গত শতকের আশির দশক, এমনকি নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘দৈনিক বাংলা’ হাউজ থেকে প্রকাশিত ‘আনন্দ বিচিত্রা’ই ছিল দেশের প্রধানতম বিনোদন ম্যাগাজিন। আমরা পড়তাম, ঢাকার বাইরে বসে। আনন্দ বিচিত্রা ছিল আর্ট কলেজ থেকে পাস করা এবং ১৯৭১ সালের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত্ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র সহযোগী পাক্ষিক প্রকাশনা। শাবানা, ববিতা, সুচরিতা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আফজাল হোসেন... মূলত টেলিভিশন-সিনেমার লোকেদের সৃজনকর্ম-জীবনকাহিনী-গসিপিং ছবিসহ ছাপা হতো আনন্দ বিচিত্রার পাতায়। আমাদের বালকবেলার পুরোটা জুড়েই তো উন্মাতাল আশির দশক, পাড়ার বড় ভাইদের জেনারেল এরশাদবিরোধী আন্দোলন, গান, গল্প-কবিতা-আবৃত্তি-পথনাটক-মঞ্চনাটক, ছবি আঁকা, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার-চিকা... আর এর মধ্যেও রাজ্জাক-কবরী, আল মনসুর, লুত্ফুন নাহার লতা, অঞ্জু ঘোষ, হাশেম খান, রফিকুন নবী, কাইয়ূম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, সেলিম আল দীন, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা, এসএম সুলতান, বিড়ি-সিগারেট, শ্মশানঘাটে রাত্রিবেলায় একটা-দুইটা পুরিয়া, মাঝে মাঝে কম দামের পানি খাচ্ছিলাম এবং মফস্বলে বসেও ঢাকার দিকে নজর রাখছিলাম। অনেক কিছুর মতো চম্পা-শম্পা রেজার দিকেও বা বলা যায় বিনোদন ম্যাগাজিন বলতে আনন্দ বিচিত্রার দিকেও যে নজর রাখছিলাম, সেই কারণেই, সেই মিড-এইটটিজ মানে আমাদের মহান ইঁচড়েপাকা সোনালি বালকবেলা থেকেই আমরা, আমরা মানে এই আমি বা আমার বন্ধুরা, তাকে চিনি। তাকে বলতে সেই আর্টিস্টকে। আর্টিস্টের নাম মাসুক হেলাল। তখনকার তরুণ তারকাদের পোর্ট্রেট আঁকতেন মাসুক হেলাল। হয়তো আঁকলেন তরুণ অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীর ‘বর্তমান’ (এই ‘বর্তমান’ বলতে আশির দশক) বয়েসী মুখ এবং হুমায়ুন ফরিদীর যখন ষাট-পয়ষট্টি বছর বয়স হবে, তখনকার কল্পিত বৃদ্ধ ফরিদীর মুখ। মাসুক হেলালের আঁকানো একই তারকার তরুণ ও কল্পিত বৃদ্ধ মুখ বা পোর্ট্রেট পাশাপাশি ছাপা হতো আনন্দ বিচিত্রার পাতায়। সেই সঙ্গে শিল্পীর লেখা কিছু একটা থাকত সেখানে, ছোট্ট গদ্য। আমরা পড়ে ভারি মজা পেতাম। তখন তো আর ব্যক্তিগত মাসুক হেলালকে চিনতাম না, মাসুক হেলালও একজন তারকা শিল্পী। তার পর সেই আনন্দ বিচিত্রা যুগ পার হয়ে গেল। মিডনাইনটিজে তো পাক্ষিকটা দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সঙ্গে বন্ধই হয়ে গেল। কিন্তু মাসুক হেলালের আঁকাআঁকি বন্ধ হওয়ার নয়, বইয়ের প্রচ্ছদ করে যাচ্ছেন তিনি শত সহস্র, সিনেমায় শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন। আঁকার মাধ্যমে ছোট ছোট করে নিরীক্ষায় তার হাতে সক্রিয় আছে।
পরবর্তীতে শেখ রেহানা সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রাতেও তিনি কাজ করেছেন সাংবাদিক বেবী মওদুদের সঙ্গে। কিন্তু মাসুক হেলাল ঠিক তার আনন্দ বিচিত্রার সৃষ্টিশীল ভঙ্গিটা যেন ফিরে পাচ্ছিলেন না। বাংলা দৈনিক প্রথম আলোতে এখন কাজ করছেন মাসুক হেলাল। আবার দেখছি তিনি ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, বাঁক নিচ্ছেন। কাগজটিতে সুন্দর সুন্দর অলঙ্করণের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রত্যন্তের কোনো সাধারণ মানুষের মুখ এঁকেছেন, সেই মানুষটার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করেছেন, সেই গল্প টুকে নিয়ে লিখে তার আঁকা মুখটা দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এ রকম মুখের আঁকানো প্রতিকৃতি ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে তার অসংখ্য।
ড্রইংবেইজড সেই অসংখ্য পোর্ট্রেটের গল্পগুলো বাছাই করে প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রচ্ছদে ছাপা আছে ‘বাছাই, মুখ ও মুখোশ’ ‘আঁকা ও লেখা মাসুক হেলাল’। ড্রইং দিয়েই যে কীভাবে একটি মুখের ভাষা ধরা যায়, তা দক্ষ হাতে এঁকেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। খুবই সুদৃশ্য মানের, ভালো কাগজ-ছাপা-বাঁধাই হয়েছে ‘মুখ ও মুখোশ’ গ্রন্থটির। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আফজাল হোসেন।
বইটির একটি চমত্কার ভূমিকা লিখেছেন শিল্পী রফিকুন নবী। ফ্ল্যাপের ছোট্ট লেখাটি শিল্পী ধ্রুব এষের। মাসুক হেলালও শিল্পীর বংশধর।
‘মুখ ও মুখোশ’ আঁকা-লেখাগ্রন্থের কনটেন্টও খুব মজার। যেমন— রমিজ রওশনের নাটুকে জীবন, সুরত আলীর চপ-বেগুনি, পথের মানুষ রেবেকা, রাশেদ রানার প্রেম, মসলা পেটেন মমতাজ নূরী, নাগরিক নাওয়ের মাঝি, পালাগানের শিল্পী শেফালি, পাখিওয়ালা ফিরোজ মিয়া, গেটলক বাসের চালক রকিব, শাখাশিল্পী নারায়ণচন্দ্র ভদ্র, রাহেলা বেগমের পইখ-পাখি... এই রকমের ১৩০টি আর্কিটাইপো মানুষের আঁকানো মুখ ও তাদের থেকে কুড়িয়ে নেয়া জীবন্ত গল্প। এতে উঠে এসেছে একদম সহজ-সরল মানুষের জীবনের ছাপচিত্র। নিঃসন্দেহে মাসুক হেলালের এই বাছাই মুখ ও মুখোশ ব্যয়বহুল গ্রন্থটি প্রকাশ করে পারিজাত প্রকাশনী আমাদেরকে একটি ভালো প্রকাশনা উপহার দিল। যেকোনো গ্রন্থপ্রেমিকই উত্সাহী হবেন বইটি হাতে পেতে, পড়তে, দেখতে। ভালো পোর্ট্রেট আঁকতে চাওয়া তরুণ আঁকিয়েদের জন্যও বইটি সংগ্রহযোগ্য বলে বিবেচিত হবে দেখামাত্রই। আমি অবশ্য মাসুক হেলালের কাছ থেকে মুখ ও মুখোশের এক কপি উপহার পেয়েছি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বুনিয়াদে। তাই বলে তো প্রকাশক এই বই প্রকাশ করেই লাটে উঠে যেতে পারে না, সেদিকটাও দেখা দরকার।
এই সুদৃশ্য সাইজের বইটির ভূমিকায় লেখক-শিল্পী মাসুক হেলাল জানাচ্ছেন, ‘আমার মা চোখে ভালো দেখতেন না। আমার মুখ ও মুখোশ লেখাটি পত্রিকায় বেরোলে আমার বউ মাকে পড়ে শোনাতেন। অনেক সময় মুখ ও মুখোশের পাত্রপাত্রীদের বাসায় ধরে নিয়ে আসতাম। তাদের ছবি আঁকতাম, ইন্টারভিউ নিতাম। আমার মা খুব যত্ন-আত্তি করতেন। খাওয়াতেনও। আমার বউ টাকা-পয়সা দিতেন। মুখ ও মুখোশ বেরোচ্ছে অথচ মা নেই, বউও গেছেন তার পিছু পিছু। বাবা গেছেন তারও আগে। আমার ১০ বছরের মেয়ে চর্যা সারা দিন একা বাসায়। রাতে বাসায় গিয়ে দেখি তার মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে সোফায় ঘুমিয়ে আছে। তোমরা থাকলে আর চর্যার জীবনটা এ রকম হতো না। তোমরা ভালো থেকো।’
‘বাছাই মুখ ও মুখোশ’-এর মূল্য ৫০০ টাকা। কমিশন আছে হয়তো, আমি ঠিক জানি না। এ ধরনের প্রকাশনায় কমিশন রাখাও মুশকিল। প্রডাকশন মূল্য বেড়ে যায়। আর্ট-গ্লসি পেপারে ছাপা হওয়া মুখ ও মুখোশ গ্রন্থের জনক শিল্পী মাসুক হেলালকে ধন্যবাদ, এমন সুন্দর একটি কাজ পাঠকের সামনে উপস্থাপনের জন্য। পরিশ্রমী ও ব্যয়বহুল কাজ। ধন্যবাদ পারিজাত প্রকাশনীকে। এবং শেষ ধন্যবাদ দেব, যারা বইটি সংগ্রহ করে আনন্দ পাবেন, তাদের, পাঠকের, দর্শকের...






