সাম্রাজ্যের খেলা ও এক তরুণ সাংবাদিক

১৮৮২ সালের ১৮ অক্টোবর সতেরো বছর বয়সী তরুণ রুডিয়ার্ড কিপলিং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করে ফিরে এলেন বাবা জন লকউড কিপলিংয়ের কর্মভূমি, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরাজের ভারতে। এখানেই, তখনকার বম্বে বা এখনকার মুম্বাইতে তাঁর জন্ম। আর বিলেত থেকে পড়ালেখার এক পর্ব শেষে ফের পয়লা পা রাখলেন সেই শহরেই। কিন্তু ততদিনে তাঁর শিল্পকলা-ইতিহাস বিষয়ের পণ্ডিত পিতা থিতু হয়েছেন পাঞ্জাব অঞ্চলের লাহোর শহরে, তিনি এখন সেখানকার রাজসিক জাদুঘরের কিউরেটর। অতএব, কিপলিংকেও ফিরতে হবে লাহোরে—পরে যেখানে তাঁর সাহিত্যিক ভবিতব্য বাস্তবে রূপ নেবে, তিনি প্রতিষ্ঠিত হবেন সাংবাদিক হিসেবে এবং ক্রমান্বয়ে দর্শক হিসেবে হলেও জড়িয়ে যাবেন ব্রিটিশরাজের সামরিক শক্তির সাম্রাজ্য বিস্তার ও গুপ্তচরবৃত্তির খেলায়।

লাহোরে আসার কিছুদিনের মাথায়, ১৮৮৩ সালের গোড়ায় যোগ দিলেন লাহোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ‘সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’-এ (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৭২)। অল্প বয়সেই তুলনামূলক ভালো পদ মিলল, সহকারী সম্পাদক। কিন্তু বিধিবাম। সম্পাদক স্টিফেন হুইলার তার পরই অসুস্থ হয়ে পড়ায় কার্যত পুরো পত্রিকার ভার এসে পড়ে একা কিপলিংয়ের ঘাড়ে। ১৮৮৬ সালে সম্পাদক হয়ে আসেন কে রবিনসন—তিনি কিপলিংকে পূর্ণমাত্রায় লেখার স্বাধীনতা দেন পত্রিকায়। ফলে পত্রিকা দপ্তরে কিপলিংয়ের পদ যাই হোক, গুরুত্ব আরো বাড়ে। আর তিনি সহজেই নাগাল পান ইংরেজ সাম্রাজ্যের অলিগলির, সাক্ষাৎ করেন উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে এবং বুঝতে পারেন যে পুরো সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থার আড়ালে চলছে এক ‘গ্রেট গেম’—মধ্য এশিয়া ও তিব্বতে রাশিয়া-চীনকে পরাস্ত করে ব্রিটিশরাজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এক বৃহৎ-বিস্তৃত-জটিল লড়াই। এবং তার জন্যে দিকে দিকে ব্রিটিশ প্রশাসন ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা কিসিমের গুপ্তচরকে—কেউ সাদাসিধে বাঙালি লেখক, কেউবা জাঁদরেল ইহুদি ব্যবসায়ী আর কখনো কখনো নেহাতই বালকেরাও বয়সের সীমানা ভেঙে হয়ে যাচ্ছে রীতিমতো দক্ষ স্পাই।

‘অবিশুদ্ধ’ রক্তের সন্তান ও ঘোড়ার ব্যবসায়ী

অবশ্য, ‘সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’-এ কাজ করার আগেও ব্রিটিশরাজের গোয়েন্দা বাহিনীর তত্পরতা সম্পর্কে যে কিপলিং অবগত ছিলেন না তেমনটি নয়। কারণ, তাঁর কলেজের পড়াশোনা একটি আধামিলিটারি প্রতিষ্ঠানেই হয়েছিল। সেখানে পড়তে আসা ভারতে কর্মরত ইংরেজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাপুত্রদের সঙ্গে তাঁর আলাপ জমে। ফলে মধ্য এশিয়ায় গুপ্তচর-তত্পরতা সম্পর্কে টুকরো টুকরো গল্পগাছা তখন থেকেই তাঁর কানে আসত। সেসব শোনা কাহিনীর পলি পরে ‘কিম’ (১৯০১) উপন্যাসে কল্পনার লাগসই রঙ গায়ে লাগিয়ে মাটি হয়ে জমাট বেঁধেছে।

‘কিম’ উপন্যাসের কাহিনী কিপলিংয়ের নির্মিত, সন্দেহ নেই। কিন্তু আখ্যানের ‘এসপিওনাজ’গন্ধী ঘটনাপ্রবাহের ছক ইংরেজ রাজের হয়ে রুদ্ধশ্বাস গোপন অভিযানে নামা গুপ্তচরদের বাস্তব জীবন থেকেই নেয়া। এর বহু চরিত্রও কার্যত ঐতিহাসিক। এমনকি, স্বয়ং কিমও। সচেতন পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে উপন্যাসে মূল চরিত্র কিম এক নিহত আইরিশ সৈনিক কিম্বল ও’হারার সন্তান, তবে মা শ্বেতাঙ্গ নন—তাঁর বাবার অস্বীকৃত দ্বিতীয় স্ত্রী তথা রক্ষিতা এক নাম-না-জানা ভারতীয় নারী তাঁর মা। আর তাঁর থেকে বয়সে বহু বড়, কার্যত পিতৃব্যের সমান বয়সী প্রকাশ্যে ঘোড়া ব্যবসায়ী এবং আড়ালে গুপ্তচর আফগান মাহবুব আলীর কথাও স্মর্তব্য—তিনি তো কিমের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড’ কার্যত। এ দুটি চরিত্রই দুজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছায়ায় নির্মিত। কিমের চরিত্র যাঁর ওপর নির্ভর করে তৈরি, তিনি হলেন হায়দার ইয়াং হেয়ার্সে (১৭৮২-১৮৪০)। মারাঠা রাজ্যে কর্মরত এক ইংরেজ অফিসার ক্যাপ্টেন হ্যারি হেয়ার্সের সন্তান। কিমের মতোই, তাঁর মা ছিলেন তাঁর বাবার ভারতীয় স্ত্রী—জাঠ সম্প্রদায়ের এক অজ্ঞাতনামা নারী। অর্থাৎ, কিম যেমন—তেমনি এই হায়দার ইয়াংও ‘অবিশুদ্ধ’ রক্তের এক শ্বেতাঙ্গ-গরিমায় ভোগা সন্তান। যদিও দুজনেরই গাত্রবর্ণ বস্তুত শ্যামল, এজন্য ‘খাঁটি’ ইংরেজরা তাঁদের অবজ্ঞা করত। অবশ্য তাঁর জীবন কিমের মতো ভাগ্যহত ছিল না। পিতার পথ ধরে তিনিও মারাঠা রেজিমেন্টে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। আর পরে বিয়ে করেছিলেন মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের পালিতা কন্যা জহুর-উন-নেসা খানমকে। আর মাহবুব আলী? কিম নিয়ে চর্চা করেছেন এমন ঐতিহাসিকদের বেশির ভাগের মত বিলেতি ঘোড়া-বিশেষজ্ঞ গুপ্তচর উইলিয়াম মুরক্রফটের আদলেই মাহবুব আলীর চরিত্রটি নির্মিত। ঘোড়ার ব্যবসার সূত্র ধরে উইলিয়াম মুরক্রাফট (১৭৬৫-১৮২৫) জড়িয়ে গিয়েছিলেন ‘গ্রেট গেম’-এর আদিপর্বের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে। তখন সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ঘোড়া ছিল যেন একটি জরুরি অস্ত্রবিশেষ। কিন্তু একই সঙ্গে দ্রুতগামী ও ভারবাহী—এমন ঘোড়া পাওয়া ইংরেজদের দখলীকৃত ভূখণ্ডে পাওয়া ছিল দুষ্কর। এজন্য উনিশ শতকের প্রথমার্ধের ইংরেজ প্রশাসন তথা কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নজর দেয় মধ্য এশিয়া থেকে টগবগে তেজি ঘোড়া আমদানির ব্যাপারে। কিন্তু তখন মধ্য এশিয়ার শাসকদের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক ভালো নয়। ইতিউতি রাশিয়াও তখন ওই এলাকায় উঁকি মারছে। অতঃপর মুরক্রফটের অভিযান শুরু। হিমালয়ের দুর্গম সব প্রান্ত ছদ্মবেশে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি দুটি বিষয় তখন যাচাই করেছিলেন—দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে মধ্য এশিয়ার চোরাই ঘোড়া আনা কতটা সম্ভব ও হিমালয় অঞ্চলের উত্তম জাতের ঘোড়াকে কীভাবে সামরিক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। ১৮১২ সালে গ্যাংটক হয়ে তিব্বতে এমনই এক অভিযানে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন হায়দার ইয়াং হেয়াসে। এ যেন প্রবীণ মাহবুব আলী ও নবীন কিমের অভিযানের ছায়া! সেই যাত্রায় হায়দার ও মুরক্রফট মানস সরোবর অব্দি গিয়েছিলেন। মাহবুব আলীর সঙ্গে মুরক্রফটের চরিত্রের আরো মিল লভ্য বটে। দুজনেই প্রজ্ঞাবান, যে জায়গায় তাঁরা অভিযানে যাচ্ছেন সেখানকার ইতিহাস-ভূগোল সম্পর্কে দরকারি জ্ঞান তাঁদের নখদর্পণে ও সর্বদা শত্রুদের তত্পরতা সম্পর্কে সজাগ-সতর্ক। মাহবুব আলীর চরিত্র নির্মাণের নেপথ্যে মুরক্রফট ও কিমের পেছনে হায়দার ইয়াংয়ের ছায়া ছিল শুধু এমনটাই নয়—তাঁদের মুখোমুখি হওয়া শত্রু গুপ্তচরদের চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও কিপলিং ইতিহাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উপন্যাসের অন্তে কিম এক রুশ ও এক ফরাসি গুপ্তচরের সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। এই রুশ গুপ্তচরের কথা স্বয়ং মুরক্রফট লিখে গেছেন। তাঁর বয়ানে জানা যায়, রাশিয়ার জারের পাঠানো আগা মেহেদি ছদ্মনামধারী এক রুশ গুপ্তচর মেখদি লিয়েফদভ উনিশ শতকের গোড়ায় ভারতের উত্তরাঞ্চলে সরেজমিন জরিপ ও মানচিত্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন। মেখদির সঙ্গে জনাকয়েক ফরাসি গুপ্তচরের সংযোগের কথাও জানা গিয়েছিল। কল্পনার সহায় কী করে হয় বাস্তবের উত্তেজনাকর ইতিহাস, এ তার এক দারুণ নিদর্শন বটে। আর উপন্যাসের শুরুতেই কিম লাহোর মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে প্রবীণ ও জ্ঞানী ইংরেজ কিউরেটরের দেখা পায়, তিনি যে আদতে কিপলিং-পিতা জন লকউড কিপলিং তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


আবার, মাহবুব আলী আদৌ মুরক্রফটের আদলে গড়া চরিত্র কিনা—এ নিয়ে কারো কারো খানিক সংশয়ও আছে।  সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও পরবর্তীকালে বহু ইতিহাস বইয়ের লেখক পিটার হপকির্ক জানাচ্ছেন, মাহবুব আলী নামের এক আফগান ঘোড়া ব্যবসায়ী উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাস্তবেই ছিলেন। ১৮৮৬-৮৭ সালে কিপলিং যখন ‘সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’ পত্রিকার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত, তখন পূর্বোক্ত ঘোড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর পয়লা মোলাকাত হয়। লাহোর ছেড়ে কিপলিং যখন এলাহাবাদে চলে যান, তখন তিনি মাহবুব আলীকে স্মরণ করেছেন নানাভাবে। তাঁর বহুমাত্রিক গুণপনা কিপলিংকে আকৃষ্ট করেছিল। হপকির্কের ধারণা, মাহবুব আলীর প্রতি তাঁর ‘কিপলিং সাহিব’-এর যে ভালো লাগা—সেটির উৎস কার্যত গুপ্তচরবৃত্তিকে আফগান এ ঘোড়া ব্যবসায়ীর জড়িত থাকার কারণেই। কারণ, খাইবারপাসে ঘটে চলা নানা সামরিক-রাজনৈতিক তত্পরতা ও গোপন কর্মকাণ্ডের খবর তখন ওই আফগান ‘হিন্টারল্যান্ড’ থেকে দেয়ার মতো নির্ভরযোগ্য সূত্র আর কেউ ছিল না। মাহবুব আলীর উল্লেখ কিপলিংয়ের ‘সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও আমরা পাই। তবে খানিক ঘুরিয়ে। ১৯ জানুয়ারি ১৮৮৬ তারিখে প্রকাশিত ‘আ উইক ইন লাহোর’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আফজাল নামের এক ঘোড়া ব্যবসায়ীর চমকপ্রদ অশ্বসংক্রান্ত বিপুল জ্ঞানের উল্লেখ (প্রশংসাসমেত) ঘুরেফিরে এসেছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ আফজালই আদতে মাহবুব আলী। পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কিপলিং শুধু তাঁর নাম পাল্টে দিয়েছিলেন। ধারণা করি, মাহবুব আলী যে গুপ্তচরবৃত্তিতে গোপনে নিয়োজিত তা ইংরেজ সেনা-ঘনিষ্ঠ কিপলিং জানতেন—আর, সেজন্যই নাম বদলে দেয়া।

বাঙালি পণ্ডিত ও জহুরি জাদুকর

উপন্যাসে কিমের সঙ্গী ও গুপ্তচরবৃত্তিতে সহযোগী হয়েছিল এমন অন্তত আরো দুজন ব্যক্তি সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্র। এবং তাঁরা এ উপমহাদেশে গুপ্তচর তত্পরতার ইতিহাসে জটিলতম ও তুমুল কৌতূহলোদ্দীপক দুই ব্যক্তিও বটেন। এঁদের একজন চট্টগ্রামের সন্তান, বাঙালি পণ্ডিত শরত্চন্দ্র দাশ; আরেকজন ইহুদি রত্ন-ব্যবসায়ী ও জাদুকর আলেকজান্ডার ম্যালকম জ্যাকব। শরত্চন্দ্র দাশ (১৮৪৯-১৯১৭) ‘কিম’-এ এসে পরিণত হয়েছেন হরি চন্দর মুখার্জি, ওরফে বাবুতে। শরত্চন্দ্র দাশের মতোই এ হরিবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট, দারুণভাবে অনুসন্ধিত্সু ও নৃতাত্ত্বিক-ভৌগোলিক গবেষণায় উৎসাহী। ব্রিটিশরাজের


গুপ্তচর হিসেবে জ্ঞানতৃষ্ণায় নিমগ্ন বিদ্যার্থীর বেশে (তিনি আদতেও তো ছিলেন তাই) শরত্চন্দ্র দাশ দুবার তিব্বতে ঘুরে বহু দুর্লভ তথ্য, ভৌগোলিক বিবরণ ও বইপুস্তক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিব্বতের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র নির্মাণও করেছিলেন তিনি। তাই  ১৮৭৯ ও ১৮৮১ সালের তাঁর দুবারের তিব্বতযাত্রা অন্য যেকোনো গুপ্তচর-পণ্ডিতের অভিযানের থেকে ভিন্ন ছিল এই অর্থে যে তিনি নিছক রাজ-সরকারের ঘুঁটি হয়ে তিব্বতে যাননি—নিজস্ব অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা তাঁর বরাবরই ছিল। আর তিব্বতে আক্ষরিক অর্থেই প্রাণ হাতে করে অভিযান সম্পন্ন করে ফিরে এসে মোটা অংকের পারিশ্রমিক পেয়ে স্রেফ বিলীনও হয়ে যাননি। দার্জিলিংয়ের লাসা ভিলায় পরে আবাস গেড়ে সেখানে বসে তিনি তিব্বতি-ইংরেজি অভিধান রচনা করেছেন, তিব্বতে ভারতীয় পণ্ডিতদের বিদ্যাচর্চার ইতিহাস লিখেছেন আর সামনে এনেছেন নিজের তিব্বতের বিপজ্জনক অথচ রোমাঞ্চকর স্মৃতিও। শরত্চন্দ্র দাশের এ জ্ঞানতৃষ্ণার প্রতিফলন যেন দেখতে পাই কিপলিং-নির্মিত হরিবাবুর চরিত্রেও। কিমকে হরিবাবু অকপট বয়ানে জানান যে তাঁর গুপ্তচরবৃত্তি ভালো লাগে না আদৌ। ইচ্ছা ছিল লেখক হবেন। সেই তাড়নাতেই বহুদিন ধরে গুপ্তচরবৃত্তি করতে করতে যেখানে যা ঐতিহাসিক তথ্য পান তা সংগ্রহ করে চলেছেন। একদিন অবসর পেয়ে লিখবেন ও সেই লেখা বিদ্বৎসমাজে প্রশংসা পাবে এমনটাই তাঁর সরল-সহজ হূদয়ের চিরন্তন আশা ।

হরিবাবুর ঠিক বিপরীত চরিত্র যেন ‘কিম’-এর লুরগান সাহেব—যিনি বাস্তবে ছিলেন পূর্বে কথিত সেই রত্ন-ব্যবসায়ী ও জাদুকর ডায়মন্ড জ্যাকব (১৮৪৯-১৯২১)। উপন্যাসে তাই হরিবাবুকে লুরগান সাহেব তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণার জন্য ব্যঙ্গ করতে ছাড়েন না, কারণ ওখান থেকে মোটাদাগে কিছু পাওয়ার আশা নেই! এ জ্যাকব ছিলেন তুরস্কের ইজমির থেকে ভাগ্যান্বেষণে ভারতে আসা এক ইহুদি। চরম দারিদ্র্য থেকে রত্নপাথর ও দুর্লভ বস্তুর দোকানদারির মাধ্যমে তাঁর রীতিমতো বড়লোক হয়ে ওঠা। উপন্যাসে কিম যে লুরগান সাহেবের সিমলার কিউরিও শপে গিয়েছিল, তা কার্যত নিখাদ বাস্তব। সিমলায় ছিল জ্যাকবের এন্টিক সামগ্রীর দোকান। দুর্লভ সামগ্রীর বেচাকেনার আড়ালে জ্যাকবের গুপ্তচরবৃত্তির কথা অজানা থাকেনি। পরে হায়দরাবাদের নিজামের কাছে এক বিরল হীরা বিক্রি করতে গিয়ে তাঁকে নিদারুণ বিপদে পড়ে সর্বস্ব খোয়াতে হয়। কারণ, ওই হীরাটি জাল কিনা সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। বিরাট বেশরম জালিয়াতির দায়ে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। ভাগ্যহত জ্যাকব পরে অন্ধ হয়ে যান। শরৎ ও জ্যাকব—দুজনের জন্মসাল কাকতালীয়ভাবে এক হলেও দুজনের পরিণতি যেন দুদিকে ধাবিত হয়েছিল। শরৎ তাঁর প্রার্থিত জ্ঞানার্জন ও লেখালেখির পথে পরে সাফল্য পান, কিন্তু রঙদার জীবনপ্রবাহে মেতে থাকা জ্যাকব বিলীন হয়ে যান ভাগ্যের ফেরে।

শরত্চন্দ্র দাশ ও ডায়মন্ড জ্যাকবের সঙ্গে কি কিপলিংয়ের সরাসরি দেখা হয়েছিল? প্রথমজনের ক্ষেত্রে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ধারণা করা হয়, কিপলিংয়ের পিতা জনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শরত্চন্দ্র দাশের। দুজনেই ইতিহাস-অনুসন্ধিত্সু ও ভারত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী ছিলেন। তাই কিপলিং বাবার কাছ থেকেই এ বাঙালি পণ্ডিত সম্পর্কে খবরাখবর পেয়েছিলেন বলে আন্দাজ। আর জ্যাকবের সঙ্গে কিপলিংয়ের সিমলায় সরাসরি একাধিকবারই মোলাকাত হয়েছিল বৈকি। কিপলিং একটা সময় এলাহাবাদের ‘পাইওনিয়ার’ সংবাদপত্রের হয়ে কাজ করেছেন। সিমলায় পত্রিকার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে জ্যাকবের এন্টিক শপ সম্পর্কে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। সেই সময়ই জ্যাকবের আকর্ষণীয় অথচ ভোগবাদী ব্যক্তিত্ব, জাদুশিল্পে তাঁর দক্ষতা সম্পর্কে কিপলিং ওয়াকিবহাল হয়ে ওঠেন।

গুপ্তচরের গ্লানি ও গন্তব্য

রুডিয়ার্ড কিপলিং কি ‘কিম’ উপন্যাসে গুপ্তচরবৃত্তিকে একপ্রকার উদ্্যাপন ও উপভোগের বিষয় বলে চিত্রায়ণ করেছেন? সম্ভবত নয়। তাঁর উপন্যাসের কিম ভাগ্যের ফেরে পড়ে ব্রিটিশরাজের কিশোর গুপ্তচরে পরিণত হয় ঠিকই, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি সে দেখতে চায় এই উপমহাদেশের রঙিন মানুষদের প্রাণভরে। মাহবুব আলী যেন তাঁর গুপ্তচরগিরি দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থেকেও পৌঁছাতে চান প্রজ্ঞা ও নির্লিপ্তির এক বিরল স্তরে। পণ্ডিত হরিবাবুর শেষ অব্দি কেবল এটুকু চাওয়া জ্ঞান-অন্বেষণ যেন তিনি করতে পারেন। আপাত ভোগবাদী লুরগান সাহেবও যেন গুপ্তচরবৃত্তিতে জীবিকার দায়ে জড়ানোর পরও অন্য এক জীবন খুঁজে বেড়ান। তাই তাঁরা বস্তুত ‘গ্রেট গেম’-এ সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকারের ‘এসপিওনাজ প্রজেক্ট’-এর অংশভাগ হলেও তা থেকে শেষমেশ তাঁরা পরিত্রাণই চান। ‘কিম’ উপন্যাসের চরিত্রদের এ গ্লানি নিয়ে অধ্যাপক আলী আনোয়ারের মন্তব্যটি এক্ষেত্রে খুবই প্রণিধানযোগ্য: ‘[কিম উপন্যাসে] বিনষ্টির অন্যদিকও আছে। সাম্রাজ্যের বিশ্বজোড়া কার্যক্রম হচ্ছে একটা দিকপ্লাবী বন্যার তোড়ের মতো। হাজার হাজার অনুগত, প্রলুব্ধ, উত্তেজিত লোককে বিত্ত ও ক্ষমতার কুহকের আকর্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে চলে আপন প্রবলতায়। ওই প্লাবনে যারা ভাসছে, একসময় তারা আবিষ্কার করে যে ওই প্লাববে ভেসে থাকা ছাড়া তার আর কোনো মানবিক গন্তব্য নেই। তাদের জীবনের শুরুতে যে ছোট ছোট স্বপ্ন ও একান্ত বাসনা ছিল, তা তলিয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যের তলায়। অনেককে ওই উত্তেজনা ও প্রাপ্তি ভুলিয়ে রাখে সারাটা জীবন, কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে আসে ফিরে তাকানোর বিষণ্ন মুহূর্ত—বিনষ্টির অনিকেত বোধ।’

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক