‘আমাদের কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেছে? সারা দিন কেউ আমাদের খোঁজ করেছে?’ বাবা হারানোর পর তাঁর প্রথম সন্তানের প্রতিক্রিয়া ছিল এ রকম। ২০ জুলাই ২০১২ সন্ধ্যায় বনানীতে গুলতেকিন ভাবির বাসায় গিয়ে নোভা ও শিলাকে দেখতে পাই। আগের রাত বাংলাদেশ সময় ১১টার পর তাদের বাবা বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন। তখন থেকেই কাঁদছে ওরা। চোখ ফুলে গেছে। আমার স্ত্রী তানিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের পাশে পেয়ে ওদের চোখ বেয়ে আবার অশ্রু ঝরতে লাগল। কাছেই ছিল নুহাশ। গুলতেকিন ভাবি আমেরিকায় ছোট কন্যা বিপাশার কাছে আছেন। হুমায়ূন আহমেদ বলতেন, ‘প্রথম সন্তান বাবা-মা’র কাছে খেলনার মতো।’ তাকে নিয়ে বাবা-মা সবসময় খেলা করে। বিভিন্ন সাজে সাজায়। চোখের সামনে ছেড়ে দেয়, ওই বাচ্চা খেলতে থাকে আর তারা অপার আনন্দ পায়। নোভাকে নিয়ে হুমায়ূন ভাই-ভাবিও অনেক খেলা করেছেন। নোভা এখন পিএইচডি শেষ করে নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটিতে অধ্যাপনা করছে। তাঁর স্বামী ড. আরশাদ চৌধুরীও নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটিতে অধ্যাপনা করছে। হুমায়ূন আহমেদের বড় সন্তান হিসেবে অনেক দায়িত্ব এখন তার ওপরই বর্তায়। ওকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হুমায়ূন ভাইয়ের দাফন নিয়ে কিছু ভেবেছ?’ নীরবতা দেখে আমিই বললাম। ‘এখানে আসার আগে মিরপুরে খালাম্মার (হুমায়ূন আহমেদের আম্মা) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। শাহীন (হুমায়ূন ভাইয়ের ছোট ভাই আহসান হাবীব) ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের বর্তমান শ্বশুর মোহাম্মদ আলী সাহেব তাকে ফোন করে জানিয়েছেন, নুহাশপল্লীতে দাফন হবে।’ দুই বোন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘ড্যাডি বারবার বলেছে, নুহাশপল্লীকে যেন গোরস্তান বানানো না হয়।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘তোমাদের ইচ্ছা কী?’ ওরা বলল, ‘মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তান হলে ভালো হয়?’ ‘এ কথা তোমরা কাউকে জানিয়েছ?’ তখনই রাগ, অভিমান ও কষ্ট নিয়ে ওরা বলেছিল, ‘আমাদের কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেছে? সারা দিন কেউ আমাদের খোঁজ করেছে? আমরা কাকে বলব?’ আমি বললাম, ‘তোমাদের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা তোমাদের চাচা ইকবাল ভাইকে বলো।’
মুহম্মদ জাফর ইকবালও তখন আমেরিকায় বড় ভাইয়ের পাশে। একদিন পর উনি দেশে ফিরে আসা থেকে নোভা, শিলা ও নুহাশ সর্বক্ষণ তাঁর সঙ্গে রইল। তার একদিন পর হুমায়ূন আহমেদের কফিন এল দেশে। এর একদিন পর নুহাশপল্লীতে দাফন করা হলো। মুরগির বাচ্চারা যেমন সারাক্ষণ মা মুরগির পেছনে পেছনে হেঁটে বেড়ায়, তেমন করেই তিনদিন কেটেছে। জাফর ইকবাল এবং ইয়াসমীন ভাবির পেছন পেছন হেঁটে বেড়িয়েছে ওরা ভাই-বোনেরা। আর ইয়াসমীন ভাবি ওদের আগলে রেখেছেন। ইকবাল ভাই যখন দখিন হাওয়ায় গিয়েছিলেন, সেই সময়টুকু বাদ দিয়ে তিনদিনের প্রায় সবটুকু সময়ই ওদের কেটেছে এ দুই আপনজনের সঙ্গে। এবং রাতের অল্প কিছু সময় বাদে সবটুকু সময় আমিও ছিলাম তাদের সঙ্গী হয়ে। টেলিভিশনের কল্যাণে সারা দেশের মানুষ সেই সময়ের ঘটনাগুলো দেখেছে।
আমাদের সমাজে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করতে হয় সার্টিফিকেটের মাধ্যমে। অবাক করা বিষয় হলেও আইন এমনটিই নির্ধারণ করে দিয়েছে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন, আপনজন-পরিচিতজন জানলেও হবে না কোর্ট বলে দেবে এরা এরা ওই ব্যক্তির উত্তরাধিকারী। কোর্টের এ পদ্ধতিটিও আবার খুব সরল পথ নয়। কয়েক ঘাট ঘুরে কিছু কাগজপত্র জোগাড় করে সেগুলো কোর্টে জমা দেয়ার পরই কোর্ট প্রত্যয়ন করবে। সেই কাগজপত্র জোগাড়ের জন্যও দৌড়তে হলো কয়েক জায়গায়। সিটি করপোরেশন থেকে নুহাশপল্লীর পিরুজালি গ্রাম পর্যন্ত। আমার এত দৌড়াদৌড়ি নিয়ে নোভাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। এমনকি উত্তরাধিকারী বিষয়টি নিয়েও ওদের কোনো আগ্রহ ছিল না। আমার মাথা ঘামানোর স্থানটি আমার কাছে খুবই সংবেদনশীল ছিল। তাই আমি হাল ছাড়ছিলাম না। আমার মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের দুটি স্থায়ী সম্পদ হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ নেই কিন্তু সেগুলো আছে। প্রথমটি সেন্ট মার্টিনে জমি ক্রয় এবং ‘সমুদ্র বিলাস’ নির্মাণ। সেন্ট মার্টিনে জমি ক্রয়ের পর অনেকবার টেকনাফ যেতে হয়েছে। নিজের ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেন্ট মার্টিনে নিজের জন্য জমি কিনলাম না। আমি চাইছিলাম সেন্ট মার্টিনে জমির মালিক হয়ে হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে যে আনন্দ কাজ করছে, তা এককভাবে তাঁরই থাকুক। আমি ঠিক করলাম টেকনাফ সিবিচে জমি কেনব। জমি পাওয়া গেল, দেখলাম, পছন্দ হলো, কথাবার্তা চূড়ান্ত, এখন শুধু টাকা পরিশোধ করে রেজিস্ট্রি করব। এত বড় আনন্দের সংবাদ হুমায়ূন ভাইকে না জানিয়ে পারা যায়! হুমায়ূন আহমেদ শোনামাত্র চিত্কার করে উঠলেন, ‘তুমি একা কিনবে? কিছুতেই না। আমাকেও কিনে দাও।’ বড় ভাইয়ের মতো দাবি নিয়ে কথাগুলো বললেন। ‘কতটুকু জমি?’ বললাম, ‘চার কানি।’ ‘কানি টানি বুঝি না। অর্ধেক তোমার আর অর্ধেক আমার।’ আপনজনের আবদার, রাখতেই হয়। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে।’ টেকনাফে বন্ধু নুরুল হকের সঙ্গে কথা বলে আমার সিদ্ধান্ত জানালাম। সে বলল, ‘ফরিদ ভাই সবটুকু জমি তো আপনার জন্য রাখি নাই। আমার বাপ-চাচাদের পূর্বের জমি এগুলো। তাই ভেবেছি দুই কানি আপনাকে দেব আর দুই কানি জমি আমি রাখব। পিতৃপুরুষের জমি, স্মৃতিচিহ্ন।’ কথায় যুক্তি এবং আবেগ দুটোই আছে। এখন কী করি? হুমায়ূন ভাইকে দুই কানি জমি দেব কথা দিয়েছি। কথা রাখতে হবে। নুরুল হককে বললাম, ‘ঠিক আছে, আমার লাগবে না। হুমায়ূন ভাইকে দুই কানি জমি দিয়ে দিলাম। আপনি রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন। তারিখ ঠিক হলে আমাকে জানাবেন আমি আসব।’ নুরুল হক ভাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আমিও এক কানি ছেড়ে দিলাম। আমি আর আপনি এক কানি করে নেব।’ নির্ধারিত দিনে টেকনাফ যাওয়ার আগে হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘আপনার জমি রেজিস্ট্রি করবার জন্য টেকনাফ যাচ্ছি।’ গুলতেকিন ভাবি আমার হাতে টাকার বান্ডিল ধরিয়ে দিলেন। কিসের টাকা জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন, ‘ওকে এই জমিটা আমি গিফট করতে চাই।’
জমির মালিক আমরা তিনজন। হুমায়ূন আহমেদ দুই কানি, ফরিদ আহমেদ এক কানি আর নুরুল হক এক কানি। রাস্তা-ঘাটের আর একটু উন্নতি হলে কিছু একটা করব। অন্তত সীমানা প্রাচীর বা কোনো ছোটখাটো স্থাপনা— আমাদের ভাবনাটা এ রকমই ছিল। এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ পারিবারিক অশান্তিতে জড়িয়ে পড়লেন। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো। উঠতি ক্ষমতাসীন কয়েকজন তরুণ জমি দখল করে বাঁশ আর চাটাইয়ের ছাপরা তুলে চাষাবাদ শুরু করে দিল। দখলমুক্ত করতে না পেরে নুরুল হক কোর্টের শরণাপন্ন হলো। সেই জমি নিয়ে মামলা হলো। কক্সবাজার কোর্টে মামলা চলে। আমি যেতে পারলেও হুমায়ূন ভাই পারেন না। মামলার অগ্রগতির জন্য অন্তরায়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় হিসেবে নুরুল হককে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে দিলাম। খুব সম্ভবত ২০০২ বা ২০০৩ সালে নোটারি পাবলিকের কাছে এফিডেভিট করে একটি দলিলে আমি আর হুমায়ূন আহমেদ স্বাক্ষর করে সমগ্র ক্ষমতা নুরুল হককে প্রদান করলাম।
মামলা চলাকালীন জড়িত ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের ওই মামলার পক্ষাবলম্বন করতে হয় নতুবা মামলা খারিজ হয়ে যায়। এ সংবাদ নিয়ে নুরুল হক ভাই আমার কাছে এল। মামলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূর্বে একবার আমাদের পক্ষে রায় হয়েছিল। বিরোধী পক্ষ আপিল করে এবং আরেকটি মামলা করে। এখন সব মামলাই শেষ পর্যায়ে এবং রায়ও আমাদের পক্ষে। অল্প কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি আছে। এর মধ্যে হুমায়ূন ভাই চলে গেলেন। তিনি বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছিলেন, ‘ফরিদ তাড়াতাড়ি মামলাটা শেষ করার ব্যবস্থা করো। আর তোমার জমিটাও দিয়ে দাও আমি একটা হোটেল বানাব।’ মামলা তো আর আমাদের ইচ্ছায় চলে না। এর একটা নিজস্ব গতি আছে। সেভাবেই চলছিল। যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তখন আর তিনি আমাদের মাঝে নেই। সুতরাং এই জমি তাঁর উত্তরাধিকারীদের হাতে তুলে দেয়ার একটা দায়িত্ব বোধ করতে লাগলাম। এখন যত দ্রুত সম্ভব উত্তরাধিকারীদের তাঁর পক্ষাবলম্বন করিয়ে মামলাটা পরিণতির দিকে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এ কাজটি করার জন্য আগে উত্তরাধিকারী শনাক্ত করতে হবে আইনানুগভাবে।
কাজটা সমাধা করার জন্য খোঁজখবর নিতে লাগলাম। এসব কাজে পরিবার থেকে সহযোগিতা পাবার আশা নেই। তাই নিজে নিজে খোঁজখবর করতে লাগলাম। মৃত্যু সার্টিফিকেট লাগবে। যেহেতু বিদেশের মাটিতে মারা গেছেন, তাই দেশে দাফন করার প্রত্যয়নপত্রও লাগবে। নুহাশপল্লী পিরুজালি গ্রামের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে খোঁজ নেয়ায় জানা গেল ওই গ্রামটি আগে যে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন সেই ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনের পরই চেয়ারম্যান নির্ধারণ হবে। এর আগে প্রত্যয়নপত্র পাওয়া যাবে না। ওই প্রত্যয়নপত্র পেলেই চলবে না। এর পর সিটি করপোরেশন এবং কোর্টে আবেদন করতে হবে উত্তরাধিকারী সার্টিফিকেটের জন্য। আবেদনে সব উত্তরাধিকারীর স্বাক্ষর লাগবে। অর্থাত্ যৌথ আবেদন। এখানেই বড় সমস্যা। সব সদস্যকে একত্র করা স্বপ্নের বাইরে। এক কাগজে স্বাক্ষর নেয়াও কঠিন কাজ। যত কঠিনই হোক, কাজটি সমাধা করতেই হবে। তোপখানা রোডের এক উকিলের চেম্বারে গেলাম। আমার পরিচিত এক উকিল সেই চেম্বারের একজনের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। গিয়ে দেখলাম চেম্বারটি এক নামকরা আইনজীবীর। যাকে আমরা অনেকেই চিনি। হাইকোর্টের বিভিন্ন মামলা সম্পর্কে টিভির ক্যামেরায় তাঁকে কথা বলতে দেখেছি। তাঁর সহকারীর সঙ্গে কথা বললাম, কীভাবে উত্তরাধিকারী সার্টিফিকেট বের করা যায়? জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘স্যারের সঙ্গে কথা বলি।’ তাঁর স্যারের সঙ্গে কথা বলার খুব ইচ্ছা আমার নেই। আমি শুধু জানতে চাই প্রক্রিয়াটি কী? এর মধ্যেই সহকারী স্যারের সঙ্গে কথা বলে বের হয়ে এলেন। এবং আমাকে বললেন, ‘আসেন, স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ আমাকে ভেতরে রেখে সহকারী বের হয়ে এলেন। উকিল ভদ্রলোক আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। তত দিনে দেশের সবাই হুমায়ূন পরিবারের সমস্যাটা জানে। বিশেষ করে দাফন নিয়ে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দেশের কারো জানতে বাকি নেই। এবং এ থেকে পরিবারের অনৈক্যের চিত্রটিও জনসমক্ষে চলে এসেছে। উকিল সাহেব আমার সঙ্গে গল্প শুরু করে দিলেন। পুরনো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। হুমায়ূন আহমেদ বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলে এ সমস্যায় পড়তে হতো। পরিবার সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার কৌতূহল দমন করতে পারত না কেউ। উকিল সাহেব অনেক কথা বললেও সহজ সমাধানে আসতে পারলেন না। তার কাছেও ওই পুরনো সমাধান। উত্তরাধিকারী সবাইকে একত্রে আবেদন করতে হবে। তবে তিনি পথ দেখালেন। আর একজন উকিলের সন্ধান দিলেন, যারা এ বিষয় নিয়ে কাজ করেন। সহকারীকে ডেকে বললেন, ওই উকিলের চেম্বারের ঠিকানা আমাকে দিতে। আসার জন্য উঠতে উঠতে উকিল সাহেবকে বললাম, ‘কাজটা একটু জলদি সমাধা করতে হবে, কোর্টে একটা মামলা আছে। পক্ষ গ্রহণ করতে না পারলে মামলা খারিজ হয়ে যাবে।’ আমার এ কথার পর উকিল সাহেব আমাকে আবার বসালেন। বললেন, ‘কোর্ট থেকে কোনো কাগজ নিয়ে আসতে পারবেন?’ জানতে চাইলাম, ‘কেন?’ উনি বললেন, ‘ওই কাগজে সবার স্বাক্ষর নিয়ে কোর্টে দাখিল করলে আপাতত মামলাটা চালিয়ে নিতে পারবেন।’ বিদায় নিয়ে ওই কক্ষ থেকে বের হলাম। সহকারী তার কক্ষে নিয়ে গেলেন। আরেকজন আইনজীবীর অফিসের ঠিকানা দিলেন। বের হতে চাইলাম, উনি বললেন, ‘ফি’।
উকিলকে দিয়ে মামলা লড়লে ফি দিতে হয় জানতাম, কিন্তু কথা বললেও ফি লাগে? তখনই আমার নজরে এল, উকিল সাহেবের কক্ষের সামনের গ্লাসে একটি কাগজ সাঁটানো। তাতে লেখা, ‘পরামর্শের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ফি ২৫ হাজার টাকা’। এখন আমার চোখ চড়ক গাছে। আমি তো কথা বলতে চাইনি। সহকারী আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে! কক্ষে ঢোকার আগে এ কাগজ চোখে পড়লে আমি ঢুকতাম না। প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমরা কথা বলেছি। যদিও গল্প শুরু করেছিলেন উনি এবং আইনের বাইরের গল্পও হয়েছে। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, উনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন। কি করব? ভাবছি, এত টাকাও তো পকেটে নেই। মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম, হাজার দশেক টাকা সহকারীর হাতে ধরিয়ে দেব। দেখি কী বলে। এর মধ্যেই বেল বেজে উঠল, সহকারী আমাকে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেল। ফিরে এসে জানাল যে, ফি লাগবে না। অর্থাত্ উকিল সাহেব এটাকে পরামর্শ বৈঠকের পরিবর্তে গল্প হিসেবে নিয়েছেন। ধন্যবাদ দিয়ে চলে এলাম। ঘটনাবহুল এ সাক্ষাত্কারের অভিজ্ঞতা জাফর ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করলাম। তার সঙ্গে পরামর্শ করে দ্বিতীয় উকিলের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করলাম। এখান থেকে নিশ্চয়তা পেলাম, সার্টিফিকেট বের করতে পারব। কিন্তু উত্তরাধিকারীদের সবার না পারলেও কয়েকজনের স্বাক্ষর লাগবেই। এ কাজটি আমার দ্বারা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস। খালাম্মা, নোভা, শিলা, নুহাশ— এরা এক কাগজে স্বাক্ষর করবে এবং বিপাশার পাওয়ার অব অ্যাটর্নিও নোভার কাছে আছে। উকিলের কাছ থেকে তারিখ নিলাম। ওই তারিখে ওরা তিন ভাই-বোনকে নিয়ে উকিলের চেম্বারে যাব। ওরা দরখাস্তে স্বাক্ষর করে দিলেই আইনি কার্যক্রম শুরু করা যাবে। ইকবাল ভাইকে বললাম। তিনি নোভার সঙ্গে কথা বললেন। আমিও নোভার সঙ্গে কথা বললাম।
নির্দিষ্ট তারিখে নোভার স্বামী ড. আরশাদ চৌধুরী গাড়ি চালিয়ে ওদের নিয়ে এল। নোভা ছাড়াও শিলা, ওর স্বামী ও নুহাশ— মোট পাঁচজন এক গাড়িতে পুরানা পল্টন এসেছে। তখন ‘সময় গ্রাফিকস’-এর অফিস ফকিরাপুলে। কিন্তু পুরানা পল্টনে আমার যাতায়াত সবসময় ছিল তাই ওখানকার বিল্ডিংগুলো খুব পরিচিত। আমার দেয়া ঠিকানায় বিকালে ওরা এসে পৌঁছল। ওদের নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। আরশাদ গাড়ি পার্ক করে আসার পর ওই বিল্ডিংয়ের লিফটের দিকে এগোতে লাগলাম। লিফটের গোড়ায় এসে ভাই-বোনেরা দাঁড়িয়ে গেল। লিফটের দিকে পা বাড়াল না। শিলা আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘আংকেল আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ আমি দুষ্টামি করে বললাম, ‘এগারো তলায়। উকিলের চেম্বারে।’ শিলার আকুতি, ‘না গেলে হয় না?’ কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘তাহলে এলে কেন?’ শিলা আমার হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে সাবলীলভাবে বলল, ‘আপনি বলেছেন তাই এলাম। আপনি ডাকলে না এসে পারি? কিন্তু কোনো কাগজে-টাগজে আমরা স্বাক্ষর করব না।’ আবারো বললাম, ‘স্বাক্ষর যদি না-ই করবে, তবে কষ্ট করে এত দূর এলে কেন?’ ভারি কণ্ঠে আবার সে বলল, ‘না এলে আপনি কষ্ট পাবেন, তাই এলাম। আপনি ডেকেছেন, আমরা এসেছি। আপনার কথা রেখেছি। এখন আমরা চলে যাব। কোনো চেম্বারেও যাব না, কোনো কাগজেও স্বাক্ষর করব না। জীবিত মানুষটাকেই আমরা পেলাম না আর তার সম্পদ...?’ কথা শেষ করার আগেই ওর কণ্ঠ ভিজে এল। আমিও খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়লাম। ওদের বললাম, ‘ঠিক আছে, তোমরা যাও। তোমাদের কথায় যুক্তি এবং আবেগ দুটোই আছে।’
হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারী প্রত্যয়নপত্র বের করার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ভেস্তে গেল। কক্সবাজার থেকে নুরুল হক জানাল, কোর্ট বলেছে। একই কাগজে আমি এবং হুমায়ূন আহমেদ যৌথভাবে নুরুল হককে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিলেও মৃত্যুর কারণে হুমায়ূন আহমেদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল হয়ে যাবে; কিন্তু আমারটা বহাল থাকবে। অর্থাত্ আমার আর নুরুল হকের পক্ষে মামলা চলবে, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মামলা খারিজ হয়ে যাবে। এ সংবাদ আমার জন্য মোটেও সুখকর নয়। আমার নিজের জমির খুব দরকার নেই। শখ করে কেনা। বরং হুমায়ূন ভাইয়ের অনেক পরিকল্পনা ছিল। এখন তার জমিই যদি বেহাত হয়ে যায়, তবে এ জমিপ্রাপ্তি আনন্দ নয় বরং সারা জীবন আমাকে কষ্ট দেবে। কী করা যায়? উপায় খুঁজতে লাগলাম। মনে পড়ল, পঁচিশ হাজার টাকা পরামর্শ ফির উকিলের শেষ কথাটা। যদি কোর্ট থেকে কোনো কাগজ বের করা যায়! ওই পথে পা বাড়ালাম। তৃতীয় প্রচেষ্টা সফলতা এনে দিল। ওই কাগজে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা গেল। মামলাটা বেঁচে গেল।
কোর্টের অ্যাপ্রুভ করা সার্টিফায়েড কাগজ দিয়ে উত্তরাধিকারী সার্টিফিকেট এবং বিস্তারিত অংশ, ভগ্নাংশ বের করা হলো। এ কাজগুলো খুব সুন্দরভাবে সম্পূর্ণ করলেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সেক্রেটারি জয়নুল আবেদিন। কে কে হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারী এবং কে কত অংশের ভাগীদার সব মীমাংসা করা হলো। একটা দরজা খুলতে পারলেই দ্বিতীয় দরজা খোলা সহজ হয়ে যায়। এখানেও তাই হলো। লেখক চলে যাবার পর প্রকাশকরা লেখক সম্মানী দেয়া নিয়ে এক সংকটে ছিলেন। কার হাতে দেবেন? কাকে কত দেবেন? এসব প্রশ্নের সমাধান কে দেবেন? এদিকে লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর বইয়ের বিক্রি বেড়ে গেল। পাঠকরা হুমায়ূন আহমেদের সব বই পড়তে চায়। তাঁকে আরো জানতে চায়। নতুন পুরনো সব বই বিক্রি হতে লাগল। প্রয়োজন হলো রিপ্রিন্টের। বইয়ের সরবরাহ থামিয়ে রাখা যাবে না তো! বইগুলো পুনর্মুদ্রণ হতে লাগল বিনা অনুমতিতেই। কার কাছে অনুমতি নিতে যাব? ‘এসব ব্যাপারগুলো না হয় পরে দেখা যাবে। মার্কেটে এখন বইয়ের চাহিদা, বই মুদ্রণ করে চাহিদা পূরণ করা হোক’— অনেকটা এ রকম মনোবৃত্তি। লেখকের মৃত্যুর সাত মাস পরই ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলে এল। এ সময় হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের চাহিদা তুঙ্গস্পর্শী। কিছু কিছু প্রকাশক পুরনো বই কয়েকটি একত্র করে সংকলন বের করার পরিকল্পনা করে ফেললেন। লেখকের পরিবারের একাংশের সঙ্গে তাদের অনেকেরই কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি তারা কোথায় থাকে তাও জানেন না। ‘দখিন হাওয়া’ প্রায় সব প্রকাশকই চেনেন। হুমায়ূন আহমেদ একযুগ ধরে এ বাসায় বসবাস করছেন। নতুন পরিবার গড়ে তুলেছেন। তাঁরা এখানেই থাকেন। এদিকেই প্রকাশকদের যাতায়াত বৃদ্ধি পেল। নতুন সংকলন বইয়ের অনুমতি সেখান থেকেই আসতে লাগল। কোনো কোনো প্রকাশক আনঅফিশিয়ালি বলেছেন যে, তারা ওখানে এসব সংকলনের জন্য রয়্যালটির কিছু অগ্রিম টাকা দিয়ে অনুমতি নিয়ে এসেছেন। সংকলন প্রকাশের ধারা ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বইমেলা পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এ সাড়ে চার বছরে অনেক সংকলন ও একক বই বের হয়েছে, কিন্তু লেখকের উত্তরাধিকারীদের সর্বসম্মত অনুমতিক্রমে নয়। শুধু একজন প্রকাশকের কথা আমি জানি যে, চুক্তিপত্র করে সবার স্বাক্ষর নিয়ে দু-তিনটি সংকলন প্রকাশ করেছে। বাকি সংকলনগুলোর কোনো অনুমতিপত্র কেউ দেখাতে পারবেন বলে মনে হয় না।
এসব আনুষ্ঠানিকতা সারতে প্রায় দুই বছর চলে গেছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশকদের কাছে একটা পত্র এল। উত্তরাধিকারীদের পক্ষে একজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিনিধির ছবিসংবলিত চিঠি এবং উত্তরাধিকারীদের বিবরণ, অ্যাকাউন্ট নম্বর ইত্যাদি। প্রকাশকদের জন্য রয়্যালটি প্রদানের দরজা খুলে গেল। সবাই হিসাব কষতে শুরু করলেন। উত্তরাধিকারীদের যার যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়্যালটির টাকা জমা দিয়ে হিসাবের কাগজ প্রতিনিধি বা উত্তরাধিকারীর নিকট পাঠিয়ে দেয়া। এ উপলক্ষে একটি নতুন কাজও হলো। অনেক প্রকাশকই বলতেন, তারা কোনো স্টেটমেন্ট লেখককে কখনো দেননি। এমনকি রয়্যালটি প্রদানের পর লেখকের কাছ থেকে কোনো স্বাক্ষরও গ্রহণ করেননি। অর্থাত্ রয়্যালটি প্রদানের কোনো প্রমাণপত্র নেয়া হয়নি। এবার সবাই একটি হিসাব তৈরি করে জমা দিলেন। হুমায়ূন আহমেদ এ রকমই ছিলেন। কে হিসাব দিল? কে না দিল? এগুলো নিয়ে খুব মাথা ঘামাতেন না। যে যা রয়্যালটি দিয়ে আসতেন, তাই নিয়ে নিতেন। তবে কেউ লিখিত হিসাব দিলে তা খুব আগ্রহ নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। অন্তত আমার বেলায় তা-ই ঘটেছে।
হুমায়ূন আহমেদ অসুস্থ হবার পর প্রকাশকরা কেউ কেউ টাকা দিয়েছিলেন। কেউ বলতেন, ডলার পাঠালাম। কেউবা অন্যভাবে বলতেন। মনে হতো লেখকের জন্য প্রকাশক ভালোবেসে এসব করছেন। কিন্তু হিসাব দেয়ার সময় সব অর্থই অগ্রিম রয়্যালটি হিসেবে দেখানো হলো। এবং পাওনা রয়্যালটি থেকে অগ্রিম প্রদত্ত ওই পরিমাণ টাকা কেটে বাকিটা উত্তরাধিকারীদের অ্যাকাউন্টে জমা দেয়া হলো। যদিও প্রায় কোনো প্রকাশকের কাছেই অগ্রিম প্রদানের প্রমাণপত্র ছিল না। উত্তরাধিকারীরাও এ নিয়ে কিছু বলেননি। প্রকাশকরা যত টাকা অগ্রিম প্রদান দাবি করেছেন। তাঁরা তাই মেনে নিয়েছেন। সর্বাধিক সংখ্যক বইয়ের একজন প্রকাশক অগ্রিম প্রদান দেখিয়ে ৭০-৮০ লাখ টাকা রয়্যালটি থেকে কর্তন করে নিয়েছেন। চিকিত্সা চলাকালীন বিদেশে থাকা ও চিকিত্সা খরচ বাবদ তার হাত দিয়ে এ পরিমাণ টাকা খরচ হতেই পারে— এ বিবেচনায়ই হয়তোবা উত্তরাধিকারীরা এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেননি। কারো কাছেই তাঁরা অগ্রিম টাকা প্রদানের প্রমাণপত্র দেখতে চাননি।
জাতীয় ঈদগা মাঠে হুমায়ূন আহমেদের জানাজার জন্য লক্ষাধিক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। অস্থায়ীভাবে নির্মিত ছোট মঞ্চে কফিন রাখা। নুহাশ কফিনের ওপর মাথা ঠেকিয়ে কফিন জড়িয়ে অর্ধ শোয়ার মতো বসে রয়েছে। আমি ওর হাত ধরে টেনে তুললাম। ইসলামিক রীতি অনুযায়ী কয়েকটি কথা ওকে শিখিয়ে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় একটি একটি শব্দ উচ্চারণ করে নুহাশ বলল, ‘আমার বাবাকে মাফ করে দেবেন। বাবার কাছে আপনাদের কারো কোনো পাওনা থাকলে আমাদের জানাবেন, ইকবাল চাচাকে জানাবেন। আমরা পরিশোধ করে দেব।’ কেউ টাকার দাবি নিয়ে ওদের কাছে এসেছিল কিনা জানা হয়নি। তবে আমরা প্রকাশকরা নিজেদের পাওনা নিজেরাই কেটে রেখেছিলাম। হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারীদের ঋণের নিচে থাকতে হয়নি।
লেখক: প্রকাশক, সময় প্রকাশন






