অ্যালেক্স হেলির নেয়া মোহাম্মদ আলীর সাক্ষাত্কার (১৯৬৪, প্লেবয় ম্যাগাজিন)
রূপান্তর: শওকত হোসেন
কবি আর ওই সমালোকদের হাতে বেরিয়ে আসা কবিতার চেয়ে ঢের বেশি আমার কবিতা ছাপা আর উদ্ধৃত হয়েছে
আমেরিকান মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর (ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে, জুনিয়র, জন্ম ১৭ জানুয়ারি, ১৯৪২) এখন অবসরপ্রাপ্ত আমেরিকান বক্সার ও তিনবারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ বক্সার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শৌখিন মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে রোমে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে লাইট হেভিওয়েট বিভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ফিরে আসেন স্বর্ণপদক আর একটি কবিতাসহ নায়ক হিসেবে: ‘আমেরিকাকে সর্বসেরা বানানোই আমার লক্ষ্য, তাই আমি রাশিয়ানদের পরাস্ত করেছি, হারিয়েছি পোলদের। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জিতেছি স্বর্ণপদক।’
ক্লের প্রথম প্রধান পেশাদার লড়াই ছিল ১৯৬২ সালে মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে সনি ব্যাঙ্কসের বিরুদ্ধে। ‘আমাকে হারাতে হলে তোমাকে সেরার চেয়েও সেরা হতে হবে,’ দাবি করে জেতার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি। কেবল জেতারই ভবিষ্যদ্বাণী করেননি, বরং নক আউট রাউন্ডের কথাই বলেছিলেন। তথাস্তু, সনি ব্যাঙ্কস চতুর্থ রাউন্ডেই কুপোকাত হন। কেবল ডন ওয়ার্নারের বেলাতেই তার কথা ফসকে গিয়েছিল, প্রতিশ্রুত পঞ্চম রাউন্ডের বদলে চতুর্থ রাউন্ডেই নক আউট হয়ে যান তিনি। ‘উপায় ছিল না,’ বলেছিলেন তিনি, ‘শুরুর ঘণ্টায় আমার সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি হননি তিনি।’
১৯৬২ সালে আর্চি মুরের মাঝে নিজের জুড়ির দেখা পান মুখরা আলী। চতুর্থ রাউন্ডে খেলা শেষ করতে হয়েছিল। জিতেছিলেন আলী। ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়ন হেনরি কুপারের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল আলীর। আলী বলেছিলেন: ‘পঞ্চম রাউন্ড শেষে হেনরি কুপার নিজেকে (নভোচারী) গর্ডন কুপার ভাববে। কক্ষপথে থাকবে সে!’ পঞ্চম রাউন্ডেই টেকনিক্যাল নক আউট হয়ে যান কুপার। ক্লের পেশাগত জীবনের প্রথম দিকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলেন ভয়ঙ্কর সনি লিস্টন। ভয় পাননি তিনি: ‘আমার গর্জন করার পালা, গর্জে ওঠো, ভাই, গর্জে ওঠো, ফ্লোট লাইক আ বাটারফ্লাই, স্টিং লাইক আ বি, ইয়োর হ্যান্ড কান্ট হিট হোয়াট ইয়োর আইজ ক্যা’ন্ট সি’— ক্যাসিয়াস ক্লে।
জাঁকাল মুখরা, প্রবল আগ্রাসী হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে আন্তরিক সাক্ষাত্কার।
গত ফেব্রুয়ারির এক রাতে ৯টা ৫৫ মিনিটের আগে কেউই ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লের অতিরঞ্জিত বাহাদুরি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। ওই মুহূর্তে মিয়ামি বিচ কনভেনশন হলের একটা স্টুলে আচ্ছন্ন অবিশ্বাস নিয়ে বসে থাকা অপ্রতিরোধ্য সনি লিস্টন হাল ছেড়ে দিয়ে মাউথপিস থুতুর সঙ্গে ফেলে বেপরোয়া তরুণের হাতে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ তুলে দিয়েছিলেন, যাকে তিনিসহ দেশের ক্রীড়ালেখক এবং বাকি সবাই বাগাড়ম্বরকারী হিসেবে নাকচ করে দিয়েছিলেন। মহাউল্লাসে রিংয়ের চারপাশে লাফাতে লাফাতে চিত্কার করছিলেন ক্লে, ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ! আমিই রাজা!’— বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা ছন্দময় ছড়া আর আত্মতুষ্টির প্রচারণার তীক্ষ চিত্কার ১৯৬০ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক বিজয়ীর আপেক্ষিক অস্পষ্টতা থেকে বক্সিংয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রিয় হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা লড়াইয়ের সন্দেহজনক বিখ্যাত ‘খলনায়কে’ পরিণত করেছিল তাঁকে। ১০০টি শৌখিন লড়াই ও ১৮টি পেশাদারি লড়াইয়ের সব ক’টিতেই অপরাজিত এই অহঙ্কারী তরুণ আরেকজন জো লুই না হলেও অন্তত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী কবি এবং সবচেয়ে জাঁকাল জনব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।
জয়লাভের চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর এক সংবাদ সম্মেলনে এখন থেকে লড়াইয়ের অনুষ্ঠানে তাকে কেবল মোহাম্মদ আলী বলেই উল্লেখ করতে ঘোষণা করার পর সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ক্রীড়াব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন তিনি। ব্ল্যাক মুসলিমস নামে একটি দেশবিস্তৃত নিগ্রো ধর্মীয় গোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে তাঁর নতুন নাম ছিল এটা। গোষ্ঠীটি জাতিগত বিচ্ছিন্নতা, কৃষ্ণপ্রাধান্য ও শ্বেতাঙ্গদের প্রতি প্রকাশ্য বৈরিতার কথা বলে।
এর ফলে সৃষ্ট হট্টগোলের ভেতর— বিশ্ব সাংবাদিকদের ভেতর ঘেরাও হয়ে আরো বিবেচক নিগ্রো নেতাদের ভর্ত্সনা আর শিরোপা ছিনিয়ে নেয়ার হুমকির মুখে— ক্যাসিয়াস তাঁর বিশ্বব্যাপী মঞ্চকে আত্মপ্রশংসা ও ইসলামের গুণগান গাওয়ার মিম্বর হিসেবে ব্যবহার করে অবিরাম কথা বলে গেছেন।
তাঁর খ্যাতি, হেভিওয়েট শিরোপা আর বিশ্বাস নিয়ে অনুসন্ধানী সাক্ষাত্কার গ্রহণের লক্ষ্যে হাজির হয়েছিলাম আমরা। নিমেষে সায় দিয়ে আমাদের নিউইয়র্ক হার্লেমে দার্শনিকসুলভ সফরে সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে হোটেল তেরেসায় তিন কামরার একটা স্যুট ভাড়া করেছেন তিনি (এখানে আরেক বিশিষ্ট অতিথি ফিদেল কাস্ত্রো জাতিসংঘে স্মরণীয় সফরের সময় সেখানে তাঁর টুপি ঝুলিয়ে মুরগির পালক খসিয়েছিলেন)।
পরের দুটি সপ্তাহ সকালের সতেজ ভ্রমণে একসঙ্গে হেঁটেছি, নির্মল মুসলিম হোটেলে তাঁর সঙ্গে খেয়েছি, দৈনন্দিন জুতা পলিশের সময় তার সঙ্গে বসেছি, হার্লেমের ভেতর শোফার চালিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাডিলাক লিমুজিনে চড়ে অলস ভ্রমণে বেরিয়েছি। চ্যাম্পিয়ন এবং পথচারীদের হাত নাড়া আর চিত্কার বিনিময়ের ফাঁকে এবং লিমুজিনের ড্যাশবোর্ডে ক্লের গমগমে ‘আমিই সবার সেরা’ রেকর্ডিং বাজানো ফনোগ্রাফের গুঞ্জন ছাপিয়ে সুযোগমতো আমাদের প্রশ্ন তুলে ধরেছি। (এখানে সাক্ষাত্কারের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ প্রকাশিত হলো):
হেলি: যেমন মনে হয়, আসলেই কি আপনি বুলি কপচানো প্রদর্শনবাদী, নাকি এসবই প্রচারণার খাতিরে?
ক্লে: আমি হাঁটা আর কথা বলা শুরুর পর থেকেই নজর কেড়ে আসছি। স্কুলে একদম ছোট থাকতে লক্ষ করেছিলাম যে, কেউ অন্য রকম আচরণ করলে সবাই সেটা পছন্দ করে। যেমন বাসে চেপে স্কুলে না গিয়ে ওটার পাশে দৌড়াতাম, সব ছেলেরা আমাকে পাগল বলে চিত্কার করে হাত নাড়ত। এটা আমাকে বিশেষ কিছুতে পরিণত করেছিল। কিংবা বিরতির সময় লোকজনের ভিড় জমাতে কারো সঙ্গে মারপিট শুরু করতাম। সবসময় জটলা তৈরি করতে পছন্দ করতাম। সত্যি সত্যি মারপিট শুরু করার পর দেখলাম লড়াই-প্রিয় বয়স্ক মানুষগুলো ঠিক ওই স্কুলের বাচ্চাদের মতোই আচরণ করছে। বলা চলে, আমার প্রথম লড়াই থেকেই আমার কথায় কান দিচ্ছে এমন যে কাউকেই কী করতে যাচ্ছি, বড় গলায় সেটা বলতাম। আমি হেরে যাব আশা করে লোকজন স্বভাবের বাইরে গিয়ে দেখতে হাজির হতো। ...অন্য বাচ্চারাও মারপিট করত, হারত বা জিতত, কিন্তু মনে হয় ওদের পরিবার আর বন্ধু-বান্ধবরা বাদে কেউ তেমন একটা পরোয়া করত না। কিন্তু আমি হাজির হলেই লোকজন চেঁচামেঁচি শুরু করত, ‘নাকে লাগাও!’ ‘মোটা ঠোঁট ভোঁতা করে দাও!’ বা এমনি কিছু। আপনি হয়তো ভাবতেন, বুঝি বয়সের তুলনায় আর দশ বছর বড় সুপরিচিত পেশাদার লড়িয়ে আমি। কিন্তু যতক্ষণ আমার লড়াই দেখতে আসছে, ওদের কথাবার্তায় কেয়ার করিনি। টাকা দিত ওরা, তো খানিকটা মজা লোটার অধিকার ছিল ওদের।
হেলি: আপনার প্রথম লড়াইটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
ক্লে: বেশ, আমার বিশতম জন্মদিনের দিন বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে একটা নতুন সাইকেল পেয়েছিলাম। কলোম্বিয়া জিমনেশিয়ামের মেলায় গিয়েছিলাম ওটায় করে। বের হয়ে দেখি আমার বাইকটা হাওয়া হয়ে গেছে। পাগলের মতো হয়ে কাঁদতে শুরু করেছিলাম। জো মার্টিন নামে এক পুলিশ এলে তাকে বললাম, আমার বাইক নিয়েছে যে তাকে পেটাব। তিনি বললেন, চোরকে ঠিকমতো পেটাতে হলে বক্সিংয়ের ছবক নিতে হবে আমাকে। তাই করলাম। তখনই লড়াই শুরু করেছিলাম। ছয় সপ্তাহ পর বারো বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ কিশোরের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াইতে জিতি আমি। বছরখানেকের ভেতরই টিভিতে মারপিট শুরু করেছিলাম। স্রেফ ক্লাব আর প্রিলিমিনারিতে লড়াই করে উপরে ওঠার চেষ্টা করতে নিষেধ করলেন জো মার্টিন। ...তাতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে... আমার উচিত অলিম্পিকে চেষ্টা করা; জিতলে সেটা আমাকে আপসেই দশ নম্বর পেশাদার রেটিং এনে দেবে। ঠিক তাই করেছি আমি।
হেলি: কবিতা আবৃত্তির এই গিমিক কবে থেকে শুরু করেছিলেন?
ক্লে: অলিম্পিকে যাওয়ারও আগে লুইভিলে গোড়ার দিকের লড়াইগুলোর কোনো একটা সময়ে। কবিতা নিয়ে ভাবতে শুরু করি আমি, লড়াইয়ের আগে এক সাংবাদিককে বলেছিলাম, ‘দিস গাই মাসটি বি ডান/ আই’ল স্টপ হিম ইন ওয়ান।’ পত্রিকায় ছাপা হয়ে গিয়েছিল সেটা, কিন্তু তখন নজর কাড়েনি। আর্চি মুরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাওয়ার আগে আসলে কবিতা আমার নাগাল পায়নি। মনে হয় তার অতিকথনই এর কারণ ছিল, তার ওপর লাগানোর মতো নতুন কিছু বের করা দরকার ছিল আমার। তখনই সাংবাদিকদের বলেছিলাম, ‘মুর উইল গো অন ফোর।’ ঠিক আমার কথামতো যখন চার নম্বর রাউন্ডেই লুটিয়ে পড়লেন তিনি, সাংবাদিকরাও বেশ হইচই করলেন এটা নিয়ে, বুঝে গেলাম ভালো একটা কিছু পেয়ে গেছি। ...সেই থেকে প্রতিটা লড়াইয়ের সঙ্গে মিলে যায়, এমন কিছু বানিয়ে আসছি আমি।
হেলি: বহু সমালোচক আপনার কবিতাকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। আপনার কি তাই মনে হয়?
ক্লে: কবি আর ওই সমালোচকদের হাতে বেরিয়ে আসা কবিতার চেয়ে ঢের বেশি আমার কবিতা ছাপা আর উদ্ধৃত হয়েছে। আমি কোনো সমালোচকেরই কোনো রকম সমালোচনায় কান দিই না। কিসের সমালোচনা করছেন সে সম্পর্কে যেমন জানেন দাবি করেন তারা, সত্যিই ততখানি জানা থাকলে তাদের উচিত এক পাশে দাঁড়িয়ে মুখ না চালিয়ে সেই কাজটাই করা।
হেলি: নিজের সেরা সমালোচক হিসেবে কোনটাকে আপনার সেরা কবিতা বলে মনে করেন?
ক্লে: জানি না। তবে পত্রিকাগুলো সবচেয়ে বেশি যেটা ব্যবহার করেছে সেটা হলো, ডাগ জোনসের সঙ্গে লড়াইয়ের আগে যে কবিতাটা দিয়ে ওয়াটার ফ্রন্ট ঢেকে ফেলেছিলাম। আমি বলেছিলাম: জোনস লাইক টু মিক্স/ সো আই’ল লেট ইট গো সিক্স/ ইফ হি টকস জাইভ/ আই’ল কাট ইট টু ফাইভ/ অ্যান্ড ইফ হি টকস সাম মোর/ আই’ল কাট ইট টু ফোর/ অ্যান্ড ইফ হি টকস অ্যাবাউট মি/ আই’ল কাট ইট টু থ্রি/ অ্যান্ড ইফ হি ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফাইট/ হি ক্যান স্টে হোম দ্যাট নাইট।’
হেলি: কতবার আপনি নক আউটের রাউন্ডের বেলায় সঠিক হয়েছেন?
ক্লে: দুবারই ভুল করেছিলাম। যার বিপক্ষে লড়ছেন তাকে আঁচ করতে পারলে আর নিজের ক্ষমতা জানা থাকলে যেভাবে যা করতে চান, বেশ ভালোভাবেই সেটা করতে পারবেন। রাউন্ডের ঘোষণা দেয়ার পর লড়াইয়ের সময় কী করতে যাচ্ছি সেই পরিকল্পনা করি। যেমন আর্চি মুরের কথাই ধরুন। সনি লিস্টনের চেয়ে ভালো লড়িয়ে তিনি। নড়াচড়া আর লাফালাফির কারণে তাকে আঘাত করা কঠিন। তিনি স্মার্টও। একটু বেখেয়াল হলেই আপনাকে ধরাশায়ী করবেন। আমার মনে হয় রিংয়ের কায়দাকানুন শুগার রে বাদে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি জানেন তিনি। কিন্তু তিনি স্থ্থূলদেহী, বয়স পঁয়তাল্লিশ, ক্লান্ত হয়ে পড়ার আগেই একটা লাকি পাঞ্চের খোঁজে থাকতে হয়েছিল তাকে। তাকে ক্লান্ত করে তুলতেই নিজেকে ক্ষিপ্র রাখতে হয়েছিল আমাকে। প্রথম রাউন্ডে হাস্যকরভাবে হুক আর জ্যাব করেছি তাকে। দ্বিতীয় রাউন্ডের ঠিক শেষে আমার চোয়ালে কায়দামতো লাগিয়েছেন তিনি, তবে তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয়নি। এর পর তাকে আঘাত হেনে তৃতীয় রাউন্ড শুরু করি, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন বোঝার পর গতি কমিয়ে আঘাত হানার জায়গার খোঁজ করছিলাম। তার পর চতুর্থ রাউন্ডে, যখন তার লুটিয়ে পড়ার কথা বলেছিলাম, আবার আঘাত হানলাম। ঠিকই লুটিয়ে পড়েছিলেন তিনি; বলতে গেলে বেহুঁশ। কিন্তু আট গোনার সময় উঠে পড়েন। অল্প কয়েকটা কম্বিনেশন আবার তাকে ফেলে দেয়, তখন রেফারি লড়াই বন্ধ করে দেন। ঠিক প্ল্যান মতোই হয়েছিল।
হেলি: ওই লড়াইয়ে আপনার বয়স ছিল বিশ আর মুরের পঁয়তাল্লিশ। প্রায় এটা বলা হয় যে, সযত্নে পরিকল্পিত ধারাবাহিক সেটআপকে পরাস্ত করেই শীর্ষে উঠে এসেছেন। আপনার উত্তর কী হবে?
ক্লে: আমাকে হারাতে চাননি এমন কাউকে পরাস্ত করিনি আমি। ঠিকমতো লড়ে কাকে হারাচ্ছি তার পরোয়া করি না। তবে ওরা একটা কিছু ঝামেলা থাকার কথা বলেছে। আর্চি মুর, হ্যাঁ, লোকে বলে তিনি বয়স্ক মানুষ ছিলেন। ডাগ জোন্স, আমার জীবনের অন্যতম কঠিন লড়াই ছিল তার সঙ্গে। তিনি তাদের একজন, যে কিনা আমার ঘোষণা করা রাউন্ড ফসকে গেছেন। লড়াইয়ের ঠিক আগমুহূর্তে বলেছিলাম, ‘আই’ল শাট দ্য ডোর অন জোন্স ইন ফোর,’ কিন্তু শেষসীমা দশ পর্যন্ত গেছেন তিনি। জাজ আর রেফারিরা আমার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়ার পর সবাই একে পাতানো খেলা বলছিল। তার পর লন্ডনে হেনরি কুপার চতুর্থ রাউন্ডে ডান হাতের আঘাতে আমাকে কায়দা করে দড়ির ওপর নিয়ে ফেলেছিলেন; কথামতো পঞ্চম রাউন্ডেই তাকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম: ‘ইট আইন্ট নো জাইভ/ হেনরি কুপার উইল গো ইন ফাইভ।’ কিন্তু লোকে কুপার ঠিক রূপে না থাকার কথা বলেছিল। লিস্টনকে কম বয়সী না বলায় অবাক হয়েছি, কারণ তাকে ভালোমতোই শেষ করেছিলাম।
হেলি: আবার একটু আর্চি মুরের প্রসঙ্গে ফিরে যাই: আপনার নিজস্ব শোরগোল কৌশলের বিকাশে সাহায্য করায় আত্মপ্রচারণার গুরু হিসেবে তাকে কোনো কৃতিত্ব দেন?
ক্লে: হ্যাঁ, বুড়োর কাছ থেকে অনেক শিখেছি। আমার আগে থেকে জানা কিছু বিষয়ের প্রমাণ দেখিয়েছেন তিনি। যেমন কথা বলাটা লড়াইয়ের চেয়ে ঢের বেশি সহজ, আর এটা দ্রুত উপরে ওঠার রাস্তা। তরুণ বয়সে তার বড় লড়াইয়ে না থাকাটা দুঃখজনক। ...তবে আমার সঙ্গে প্রবীণের বড় তফাতটা হলো আমি বেশি বড়, উচ্চকণ্ঠ আর ভালো। অন্যরা সাংবাদিকদের সঙ্গে একটা কিছু ছাপানোর জন্য ফিসফিস করে কথা বলতেন, কিন্তু আমি চিত্কারে বিশ্বাস করি।
হেলি: পেশার কোন পর্যায়ে প্রথম চিত্কারের কৌশল চর্চায় পরিণত করেছিলেন?
ক্লে: অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ের পর পরই। লুইভিলে ফেরার পর একদিন বাসে করে যাচ্ছিলাম। প্যাটারসন আর ইঙ্গমার জোহানসনের পের একটা লেখা পড়ছিলাম। লড়াইয়ের সুযোগ পেলে ওদের দুজনকেই হারানোর ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু পথে বাধা হয়ে ছিল ম্যাচেন, ফলি, জোন্স আর অন্যরা। কিন্তু ওদের মতো অপেক্ষায় না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি। অলিম্পিক শিরোপা জিতেছি, সেটা ছিল কেবল পত্রিকাতেই, সত্যিকার অর্থে আমাকে কেউ চিনত না, আর শুধু মনে মনে রাখলে কেউ চিনবেও না। ওই বাসে থাকতেই আমার বিরাট মুখটা খুলে লোকজনকে আমার কথা শুনতে আর মনোযোগ দিতে বাধ্য করার কথা বুঝতে পারি।...
হেলি: কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিপক্ষে লড়াই না করলেও ইঙ্গমার জোহানসনের সঙ্গে এক ধরনের মোকাবেলা হয়েছিল আপনার, তাই না?
ক্লে: হ্যাঁ, নির্ঘাত তার মাথা বিগড়ে দিয়েছিলাম! মিয়ামিতে আমাকে স্পারিং পার্টনার হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। প্রথম রাউন্ডের শেষ দিকে তাকে দড়ির ওপর চেপে ধরি আমি। ক্ষেপে একেবারে টং। দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ দিকে আমার গায়ে গ্লাভস ছোঁয়াতে পারেননি তিনি। কারো বিচলিত হওয়ার কথা বলেন আপনি! তিনি এমন ক্ষেপে উঠেছিলেন যে, চেয়েছিলেন আমি যেন পাম বিচে ফিরে যাই, যেখানে একান্তে স্পার করতে পারব আমরা। আমি নই! আমি দারুণ আর আলোড়ন তোলা কিছু করলে পত্রিকাওয়ালারা আমাকে দেখুক, সেটাই চেয়েছিলাম।
হেলি: জোহানসনকে পরাজিত করতে পারতেন মনে করেন?
ক্লে: এমাত্রই তো তাকে হারানোর কথা বললাম আপনাকে। নিয়মিত লড়াইয়ের সঙ্গে ওটার একমাত্র তফাত হলো আমাদের পরনে হেডগিয়ার ছিল আর বিরাট ভিড়ের সামনে লড়িনি। আর আমার কোনো চুক্তি ছিল না।
হেলি: আর্চি মুর, চার্লি পাওয়েল, ডাগ জোন্স আর হেনরি কুপারের বিপক্ষে জেতার পর লিস্টনের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাওয়ার জন্য কীভাবে প্রচারণা চালিয়েছিলেন?
ক্লে: বেশ, তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যে কাজটা আমি করেছিলাম সেটা হলো, লড়াইয়ের একটা পথ বের করার জন্য মানুষকে শোনাতে বুলি কপচেছি। যার সঙ্গে লড়ব, কখনোই আমি তার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঝামেলায় যাই না। লিস্টনের বিরুদ্ধে নামার আগে ঠিক সেটাই শুরু করেছিলাম। র্যাংকিংয়ে আসার পর থেকে আগাগোড়া লিস্টনকে জরিপ করছিলাম আমি।
হেলি: বলছিলেন লিস্টনকে জরিপ করেছেন...
ক্লে: হ্যাঁ। তার লড়াইয়ের কায়দা। শক্তি। ঘুষি। এসব— কিন্তু সেটা ছিল আমার নজরের একটা অংশ। যেকোনো ফাইটারই যার সঙ্গে লড়তে যাচ্ছে তার এসব জিনিস খেয়াল করবে। আমার পক্ষে বড় ব্যাপারটা ছিল রিংয়ের বাইরে লিস্টন কেমন আচরণ করতেন। যেখানেই তার সাক্ষাত্কার নেয়া হতো আমি সব পড়তাম। তার আশপাশে যারা ছিল বা যারা তার সঙ্গে কথা বলেছে সেসব লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। তার মন কীভাবে কাজ করে তার একটা ছবি পেতে বিছানায় শুয়ে সবকিছু মিলিয়ে তার কথা ভাবতাম। তখনই আমার মাথায় ভাবনা আসে যে, ঠিকমতো সামাল দিতে পারলে, তার ওপর মনস্তত্ত্ব কাজে লাগাতে পারব— বোঝেনই তো, তাকে খুঁচিয়ে এমনভাবে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আমার সঙ্গে রিংয়ে ঢোকার আগেই তাকে হারিয়ে দিতে পারি।
হেলি: কীভাবে?
ক্লে: মানে তাকে যেমনটা ভাবাতে চাই, সেটাই ভাবানোর জন্যে কাজ করছিলাম। আসলে আমি একটা ভাঁড়, রিংয়ে ঢোকার পর সত্যিকার অর্থে লড়াই করতে পারব, এমন কথা দ্বিতীয়বার ভাবতে যাবেন না। তার সামনে নিজেকে যত বেশি অতিআত্মবিশ্বাসী আর বেঢপ হিসেবে তুলে ধরত পারব ততই ভালো। সংবাদ মাধ্যম, সবাই— আমাকে ভাঁড়ের চেয়ে বেশি কিছু যেন না ভাবে। শুনুন, খবর-কাগজের সব রিং ‘বিশেষজ্ঞ’ই খোদ লিস্টনের মতো তার খ্যাতির কাছে ভেসে যায়নি, বুঝতে পেরেছেন? সবাই কি লিখছিল জানেন? বলছিল, ‘তুচ্ছ’ ফাইটারদের সঙ্গে লড়ছি বলেই রাউন্ডের ঘোষণা দিয়ে আমি লড়াইতে জিতছি। আগেই যেমন বলেছি, এমনকি মুর, পাওয়েল ও কুপারের মতো লোকের বেলায়ও পত্রিকাওয়ালারা একটা অজুহাত বের করেছে। লিস্টনের পালা এলে সবাই বলাবলি শুরু করল, এবার আমার রক্ষা নেই। পরে সাংবাদিকদের বলতে বাধ্য করেছিলাম, আমিই সর্বসেরা।
হেলি: একজন ডাক্তার আপনার আচরণকে ‘বিপজ্জনক রকম অসংলগ্ন’ বলে বর্ণনা করেছেন। আরেকজন বলেছেন, আপনি এমনভাব করেন যেন ‘মৃত্যুর ভয়ে’ আছেন। পোড়খাওয়া ক্রীড়া সাংবাদিকরা ক্ষ্যাপামোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘স্নায়ুবিকারগ্রস্ত’ আর ‘উন্মত্তে’র মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। যে কারণে আপনাকে আড়াই হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। আসল ব্যাপারটা কী?
ক্লে: আমি কেবল বলব যে, ডাক্তার আর ক্রীড়া সাংবাদিকরা একে অন্যের কথায় কান দিচ্ছেন। আপনি জানেন, কী কারণে এসব কথা বলেছেন আর লিখেছেন তারা— কী ঘটবে তার সঙ্গে নিজেদের প্রত্যাশা মেলানোর জন্য। এ কথাই আপনাকে বলছি আমি। সবকিছু ওদের মনমতো চললে আমি আর রিংয়ে পা রাখার অনুমতি পেতাম না।
হেলি: ততদিনে কি আপনি ফাইট প্ল্যান স্থির করে ফেলেছিলেন?
ক্লে: লড়াইয়ের বেশ কয়েক মাস আগেই আমার কৌশল স্থির করে ঘোষণাও দিয়েছিলাম: ‘ফ্লোট লাইক আ বাটারফ্লাই, স্টিং লাইক আ বি,’ বলেছিলাম আমি।
হেলি: কথাটা আমরা পড়েছি। ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন আপনি?
ক্লে: এভাবে বলা যেতে পারে, আমি জানতাম ওজন বেশি বলে এবং পত্রিকার কথাবার্তা থেকে ইঙ্গিত পেয়ে লিস্টন দুই রাউন্ডের বেশি লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নেবেন না। জানি না আপনি লড়াইয়ের পর তাঁর সহকারীদের ঠিক এমনটাই ঘটার কথা স্বীকার করে নেয়ার কথা পড়েছিলেন কিনা। তো এটাই ছিল নিজেকে তালিম দেয়ার, গতিময় করার রাস্তা। আপনি জানেন, একজন যোদ্ধা বিশেষ কিছু রাউন্ডে শরীর কঠিন করে তুলতে পারেন, তার পর শিথিল করেন। কেউই পুরো পনেরো রাউন্ড লড়তে পারে না। তো আমি প্রথম দুই রাউন্ড লড়ার আর লিস্টনের আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর তালিম নিয়েছিলাম। জানা ছিল এভাবে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। জানতাম, দুনিয়াকে হতবাক করে দিতে চলেছি!
হেলি: তাহলে আপনার পরিকল্পনামতোই হয়েছিল লড়াইটা?
ক্লে: প্রায়। দুইশ বিশ পাউন্ড ওজনের শরীর নিয়ে দুই রাউন্ডের বেশি লড়াইয়ের প্রস্তুতি ছাড়া হাজির হয়েছিলেন তিনি। একজন তরুণের বিরুদ্ধে খুবই প্রবীণ। আমার শরীরে এক আউন্সও মেদ ছিল না। খুব বেশি আঘাত আমি করিনি। তবে যেগুলো দিয়েছি দাগ রেখে গেছে। ঠিক পরিকল্পনামতোই তার শরীরে আঘাত হেনেছি, চোখজোড়া বুজিয়ে দিয়েছি।
হেলি: কিন্তু লিস্টনও আপনার কিছু ক্ষতি করেছেন।
ক্লে: অনেক সময় মার খাওয়া ছাড়া একজন যোদ্ধা লড়াই করবেন, এটা আশা করতে পারেন না। তবে আপনি নক আউট হতে চান না, এটাই আসল কথা। ঠিক, আমাকে কিছু ক্ষতিকর আঘাত হেনেছেন তিনি।
হেলি: আপনার জয়লাভ সত্ত্বেও লিস্টনের হাতের আঘাত সম্পর্কে সন্দেহের মেঘ নিয়েই শেষ হয়েছিল লড়াইটা। আপনার মত কী?
ক্লে: আটজন ডাক্তার তাঁর হাতে আঘাত লাগার কথা বলেছেন। আমি আটজন ডাক্তারের মতের বিরুদ্ধে তর্ক করতে যাচ্ছি না।
হেলি: লড়াইয়ের পরপর নেয়া তিন দফা আর্মি প্রিইন্ডাকশন টেস্টে আপনার ব্যর্থ হওয়ার বেলায় আপনার সততা নিয়ে আরেকটা বিতর্ক আছে। কোনো মন্তব্য?
ক্লে: সত্যি কারো ক্ষতি করেনি। আসল কথা, স্কুলে আমি কোনো দিন তেমন ভালো ছিলাম না। কোনোমতে পাস করেছি, ডি-মাইনাস এভারেজ ছিল আমার। তবে সেজন্য আমি মোটেই লজ্জিত নই। কিন্তু আর্মি টেস্টের সময় অত অত প্রশ্ন দেখেছি যখন, উত্তর জানা ছিল না আমার। এমনকি উত্তর বের করার পর কীভাবে শুরু করতে হবে তাও জানা ছিল না। ব্যস। তো আমি পাস করিনি। আমাকে চাকরিতে না নেয়ার সিদ্ধান্তটা সেনাবাহিনীর।
হেলি: মানসিকভাবে অনুপযুক্ত ঘোষিত হওয়া কি বিব্রতকর ছিল?
ক্লে: আমি বলেছি, আমিই সেরা, কেউ কখনো আমিই সেরা বুদ্ধিমান দাবি করার কথা শোনেনি।
হেলি: লড়াইয়ের আপনার টাকা স্থগিত রাখার ব্যাপারে কী অনুভূতি?
ক্লে: আমি এটা বুঝতে পারিনি। আমি কোনো রকম কর-সংক্রান্ত সমস্যায় নেই। আমার টাকা আটকে রাখাটা কীভাবে জায়েজ করবে ওরা? টাকা আর সম্পদ আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। কোনো ধনী লোকের পরোয়া আমি করি না। খ্যাতি বা মহত্ত্বের জন্য লড়ছি না আমি। এসবই ধ্বংস হয়ে যাবে। আজ আছে কাল নেই। আমার মনে এর চেয়ে ঢের বিরাট বিষয় রয়েছে। আমার মনে আছে ইসলাম।
হেলি: ইসলামের কথা যখন উঠল, ন্যাশনাল বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন লড়াইয়ের পর পরই ব্ল্যাক মুসলিমসের সঙ্গে আপনার সদস্যপদের কথা ঘোষণা করায় আপনার হেভিওয়েট শিরোপা কেড়ে নেয়ার চিন্তা করার কথা বলেছে। ওদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক কথা শুনেছেন?
ক্লে: কথাটা স্রেফ হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা হওয়ার আগপর্যন্ত এনবিএ একাই আমার নিন্দা করেছে, দণ্ড দিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ দেশের কি এমন হওয়ার কথা ছিল না, যেখানে প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো ধর্ম বেছে নিতে পারবে, এমনকি চাইলে ধর্ম পালন নাও করতে পারবে? ধর্মের কারণে আমেরিকার কোনো আদালত কারো চাকরি বা শিরোপা কেড়ে নেয় না। সংবিধান কংগ্রেসের ওপর কারো ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে আইন তৈরির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু এনবিএ আমার শিরোপা কেড়ে নিতে চায়— কেন? বক্সিংয়ের ক্ষতি করার মতো কী করেছি আমি? আমি ধূমপান করি না, মদ খাই না, কাউকে বিরক্ত করি না। লিস্টনের ব্যাপারে ওদের কখনই কিছু না বলাটা অদ্ভুত না? কি না করেছেন তিনি? এনবিএর কোনো ক্ষমতা নেই। কাউকে লড়াই থেকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না ওরা। আর যদি পারেও, আমার কিছু এসে যায় না, কারণ হেভিওয়েট শিরোপাকে আমি থোড়াই কেয়ার করি, একসময় করতাম, সেটা ধর্মীয় বিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার আগে। কোনো একটা ছেড়ে দিতে হলে আমি লড়াই ছেড়ে দিতে পারব। যখন দেখি এই আমেরিকায় লাখ লাখ নিগ্রো মুসলিম ভাই ও বোন তাদের মানবাধিকার পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে, তখন এই শিরোপাকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়।
হেলি: কে বা কোন জিনিসটা আপনাকে মুসলিমদের সঙ্গে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছে?
ক্লে: কেউ বা কোনো কিছুই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে না। আমিই সিদ্ধান্ত নিই। ১৯৬০ সালে মিয়ামিতে একটা লড়াইয়ের ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। ১৯৬০ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক জেতার খুব বেশি পরে নয়। হার্ব সিলারের সঙ্গে লড়াই হওয়ার কথা ছিল আমার। মনে আছে, চতুর্থ রাউন্ডেই তাকে জমিনে ফেলে দিয়েছিলাম। যাহোক, একদিন এই মুসলিম যাজক আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন পূর্বপুরুষের কাহিনী শুনতে মসজিদে যাব কিনা। আমি কখনো কোনো কৃষ্ণাঙ্গকে তারা যে ক্রীতদাস ছিল, এটা ছাড়া পূর্বপুরুষের কথা বলতে শুনিনি। তো একটা মিটিংয়ে যাই আমি। এই যাজক কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথাগুলো আমাকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে গেল। বিশ মিলিয়ন আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আমাদের আসল পরিচয়, এমনকি আমাদের আসল পারিবারিক নামও জানতাম না। সমৃদ্ধ কৃষ্ণ মহাদেশ থেকে চুরি করে আনা কৃষ্ণ নারী-পুরুষের সরাসরি বংশধর আমরা, তাদের এখানে এনে নিজেদের সব ধারণা থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছে। এভাবেই আমরা তথাকথিত ‘নিগ্রোরা’ মানুষের ভেতর একমাত্র জাতিতে পরিণত হয়েছি, যারা শত্রুকে ভালোবাসে। আমি অল্পেই আপ্লুত হয়ে পড়ার মতো মানুষ। নিজেকে বলেছিলাম, এই মানুষটা কথার মতো কথা বলছে! যাজক ভাই যখন বললেন, চীনাদের নাম রাখা চীনা ভাষায়, রাশিয়ানদের রাশিয়ান ভাষায়, কিউবানদের কিউবার ভাষায়, ইতালিয়ানদের ইতালীয় ভাষায়, ইংরেজদের ইংরেজি ভাষায়, তখন এমন ঝাঁকি খেয়েছিলাম যেমনটা রিংয়ে কেউ কখনো আমাকে দিতে পারেনি। মোট কথা, আমরা বাদে প্রত্যেকেই নিজের দেশ বলবে, এমন কোনো জায়গার নামে ডাকা হয়। তিনি বললেন, ‘তথাকথিত ‘নিগ্রো’দের কোন দেশের নামে নাম রাখা হয়েছে? কোনো দেশ না! আমরা স্রেফ হারিয়ে যাওয়া জাতি! বেশ, বুম! বাস্তবতা আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিল।
হেলি: তখনই কি মুসলিমসে যোগ দিয়েছিলেন?
ক্লে: না, ঠিক তখনই না। যোগ দেয়ার আগে বিভিন্ন জায়গায় মসজিদ সভায় যোগ দিয়েছি। কোনো মিটিং থেকেই আগে বুঝতাম না বা জানতাম না কিংবা এমনকি ভাবিনি এমন কিছু না বুঝে ফিরে আসিনি। যেদিকে তাকিয়েছি, সবকিছু নতুন আলোয় দেখতে শুরু করেছিলাম। যেমন আমার মনে পড়ে গিয়েছিল যে লুইভিলে আমাদের বাড়ির সব ছবিই ছিল সাদা মানুষের। কালোদের কিছুই না। শ্বেতাঙ্গ যিশু খ্রিস্টের একটা ছবি। আচ্ছা, কোন শিল্পী কবে শ্বেতাঙ্গ যিশুকে দেখেছে? কে বলেছে যে যিশু শ্বেতাঙ্গ ছিলেন? জীবনভর দেখে এসেছি শ্বেতাঙ্গদের হাতে কৃষ্ণাঙ্গরা মার খাচ্ছে, কৃষ্ণাঙ্গদের শ্বেতাঙ্গদের জেলে ভরা হচ্ছে। আর নিজের কথা বলতে গেলে, ওই সময়টুকু অবধি কালো হওয়ায় ঘৃণার শিকার হয়েছি। অন্য সব নিগ্রোর মতোই পরস্পরকে ভালোবাসার বদলে ঘৃণা করেছি। যতই দেখেছি, ভেবেছি, সত্যি জিনিসটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আজ আমার ধর্ম ইসলাম। আমি সেজন্য গর্বিত।
হেলি: এটা কীভাবে আপনার জীবন পাল্টে দিয়েছে?
ক্লে: সব দিক থেকেই। এটা আমাকে টেনে তুলে পরিচ্ছন্ন করে মানুষে পরিণত করেছে।
হেলি: আরেকটু স্পষ্ট করে বলবেন?
ক্লে: বেশ, মুসলিম হওয়ার আগে আমি মদ খেতাম। হ্যাঁ, তাই। যা সত্যি তা সত্যিই। আর লড়াইয়ে কাউকে হারানোর পর খুব কমই দুটি সুন্দরী মেয়েকে বগলদাবা না করে কোথাও পা ফেলেছি। কিন্তু আমার পরিবর্তন আমাকে ইতিহাসে মহান মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার একটা প্রধান কারণ হয়ে থাকবে। আপনি যখন নরকতুল্য উত্তর আমেরিকায় ভালোভাবে চলতে পারেন— যখন একজন পুরুষ তার জীবন, জৈবিক চাহিদা, রিপুর তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নিজেকে সে উন্নত করে তোলে। বহু মহান মানুষের পতনের কারণ হলো তারা নারীলিপ্সা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
হেলি: কিন্তু আপনি পেরেছেন?
ক্লে: আমরা মুসলিমরা বিবাহিত স্ত্রী না হলে কোনো নারীকে স্পর্শ করি না।
হেলি: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন নারীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নেই?
ক্লে: আমি এমনকি কোনো নারীকে চুমু পর্যন্ত খাই না। নিজের জন্য আমি লজ্জিত, কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, ধরুন, আরো পাঁচ বছর আগে মুসলিম হইনি কেন ভাবছি বলে আবিষ্কার করি— যেসব প্রলোভন আমাকে দমন করতে হয়। কিন্তু আমি এমনকি চুমুও খাই না, কারণ বেশি কাছাকাছি হলে থামা কঠিন। আমি একজন তরুণ, জীবনের সূচনায় আছি।
হেলি: প্রলোভনের কথা বললেন। সেগুলো কী?
ক্লে: সব ধরনের নারী, শ্বেতাঙ্গ নারীও— আমাকে ইঙ্গিত করে। মেয়েরা আমার আবাস খুঁজে বের করে রাত দুটোয়, তিনটায় কড়া নাড়ে। নিজেদের ছবি আর ফোন নাম্বার পাঠায় আমাকে। আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়, আমার সেক্রেটারি লাগবে? এমনকি মাথায় স্কার্ফ পরে মেকআপ ছাড়াই দুষ্টু মেয়েরাও এসেছে আমার কাছে, মুসলিম তরুণীর মতো ভাব করে। কিন্তু কথা হলো, কোনো মুসলিম নারী এমনটা করবে না।
হেলি: ইসলামের আগে কি আপনার অন্য কোনো ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা ছিল?
ক্লে: আমার বয়স যখন বারো, কী করছি জানা ছিল না আমার, লুইভিলে সেন্টেনিয়েল চার্চে আমাকে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছিল।
হেলি: তাহলে কি খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করেছেন?
ক্লে: আসলে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গের মগজ ধোলাইয়ের কাজে ক্রিশ্চিয়ান ধর্মকে কাজে লাগানো হয়েছে মাত্র। মৃত্যুর পর স্বর্গের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে শিখিয়েছে তাকে এটা। যখন শ্বেতাঙ্গ লোক এই দুনিয়াতেই স্বর্গের স্বাদ পায়।
হেলি: চারটি ক্যাডিলাকের মালিক আর লিস্টনের যুদ্ধের শ্বেতাঙ্গ পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে ছয় লাখ ডলারের গ্রহীতা হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে, আপনার বেলায় এ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ সত্য?
ক্লে: কাউকে কি কখনো অভিযোগ করতে শুনেছেন যে, তার টাকার দাম নেই? না! সব কোলাহল কেবল আমার ধর্ম নিয়ে, যার সঙ্গে আমার লড়াইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি মুসলিম, এটা বোঝার আগপর্যন্ত আমার চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তার পর আর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়নি ওরা। শ্বেতাঙ্গরা শিরোপার চেয়ে বরং ইসলাম নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।
হেলি: আপনার কি মনে হয় যে, শ্বেতাঙ্গদের হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন সাদাদের প্রতি ঘৃণা বিস্তারকারী একটা সংগঠনের সদস্য হওয়ায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে?
ক্লে: দেখুন, মিশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে পেটানো হচ্ছে, বোমা মারা হচ্ছে, গুলি করা হচ্ছে। কিন্তু যে কালো মানুষটা মিশে যেতে নারাজ তাকে ‘ঘৃণার গুরু’ বলা হচ্ছে। চাব্বি চেকার একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর সঙ্গে ভয়াবহ বিপাকে পড়েছে। আমি শ্বেতাঙ্গ নারী চাই না বলে বিপাকে আছি। মিস্টার এলিজা মুহাম্মদের অনুসারী আমরা কোনো সাদা মানুষের বোন বা মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছি না। আমরা সাদাদের মহল্লায় হানা দিচ্ছি না। আমার মনে হয় সমন্বিত স্কুল, রেস্তোরাঁ আর হোটেলের বিরোধিতা করা সাদা মানুষগুলোর মিস্টার মুহাম্মদ অনুসারীদের যে শিক্ষা দিচ্ছেন তাতে খুশিই হওয়া উচিত। বিভিন্ন জাতির বিচ্ছিন্নতাই শান্তির উপায়।
হেলি: তাহলে কি আপনি সিভিল রাইটস অ্যাক্টের বিরোধী?
ক্লে: আমার মনে হয় সিভিল রাইটস অ্যাক্ট রক্তপাতের দিকে নিয়ে যাবে। নিয়ে গেছেও। লোকের হূদয় বদলায়নি এটা। তবে আমি একে ঘৃণা বলব না। একে বলব মানুষের স্বভাব। সাদারা কালোদের ঘৃণা করে বলে মনে করি না। আপনি কখনো খরগোশকে সিংহের সঙ্গে বসে খেতে দেখেন না। ...আমার মনে হয়, সাদাদের নিজেদের ভেতরই থাকা উচিত। সাদারা মিশে যেতে চায় না। আমি জোরজবরদস্তিতে বিশ্বাস করি না, মুসলিমরাও করে না।
হেলি: সেজন্যই কি হার্লেমে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
ক্লে: ঠিক। আমি কোনো এক্সক্লুসিভ ডাউন টাউন স্কাইস্ক্র্যাপার হোটেলে থাকতে পারতাম। চারপাশের বিভিন্ন কামরায় বন্ধুদের নিয়ে পেন্টহাউজেই থাকতে পারতাম। কিন্তু সেসব চাইনি আমি। হার্লেমের কেন্দ্রে থাকি, যেখানে ভালো চাকরিওয়ালা একজন শ্রমিক থাকতে পারে। আপন লোকদের সঙ্গে থাকতেই পছন্দ করি আমি।
হেলি: বেশ কয়েকজন নিগ্রো নেতাসহ অনেক নিগ্রোই বলেছেন, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম বক্সিং শিরোপাধারীর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। এ ব্যাপারে কী বলার আছে আপনার?
ক্লে: তাদেরই জাতির পক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এমন কাউকে আক্রমণ করাটা নিগ্রোদের পক্ষে পরিহাসমূলক। লোকে সবসময় বলে আসছে, স্রেফ মুসলিম না হলে মানুষের চোখে কি চমত্কার আদর্শ হতে পারতাম আমি। বারবার শুনেছি, কেন জো লুই বা শুগার রে হলাম না। বেশ, এখন তারা নাই হয়ে গেছেন। আর কালোদের অবস্থা রয়ে গেছে আগের মতোই, তাই না? আসল কথা, আমি মুসলিম হওয়ায় আমাকে তা ক্রীড়া পাতা থেকে প্রথম পাতায় নিয়ে গেছে। স্রেফ প্রাইজ ফাইটার হলে যতটা হতাম, এখন তারচেয়ে ঢের বেশি বিশাল আমি। ...আমি আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, কিভাবে মুষ্টিযোদ্ধার স্তর থেকে বিশ্ব ব্যক্তিত্বে, কজন নেতা, রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছি।
হেলি: রাষ্ট্রনায়ক?
ক্লে: তাই বলেছি আমি। শুনুন লিস্টনকে হারানোর পর কিছু আফ্রিকান কূটনীতিক আমাকে জাতিসংঘে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর আমি মুসলিম বলেই আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যে সফরের সময় আমাকে রাজার মতো স্বাগত জানানো হয়েছে। আমি প্রথম বিশ্ব সফরকারী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
হেলি: আপনি কি বর্তমানে যারা লড়ছে তাদের ভেতর শ্রেষ্ঠ, নাকি বক্সিংয়ের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ?
ক্লে: অনেকেই কথাটা পছন্দ করবে না। কিন্তু আপনাকে সত্যি কথাটাই বলছি। এক এক করে বহু সেরা বক্সিং চ্যাম্পিয়নের নামেরই লিস্ট করা যায়, কিন্তু তার দরকার নেই। আমার মনে হয় তরুণ বয়সে জো লুই তাদের সবাইকেই হারাতে পারতেন। আর আমি লুইকে হারাতে পারতাম। ...লিস্টনের ঘুষির জোর জো লুইয়ের চেয়ে বেশি ছিল... কিন্তু আমি লুইয়ের চেয়ে লম্বা। আমি লুইয়ের চেয়ে ক্ষিপ্র। উঁহু, লুই আর বাকি কেউই আমাকে হারাতে পারতেন না। শুনুন আমার মতো একজন যোদ্ধা আর কখনোই ছিল না।
[সংক্ষেপিত]






