কয়েকটা মূক-বাকহীন প্রাণী
স্থির-প্রশান্ত চোখ তুলে দেখছে আর দেখে নিচ্ছে সম্পূর্ণ আমাকে,
আর সম্পূর্ণ আমাদের। এই তো নিয়তি...
১.
অনেক অনেক বছর আগে, মাছ ধরতে এসে ঝড়ের মুখে পড়ে গেল এক জেলে। চারপাশে তার ভয়ানক ক্রুদ্ধ এক দৈত্য বাতাস হয়ে তড়পায়, নৌকা তার ভেঙে চৌচির; ঝড়ের দাপটে সে ছিটকে পড়ে এক জলে ভাসা ঝড়ে উপড়ানো গাছের ওপর। গাছই হয়ে উঠল তার বাঁচা-মরার একমাত্র অবলম্বন, দুহাতের বেড়ে তাকেই জড়িয়ে ধরে সে। লোনা পানি চোখে-মুখে নিয়ে কোনো রকমে ভেসে থাকে; কানের চারপাশে তখনো শোঁ শোঁ দৈত্যের গর্জন, আর ঢেউয়ের তড়াশে ভাসতে ভাসতে সে বোঝে, কীভাবে তার পায়ের তলায় মাটি ঠেকেছে, কোনো রকমে হাচড়ে-পাচড়ে তীরে উঠেই কাছের বড় একটা গাছে চড়ে বসে সে, ঝড় আরো প্রবল হয়েছে এর মধ্যে। গাছের ডালে তার প্রবল ডানা ঝাপটানি চলছে; গাছের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য কোমরের গামছা খুলে শক্ত করে নিজেকে বাঁধে। তারপর কতক্ষণ ওভাবে গাছের সঙ্গে জাপটে ধরে থাকল সে, তার হিসাব রইল না। একসময় দেখল, ঝড় থেমে এসেছে এবং সে বেঁচে আছে, নীরব-নিস্তব্ধ চারদিক; ঢেউয়ের গর্জন থেমেছে, তার আশ্রয় নেয়া গাছটি তখনো দাঁড়িয়ে, আকাশে কোনো চাঁদ নেই, আশপাশে আর কিছুই নেই।
তখনই রাতের আঁধার চিরে সে শুনল ভয়াবহ এক গর্জন; তার পরই তার নাকে এল সেই গন্ধ, যার নাম মুখে নিতে নেই। ভয় বুক খামচে ধরল তার; মনে হলো চেতনা হারাচ্ছে সে, গামছায় বাঁধা না থাকলে পড়েই যেত। তখনই মনে হলো, তিনি এবার স্বপ্নে দেখা দিলেন তার, নাকি বিস্মরণে তিনি এলেন, যিনি বনবিবি: এসেই ‘নরাধম তুই!’ বলে হুঙ্কার দিলেন বনবিবি। পরক্ষণেই বলেন, ‘ভয় পাসনে; আমার ওপর ভরসা রাখ। তুই যেখানে এসেছিস, এ তো আমারই ভূমি, তোর অন্তর যদি শুভ হয়, তুই এখানে কখনই একলা হবি না।
সকাল হলে দেখবি ভাটার টান চলছে; দ্বীপের এদিক ছেড়ে উত্তরে চলে যাবি... জলের দিকে নজর রাখিস, তাহলেই দেখবি: তুই একলা না, আমি আছি তোর পাশেই। আমার দূতেরা আছে... আমার কর্ণ আমার চক্ষু; জোয়ার আসা পর্যন্ত আমি রইলাম তোর সঙ্গে। এর মধ্যেই তুই তোর পরিত্রাণের পথ পেয়ে যাবি; কোনো নৌকা তোকে পৌঁছে দেবে তোর দাওয়ায়।’
ঝড়ে বেঁচে ফিরে এসে জেলে সেই বন প্রান্তেই গড়ে তোলে বনবিবির থান।
আর বনবিবির বার্তাবাহক? তার চক্ষু, তার কর্ণ?
গল্পটা এটুকু বলে থামার পরই তোমার অবধারিত প্রশ্ন।
আমি জলের দিকে তাকিয়ে বলি, হ্যাঁ, সে এসেছিল। এখানে আমার মতো চোখ খোলা রাখলে যে কেউ দেখা পাবে, বনবিবির সেই দূতেরা, যারা তার কর্ণ, তার চক্ষু।
এখানে যদি তুমি, তোমাকে নিবদ্ধ করো, গভীর চোখে তাকিয়ে দেখো; তুমি যা দেখছ তা বিশ্বাস করা কঠিন বটে, কিন্তু এখানে, দৃষ্টি প্রসারিত করো, ঠিক তোমার চোখের সামনেই দেখো কেমন মিশে আছে সাগর আর বাংলার বিস্তৃত দ্বীপরাশির এক সমতল, যেন অতিকায় এক আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে কেউ! পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীতীর হতে বিছানো আঁচল এসে ছুঁয়েছে তোমার পূর্ববাংলার মেঘনার তীর অবধি, আর দেখো আঁচল ঘিরে কেমন ফুলকো মালার মতো জুড়ে আছে কত সহস্র দ্বীপরাশি! কোনোটি কি অতিকায় আর প্রকাণ্ড, কোনোটা সামান্য এক বালিয়াড়ি বৈ কিছু নয়, আর একই সঙ্গে দেখো চলছে তার ভাঙা-গড়ার খেলা; এ খেলায় কারো কারো বিলীন হওয়ার খবর কখনো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হয়, আবার কারোর বিলুপ্তির খবর রয়ে যায় শুধুই জেলে স্মৃতিতে— এক-দুই বছরের মধ্যেই নদীগর্ভে তাদের অপসৃয়মাণ হয়ে যাওয়ার খবর তাই বাইরের দুনিয়া পর্যন্ত আর কখনই পৌঁছায় না।
তার পরও ভেবে দেখো: অস্তিত্বমান এ দ্বীপমালা শেষ পর্যন্ত ওই নদীরই দান, যা সে একদা ফিরিয়ে নিয়েছিল, তা-ই সে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ মহাত্মা হয়ে, তাই নদীর শ্রেষ্ঠত্ব কখনো ফুরানোর নয়, সে ইচ্ছেমতো ভাঙে আর গড়ে, আর তারই মোহনায় জেগে ওঠা দ্বীপমালায় কদাচ কখনো গড়ে ওঠে একেক জনপদ কি গরানের কোনো ঘন গভীর বন। তার পরও অলক্ষে ঠিকই চলে তার আরো নতুন নতুন ভাঙা-গড়ার খেলা। তার বিরাম নেই। নদী আর ভূমির এ বন্ধুত্ব, এ শত্রুতা চিরকালের।
আর দেখো, ওই নদীপাড়ের ওই গরানের বনে, গরানের পাতা কত নাছোড় আর শুষ্ক রুক্ষ চামড়ার মতো, আর তার একগুঁয়ে ডালাপালায় এদিক-সেদিক প্রসারিত হয়ে গড়ে তোলা তার কি নিবিড় বন! কি দুর্ভেদ্য। দিনের বেলায়ও তোমার দৃষ্টি বেশি দূর যাবে না ওই বনে, আর বাতাস দেখো কেমন ঘনিয়ে তুলেছে পচা দমবন্ধ করা গন্ধকে।
আসলে মানুষের উপস্থিতি ওই গরান বনের সহ্য হয় না কোনোদিনই। তাই কত কত অভাগা মধু শিকারি, কাঠুরে আর বাওয়ালি অসাবধানে পথ হারায় প্রতিদিন, তারপর প্রাণ হারায় ওঁৎ পেতে থাকা দুরাত্মা বনচর বাঘের থাবার ঘায়ে, কিংবা অগোচরে গরানের গায়ে মিশে থাকা সাপের সবল ফনায়, কখন সে মৃত্যুদূত হয়ে আচমকা সপাটে নেমে আসে, পথহারা মানুষ তার কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, কিংবা আলগোছে ওই জলে কাদায় মিশে থাকা কুমির কখন হাঁ করে গিলে নেয়, তাও বলা দুষ্কর।
তার অর্থ কি তুমি বোঝো! হঠাৎ অনুপ্রবেশকারীর জন্য এখানে কোনো মনোহর অভ্যর্থনা নেই। তার পরও এ নিষ্ঠুর বনের নাম হয় সুন্দরবন। কারো কারো মতে, গরান বনের আরেক প্রজাতি— সুন্দরী (হেরিতেরিয়া মাইনর) গাছের নামেই হয়েছে নিষ্ঠুর এ নাম। কিন্তু আরেক প্রচল কাহিনী, নামের উৎস হিসেবে উল্লেখ করছে মোগল সম্রাটদের নথিপত্রকে, সেখানে বলা হচ্ছে, গাছ নয়, এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে জোয়ার-ভাটার এক অংশ থেকে— ভাটি। আর এ অঞ্চলের অধিবাসীরা হলো ভাটির দেশের মানুষ— আর এই ভাটি হলো জোয়ার-ভাটার শুধু একটা স্রোত, ভাটা। যার দোস্তি চাঁদের সঙ্গে।
আর তার জাগ্রত পুরাণ দেবী ওই বনবিবি আর তার দূতেরা? প্রতিধ্বনি তুললে তুমি।
আমি বলি: চক্ষু মেলে দাও! দেখো, ওরা তোমার কাছেই আছে, শুধু তোমার দেখার চোখটুকু থাকতে হবে। নজর করে তাকাও, দেখো, তীর থেকে দূরে সুন্দরবনের এই দিকে ভাটার টান চলছে, পানি কেমন স্থির। কোনো চপলতা নেই, কোনো উচ্ছলতা নেই, আর দৃশ্যমান কোনো কিছু দেখারও নেই— স্বর্গীয় বনবিবির দূত কিংবা অন্য কিছু! এ রকম যখন তুমি ভাবছ, আমি জানি তখনই তুমি সোজা হয়ে বসে যাবে আচম্বিতে, কান খাড়া তোমার! একটা কোনো শব্দ কি শুনতে পেলে, যেন কোনো মানুষ নাক ঝাড়ল! সে রকম একটা শব্দ। তার পরই একটা কালো ছোপের মতো কিছু একটা চকিতে জলের ওপর ভেসে উঠেই কি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখলে!
‘কী ওটা?’ নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে ওঠা স্বাভাবিক তোমার। ‘কোত্থেকে এল? কোথায় বা চলে গেল?’
‘ওইদিকে দেখেন?’ বোটের মাঝিও কখন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। ডান দিকের জলের দিকে নিশানা তার হাতের আঙুলের। ‘ওই যে! ওইদিকে!’
তুমি এবার ঘুরে বসে কালো মোষের শরীরের মতো এক প্রাণীকে জলের ওপর অনায়াশ গতিতে গড়িয়ে যেতে দেখলে। ওর ত্রিকোণাকৃতির ছোট ডানাও দেখো তুমি এক ঝলক। তুমি এর আগে কখনো এই জলের প্রাণীকে দেখোনি, এই হলো সেই পুরাণকথার বনবিবির বার্তাবাহক, একালে যার নাম হয়েছে ডলফিন; তবে যাকে তুমি শুশুক বা শিশু নামেও চেনো, কিন্তু তোমার চেনা শুশুক আর এই ডলফিন ঠিক একও না। খেয়াল করো, তোমার শুশুকের পিঠে ওই রকম ছড়ানো ডানা বা ফিন কি থাকে? থাকে না। এরা ইরাবতী, ইরাবতীর ডলফিন। আর এ ইরাবতীরাও আবার দুই প্রজাতির।
১৮৭০ সালের দিকে জনৈক জন অ্যান্ডারসন নামের এক সাহেব প্রাণিবিজ্ঞানী ইরাবতী ডলফিনের খোঁজে তরী ভাসান বার্মা ও দক্ষিণের চীন উপকূলে। বর্মার ইরাবতীতে অনুসন্ধানে নদীর ভাটিতে তিনি কোনো ডলফিনের দেখা পেলেন না ঠিক, কিন্তু উজানে এসেই তিনি বিস্ময়ে হতবাক হলেন, দেখলেন: এখানে বিচরণ করছে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে। এ পর্যায়েই তিনি খেয়াল করলেন, মিঠা পানিতে বসবাস করছে যেসব ডলফিন আর যাদের বাস লোনা জলে, তাদের মধ্যে সামান্য কিছু তফাত আছেই— ওই পর্যবেক্ষণে অ্যান্ডারসন সাহেব উপসংহারে পৌঁছলেন, ইরাবতী ডলফিনের প্রকারভেদ আসলে দুই প্রকারের: একটি ওরাকেল্লা ব্রিভেরওসট্রিস, বৈজ্ঞানিক নাম। অন্যটি, যাকে তিনি বলছেন খালাতো ভাই, সেটি ওরাকেল্লা ফ্লুমিনালিস। কাজেই এ সাহেবের কথা আমলে নিলে ওরাকেল্লা ডলফিনের একশ্রেণীর পছন্দ লোনা পানি, অন্যটির পছন্দ মিঠা পানি। এ দুই আত্মীয়ের মধ্যকার পার্থক্য কিন্তু শারীরিক না— তাদের পার্থক্য শুধু আবাসের পছন্দে। এখন যদি জিজ্ঞেস করো, এ দুই কাজিনের মধ্যে সংখ্যায় কারা বেশি? উত্তর হবে উপকূলবাসীই সংখ্যায় বেশি। সারা বিশ্বের এ ভাইবেরাদরদের আবাস নিয়ে ঘাঁটলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশিয়া আর উত্তর অস্ট্রেলিয়ায়ই এদের যত আনোগোনা। সংখ্যায় এরা কয়েক হাজার। অন্যদিকে মিঠা পানির ওরাকেল্লা, প্রায় দুষ্প্রাপ্য; দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাই যাই করছে। ধরা হয়, এশিয়ার নদ-নদীগুলোয় মেরেকেটে কয়েকশ মিঠা পানির ওরাকেল্লা টিকে আছে।
উপকূলীয় ওরাকেল্লা সাধারণত এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকে না, উপকূলের কাছাকাছিই বেশির ভাগ সময় সাঁতরে বেড়ায়। আর তাদের অন্য ভ্রাতাকুল, মিঠা পানির এরা, মূলত স্থানিক আর ভীষণ রকম যূথচর—মানে দলবেঁধে থাকাই তাদের পছন্দ। তুমুল বৃষ্টির সময়, নদী যখন খুব ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন ওরা সরে আসে আরো ভেতরের দিকে, ছোট উপনদী-শাখানদীতে শিকার তাড়া করে বেড়ায়, এমনকি কোনো কোনো সময় ওরা বন্যাকবলিত ফসলের মাঠেও ঢুকে পড়ে।
তবে শুকনো মৌসুমে, নদীর পানি যখন কমে আসে ওরা ওদের নিজস্ব, নির্দিষ্ট আবাসে ফিরে আসে। ওগুলো হয় সাধারণত নদীরই কোনো খাঁড়ি কিংবা জমাট জলের গভীর কোনো আধার, যা তৈরি হয়েছে নদীর ওই অদ্ভুতুড়ে ভূতাত্ত্বিক খেয়ালে কিংবা নদীর স্ত্রোতধারার বাঁকবদলে। দক্ষিণ চীনে— কম্বোডিয়া থেকে মেকং, নমপেন থেকে লাওস সীমান্ত পর্যন্ত বেশকিছু নদীবর্তী খাঁড়িতেই ওরাকেল্লা চরে বেড়ায়। বছরের পর বছর এরা এই খাঁড়িগুলোয় ফিরে ফিরে আসছে। কিন্তু মৌসুমের বদল ঘটলে এসব ডলফিন উজিয়ে চলে যায় প্রায় কয়েকশ মাইল।
কিন্তু এই যে আমাদের সামনে প্রসারিত সুন্দরবন, তুমি দেখছ, খানিক আগে সশব্দ জানান দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ওরাকেল্লার দল আর ওই দক্ষিণ চীন উপকূলের কাজিনরা কিন্তু একই।
স্বভাবগত দিক দিয়েও কি তারা হুবহু এক? প্রশ্নটা তুমি করেই বসলে।
জবাব হলো: না, এ ব্যাপারে যদিও আমার একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন আছে: খানিক আগে আমাদের দেখা দিয়ে যাওয়া ওই ডলফিনরা কি মিঠা পানির ডলফিন নয়? তাহলে দিন দুপুরে ওদের নদীর যেখানে সেখানে হাজিরা দেওয়ার কি কথা! ওরাকেল্লা ডলফিন তো পুরো মৌসুম এক জায়গাতেই কাটিয়ে দেয়। তাহলে খানিক আগে বনবিবির বার্তাবাহক হয়ে আসা ওই প্রাণীগুলো কোন প্রজাতির ওরাকেল্লা?
এমন কি হতে পারে যে, একই প্রজাতি, কিন্তু স্বভাবের দিক থেকে, পরিবেশগত কারণে সুন্দরবনের ওরাকেল্লারা মেকংয়ের ভাইবোনদের মতো বছরে একবার না, প্রতিদিনই দুবার করে হিজরত করে আর ফিরে যায়! তার মানে কি সুন্দরবনের ডলফিনরা নিজস্ব কোনো কায়দায় তাদের স্বভাবকে মানিয়ে নিয়েছে এখানকার জীব-পরিবেশের সঙ্গে? বার্ষিক অভিবাসন বদলে ফেলে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল রেখে দিনে দুবার করে তারা মিঠা পানির আধারে চলে আসছে?
এ প্রশ্নে সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন চলে আসবে।
উদাহরণ হিসেবে আরো কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়: ওদের শারীরবৃত্তীয় কলকবজা যদি জোয়ার-ভাটার সঙ্গে এক সুরে বেঁধে নিয়ে থাকে, তাহলে সিরকাডিয়ান রিদমের সময়সূত্র কীভাবে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সমন্বয় করছে? বর্ষা মৌসুমে কী হবে, বানের তোড়ে যখন মিঠা পানি বেড়ে গিয়ে লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট করে দেবে, তখন? ওই সময় কি দীর্ঘ মৌসুমের দিনকার অভিবাসন চক্রের হিসাব নতুন করে লিখিত হবে?
এক গবেষণার কথা মনে পড়ছে, যেখানে বলা হয়েছিল, এক সুন্দরবনেই যত রকম প্রজাতির মাছ রয়েছে, তা গোটা ইউরোপ মহাদেশেও নেই। জলজ প্রাণীর এ বিপুল বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এখানকার লক্ষণীয়ভাবে রূপান্তরিত হওয়া পানির গঠনকেই। বদ্বীপের এ অংশে নদী আর সাগরের পানি কখনই সমানভাবে মেশে না; পরস্পরের সুগভীর মিশ্রণে বরং কয়েকশ ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশগত বলয়ের সৃষ্টি হয়, বিভিন্ন দিক থেকে ধেয়ে আসা মিঠা পানির প্রবাহ লবণাক্ততার নানাধর্মী, বেহিসাবি আর এলোমেলো ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলে। এ বহুমুখী পরিবেশ জলের মধ্যে যেন এক ঝুলন্ত বেলুনের মতো, যার স্রোতের নিজস্ব প্রবাহ ও ধরন বর্তমান। প্রতিনিয়ত তারা স্থান পরিবর্তন করছে, কোনো সময়ে তারা বইছে মধ্যভাগে, কিছুক্ষণ পরই তা সরে আসছে তীরের দিকে। একেকটা বেলুন যেন একেকটা খুদে বাস্তুতন্ত্রের জগৎ, যার ভেতরটা ঠাসা স্থানীয় সব প্রাণী আর উদ্ভিদকুলে— এর মধ্যে যেমন আছে প্রকাণ্ডদেহী কুমির, তেমনি আছে অতি সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক মাছও।
ওই যে শোনো, আবার আসছে ওরা। কান পাতো, কোনো প্রাণীর নাক ঝাড়ার মতো একটা চাপা শব্দ দেখো জলের কলরোল ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছ?
নীরব কয়েক মুহূর্ত পার হতে দাও। বোটের খুব কাছে তখনই একেবারে একসঙ্গে ভেসে ওঠে এক দল ডলফিন। পানিতে খলবল শব্দ তুলে নানাদিকে ছুটে যায় ওরা, এক জায়গায় স্থির থাকছে না, নাক ঝাড়ার শব্দটা সমস্বরে যেন কানের কাছে শোনা যাচ্ছে।
তোমাকে বলি নিশ্চিত করেই, এ রকম শব্দ একমাত্র ইরাবতী ডলফিনরাই করে। ওরাকেল্লা ব্রেভিরসট্রিস। এমনিতে ডলফিন খুব চঞ্চল, মুহূর্ত এক জায়গায় থাকার প্রাণী সে না, কিন্তু দেখো বোটের এত কাছে ওরা, যেন ওদের নিঃশ্বাসের আওয়াজ অনুভব করা যাচ্ছে।
২.
ছেলেবেলায় আমি শুশুক দেখেছি। এই ঢাকাতেই। পঁচাশি-ছিয়াশির দিকে মিরপুর সেতু পার হয়ে গেলে, নবীনগর ছাড়িয়ে গেলেই নয়ারহাট, সেখানেও পেল্লায় এক সেতু আছে, আমার বেশ মনে পড়ে, ওই সেতুর নিচ থেকেই লঞ্চে করে গ্রামের বাড়ি যেতাম আমরা। ওই লঞ্চ তখন নয়ারহাট থেকে তরা ঘাট পর্যন্ত চালু ছিল। তখন লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে হামেশাই শুশুক বা স্থানীয় ভাষায় শিশু বলে যাকে, দুই পাশেই দেখতাম একের পর এক হুশহাশ করে ভেসে উঠছে। কালো, ছোট শূকরছানার মতো একটা শরীর জলের ওপর ভুঁশ করে উঠেই পরমুহূর্তে মিলিয়ে যেত। কখনো একটা কখনো একসঙ্গে দুটা-তিনটা।
তাহলে ওরা তো ইরাবতী না!
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ, ওরা গাঙ্গেয় ডলফিন, গ্যানজেস ডলফিনও বলে। বৈজ্ঞানিক নামও আছে, প্লাটিনিস্তা গাঙ্গেটিকা। মজার ব্যাপার কি জানো, এদের শিশু বা শুশুও বলে। কেন জানো? ওই নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়ার শব্দের জন্য। পানির ওপর ভেসে উঠেই ওরা শব্দ করে নিঃশ্বাস নেয়। দূর থেকে গায়ে চকচকে পানির আবরণের কারণে কালো দেখালেও এদের গায়ের রঙ আসলে কালোর দিকের বাদামি।
গাঙ্গেয় ডলফিন কিন্তু কচ্ছপের মতোই ভীষণ প্রাচীন, তবে এর আনুষ্ঠানিক আবিষ্কারের বিষয়টি খুব বেশি দিন আগে ঘটেনি। ১৮০১ সালে এদের প্রথম গ্যানজেস ডলফিন বলে শনাক্ত করা হয়। একসময় গাঙ্গেয় ডলফিনের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা আর কর্ণফুলী-সাঙ্গু ছিল মূল বিচরণ স্থল। ভারত, নেপালেও আছে। পাকিস্তানের সিন্ধু নদেও আছে। সিন্ধুর ডলফিনও এই গ্যানজেস ডলফিনেরই আরেক প্রজাতি। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার কি জানো? সব জায়গাতেই এ ডলফিন এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সব শুনে তোমার মন খারাপ হবে জানি, কিন্তু এটাই সত্যি!
সুন্দরবনের ইরাবতীর সঙ্গে শুশুকের বড় পার্থক্য কি জানো? মিঠা পানি ছাড়া এদের বেঁচে থাকা সম্ভব না, আর এরা চক্ষুষ্মান না। অন্ধ। আলট্রাসনিক শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে শিকারের কাজ সারে। শুশুকের চলাফেরা হয় একাকী, কখনো দলবেঁধেও। সাধারণত মা আর ছোট শিশু ডলফিন সবসময় একসঙ্গে থাকে। জন্মের সময় শিশু শুশুকের গায়ের রঙ থাকে ঠিক চকোলেটের গাঢ় বাদামি রঙের মতো, যত বড় হয় তত তার গায়ের রঙ হয় বাদামি আর মসৃণ। প্রাপ্তবয়স্ক শুশুকের মতোই ছোট শুশুকের গাও কিন্তু লোমহীন। মা-শুশুক পুরুষ শুশুকের চেয়ে আকারে বড় হয়, স্ত্রী শুশুক প্রতি দুই কি তিন বছরে একটি মাত্র বাচ্চা প্রসব করে।
সুন্দরবনের ইরাবতীদের মতো শুশুকেরা অত ভাগ্যবান না। শুশুকের বড় শত্রু মানুষ আর মানুষের তৈরি নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রতি বছর জালে আটকে পড়ে অসংখ্য শুশুক মারা পড়ে। আবার কবিরাজি তেল বানাতে আর মাংসের লোভেও শুশুক নিধন চলে। কোথাও কোথাও শুশুকের তেল ব্যবহার করা হয় মাছ শিকারে, শুশুকের তেলের গন্ধে লোভাতুর হয়ে ছুটে আসে মাছ।
হ্যাঁ, শৈশবের তোমার সেই বংশী নদী এখন এক শীর্ণ ধারার নদী কেবল। ভরা বর্ষায়ও আর লঞ্চ ভাসে না ওই নদীতে। নদীবর্তী শিশুরা আর নদীর বুকে ভুঁশ করে ভেসে ওঠা শিশু বা শুশুকের অস্তিত্বও জানে না। ওই নদীতে একসময় অসংখ্য শুশুক নৌকার পাশে হামেশাই ভেসে উঠত, এ কথা এখন গল্পগাছা হয়ে গেছে।
শিল্পবর্জ্য, কৃষি আর মানুষের তৈরি দূষণে হারাচ্ছে এ শুশুকেরা। একটা পরিসংখ্যানের কথা মনে পড়ছে: তাতে বলা হয়েছিল, বছরে নয় হাজার টন কীট-পতঙ্গনাশক আর ছয় মিলিয়ন টন সার নদী নিকটবর্তী জমিতে ব্যবহার হয়।
এর মানে বুঝতে পারছ তো?
বর্ষা মৌসুমে ওই তলিয়ে যাওয়া জমির সব ওষুধ, সার জলের সঙ্গে এসে মেশে নদীতে। কাজেই শুশুককে তো বিদায় নিতেই হবে।
৩.
দিন ফুরাল। কথাও শেষ। তোমার মুখে গোধূলির বিষাদ।
দেখো, আমাদের চারপাশে কেমন সন্ধ্যা নামছে আচমকা। তুমি খেয়াল করো কি করো না, তোমার চোখে সেই কোন শৈশবে দেখা শিশুর দুরবস্থা, তার নিশ্চিহ্ন হওয়ার সংগ্রাম, তোমাকে রিক্ত, পীড়িত করে দিচ্ছে।
তোমাকে আমি বলতে পারি না, এই ইরাবতী শুশুকের নিশ্চিন্ত জীবনও শেষ হতে চলেছে, ওরাও ক্রমশ একদিন সংখ্যালঘু হবে, তারপর হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে। আমরা তখন রয়ে যাব।
তোমাকে রামপাল শব্দটা বলতে গিয়েও আমি থমকাই, আর মন খারাপ করে দেব না; সুন্দরবনের যে অভূতপূর্ব ইকোসিস্টেমের কথা তোমাকে বললাম, তা বিনষ্টের আয়োজনও চলছে। ইউরোপের চেয়ে শতগুণ বৈচিত্র্যময় এ মত্স্য জগৎ দিয়ে আমরা কী করব? আমাদের উন্নতির দরকার নেই! ওই কাঠুরে, ওই বাওয়ালি— সারা জীবন ওরা বন-বাদাড়েই ঘুরে বেড়াবে, না থাকল ডলফিন, না থাকল হাজার রকমের মাছ, প্রাণী, উদ্ভিদকুল— আমার ঘরে যে আলোর রোশনাই চাই।
বলা হলো না এসব কিছুই।
তার চেয়ে এই মনোহর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরবনের জোয়ারের অমোঘ টান দেখো: নদীর পানি দেখো কেমন ফুলে উঠছে...
রিলকের পর জীবনানন্দ দাশের শরণ নেই—
কঠিন অমেয় দিন রাত এই সব।
চারিদিকে থেকে থেকে মানব ও অমানবিকতা
সময়সীমার ঢেউয়ে অধোমুখ হয়ে
চেয়ে দেখে শুধু মরণের
কেমন অপরিমেয় ছটা।






