কুলদীপ নায়ার | অনুবাদ: এম এ মোমেন
জরুরি অবস্থা ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টা আগে আমি বাহাদুর শাহ মার্গে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ভবনের আমার কেবিনে। দ্য নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকার লন্ডন সংবাদদাতা আমার কাছে এসে বললেন, ধরুন সংবিধান স্থগিত রাখা হলো, বিনা বিচারে লোকজনকে কারাগারে ঢোকানো হলো, মৌলিক অধিকার বাতিল হলো— তখন কী হবে?
আমি হাসলাম। তাকে নাকচ করে দিয়ে বললাম, এমন কিছু ভারতে ঘটতে পারে না।
২৫ জুন (১৯৭৫) রাত সাড়ে ১২টায় আমার অফিসের একজন লেডারের ফোন পেলাম। শুনলাম পুলিশ তাদের সদ্যমুদ্রিত খবরের কাগজ নিয়ে বেরোতে দিচ্ছে না। কেন বেরোতে দিচ্ছে না, তার কোনো কারণ তারা বলছে না; শুধু বলছে যে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
তারা পুলিশকে জিজ্ঞেস করেছে, এটা কী?
পুলিশ বলছে, উপরওয়ালা যা বলেছে, আমরা তা-ই করছি। এর বেশি কিছু আমাদের জানা নেই।
আমি কে সি পাস্থর (পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আমার বিশেষ পরিচিত) সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। ২৬ তারিখের পত্রিকা বিতরণ হলো না।
পরদিন অফিসে আসার পর এইচ জে ডি পেনহার ফোন পাই, তিনি ডেপুটি পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার, তখন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাকে প্রধান সেন্সর অফিসার করা হয়েছে। এমনিতে তিনি শরিফ মানুষ কিন্তু তাকে দেয়া দায়িত্ব তো তিনি পালন করবেন।
তিনি বললেন, কী ছাপতে যাচ্ছেন, আপনার পত্রিকা নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তো থাকলই।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিবাদে প্রতিদিনই পত্রিকার প্রথম পাতায় দুটি কলাম শূন্য থাকবে। সংবাদের ব্যাপারে সতর্ক হলাম। আমি একটি সাপ্তাহিক কলাম লিখতাম।
নিজ দেশ নিয়ে লেখার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় একই সঙ্গে ইঙ্গিতধর্মী ও প্রতীকী রচনা লিখতে শুরু করলাম— আইয়ুব খান ও ভুট্টোর শাসনের তুলনা। সেন্সর অফিসার বললেন, আমার নামে কিছুই ছাপতে পারব না।
সেন্সরশিপ থাকার পরও আমরা সরকারবিরোধী ভূমিকা অব্যাহত রাখলাম। জনগণ আমাদের সাধারণ সংবাদের ভেতরও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুসন্ধান করতে থাকে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তখন অন্য সংবাদপত্রের চেয়ে পাঁচ পয়সা কম দরে বিক্রি হতো। আমরা দাম বাড়িয়ে দিলাম। আমাদের প্রচার সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে গেল, আমাদের নিউজপ্রিন্টে ঘাটতি পড়ে গেল।
যখন জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলো, আমাদের প্রকাশক রামনাথজি (রামনাথ গোয়েঙ্কা) বললেন, যেভাবেই হোক সার্কুলেশন যা বেড়েছে তা যেন না নামে।
আমি বললাম, এতদিন যা বিক্রি হয়েছে তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নয়, তা ছিল সেন্টিমেন্ট।
সম্পাদক এস মালগোয়েঙ্কারকে সরিয়ে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস থেকে নরসিংহামকে আনা হয়। তিনি দেখতে যত নিরীহই হোন না কেন, সংবাদের ‘কামড়’ দিতে জানতেন, কখনো কখনো আমাদের লেখাকে আরো ধারালো করে দিতেন। আমাদের আর কিছু করা হয়নি, একজন সম্পাদকের পরিবর্তন তো হয়েছেই।
জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ব্রেকিং নিউজটি আমিই দিই। এর পেছনের একটি গল্প আছে, ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে এক পার্টিতে আমি ছিলাম। সেখানে আমার বয়সী একজন পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে দেখা।
আমি জিজ্ঞেস করি, কী হচ্ছে ভাই? তিনি বললেন, কিছু তো হবেই। আমাকে বলা হয়েছে, খোঁজ করে দেখো কোন আসনে কোন প্রার্থী জিতবেন।
এটাই আমার জন্য বড় তথ্য, এখন দরকার এর নিশ্চায়ন। আমি কমল নাথের (পবরর্তী সময়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী) মালশা মার্গের বাড়িতে গেলাম। তার অপেক্ষায় তার স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করছিলাম। কমল নাথ ফিরে এলে জিজ্ঞেস করি, তুমি তো আগের জায়গা থেকেই নমিনেশন পাচ্ছ আর সঞ্জয় আমেথি থেকে?
কমল নাথ বলল, তুমি কেমন করে জানলে?
আমার জন্য এটাই যথেষ্ট। আমি রাত সাড়ে ১০টায় আমার স্টোরি জমা দিলাম, আগে দিলে যাতে ফাঁস হয়ে না যায়, অন্য কেউ এটা ব্যবহার না করে।
১৬ জানুয়ারি, ১৯৭৭। আমার করা ব্যানার হেডলাইন ‘মার্চে লোকসভার নির্বাচন’।
রামনাথজি ফোন করে আমাকে জিঞ্জেস করলেন, আপনি কি নিশ্চিত?
সেন্সরপ্রধান ডিপেনহা পরদিন ফোন করে আমাকে জানালেন, বিদ্যাচরণ শুক্লা (তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী) তাকে ফোন করেছেন।
আমি জিজ্ঞেস করি ‘কী বলেছেন?’
‘তাকে আবার জেলে ঢোকাও।
জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ায় ৯ জুলাই, ১৯৭৫ থেকে আমি মিসায় (এমআইএসএ— মেইনটেন্যান্স অব ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট) জেল খেটেছি।
আমি বলি, এক দফা জেল খেটে শরম হয়েছে।
আমাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি বললেন, সংবাদটা সঠিক নয়। কিন্তু ঘুরে এসে সন্ধ্যায় জানালেন, এটাই সত্যি।
দুদিন পর ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে ভাষণে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করলেন এবং নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন।
বদলে যাওয়া ইন্দিরা
জরুরি অবস্থায় গ্রেফতার হওয়ার আগে আমি ভালো বন্ধুই ছিলাম। আমি লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ইনফরমেশন অফিসার ছিলাম, তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৬২-তে নেহরুর গড় সিটিজেনস কমিটির তিনি ছিলেন একজন। এ ছোট কমিটিতে ইন্দিরার সঙ্গে দেখা হতো। তিনি তার লম্বা চুল কেটে বব করে গর্ব করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাকে কেমন দেখাচ্ছে? তিনি নোংরা জোক পছন্দ করতেন, যত নোংরা তত মজার। তিনি প্রায়ই আমাকে এসব জোক বলতে অনুরোধ করতেন।
জরুরি অবস্থায় তিনি ক্রমাগত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে চলেছিলেন। আমি তার বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করলাম। তার উপদেষ্টা শারদ পাওয়ার আমাকে বললেন, তোমার কী হলো? ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার সম্বোধন করে তার বাবার উক্তি উদ্ধৃত করে চিঠি লিখলাম— অনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র ও নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, এ দুয়ের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে হলে আপনার বাবা অনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রের দিকেই যেতেন।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।
কিন্তু তিনি কেন জরুরি অবস্থা ঘোষণার পথে এগোলেন?
আমার মনে হয়, ১২ জুন ১৯৭৫-এর এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় (যাতে সরকারি জনবল ও সম্পদ অপব্যবহারের অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন) ছুঁচোর ডিবিকে পর্বত করে তুলেছে এবং তারা (বিচার বিভাগ) মাছি মারতে হাতুড়ি চালিয়েছে বলে তিনি মনে করেছেন।
তিনি তখন জগজীবন রামকে প্রধানমন্ত্রী করে নিজে সরে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছেন কিন্তু সঞ্জয় তাকে নিরস্ত করতে সমর্থ হন। আমি জানতাম ডাইনিং টেবিলে ইন্দিরা গান্ধী রাজনৈতিক বিষয়ে সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলতেন, রাজীবের সঙ্গে নয়; ও তো পাইলট।
তাহলে তিনি কেন জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করতে গেলেন?
প্রথমত. এডলফ হিটলারের সঙ্গে তাকে তুলনা করতে দেখে তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন। কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রশংসাও তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল, তিনি পাশ্চাত্যের দেশগুলোর প্রশংসাও চাইছিলেন।
দ্বিতীয়ত. তার গোয়েন্দা সংস্থা তাকে আশ্বস্ত করেছে যে, নির্বাচনে তিনিই জিতবেন এবং দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে জনগণের নাড়ি টিপে তিনি নিজেও তা-ই মনে করেছেন।
পরাজয়ের পর
যখন খবর এল রায় বেরিলি আসনে ইন্দিরা গান্ধী পিছিয়ে আছেন, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিনিধিকে ফোন করি। তিনি জানান, তিনবার ভোট গণনা করা হয়েছে, একই ফল। ফল ঘোষণা না করার জন্য ওপর থেকে আদেশ এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রায় বেরিলির রিটার্নিং অফিসারকে ঘোষণা করতে হলো যে, ইন্দিরা গান্ধী হেরে গেছেন।
পরদিন আমি রায় বেরিলিতে সেই বুকের পাটাওয়ালা রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমি প্লেনে লক্ষৌ এবং সেখান থেকে গাড়িতে সোজা ডেপুটি কমিশনারের অফিসে গিয়ে হাজির হলাম, তিনিই রিটার্নিং অফিসার।
ডেপুটি কমিশনার বললেন, ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠজন এম এল ফতেদার ভোট পুনঃগণনার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি যে হেরে গেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে সবাই তা জেনে গেছে।
ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রী বললেন, বরং বাসন মেজে খাব, তবু আমার স্বামীকে অসৎ হতে দেব না।
১৯৮০-র নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী যখন বিজয়ী হলেন, আমি সেই ডেপুটি কমিশনারের খোঁজ করলাম। তিনি একটি তুচ্ছ পদবি নিয়ে এলাহাবাদের একটি লাইব্রেরির কর্মকর্তা। তিনি সবিনয় অনুরোধ জানালেন, আজকের পর যেন তাকে আর ফোন না করি।
২১ মাস মেয়াদি জরুরি অবস্থার শুরু ১২ জুন, ১৯৭৫ এবং এর সমাপ্তি ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৭৭।
১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার কারণ দেশের বিপন্নতা নয়, ইন্দিরার বিপন্নতা। ব্যক্তিস্বার্থে গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছিল। কুলদীপ নায়ারের ‘দ্য জাজমেন্ট’ থেকে সংক্ষেপে আরেকটি এপিসোড:
১৮ জানুয়ারি ১৯৭৭। অভ্যেসমতো মোরারজি দেশাই খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বেরোলেন। কয়েক মাস ধরে এটাই রুটিন। আজকের দিনটা অন্য যেকোনো দিনের মতো। একঘেয়ে রুটিন হলেও আগের বন্দি অবস্থা থেকে তো ভালো। আগের জেলে ছোট, অন্ধকার কক্ষে থাকতে হতো, জানালাটা বন্ধ। তিনি প্রতিবাদ করার পর তাকে ভোরে হাঁটার অনুমতি দেয়া হয় কিন্তু হাঁটাও বিপজ্জনক, কারণ জেলখানার ওয়াকওয়েতে সাপ ও বৃশ্চিকের আনাগোনা। কাজেই তিনি নিজের খাটের চারদিকে ঘুরে ঘুরে হাঁটতেন এবং ব্যায়াম করতেন। তিনি কোনো খবরের কাগজ পেতেন না।
এখানে খবরের কাগজ পাচ্ছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে দেখলেন ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা ভেঙে দিচ্ছেন, তারপর নির্বাচন। তিনি খবরটা বিশ্বাস করলেন না।
কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা তার কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, তাকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তারা গাড়ি এনেছেন, মোরারজিকে চার ডুপ্লে রোডের বাসভবনে নামিয়ে দেবেন। ততদিনে বিরোধী দলের অন্তরীণ অনেক নেতাকেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ইমার্জেন্সির দোহাই দিয়ে আটকে রাখা এক লাখ বন্দির সংখ্যা কমে ১০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
পরে মোরারজি দেশাই আমাকে বলেছেন, ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন দেবেন, এটা আমি বিশ্বাস করতাম কিন্তু তিনি যে এভাবে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার ও নির্বাচণের ঘোষণা দেবেন, তার মন্ত্রীদের এক দুজন ছাড়া অন্য করোরই জানা ছিল না। যখন সবাই জানলেন (মন্ত্রীরাও তখনই জানলেন, বংশী লাল, বিদ্যাচরণ শুক্লা হয়তো ব্যতিক্রম) ইন্দিরা বললেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পার্টিকে নির্বাচনের পরীক্ষার মধ্যে দিয়েই এগোতে হয়।
তিনি স্বীকার করলেন, তিনি একটি বড় ঝুঁকি নিয়ে নিয়েছেন।
নির্বাচনের ঘোষণাকে বিরোধীরা স্বাগত জানায়। কংগ্রেস, জনসংঘ, বিএলডি ও সমাজতান্ত্রিক নেতাদের কেউ কেউ মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে আগেই বসেছিলেন। তাদের সমস্যা সম্মিলিত বিরোধী দল একীভূত, কে হবেন তাদের নেতা? চরণ সিং নেতৃত্ব চাইছেন। মোরারজি তখনো কারামুক্ত হননি। তিনি চিঠি লিখে একীভূত হওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেন, নেতৃত্বের আগ্রহ তার নেই, এটাও বললেন।
কিন্তু তার মুক্তির পর তিনি যেভাবে একীভূতকরণের কাজটি করলেন, স্বাভাবিকভাবেই অন্যসব দল তাকেই নেতৃত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ জানায়। শেষ পর্যন্ত তিনি হলেন নতুন দল জনতা পার্টির প্রেসিডেন্ট এবং চরণ সিং তার ডেপুটি। ওদিকে ইন্দিরা ও সঞ্জয়ের নির্বাচন প্রচারণাকে বলা হলো, তারা স্বৈরতন্ত্রের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট চাইছেন।
লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর পর তার প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা অবশ্যই আকস্মিক এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল ঘোষিত ও অঘোষিত প্রত্যাশী প্রার্থীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি করবে, রামস্বামী কামরাজের নেতৃত্বে কংগ্রেস সিন্ডিকেট তাদের অনুগত থাকবে বিবেচনা করে ইন্দিরাকে প্রধানমন্ত্রী বানায়। তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ সিন্ডিকেটের প্রায় সবাইকে ইন্দিরা কোনো না কোনো পর্যায়ে তার রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করেছেন অথবা তিনি তাদের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ এবং ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ক্যাবিনেটে তিনিই একমাত্র পুরুষ
ইন্দিরা গান্ধীর কঠোর সমালোচককে বলতে শোনা গেছে, ইন্দিরার ক্যাবিনেটে তিনিই একমাত্র পুরুষ। একই কথা বলা হতো ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে নিয়ে।
ভারতীয় নারীর জীবনে স্বামী যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, ইন্দিরার বেলায় ফিরোজ গান্ধীর সেই গুরুত্ব ছিল না। ফিরোজের প্রেমমুগ্ধ হয়ে পারসিক ধর্মাবলম্বী ফিরোজ জাহাঙ্গীরকে বিয়ে করেছেন পরিবার ও সামাজিক অনুশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। বিষয়টি সামলে নিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। ফিরোজের নামের জাহাঙ্গীর ছেঁটে তাতে গান্ধী বসিয়েছেন এবং বিয়েতে একটি আনুষ্ঠানিক অবয়ব দিয়েছেন। ইন্দিরা নিজে গান্ধীমুগ্ধ ছিলেন মনে করার কোনো কারণ নেই। একাধিক পত্রে তিনি গান্ধীয়ান হিপোক্রেসি— ভণ্ডামির কথা উল্লেখ করেছেন।
পিতা জওহরলাল নেহরুর একমাত্র সন্তান, ওদিকে নেহরু বিপত্নীক। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ‘অফিশিয়াল হোস্টেস’-এর দায়িত্ব ইন্দিরাকেই নিতে হয়েছে। নেহরু ঘুম থেকে উঠে ইন্দিরাকে দেখেছেন, রাতের বেলাও বাবা ঘুমাতে গেছেন নিশ্চিত হওয়ার পর ইন্দিরা বিছানায় গেছেন। বাবার সঙ্গে প্রায় সব বিদেশ সফরেই তিনি সঙ্গী হয়েছেন। রাজীব ও সঞ্জয় দুই সন্তানের জননী হয়েছেন সত্য কিন্তু তাদের বাবার জন্য ইন্দিরার সময় ছিল না। এই অভাব এবং একই সঙ্গে সুযোগ দুটোই কাজে লাগিয়েছেন সুদর্শন ও বাকপটু ফিরোজ। তার নারীলিপ্সা এবং এমনকি নেহরু পরিবারের ভেতরেও বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের মেয়ের সঙ্গে তার বাড়াবাড়ি রকমের সম্পর্ক ইন্দিরার জন্য যাতনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নেহরু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইন্দিরা দুই ছেলেকে নিয়ে বাবার কাছে তিন মূর্তি ভবনে চলে আসেন। এরপর ফিরোজের সঙ্গে কদাচিৎ তার সাক্ষাৎ হয়েছে, তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।
ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেবেন, প্রধানমন্ত্রী হবেন— এসব নেহরু কখনো ভাবেননি, সে রকম পরিকল্পনাও তার ছিল না। নেহরুর কালের বিশিষ্ট কলাম লেখক ও সম্পাদক ফ্রাংক মোরেস ১৯৬০ সালেই লিখেছেন, নেহরু রাজবংশ প্রতিষ্ঠার কোনো ইচ্ছে তার নেই, আর এটা তার চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।
ইন্দিরা বাবার জীবদ্দশাতেই একবার কংগ্রেস সভাপতি হয়েছিলেন। নেহরুর কন্যা— এ পরিচিতি কাজ করলেও নেহরু তা সক্রিয়ভাবে চাননি কিংবা মেয়ের জন্য কংগ্রেস নেতৃত্বকে প্রভাবিত করেছেন, তাও সঠিক নয়।






