ও সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোর পরিসর নির্মাণ ও প্রয়োগের ব্যাপারে তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি হয়। সীমিত সম্ভাবনার সামাজিক ইতিহাসের ধারাগুলোও এসব নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হতে শুরু করে এবং প্রাসঙ্গিক লৈঙ্গিক আলোচনাকে অন্তর্ভুক্ত করে।’ (বাংলাদেশের ইতিহাস, সুলতানী আমল, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদক আবদুল মমিন চৌধুরী)  উপনিবেশ ভারতে বসবাসের সময় বাংলায় ব্রিটিশ রমণীদের দৈনন্দিন গৃহস্থালি কর্মকাণ্ডই আলোচ্য প্রবন্ধের মূল বিষয়। আলোচনার প্রথম ভাগে একটি ব্রিটিশ পরিবারে ব্যবহূত বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী, দ্বিতীয় ভাগে কর্মচারী/পরিচারক শ্রেণীর পরিচয় এবং সবশেষে পণ্যদ্রব্যের মূল্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে বাংলায় এসে সংসার সামলানো ব্রিটিশ নারীদের জন্য খুব বেশি সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, যার বর্ণনা পাওয়া যায় মড ডাইভারের The Englishwomen in India (১৯০৯) গ্রন্থে। ভারতের জীবনযাপন সম্পর্কে গভীরভাবে জানতেন না এমন একজন ব্রিটিশ নারী বলছেন ভারতের জীবনযাত্রা হচ্ছে ‘idle, frivolous and luxury-loving’ কিন্তু তিনি আবার পরে বলছেন, ‘If is a life hedged about with dangers, difficulties and hardships rarely dreamed of in our placid English homes’. ভারতে মেম সাহেবদের ভূমিকা, আচরণ এবং জীবনধারা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি প্রবল ছিল, যেমনটি এ উদ্ধৃতি এবং ব্রিটিশ ভারতে লিখিত ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর গ্রন্থগুলোয় দেখা যায়। ইংরেজ নারীদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির এ প্রেক্ষাপটে The complete Indian Housekeeper and Cook-এর মতো উপদেশমূলক বইগুলোতে একটি ঔপনিবেশিক পরিবার পরিচালনাকারী ব্রিটিশ নারীদের অনুশীলনগুলোকে সুসংবদ্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। এ গ্রন্থটি রান্না থেকে শুরু করে দেশীয় পরিচারকদের সঙ্গে আচরণ করার বিষয়ে বিশদ নির্দেশনা প্রদান করে। 

আসবাবের পাশাপাশি একটি ব্রিটিশ পরিবারের রান্নাবান্না, পরিবেশন বা  সাজসজ্জার জন্য কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হতো তার ধারণা পাওয়া যায় স্টিল ও গার্ডিনারের বইয়ে। তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন উপাদানের নাম যুক্ত করেছেন। যেমন স্নোফেল আমেরিকান, নরওয়েজিয়ান অ্যাঙ্কোভিস, অ্যাসারবোনি অ্যান্ড কোং, মেপল সোপ, বোল্টন শিটিং, স্যানিটারি পেইন্ট, মেলিনস, বেঞ্জার্স, অ্যালেনবারির গুঁড়া দুধ প্রভৃতি। ব্র্যান্ড এবং কিছু নির্দিষ্ট পণ্য উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে এগুলো আক্ষরিক অর্থে ব্রিটিশ পরিবারের জন্য পরিচয় নির্ধারণকারী অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইংরেজ পরিবারগুলো এসব পণ্য কিনেছিল বা ব্যবহার করেছিল কিনা তা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কথা হলো নির্দিষ্ট গুণমান ও ব্র্যান্ডমূল্যের পণ্যগুলো ইংরেজ বাড়ির ধারণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ডেবোরা কোহেন মনে করেন, বস্তুগত সম্পদ ইংল্যান্ডে ভিক্টোরিয়ান হোমকে সংজ্ঞায়িত করলেও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্র্যান্ডের পণ্যের ব্যবহার ভারতে ইংরেজ বাড়ির ধারণা দেয়। (Deborah Kohen, Household Gods : the British and their Possessions)

গার্ডিনার একটি ইংরেজ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত পণ্যগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেন। পাহাড়ে ভ্রমণে যাওয়ার সময় একজন ইংরেজ নার্স ও তিন-চার সন্তানবিশিষ্ট একটি পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো উটের পিঠে করে নিয়ে যাওয়ার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন তিনি। যেমন:

প্রথম উট: দুটি বড় এবং দুটি বড় কাপড়ের ট্রাংক 

দ্বিতীয় উট: বাচ্চাদের কাপড়ের বড় ট্রাংক, প্লেট চেস্ট, তিনটি ব্যাগ এবং একটি হ্যাট রাখার বাক্স

তৃতীয় উট: তিনটি বইয়ের বাক্স, একটি বাক্সে ভাঁজ করা চেয়ার এবং হালকা টিনের বাক্সে কাপড় 

চতুর্থ উট: স্টোরের চারটি কেস, চারটি বেতের চেয়ার, স্যাডল স্ট্যান্ড, ম্যাকিনটোশ শিট

পঞ্চম উট: একটি চেস্ট ড্রয়ার, দুটি লোহার খাট, চায়ের টেবিল, ধোয়ার জন্য প্যান

ষষ্ঠ উট: দ্বিতীয় চেস্ট ড্রয়ার। পর্দা, বাতি, একটি লণ্ঠন, কাপড় ঝোলানোর ওয়ার্ডরোব।

সপ্তম উট: ক্রোকারিজের তিনটি পিপা, পানির ফিল্টার, অলংকারের পিপা, পর্দা, বাঁশ,  টেনিস খুঁটি

অষ্টম উট: হট-কেস, দুধ রাখার পাত্র, শিশুর গোসলের টব এবং স্ট্যান্ড, সেলাই মেশিন, ফেন্ডার অ্যান্ড আয়রন, পানির পাত্র, কলসি

নবম উট: তিনটি বাক্সে স্যাডলারি, রান্নাঘরেরে বাসনপত্র,  কার্পেট

দশম উট: ড্রয়িংরুমের বিভিন্ন জিনিস সহ দুটি বাক্স, চাকরদের কোট, আয়রন বাথ, চেভাল গ্লাস, প্লেট ঝুড়ি। 

পরিবহনের ক্ষেত্রে উটের বিকল্প হিসেবে লেখক গরুর গাড়ি ব্যবহারের কথা বলেছেন। উল্লিখিত পরিমাণ সম্পদ পরিবহনের জন্য ১০টি উটের পরিবর্তে তিন-চারটি গরুর গাড়িই যথেষ্ট হবে।  

গৃহস্থালি জিনিসপত্রের বাইরে ব্রিটিশ রমণীদের ঘরকন্নার প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা পরিচারক ছিল। পরিচারকদের প্রত্যেকের কাজ সুনির্দিষ্ট করা ছিল। আমাদের প্রবন্ধের মূল মনোযোগ বাংলা অঞ্চল হওয়ায় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে বিভিন্ন কাজে পরিচারকদের দায়িত্ব, বেতন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে একটি ব্রিটিশ পরিবারে মেমসাহেবদের কাজে সহায়তা করার জন্য যে সহায়করা ছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বেয়ারা বা বাহক, রাঁধুনি, খেদমতগার, খানসামা, মশালচি, মেথর, ভিস্তি, আয়া, দর্জি, ধোপা, সহিস, ঘাসকাটার লোক, মালি, গোয়ালা প্রভৃতি।

বেয়ারা/বাহক: বাংলায় বাহকের বেতন ছিল ১০-১৬ রুপি। মাদ্রাজ বা বোম্বেতে ঘরের কাজকর্মে বাটলার/খানসামা প্রধান কর্মচারী হলেও কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলায় প্রধান কর্মচারী ছিল বেয়ারা বা বাহক। প্রধান কর্মচারী হিসেবে সত্ ও সম্মানিত একজনকে বাহক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতো। অন্য ভৃত্যরা বাহকের মতামতকে গুরুত্ব দেয় এবং তার নেতৃত্ব অনুসরণ করে কেননা বাহকের সঙ্গে গৃহকর্ত্রীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। কর্মচারী মহলের শৃঙ্খলা এবং সম্মান অনেকাংশে নির্ভর করত প্রধান বাহকের ওপর। বাহককে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হতো, গৃহে মজুদ প্রতিটি বস্তুর যেকোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য বাহককে জবাবদিহি করতে হতো। ফলে নিজের কাজের সুবিধার জন্য অধীনস্থ চাকরদের ওপর নজর রাখতে হতো। 

বাহকের আরেকটি দায়িত্ব হলো রাতে ব্যবহূত বাতিগুলোকে প্রদীপ কক্ষে সরিয়ে দেয়া। সব কর্মচারীর কাজ পর্যবেক্ষণ করা। সপ্তাহে একদিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গৃহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। 

বাহক ও খানসামা একজন হলে তার দায়িত্ব হলো গৃহমালিকের ব্যবহূত কাপড় ব্রাশ করা, ভাঁজ করা, ড্রেসিং টেবিল পরিপাটি করা, আয়না পরিষ্কার করা। মালি বাগান পরিষ্কার করলে ফুলদানিগুলো সাজানো। সকালের নাশতার পরে গৃহকর্ত্রীকে বিগত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কম্পাউন্ডে যা কিছু ঘটেছে তা খোলাখুলিভাবে জানানো। নির্দিষ্ট সময়ে কল রিসিভ করা, কেউ পরিদর্শন করতে এলে তাকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে তার কার্ড গৃহকর্ত্রীর কাছে পাঠানো। 

বাহকের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যথাযথভাবে প্রদীপ জ্বালানো। ভারতে বেশির ভাগ বাতি কেরোসিন দিয়ে জ্বালানো হতো এবং পরিষ্কার আলো পাওয়ার জন্য এগুলো পরিচ্ছন্ন করা জরুরি। 

মেথর/ঝাড়ুদার: ঝাড়ুদারের কাজ পরিচালনার জন্য নানা ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল। যেমন দেশীয় ঝাড়ু, ডাস্টপ্যান অ্যাবল ব্রাশ, কার্পেট সুইচ, হার্থ ব্রাশ, অ্যাশ-প্যান, স্ক্র্যাবিং ব্রাশ, সাবান, সব ধরনের ডাস্টার, কার্বলিক বা ফিনাইল বোতল, কাঠের স্পড, কুকুরের জন্য চিরুনি এবং ব্রাশ। 

গৃহের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সব বিষয় ঝাড়ুদারের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং তার কাজের জন্য প্রতিটি কক্ষে প্রবেশ করতে পারত, ফলে বিশ্বস্ত দেখে ঝাড়ুদার নিয়োগ দেয়া হতো। অন্য চাকররা যেন ঝাড়ুদার/মেথরের ওপর কাজ চাপিয়ে না দেয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হতো। কিছু কিছু জায়গায় আয়ার স্বামীকে ঝাড়ুদার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও এটিকে মারাত্মক ভুল হিসেবে বিবেচনা করেছেন গার্ডিনার। গার্ডিনারের দেয়া বিবরণ অনুযায়ী বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে একজন ঝাড়ুদারের বেতন ছিল ৬ থেকে ৮ রুপি। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝাড়ুদার/মেথরের প্রথম কাজ হলো ময়লা-আবর্জনা ফেলে দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। এরপর বারান্দা ঝাড়ু দেয়া, ডাইনিং রুম, হল এবং সবশেষে ড্রয়িং রুম ঝাড়ু দেয়া। 

রাঁধুনি/বাবুর্চি: একজন বাবুর্চির প্রধান দায়িত্ব হলো একটি পরিপাটি রান্নাঘরের ব্যবস্থা করা। গৃহের সবার জন্য রান্না করা। রান্নাঘরকে আলো-বাতাসপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যকর রাখা। ব্রিটিশ পরিবারগুলোতেও কয়লার চুলা ব্যবহার করা হতো। বাবুর্চির সুবিধার জন্য কোনো কোনো পরিবারে স্টোভ ব্যবহার করা হতো। পানির সিঙ্ক, ওভেন ও কাপবোর্ডের ব্যবহার ছিল।  

খিদমতগার: খিদমতগারের দায়িত্ব হলো গৃহকর্ত্রীর কাজগুলো নিজ দায়িত্বে করা। গৃহকর্ত্রীর প্লেট, গ্লাস, সকালের নাশতার সব বিষয় নিজ হাতে পান্ট্রিতে নিয়ে ধোয়া। মাছি থেকে মুক্ত রাখার জন্য রাতের খাবারের প্লেট বাসনগুলো আলাদা বাসন মাজার স্থানে বা বারান্দায় নিয়ে ধোয়া। টেবিলে খাবার পরিবেশন করা।  

খেদমতগারের একটি প্রধান কর্তব্য হচ্ছে সকালে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ছোট হাজরি গৃহকর্ত্রীর বেডরুমে পৌঁছে দেয়া। খাবার টেবিল সাজানোর আগে বাবুর্চির কাছ থেকে কী কী খাবার রান্না হয়েছে তা জেনে নেয়া যেন সে প্রয়োজনীয় বাসন-কোসন সাজাতে পারে। বাংলায় একজন বাবুর্চির বেতন ছিল প্রায় ১৪-৪০ রুপি। 

মশালচি: মশালচি সাধারণত খেদমতগারের অধীনে কাজ করত। মশালচির কাজ হলো সকালে আগুন জ্বালানো, সকালের চা-টোস্ট বানানো এবং খেদমতগারের সব কাজে সহায়তা করা। 

ভিস্তি: ব্রিটিশ ভারতের গৃহকর্মে ভিস্তি সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একজন চাকর। ভিস্তির প্রথম কাজ হচ্ছে উপযুক্ত উৎস থেকে প্রতিদিনের খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা, পানি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে, ফিল্টার করে তা পানের যোগ্য করে তোলা। বাথরুম ও রান্নাঘরে পানি সরবরাহ করা। ভিস্তির মাসিক আয় ছিল মাত্র ৮ রুপি। 

আয়া: কিছু কিছু পরিবারে আয়া রাখা হতো। আয়ার দায়িত্ব অনেকটা অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতো। পরিবারে ছোট বাচ্চা না থাকলে আয়া মূলত গৃহকর্ত্রীর দেখাশোনা করতেন। ব্রিটিশ পরিবারের দেখাশোনা করার জন্য ইংরেজ নার্স রাখা হলে বেশির ভাগ সময় আয়ার আর কোনো দায়িত্ব থাকত না।  বাচ্চাদের দেখাশোনার ক্ষেত্রে বাংলার আয়াদের সুনাম ছিল এবং অন্যান্য প্রেসিডেন্সির তুলনায় বাংলা ও মাদ্রাজে আয়াদের বেতনও ছিল বেশি, যা হচ্ছে ১০-২০ রুপি। 

সহিস: ঘোড়া দেখাশোনা করার জন্য নিয়োগ করা হতো। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে একজন সহিস সারা মাসে ৮ রুপি উপার্জন করতে পারত। ঘোড়া দেখাশোনার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে গৃহকর্ত্রীর কাজের সীমানার বাইরের বলে মনে হলেও ব্রিটিশ রমণীরা ঘোড়ার দেখভালের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। সহিসের কাজ হচ্ছে সকালে ঘোড়াগুলোকে খাবার দেয়া, রাতের পোশাক গুছিয়ে রাখা, আস্তাবল পরিষ্কার করা। ঘোড়া চালানোর জন্য ঘোড়াগুলোকে জিন পরিয়ে প্রস্তুত করা। কাজ শেষে ফেরার পর ঘোড়াগুলোর যত্ন নেয়া, যেসব ঘোড়া বাইরে কাজে যাবে না সেগুলোর অনুশীলনের ব্যবস্থা করা, রাতের খাবার খাওয়ানো। ঘাস কাটার লোকও সহিসের সঙ্গে কাজ করত। ঘোড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস সরবরাহ করা, ঘাস কেটে গৃহের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা।  

দর্জি: খুব সংক্ষেপে দর্জির কাজ হচ্ছে গৃহকর্ত্রীকে দৈনিক কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা সেলাইয়ের কাজ করে দেয়া। রোববার ছুটি হলে অন্যান্য দিন আরো বেশি সময় কাজ করতে হতো। অন্যথায় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। দুপুরে ১ ঘণ্টা খাবারের বিরতি ছিল। ব্রিটিশ রমণীরা বেশির ভাগ সময় এবং বিশেষ করে কাপড় কাটার সময় দর্জির কাজ নিজে দেখাশোনা করতেন। স্থায়ীভাবে নিযুক্ত একজন দর্জি প্রায় সবসময় নিজের মজুরি সঞ্চয় করতে পারত যদি সে অবসর সময়ে এমব্রয়ডারি কাজ করতে পারে। একজন দর্জির বেতন ছিল প্রায় ১৫ রুপি। 

ধোপা: ধোপার কাজের জন্য খুব কম সময় তার গৃহকর্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাত্ হতো। গৃহকর্ত্রী কাপড় ধোয়ার জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে দিতেন। অনেক সময় নিজেদের কাপড়চোপড় এবং নানা ধরনের পানিবাহিত রোগ থেকে নিরাপত্তার জন্য নিজেদের কূপেই কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা করা হতো। সাধারণত সোমবার ও বৃহস্পতিবার সপ্তাহে এই দুদিন ধোপা কাপড় ধোয়ার জন্য নিয়ে যেত এবং ফেরত দিত। 

হিসাবনিকাশ: ব্রিটিশ ভারতের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের আয়-ব্যয়ের লিখিত হিসাব প্রদান করতে হতো।  ফলে ঠিকমতো হিসাবনিকাশ রাখা হচ্ছে কিনা তা দেখাশোনা করতেন গৃহকর্ত্রী, যেন এটি অবহেলিত থেকে না যায়। হিসাব রাখার বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও গৃহকর্ত্রীদের এটি দ্রুত শিখে নিতে হতো। 

কলকাতা ছিল খুবই ব্যয়বহুল এলাকা। বোর্ডিং হাউজে বসবাস করতেন যেখানে এক রুমে দুজন মানুষের জন্য মাসিক ভাড়া পড়ত ৩৫০ রুপির মতো অথবা তারা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। কলকাতায় কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি ছিল এবং সাধারণত কেউ মেথর বা ভিস্তির মতো কর্মচারী নিয়োগ দিত না। ক্যাটারিংয়ের খরচ সারা দেশের তুলনায় কলকাতায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেশি ছিল, কিন্তু তার পরও মূল্য তালিকা যুক্তিসংগত ছিল বলে অনুমিত হয়। কেননা প্রতি রুপিতে ৮-১০টি রুটি, ছয় সের দুধ এবং ৬ আনায় ডিম পাওয়া যেত। শাকসবজির প্রাচুর্য ছিল। প্রতিদিনই বাজার থেকে আধা রুপি বা ১ আনার লবণ, মরিচ প্রভৃতির জন্য ব্যয় করার প্রবণতা দেখা যায়। 

মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাখা ব্যবহার করা হতো। পাখা টানার জন্য একটি বাড়িতে প্রায় তিনজন করে কর্মচারী নিয়োগ দিতে হতো। কলকাতায় বৈদ্যুতিক পাখার প্রচলন ছিল। 

পুরো ভারতের তুলনায় বাংলার কিছু জায়গায় দ্রব্যমূল্য কম ছিল। মুরগির দাম ৩ আনা থেকে শুরু হয়। কিন্তু দুধ এবং ঘোড়ার শস্যের দাম বেশি ছিল।

ব্রিটিশ নারীদের ভারতীয় উপমহাদেশের সংসার পরিচালনার জন্য ডাইভার মড তার The Englishwomen in India গ্রন্থে উপদেশ দিয়েছেন যে 

In fine, if a woman wills to keep house successfully in India, she must possess before all things a large tolerance and a keen sense of justice, rare feminine virtues both, even in these days. She must train her mind to look upon petty falsehoods, thefts, and uncleanliness not as heinous offences, but as troublesome propensities, to be quietly and firmly checked. Swift should she be also to recognise the trustworthy man, and to trust him liberally.

সফলভাবে সংসার পরিচালনা করা রাজ্য পরিচালনা থেকে কোনো অংশেই কম কিছু নয়। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান গৃহকর্ত্রীরা সংসারের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রটিকে এমন একটি জায়গা হিসেবে বিশেষ অধিকার দিয়েছিল যেখানে ক্ষমতা কাঠামোগত জাতিগত এবং লিঙ্গ পরিচয়ের সম্পর্কগুলো নিয়োগকর্তা এবং পরিচারকরা একইভাবে শিখেছিল। গৃহকর্ত্রীরা নিজেদের দেশীয় কর্মচারীদের সভ্য সমাজের দায়িত্ব পালনের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী সমাজের জন্য একটি সেবামূলক কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। 

কাওছারা বেগম: এমএ শিক্ষার্থী, ল্যান্ডস্কেপ আর্কিওলজি বিভাগ, উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন