[ইন্তিজার হুসেন। পাকিস্তানের অনন্য উর্দু সাহিত্যিক। অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের শহর দিবাইতে ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন এ কথাশিল্পী। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় চলে যান পাকিস্তানে, থিতু হন লাহোরে। দেশভাগের রক্তঝরা ইতিহাস আর দুঃখ-যন্ত্রণা তাই তার রচনায় বারবার ফিরে এসেছে। তার গল্প-কবিতা-উপন্যাসে ঘরহারাদের কষ্ট, মৃত্যু, কঠিন বাস্তবতা পড়তে পড়তে পাঠক যখন বাকরুদ্ধ হন, তখনই ইন্তিজার খুলে বসেন রূপকথার ডালি। সেই ডালি সেজে ওঠে রামায়ণ-মহাভারত-উপনিষদ-জাতককথা আর এক সহস্র এক রজনীর হাত ধরে, নতুন রূপে। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের জন্য ২০১৪ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাহিত্য খেতাবে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে ম্যানবুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পান। উর্দু সাহিত্যের এই সফল কথাকারের জীবনাবসান ঘটে ২০১৬ সালে। অনূদিত ‘বামুন ছাগল’ গল্পটি ‘দ্য ব্রামহিন গোট’ গল্পের ভাষান্তর। গল্পটি নেয়া হয়েছে তার লিভস এন্ড আদার স্টোরিজ গল্পগ্রন্থ থেকে। গ্রন্থটি উর্দু থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর, ভাষান্তর করেছেন অলোক ভাল্লা ও বিশ্বমিত্র আদিল।]
দাক্ষিণাত্যের নর্মদা নদীর ধারের এক গ্রামে একজন বামুন বাস করত। তার জীবন ছিল জাগতিক সব আনন্দ আর আরাম-আয়েশে পরিপূর্ণ। শুধু একটাই হতাশা, বংশের বাতি জ্বালানোর জন্য তার কোনো ছেলে সন্তান নেই।
একবার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ঘুরতে ঘুরতে এক সাধুর আগমন ঘটল বামুনের গ্রামে। খবর পেয়ে সাধুর সঙ্গে দেখা করতে গেল বামুন। সাধুর পা ছুঁয়ে প্রণাম জানিয়ে বামুন বলল, ‘সাধুজি, আমাকে আশীর্বাদ করুন। আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই।’
সাধু বললেন, ‘দেবীর উদ্দেশে একটা ছাগল বলি দাও। দেবীই তোমার আশা পূর্ণ করবেন।’
বাড়িতে পৌঁছেই বলি দেয়ার জন্য একটি ছাগল জোগাড় করল বামুন। দেবী যাতে তাকে একটি হূষ্টপুষ্ট সন্তান দান করেন— সেই আশায় বামুন ছাগলটিকে মেওয়া আর নানা উপাদেয় খাবার খাওয়াতে শুরু করল। আর মেওয়া চিবাতে চিবাতে ছাগলটা হাসতে শুরু করল। হাসি আর থামেই না! ছাগলটাকে হাসতে দেখে বামুন বেশ ফাঁপড়ে পড়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, ‘রে ছাগল, হাসছিস কেন?’
ছাগল উত্তর দিল, ‘ওহে বামুন ঠাকুর, এই দুনিয়ার উল্টা-পাল্টা অবস্থা দেখে হাসছি। সময়ের চাকা কী অদ্ভুত বলো! কত বিস্ময়করভাবে দিন পাল্টায়। একদিন তুমি ছাগল ছিলে, আমি ছিলাম বামুন। আর আজ তুমি বামুন, আমি ছাগল।’
‘বলছ কী! কবেকার কথা সেটা?’
‘তখন উজ্জয়নীর স্বর্ণাসনে বিক্রমাদিত্যের রাজ। আমি ছিলাম উজ্জয়নীর সম্ভ্রান্ত আর সর্বমান্য এক ব্রাহ্মণ। আমাদের প্রতিপালক প্রভু তার আশীর্বাদে আমাকে কানায় কানায় পূর্ণ করেছিলেন। কেবল একটাই দুর্ভাগ্য...আমি ছিলাম নিঃসন্তান। এ নিয়ে আমার দুঃখও ছিল বটে। একদিন এক যোগীকে সেই দুঃখের কথা পাড়তেই সে বলল, ‘দেবীর থানে একটা ছাগল বলি দাও। দেবীর আশীর্বাদে সহসাই তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।’ কথাটা শোনামাত্রই বাজার থেকে একটা ছাগল কিনে বাড়িতে নিয়ে আসি। তারপর সেটাকে মেওয়া-নাশপাতি ছাড়াও ভালো ভালো খাবার খাওয়াতে শুরু করি এই আশায় যে, দেবী হয়তো তাতে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে একটি স্বাস্থ্যবান সন্তান দান করবেন। আর শোনো, তুমিই গত জন্মের সেই ছাগল।’ এইটুকু বলে ছাগলটা চুপ করে গেল।
বিভ্রান্ত বামুন, বেশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবতে বসল। শান দেয়া ছুরিটা আস্তে করে সরিয়ে রেখে ফের ছাগলটাকে খাবার খাইয়ে যেতে লাগল সে। এভাবে বেশ কিছুদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর বামুন ছুরিটা আবার বার করল। নিজেকেই বোঝাল, ‘ছাগলটার গর্দান বরাবর ছুরিটা আমাকে চালাতেই হবে, কারণ ও এখন দেবীর প্রসাদ।’ সেদিন সে ছাগলটাকে প্রচুর মেওয়া খেতে দিল, কেননা বামুন ভাবছিল আজই হয়তো ওর জীবনের শেষ খাবার গ্রহণ। যা-ই হোক, খাবারের গামলায় মুখ দিতে গিয়েই ছাগলটা কান্না শুরু করল।
ছাগলটাকে কাঁদতে দেখে বামুন হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার! কাঁদছিস কেন?’
‘হে ঠাকুর, কাঁদছি কারণ আমি জানি আজই আমার গলায় তুমি ছুরি চালাবে। তবে এ-ও জানি, কাল তোমার গলায়ও অন্য কেউ ঠিক এভাবেই ছুরি চালাবে।’
বামুন হাসতে হাসতে উত্তর দিল, ‘আমি যদি একটা ছাগল হই, তাহলে কোনো মানুষ আমার গলায় ছুরি চালাতে কেন ভয় পাবে? আর আমি তো গত জন্মে তোমার মতোই ছাগলজন্ম কাটিয়ে এসেছি। এখন আমি প্রাণীকুলের মহত্তম প্রজাতি হিসেবেই পৃথিবীতে বাস করছি।’
‘হ্যাঁ, অস্বীকার করছি না যে তুমি মহান মানব প্রজাতি। কিন্তু যখনই তুমি আমার গলা কাটবে, ঠিক তখনই তুমি মানব প্রজাতি থেকে বিচ্যুত হবে।’
‘সেটা কী রকম?’
‘বামুন ঠাকুর, মানছি আমার জ্ঞান খুবই সামান্য কিন্তু এইটুক জানি যে, কোনো মানুষ যদি কাউকে হত্যা করে, ঠিক তখনই সে আর মানুষ বলে বিবেচিত হয় না। বহুজন্ম ঘুরে এসে আমি অন্তত এইটুকু বুঝতে পেরেছি— যে যেমন বীজ বোনে, সে তেমন ফসলই ঘরে তুলতে পারে। সবাই তার কর্মফলের দ্বারাই আবর্তিত।’
এইটুকু শোনার পর বামুন যুগপত্ভাবে বিভ্রান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। ছুরিটা আবারো দেরাজে তুলে রাখল। বেশ কিছুদিন পর্যন্ত ছুরিটাকে আবারো হাতে তোলার সাহস হলো না তার। ছাগলটাও আত্মতৃপ্তির সঙ্গে মেওয়া খেয়ে যেতে লাগল।
অবশেষে একদিন আবারো বামুনের হাতে উঠে এল শানানো ছুরি। নিজেকে বোঝাল, ‘ছাগলটা অত্যন্ত চালাক। একবার হেসে কুটিকুটি হচ্ছে তো আরেকবার কেঁদে ভাসাচ্ছে। ও এমনভাবে নীতিবাক্য ঝারে যে শুনে মনে হয়— ও নয়, আমিই একটা ছাগল। আজ যত যা-ই হোক, ছাগলটার কোনো কথাতেই আর কান দিচ্ছি না। কাঁদুক, হাসুক— যা ইচ্ছা তা করুক, আমি ব্যাটার গলা কাটবই।’ ভাবনাটা একবার নয়, বারবার ভাবল বামুন, হলফ করার মতো। কষে শান দিল ছোরায়। এইবার আর ভবি ভুলবে না।
কিন্তু বামুনের একটু খটকা লাগল। ছাগলটা আজ বেশ চুপচাপ যেন! হাসছে না, কাঁদছে না, কথা বলছে না। দেখে বামুন নিজ থেকেই জানতে চাইল, ‘কী হে, আজ এত চুপচাপ যে? আমার হাতের ছুরিটা তো দেখতে পেয়েছিস, না কি চোখে ঠুলি পরেছিস?’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছাগল উত্তর দিল, ‘একটা বোকার সঙ্গে কথা বলা মানে সময় নষ্ট করা। তাছাড়া একজন তার নিয়তি আর কতকাল-কতবার খণ্ডাতে পারে? আমার গলা কাটামাত্রই তুমি ছাগলে পরিণত হবে। তোমার আমার গলা একই দড়িতে বাঁধা। ফারাক শুধু এইটাই যে, আজ আমার গলা কাটা পড়বে, কাল তোমার গলা।’
এমন কথায় বামুনের পণ ভেস্তেই যাচ্ছিল কিন্তু নিজেকে সামলাল সে। একটু ভেবে উত্তর দিল, ‘ছাগলের ব্যাটা ছাগল, আজ তোর গলা কাটা পড়বেই। দেবীর জন্য তোর রক্ত উত্সর্গীকৃত। কিন্তু একটা কথা জানার ছিল, ছাগলে রূপান্তরিত হওয়া থেকে নিজেকে কি কোনো উপায়ে বাঁচানো সম্ভব নয়?’
কিছুটা সময় চুপ করে থেকে ছাগল বলল, ‘আমার একটা অনুরোধ আছে। যদি সেটা রক্ষা করতে পারো তাহলে তোমার জন্য কিছু করা যায় কিনা, সেটা ভেবে দেখব।’
‘কী অনুরোধ?’
‘আমার গলা কাটার পর তুমি পবিত্র গ্রন্থ গীতার অষ্টম অধ্যায়টি পাঠ করবে। তারপর এক আজলা জল আমার গায়ের ওপর ছিটিয়ে দেবে, তাতে আমার আত্মা এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে পরিত্রাণ লাভ করবে।’
‘যদি তা-ই হয়, তবে তোমার ইচ্ছাপূরণে আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়।’
কথামতোই; ছাগলের গলায় ছুরি চালানোর পর পরই ব্রাহ্মণ গীতার অষ্টম অধ্যায়টি পাঠ করে ছাগলের গায়ে এক আজলা জল ছিটিয়ে দিল। আর ঠিক তক্ষুনি বর্তমান রূপ পরিত্যাগ করে অবতার রূপে স্বর্গে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে লাগল ছাগলটি। সে ব্রাহ্মণকে বলল, ‘ওহে পুণ্যাত্মা, গীতার অষ্টম অধ্যায় পাঠ করে তুমি আমাকে অনুগ্রহভাজন করলে। আমি মুক্ত হলাম। আর তাই পুনর্বার ছাগলরূপে এ ধরাধামে জন্মানোর প্রতি তোমার যে ভয় তা দূর হলো।’ এই বলে সে স্বর্গ অভিমুখে চলে গেল।
সেদিন রাতেই বামুন পরমানন্দে স্ত্রী সান্নিধ্যে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যেই বামুনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হলো। নয় মাস পর বামুনের স্ত্রী এক হূষ্টপুষ্ট ছেলে সন্তান প্রসব করল। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সন্তান লাভের অব্যবহিত পরেই বামুন মারা গেল।
নতুন জন্মে বামুন বানররূপে পৃথিবীতে এল। কিন্তু বানরজন্মে সে কোনো সুখ খুঁজে পেল না। কারণ জন্মানোর পর সে নিজেকে যে দেশে আবিষ্কার করল, সে দেশে তখন চরম দুর্ভিক্ষ চলছিল। ক্ষুধায় মানুষ মরছে, খাবার নেই কোথাও। খাবার ছাড়া সে কত দিন টিকবে? ফলে ক’দিনের মধ্যেই সে মারা গেল। তার পরের জন্মে সে জন্মাল কুকুররূপে। কুকুরজন্মে এককথায় দুর্বিষহ জীবন কাটল তার। এক টুকরা হাড়ের জন্য কত লড়াই, ঘেঁয়োঘেঁয়ি। একবার এক ঘর থেকে খাবার চুরি করেছিল সে, কিন্তু ঘরের মালিক তাকে বাগে পেয়ে এমন ঠ্যাঙালো যে একটা পা-ই ভেঙে গেল। ভাঙা পায়ে তার জীবন নরকে পর্যবসিত হলো। কারণ পথে নামলেই দুষ্ট ছেলের দল তার দিকে ইট-পাথর ছুড়ে মারত। একদিন যা হবার তা-ই হলো, রোগেশোকে ভুগে ভুগে কুকুরটা মারা গেল।
তারপর বহু বহুবার এই জন্ম-মৃত্যু চক্র ঘটে গেল। আর এ সময়ে তার আত্মা নানা প্রাণীর দেহে ভর করে ধরাধামে এল। শেষতক সে বিড়ালজন্ম পেল। কিন্তু এই বিড়ালজন্মেও তার আত্মা শান্তি খুঁজে পেল না। সে যে শহরে জন্মেছিল, সেই শহরের ছেলেপিলেগুলো ছিল একেকটা বদের হাড্ডি। করুণা বা সমবেদনা নামের কোনো শব্দ তাদের অভিধানে ছিল না। ওদের হাতের নাগালে পড়লেই গলায় দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেত, যেন এটাই একটা খেলা! এমনকি নির্দয়ভাবে পেটাত। একদিন এক কুকুর এমনভাবে নিপীড়ন চালাল যে পুরো শরীর ক্ষতে ভরে গেল, ব্যথা-যন্ত্রণায় দিন কাটতে লাগল। এই করে যখন চলছিল, একদিন বামুন বিড়ালের পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ল, বেশ মন খারাপ হলো তার। চোখের সামনে পূর্বজন্মগুলো ভেসে উঠল একে একে। সে বুঝতে পারল তার বিগত প্রত্যেক জন্মই ছিল দুঃখ-যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। সেই বিস্তৃত জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে তার মনে হলো, এ নিছকই এক জন্ম আর মৃত্যুর অন্তহীন চক্র, দুর্ভোগের অগণন মিছিল, বেদনা আর বিষাদের এক বজ কঠিন শিকল। নিজের প্রতিই মায়া হলো, কণ্ঠে তার আহাজারি, ‘হায় রাম, এর শেষ কোথায়? জীবনে কি কোনো সুখলাভ নেই; জন্ম আর মৃত্যুর এ চক্র কি তবে কেবলই দুর্দশা আর দুর্গতির বৃত্ত। জীবন কি তবে দুঃখ-কষ্টের অন্তহীন গোলকধাঁধা?’ আর ঠিক সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল জীবনের এই যে নিরন্তর স্পন্দন, তা আসলে অন্তঃসারশূন্য। এর কোনো মানে নেই, নেই কোনো অভীষ্ট লক্ষ্য। সে নিজেকেই শোনাল, ‘আমরা ভাবি প্রতিটি নতুন জন্মই একটি নতুন শুরু। কিন্তু প্রতিবার আমরা কেবল বাহ্যিক অবয়বেই পাল্টাই, এর বাইরে সবই থাকে অপরিবর্তিত। প্রতিটি জন্মই স্রেফ পূর্বজন্মের পুনরাবৃত্তি। দুঃখ-শোকও একই, কোনো কিছুই বদলায় না।’
অনেক অনেক জীবন পেরিয়ে এসে সে ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করল। ‘এই যে নতুন নতুন রূপে জন্মাচ্ছি আর মৃত্যুবরণ করছি। এই যে চক্র...তাহলে নতুন করে জন্মানোই-বা কেন, আর জন্মালে মৃত্যুবরণ করাই-বা কেন? এতসব প্রাণীর দেহে ভর করে এই যে আসা-যাওয়া, এতে আমার অর্জন কী? কেবলই দুঃখ-যন্ত্রণা আর অপমান ভোগ।’
বামুন বিড়াল ভাবল, অনেক হয়েছে আর নয়। এবার এই চক্র ভাঙতেই হবে।
আর ঠিক তখনই তার মনে পড়ল স্বর্গে উঠতে উঠতে ছাগলের বলা কথাগুলো। ‘আসলে আমার ভাগ্যে ছিল ছাগলজন্ম। সেটা পেয়েছি। তাই প্রতিবার নতুন জন্মে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী হয়ে জন্মানোর ভেতর আমি কিছু দেখি না। আজ বিড়াল তো কাল কুকুর; আজ এটা তো কাল ওটা। এ রকম ক্লান্তিকর জন্ম-মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আসা-যাওয়া রীতিমতো ক্লান্তিকর। তাই এ চক্র আমি ভাঙতে চেয়েছিলাম। পবিত্র গীতার অষ্টম অধ্যায়েই ছিল সেই মুক্তির মন্ত্র। মনিব আমার, তুমি আমাকে সেই মুক্তির দিকে নিয়ে গেলে। আজ থেকে আমি পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্ত।’
পরবর্তী জন্মে ছাগল হিসেবে জন্মগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশের পর পরই বামুন বিড়াল মারা গেল এবং ছাগলরূপে জন্ম নিল।
বামুনের ছাগলরূপে জন্ম নেয়ার ইচ্ছা এজন্য হয়েছিল যে, সে-ও আসলে বারবার জন্ম-মৃত্যুর খেলায় তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েছিল। তারও আশা জেগেছিল, কোনো এক সহূদয় মালিক নিশ্চয় তার ওপর দয়া করে গীতার অষ্টম অধ্যায়টি পাঠ করে মুক্তি এনে দেবে। কিন্তু ছাগলজন্মে বামুনের জীবন একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে মোড় নেয়। বামুন ছাগলের যে মালিক, সে ছিল বাজিকর। বাজিকর তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে ডুগডুগির তালে তালে নাচতে শেখাল। শূন্যে ঝোলানো একটা চিকন দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে শেখাল। চার আঙুল পরিমাণ চিকন একটা কাঠের টুলে চার পা জড়ো করে দাঁড়িয়ে মৌজ দেখতে আসা দর্শকদের প্রতি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাতে বাধ্য করল।
বাজিকরের একটা মাদি বানরও ছিল। প্রতিদিন সকালে একই দড়িতে দুটোকে বেঁধে বাজিকর পথে নামত। সুবিধামতোন জায়গায় গিয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে লোক জড়ো করত সে, তারপর বানরটাকে নাচার আদেশ করে ছাগলটাকে চিকন টুলে উঠে দাঁড়াতে বলত। এ-ই রোজকার খেলা।
পথ থেকে পথে ঘুরতে ঘুরতে একদিন বাজিকর উজ্জয়নী নগরে পৌঁছল। বাজার এলাকাটা খুঁজে নিয়ে সে সেখানে তার পসরা সাজিয়ে বসল। যে মুহূর্তে বামুন ছাগল টুলের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে সমবেতর উদ্দেশে অভিবাদন জানানো শুরু করল, ঠিক তখনি ভিড়ের মাঝে নিজের ছেলেকে আবিষ্কার করল। ছেলেটা আনন্দে হাততালি দিচ্ছে, বেশ মজা করছে। লজ্জায়-অপমানে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত নেমে পড়ল বামুন ছাগল। তারপর বাকি খেলাটা চালিয়ে যেতে অসম্মতি জানাল। বাজিকর বেশ অনুনয়-বিনয় করল, মিষ্টি কথায় ভুলাতে চাইল। কিন্তু বামুন ছাগল গো ধরে বসে রইল। উপায়ন্তর না পেয়ে চতুর বাজিকর দর্শকদের জানাল যে— ছাগলের এহেন আচরণ আসলে মাদি বানরটার জন্যই, কারণ বানরটা ওকে বেশ বিরক্ত করছে।
সেদিন সন্ধ্যায় বামুন ছাগল ওদের অস্থায়ী ঠিকানার মেঝেতে একপ্রকার ভেঙে পড়ল। দানাপানি সামনে এলে সেসবের দিকে ফিরেও তাকাল না। বাজিকর বামুনের মন ভোলানোর জন্য নানা কসরত করেও বিফল হলো। রাত বাড়লে মেঝেতে শুয়ে শুয়েই একমনে ভাবতে লাগল, ‘ঈশ্বর, তোমার লীলা কী বিচিত্র! সেই সন্তান, যে সন্তানের জন্য আজ আমার ছাগলজন্ম, আমার দিকে তাকিয়ে আমার অসহায়ত্ব দেখে হাসছে? এই-ই কি জগতের বিচার! জীবনে কি এর বাইরে আর কিছুই নেই?’ ভাবতে ভাবতে পানিতে চোখ ভরে এল বামুন ছাগলের। নিজের ওপরই তার মায়া হলো। ভাবল, ‘বাকি সব জন্মের চেয়ে এই ছাগলজন্মই আমার জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক। এর আগে নিজের ওপর এতটা লজ্জা কখনো লাগেনি। আর এখন তো মনে হচ্ছে ছাগলজন্মের কোনো শেষ নেই। অন্যবার কত দ্রুত এক জন্ম থেকে আরেক জন্মে গিয়েছি, হায়! এবার মনে হয় আমার জন্মচক্র আটকে গেছে। যেন জোঁকের মতোন কামড়ে ধরে আছে। ভগবানই জানে, আমার মুক্তি যার হাতে, সেই মনিবের সঙ্গে কবে দেখা হবে। হায় রাম, এ দুনিয়া আর কতকাল আমার ওপর হাসবে?’
বামুন ছাগলের চোখ দিয়ে বর্ষার ধারার মতো কান্না ঝরতে লাগল। দীর্ঘ সময় ধরে চুপচাপ কেঁদে গেল বামুন। কিন্তু বেশিক্ষণ সে চুপচাপ থাকতে পারল না, প্রচণ্ড হতাশায় বিলাপ জুড়ে দিল। বাজিকরের ঘুম ছুটে গেলে চাপা গর্জন করে বলল, ‘হতচ্ছাড়া ছাগলটা আজ দিনভর ম্যা ম্যা করছে।’ বিছানা ছেড়ে উঠে কষে দুটা লাথি মারল ছাগলটাকে।
পরদিন সকালে প্রাণী দুটোর বাঁধন খুলে দিয়ে বাইরে বেরুবার জন্য তৈরি হয়ে নিল বাজিকর। কিন্তু ছাগলটি সামনে এগোতে অস্বীকার করায় আরো দুটো লাথি কষাল সে। উপায়ন্তর না পেয়ে ছাগলটা সুড়সুড় করে মনিবের পথ ধরল। ডুগডুগি বাজিয়ে ভিড় জমাতে জমাতে ছাগলটাকে তার অংশটুকু পরিবেশন করতে ইশারা করল বাজিকর। ছাগলটাও এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেল সরু কাঠের টুলটার দিকে। প্রথমে সামনের দু-পা তুলে দিয়ে একটু সময় অপেক্ষা করল, তারপর ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে বাকি পা দুটোও তুলে নিল টুলে। পড়ে যাবে কিনা সেই ভয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলল বামুন ছাগল। কিন্তু শেষতক সামলে নিল ব্যাপারটা। তারপর মৌজ দেখতে আসা দর্শকদের প্রতি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল।






