জর্জ হার্বার্টের কথাটি গুরুত্বপূর্ণ—স্পাইয়ের কাজ জানা, নিজেকে জানানো নয়।

সম্ভবত এ কারণেই বাস্তব জীবনের বিখ্যাত স্পাই হাতেগোনা, কিন্তু ফিকশনের স্পাই পৃথিবীজুড়ে—প্রতিটি গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাসে। বাস্তবের কয়েক জন বিখ্যাত স্পাইয়ের নাম উল্লেখ করছি: স্যার ফ্রান্সিস ওয়ালসিংহাম, বেনেডিক্ট আরনল্ড, নাথান হেইল, মাতা হারি, ফ্রেডেরিখ ফ্রিজ, উইলিয়াম সেবল্ড, রুডলফ আবেল, ভার্জিনিয়া হল, কিম ফিলবি, জুলিয়াস রোজেনবার্গ, নূর ইনায়েত খান প্রমুখ।

আর ফিকশন জগতে স্পাইদের মধ্যে রয়েছেন—শার্লক হোমস, এরকুল পোয়রো, জর্জ স্কাইলি, জেমস বন্ড, মাসুদ রানা, কিম্বল ও হারা, জেমস ওরমল্ড, মিস মার্পেল, জেসিকা ফ্লেচার, কাউলিয়া হোমস, ফেলুদা, অগাস্ট ডুপিন, বোমকেশ বকশি, ইন্সপেক্টর ফ্রেঞ্জ, সার্জেন্ট কর্ক প্রমুখ। রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরক্ষার বিষয়টি সামনে চলে আসে তার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা ও গুপ্তচরবৃত্তি প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করে।

এমআইসিক্স

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হার্বার্ট হেনটি এসকুইথ ১৯০৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯০৯ সিক্রেট সার্ভিস ব্যুরো গঠন করলেন। এটি বিদেশে গোয়েন্দা বৃত্তির উদ্দেশ্যে সৃষ্টি, গোয়েন্দা সদস্যরা সব উপনিবেশে ও অন্যান্য দেশেও কাজ করতে শুরু করে। প্রথম মহাযুদ্ধ সংস্থাটিকে আরো শক্তিশালী করার তাগিদ দেয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এর কাঠামো ও নামে পরিবর্তন আসে এবং তা মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সেকশন সিক্স, সংক্ষেপে MI6 নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের জন্য কাজ করে এমআইফাইভ (MI5)। রয়াল নেভির অফিসার স্যার জর্জ কামিন (ম্যানফিল্ড জর্জ স্মিথ-কামিন) প্রথম প্রধান হিসেবে এমআইসিক্স সংস্থাটিকে দাঁড় করান। মহাযুদ্ধে ব্রিটেন ও জার্মানির শত্রুতা থাকলেও উভয় দেশই কমিউনিজমকে মনে করেছে তাদের সাধারণ শত্রু। সে কারণে নািসদের গোপন পুলিশ গেস্টাপো এবং এমআইসিক্স কমিউনিজম-সংক্রান্ত সংবাদ পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের স্নায়ুযুদ্ধ সংস্থাটিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এমআইসিক্সের স্বনামধন্য গোয়েন্দাদের মধ্যে রয়েছেন এন্থনি ব্লাট, কিম ফিলবি, ডেভিড কর্নওয়েল, চার্লস কামিন, ফ্লেডেরিথ ফরসিথ, আয়ান ফ্লেমি, বিল হাডসন, ক্রিস্টিনা স্কারবেক।

সিআইএ

সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সিআইএ সম্পৃক্ত থাকুক বা নাই থাকুক এ আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাটির পারঙ্গমতা ও দুর্নামের খবর এতটাই বিশ্বজনীন যে দুনিয়ার বড় ধরনের অঘটনের পেছনে মানুষ মনে করে সিআইএর হাত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনএফ কেনেডি নিহত হলেন আততায়ীর গুলিতে, পৃথিবীজুড়ে গুঞ্জন উঠেছে কাজটা সিআইএ করেছে। মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করলেন কিন্তু ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা বললেন সিআইএ মনরোকে হত্যা করেছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমান ১৯৪৭ সালের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় ২৬ জুলাই ১৯৪৭ এ গোয়েন্দা সংস্থা সৃষ্টি করেন। এফবিআই-ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন অভ্যন্তরীণ বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আর সিআইএর দায়িত্ব বৈদেশিক।

১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জার্মান ইন্টেলিজেন্স সংস্থা বুন্ডেসনাখরিচটেনডিস্ট (বিএনডি), ১৯৮৩ সালে কাজ শুরু করে চীনের সংস্থা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি, ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে, অস্ট্রেলিয়ান সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (১৯৮২), ডিরেক্টরেট জেনারেল ফর এক্সটার্নাল সিকিউরিটি, ফ্রান্স (১৯৮২), কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (১৯৮৪)। স্বাধীন সার্বভৌম সব দেশেরই নিজস্ব এক বা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে।

কেজিবির সাফল্য ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট বানানো

ধনাঢ্য ফ্রেড ট্রামপুত্র ডোনাল্ডের সুন্দরী নারী প্রীতি সম্পর্কে অবহিত থাকলেও ১৯৭৭ সালে তিনি যখন সোভিয়েত ঘরানার চেকোস্লোভাকিয়ার সুন্দরী মডেল ইভানা জেলনিকোভাকে বিয়ে করেন সোভিয়েত সংস্থা কেজিবি এটাকেই মনে করল তাদের গেটওয়ে। এই সোভিয়েত/রুশ গোয়েন্দা সংস্থা ৪০ বছর ধরে তাকে আগামীর সম্পদ বিবেচনা করে লালন করেছে। ইউরি সভেতস যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা। ‘আমেরিকান কমপ্রোমাত : হাউ দ্য কেজিবি কাল্টিভেটেড ডোনাল্ড ট্রাম্প’ গ্রন্থে ক্রেইগ আনগারের ট্রাম্পকে লালন এবং প্রেসিডেন্টি পদে বসাতে তাদের ভূমিকার কথা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘ট্রাম্প ছিলেন আমাদের সঠিক টার্গেট, তার অহংকার ও স্বাকামবোধ তাকে কেজিবির স্বাভাবিকে টার্গেট হতে সহায়তা করে।’ তাকে রুশ অপারেটরা তোষামোদি করে এবং রাজনীতিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করে। রাশিয়া সফরে ইভানা ছিলেন তার সফরসঙ্গী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রুশ সমর্থনপুষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প অন্তত ৩৮টি বৈঠক করেছেন। সংস্থাগুলো তাকে পুরোদমে সহায়তা করেছে। রাশিয়া ও পুতিন সম্পর্কে ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য তার আনুগত্যের প্রমাণ দেয়। একমাত্র ট্রাম্পের নির্বাচন বিজয়ের পরই মস্কোয় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

পৃথিবীর সর্বাধিক উচ্চারিত দুটি গোয়েন্দা সংস্থার একটি কেজিবি ১৩ মার্চ ১৯৫৪ প্রতিষ্ঠিত: যদিও এর অধিক্ষেত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিন্তু বলা হয় অখণ্ড সোভিয়েত বছরগুলোয় কেজিবি পৃথিবীজুড়েই সক্রিয় ছিল। সোভিযেত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটলে ৬ নভেম্বর ১৯৯১ কেজিবি বিলুপ্ত করে রুশ ফেডারেশনের ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস এবং এবং ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস গঠিত হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও মনে করত পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ ও কার্যকরী তথ্য সংগ্রহের সংস্থা হচ্ছে কেজিবি। বিদেশে কেজিবি কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি আদায় করা হতো।

সিআইএ-কেজিবি কৌতুক

স্পাই সংস্থাগুলোর হাবভাব ও কাজকর্ম নিয়ে কৌতুক প্রচলিত আছে সারা পৃথিবীতেই। কল্পিত শত্রু সৃষ্টি ও ছায়ার সঙ্গে লড়াই তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১. সোভিয়ত একনায়ক জোসেফ স্ট্যালিনের রিস্ট-ওয়াচ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কেজিবি প্রধান মার্কুলভকে কথাটা বললেন। মার্কুলভ বললেন, নো প্রব্লেম, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঘড়ি উদ্ধার হয়ে যাবে।

     ১২ ঘণ্টা পর স্ট্যালিন অগ্রগতি জানতে চাইলে কেজিবি প্রধান বললেন, সন্দেহভাজন সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৮ ঘণ্টা পর স্ট্যালিন নিজের শোয়ার ঘরের বালিশ উল্টে ঘড়িটি পেয়ে গেলেন। ২৪ ঘণ্টা পর কেজিবি প্রধান ফোন করে স্ট্যালিনকে বললেন, সুখবর আছে। গ্রেফতারকৃত সাতজনের মধ্যে ছয়জন আপনার ঘড়ি চুরি করেছে, এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছে। স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করায় সপ্তম ব্যক্তিকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

২. সিআইএ, কেজিবি ও এমআইসিক্সের মধ্যে কর্মদক্ষতা প্রতিযোগিতা চলছে। জঙ্গলের মধ্যে একটি খরগোশ ছেড়ে দিয়ে তা বের করে আনতে বলা হলে সিআইএ স্পাই প্লেন ও স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ৩ ঘণ্টার মধ্যে খরগোশটাকে বের করে আনল।

     খরগোশ বের করতে এমআইসিক্স বনের মধ্যে প্যারাট্রুপার ও সার্চ টিম নামিয়ে দিল, তারা ২ ঘণ্টার মধ্যে খরগোশ নিয়ে হাজির হলো।

     অন্যদিকে ১ ঘণ্টার মধ্যে কেজিবি যখন ফিরে এল সবাই দেখল মার খেয়ে অর্ধমৃত হয়ে যাওয়া একটি ভালুক বলছে, আমি স্বীকার করছি, আমিই খরগোশ।

৩.        এটি কৌতুক নয়, বাস্তব ঘটনা: এক সুন্দরী রুশ স্পাইয়ের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্নোর অন্তরঙ্গ ভিডিও ব্ল্যাকমেইল করার লক্ষ্যে কেজিবি তার সামনে উপস্থাপন করল। ফাঁদে পা না দিয়ে প্রেসিডেন্ট বললেন, দারুণ তো! দয়া করে আমাকে আরো কিছু কপি দিন, আমি প্রিয়জনদের দেব।

স্পাই শব্দকোষ থেকে—

বার্ডওয়াচার  :    পাখি সন্ধানী নয়, ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

ড্রাই ক্লিন  :   যদি গোয়েন্দা মনে করে কেউ তাকে চিনে ফেলেছে, তাহলে দ্রুত স্পট বদল করা।

হানি ট্র্যাপ    :    গুপ্তচরকে ফাঁদে ফেলা বা কব্জায় আনতে সুন্দরী নারী কিংবা অন্য কোনো আকর্ষণের টোপ। কেজিবি পুরুষ ট্র্যাপকে বলত র্যাভেন (দাঁড়কাক) আর নারী ট্র্যাপকে সোয়ালো (ছোট পাখি)।

স্যানিটাইজ  :    কোনো বাজে লেনদেন ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে রেকর্ড থেকে সরিয়ে ফেলা, নতুন ভিন্ন কিছু যোগ করা।

স্পুক        :   আক্ষরিক অর্থে ভূত, এখানে ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা।

ফার্ম         :   সিআইএর প্রশিক্ষণস্থল।

এনিগমা   :   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্যবহূত বার্তা কোডিং করার মেশিন।

হসপিটাল :   কেজিবির শব্দ—কারাগার।

ইলনেস    :   গ্রেফতার হওয়া।

পিগ         :   বিশ্বাসঘাতক

দ্য কোম্পানি     :           সিআইএ

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা