দুনিয়ায় আমেরিকার প্রভাব বিস্তার আর আমেরিকান ড্রিমের পেছনে একটি পরিবারের জোরালো ভূমিকা রয়েছে। হ্যাঁ, একটি পরিবার, যার নাম রকফেলার। দুনিয়াতে যারা ‘ধনীদের মধ্যে ধনী’। এক শতকের বেশি সময় ধরে তারা নিউইয়র্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবার। এটা বলা মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, তারাই নিউইয়র্ক শহরকে নির্মাণ করেছেন। পুরো শহরেই তাদের ছাপ স্থায়ী হয়ে আছে— রকফেলার সেন্টার, রকফেলার ঝরনা, রকফেলার ইউনিভার্সিটি ফর মেডিকেল সায়েন্সেস। একটা সময় ছিল যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অনুষ্ঠানে রকফেলার পরিবারের একজন সদস্যের উপস্থিতি মানে সে অনুষ্ঠানের মর্যাদা বেড়ে যাওয়া। তবে পরিবারটির এ প্রভাবের ভিত্তিটা কিন্তু সরল পথে নির্মাণ হয়নি।

১৮৭২ থেকে ১৯১৪— এ সময়কালে জন ডি রকফেলার ছিলেন আমেরিকার সমাজে অন্যতম ঘৃণিত মানুষ। তার হাতেই রকফেলার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। লোভ, নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার নাম। ইতিহাসে আর কোনো আমেরিকানের নামের সঙ্গে এত ঘৃণা জড়িয়ে ছিল না। থিওডর রুজভেল্ট রকফেলারকে আইন ভঙ্গকারী হিসেবে সমালোচনা করেছেন। আধডজন রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা তাকে কারাগারের শিকের পেছনে দেখতে চেয়েছেন। রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ লাফলেট তাকে যুগের সবচেয়ে বড় অপরাধী হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। টলস্টয় বলেছেন, কোনো সত্ মানুষের উচিত নয় রকফেলারের সঙ্গে কাজ করা। ধর্মীয় নেতাদের অনেকে বলেছেন, গির্জা ও কলেজে তিনি যে অর্থ দান করেছেন, তা পাপযুক্ত। বহুদিন তার দয়ায় বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা বাদে আর কেউ রকফেলারকে নিয়ে একটি ভালো কথা উচ্চারণ করেননি। তারপর একসময় সমালোচনাকারীদের সমালোচনার ঝাঁজ কমতে লাগল। পরে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, একসময়কার ঘৃণিত রকফেলার অনেকটা সন্ত হয়ে উঠলেন। একটি পত্রিকার জরিপে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ আমেরিকানদের একজন। জন সিঙ্গার সার্জেন্ট তার প্রতিকৃতি এঁকেছেন এবং বলেছেন, আঁকার সময় তার মনে হয়েছে, তিনি মধ্যযুগের একজন সন্তের সামনে বসে আছেন। সিঙ্গার তাকে আসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার জন্মদিন সংবাদপত্রের জন্য বিশেষ উপলক্ষ। আজকের দিনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো পরিবারই দেশটির ওপর রকফেলারদের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আমেরিকার যেকোনো প্রান্তে রকফেলারদের চিহ্ন পাওয়া যাবে। পুরো নাম জন ডেভিসন রকফেলার, জন্মেছিলেন ১৮৩৯ সালের ৮ জুলাই, নিউইয়র্কের রিচফোর্ডে। তাকে আমেরিকার সর্বকালের সবচেয়ে ধনী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুনিয়ার প্রথম বিলিয়নেয়ার। এককথায় তিনি আধুনিক দুনিয়ার মোগল বাদশাহ। রকফেলার পরিবারের নামে রূপকথার মতো গল্প দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে। দুনিয়ায় এ পরিবারের যে প্রভাব, তার শুরুটা করেছিলেন এই জন ডেভিসন রকফেলার। তার দর্শন ছিল— টাকা উপার্জনের ক্ষমতা মানুষ পায় ঈশ্বরের কাছ থেকে। এ দর্শন ও কাজের প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠার প্রেরণা তিনি রেখে যান তার একমাত্র পুত্র জন ডি রকফেলার জুনিয়রের কাছে।

জন ডেভিসন রকফেলারের পিতা ছিলেন একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। বাল্যকাল থেকেই তিনি পরিশ্রমী। দুনিয়ার ভবিষ্যত্ তেল ব্যবসার ম্যাগনেট গোড়ায় টার্কি পালন, ক্যান্ডি বিক্রি ও প্রতিবেশীদের ছোটখাটো কাজ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। ১৮৫৩ সালে রকফেলার পরিবার ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ডে চলে আসে। এখানে জন হাই স্কুল সমাপ্ত করেন এবং একটি বাণিজ্যিক কলেজে বুককিপিং বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।

১৮৫৫ সালে ১৬ বছর বয়সে ক্লিভল্যান্ডের একটি ফার্মে কেরানি হিসেবে যোগ দেন। এ ফার্ম খাদ্যশস্য, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্য কেনাবেচা ও জাহাজে পরিবহনের ব্যবসা করত। ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখটি পরবর্তী জীবনে তিনি ‘কর্মদিবস’ হিসেবে পালন করেন। কারণ এ তারিখেই তিনি কর্মজীবী হিসেবে যাত্রা করেন। তিনি দিবসটিকে তার জন্মদিনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। ‘আমার পুরো ভবিষ্যত্ যাত্রা শুরু হয়েছিল সেদিন। এবং মাঝে মধ্যে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, কী হতো যদি আমি সেদিন চাকরিটা না পেতাম?’

১৮৫৯ সালে রকফেলার ও তার পার্টনার নিজেদের কমিশন ফার্মের পত্তন করেন। একই বছর পেনসিলভানিয়ার টিটাসভিলে আমেরিকার প্রথম তেল কূপ খনন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য, এ তরল স্বর্ণের ব্যবসা দুনিয়ার বুকে নতুন ঝড় তুলল। ১৮৬৩ সালে রকফেলার এবং তার আরো কয়েকজন পার্টনার তেলের ব্যবসায় প্রবেশ করেন। শুরুতে তারা ক্লিভল্যান্ড রিফাইনারিতে বিনিয়োগ করেন।

১৮৬৪ সালে রকফেলার লরা সেলেস্টিয়া স্পেলম্যানকে (১৮৩৯-১৯১৫) বিয়ে করেন। লরার পিতা ছিলেন ওহাইয়োর স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ; তিনি দাস প্রথাবিরোধী আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড নামের সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। রকফেলার-লরা দম্পতির ঘর আলো করে চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তান।

১৮৬৫ সালে টাকা ধার করে রকফেলার তার কয়েক পার্টনারের অংশ কিনে নিয়ে তেল রিফাইনারির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এটি ছিল ক্লিভল্যান্ডের সবচেয়ে বড় রিফাইনারি। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনি নতুন পার্টনারদের সঙ্গে নেন। ১৮৭০ সালে রকফেলার তার ছোট ভাই উইলিয়ামসহ আরো অনেককে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ওহাইয়ো। প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সর্বোচ্চ শেয়ারের মালিক ছিলেন জন রকফেলার। শিগগিরই স্ট্যান্ডার্ড অয়েল তেলের বাজারে মনোপলি প্রতিষ্ঠা করে। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী রিফাইনারি ও কোম্পানিগুলো কিনে নেয়। দুনিয়াজুড়ে তাদের ব্যবসা বিস্তৃত হয়। ১৮৮২ সালে এসব কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল স্ট্রাস্টে একীভূত হয়। এ ট্রাস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ শতাংশ রিফাইনারি ও পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অয়েল সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নেয়, যার মধ্যে আছে নিজেদের তেলের ব্যারেল তৈরি করা, নতুন নতুন পেট্রোলিয়াম বাই প্রডাক্ট তৈরির জন্য বিজ্ঞানীদের নিয়োগ করা।

রকফেলারের এ সাফল্য এবং সম্পদ সাংবাদিক, সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদদের কৌতূহলী করে তোলে এবং তারা তাকে করপোরেট লোভের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। তারা নিজের ব্যবসা-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় রকফেলারের নেয়া পদ্ধতির সমালোচনা করেন। ১৯৩৭ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লেখে, ‘তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীদের গুঁড়িয়ে দেয়া, রেলরোড থেকে ছাড় নিয়ে ধনী হওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির ওপর নজরদারি করতে ঘুষ দেয়া, গোপন চুক্তি করা, হুমকি দিয়ে অন্য কোম্পানিকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলে যুক্ত করা, অন্যদের ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের ভাগ্য তৈরি করাসহ আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে।’

১৮৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস শেরম্যান অ্যান্টি-ট্রাস্ট অ্যাক্ট পাস করে। ব্যবসা সংকুচিত করে এমন যেকোনো ট্রাস্ট বা একীভূতকরণকে এ আইন নিষিদ্ধ করে। দুই বছর পরে ওহাইয়ো সুপ্রিম কোর্ট স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্টকে বিলুপ্ত করে। কিছুদিনের মধ্যে এ ট্রাস্টের ব্যবসা স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউজার্সির অংশ হয়ে যায়, এটা হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে যাত্রা করে। বেশ কয়েক বছর মামলা চলার পর ১৯১১ সালে ইউএস সুপ্রিম কোর্ট স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউজার্সিকে অ্যান্টি-ট্রাস্ট আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সাব্যস্ত করে। এবং কোম্পানিটি ভেঙে দেয়। কোম্পানিটি ভেঙে এবার ৩০টি পৃথক কোম্পানিতে পরিণত হয়।

১৮৯০-এর দশকের মধ্যভাগে তিনি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের ব্যবসার দৈনন্দিন কাজ থেকে অবসর নেন। এ সময় তিনি সমসাময়িক আরেক ব্যবসায়ী টাইকুন অ্যান্ড্রু কারনেগি দ্বারা প্রভাবিত হন। কারনেগি স্টিল ব্যবসায় নিজের ভাগ্য গড়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সমাজসেবক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নিজের রোজগারকৃত অর্থের এক বিরাট অংশ দান করে দেন। রকফেলার বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে ৫০ কোটি ডলারের বেশি দান করেন। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ও রকফেলার ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল রিসার্চ (বর্তমানে রকফেলার ইউনিভার্সিটি) তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে রকফেলার ছিলেন গভীরভাবে ধার্মিক, মিতাচারী ও গলফ খেলোয়াড়। তার জীবনের লক্ষ্য ছিল ১০০ বছর বেঁচে থাকা। তবে ইচ্ছাটি তার পূরণ হয়নি। ১৯৩৭ সালের ২৩ মে ফ্লোরিডায় নিজের শীতকালীন আবাসে ৯৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান। উল্লেখ্য, রকফেলারের বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল— নিউইয়র্ক শহরে একটি বাড়ি, নিউজার্সির লেকউডে একটি এস্টেট, টেরিটাউনের কাছে কিকুইট নামে ৩ হাজার একরের একটি এস্টেট। ক্লিভল্যান্ডের লেক ভিউ সেমিট্রিতে তাকে সমাহিত করা হয়।

জন ডি রকফেলারের অবর্তমানে পারিবারিক ব্যবসা সাম্রাজ্যের হাল ধরেন তার একমাত্র পুত্র জন ডি রকফেলার জুনিয়র (১৮৭৪-১৯৬০)। পিতার দেখানো পথই তিনি অনুসরণ করেছিলেন। বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, চিকিত্সা ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তিনি ৫৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। ১৮৯৭ সালে তিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০১ সালে তিনি অ্যাবি গ্রিনকে বিয়ে করেন। গ্রিনের বাবা ছিলেন একজন মার্কিন সিনেটর। ১৯৪৮ সালে গ্রিন মারা গেলে জন রকফেলার জুনিয়র বিয়ে করেন তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু বিধবা মার্থা বার্ডকে। হিসাবে দেখা যায়, ১৯২৮ সালে রকফেলার জুনিয়রের সম্পদ ছিল প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ডলারের। দান-খয়রাত করে তার এ সম্পদ পরবর্তী এক যুগের মধ্যে ২৭৯ দশমিক ৬ মিলিয়নে নেমে আসে। ব্যবসার চেয়ে তিনি সেবামূলক কাজেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।

গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেই রকফেলার জুনিয়র পিতা জন রকফেলার সিনিয়রের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। জন ডি রকফেলার জুনিয়রের ছয় সন্তান— এক কন্যা ও পাঁচ পুত্র। এদের মধ্যে নেলসন রকফেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আর রকফেলার পরিবারের ব্যবসায়িক কিংবদন্তিকে এগিয়ে নিয়েছেন নেলসনের ছোট ভাই ডেভিড রকফেলার।

ডেভিড রকফেলার মারা গেছেন গত ২০ মার্চ। পিতামহ জন ডি রকফেলার যে কিংবদন্তি পরিবার তৈরি করেছিলেন, তারই দ্বিতীয় প্রজন্মের সর্বশেষ জীবিত সদস্য ছিলেন তিনি। পিতামহ জন রকফেলারের ১০০ বছর বাঁচার ইচ্ছা পূরণ না হলেও তার নাতি ডেভিড তা পূরণ করেছেন। ২০ মার্চ নিউইয়র্কের পোকানটিকো হিলে তার বাসবভনে যখন তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তার বয়স হয়েছিল ১০১ বছর। ডেভিড রকফেলার ছিলেন ব্যাংকার, সমাজসেবক। এক দশকের বেশি সময় তিনি চেজ ম্যানহাটন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আমেরিকান পুঁজিবাদের বার্তা ও প্রভাব দুনিয়াজুড়ে বিস্তৃত করার পেছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল ডেভিডের। চেজ ম্যানহাটন বহুদিন রকফেলার ব্যাংক নামে পরিচিত ছিল। তবে এ পরিবার কখনই ব্যাংকের ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক ছিল না। তবে ডেভিডই ছিলেন এ ব্যাংকের প্রাণভোমরা। সত্তরের দশকে তিনি এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একসময় এটি ডেভিড’স ব্যাংক নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। দুনিয়াজুড়ে এ ব্যাংক তার প্রভাব বিস্তার করে। তার মর্যাদা যেকোনো করপোরেট পদবির চেয়ে অনেক বেশি কিছু ছিল। তার প্রভাব অনুভব করা যেত ওয়াশিংটন কিংবা অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে, নিউইয়র্ক সিটি গভর্নমেন্টের বারান্দায়, শিল্প জাদুঘরে, সেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পাবলিক স্কুলে। তিনি দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার ব্যাংকের প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী ছিলেন। বিশ্ব অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে তার বিরাট প্রভাব ছিল। তিনি যে দেশ সফরে যেতেন, সেখানে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতোই মর্যাদা দেয়া হতো।

পিতামহ জন ডি রকফেলারের নাতিদের মধ্যে সর্বশেষ জীবিত ছিলেন ডেভিডই। অর্থাত্ তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রকফেলার পরিবারের একটি প্রজন্মের অবসান হয়েছে। জন ডি রকফেলার তৈরি করেছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার। আর সেই পরিবারের বংশধর হিসেবে ডেভিডের জীবন কেটেছে রাজা-বাদশাদের মতোই। বাল্যকালে তিনি আর তার অন্য ভাইয়েরা ফিফথ অ্যাভিনিউতে রোলার স্কেট চালাতেন। তারা ক্লান্ত হয়ে গেলে লিমুজিন তাদের টেনে নিয়ে যেত।

ডেভিড ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। তার দানের পরিমাণ পাহাড়সম। তিনি একজন শিল্পসংগ্রাহকও। তার সংগ্রহের ১৫ হাজার শিল্পকর্ম একটি জাদুঘরের চেয়ে কিছু কম নয়। এসবের মধ্যে অনেক মাস্টারপিসও আছে।

ডেভিডের ক্ষমতা আর প্রভাবের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে তার রোলোডেক্স। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, যাদের সঙ্গে তিনি ব্যাংকার বা স্টেটসম্যান হিসেবে সাক্ষাত্ করেছেন। এ রোলোডেক্সের জন্য একটি আস্ত কক্ষ দরকার হতো।

রকফেলার সেন্টার যে শহরে অবস্থিত, সে শহরকে তিনি ভালোবাসতেন এবং শহরের ওপর তার গভীর প্রভাব ছিল। সত্তরের দশকে নিউইয়র্ক শহরের আর্থিক সংকট মেটাতে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে যে সহায়তা দেয়া হয়েছিল, ডেভিড সেখানে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের চেয়ারম্যান। তার মা ১৯২৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন। ডেভিড বিভিন্ন করপোরেশনকে শিল্পকর্ম কিনতে এবং সেগুলো দিয়ে অফিস সাজাতে উত্সাহিত করতেন। শহরের স্থানীয় জাদুঘরগুলোকে সহায়তা করতেও তিনি পথ দেখিয়েছেন। ব্যবসায়ী নির্বাহীদের জোট নিউইয়র্ক সিটি পার্টনারশিপের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পাবলিক স্কুল এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করেছেন। রকফেলার নামটির সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে সবসময় সচেতন ছিলেন।

ডেভিড রকফেলার ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য বাজার শক্তি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত বিদেশ সফর করেছেন। সত্তরের দশকে তিনি সাক্ষাত্ করেছিলেন মিসরের আনোয়ার সাদাত, সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্রেজনেভ ও চীনের চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে। তার এ সাক্ষাতেই প্রথম মার্কিন ব্যাংক হিসেবে এসব দেশে চেজ ম্যানহাটন কাজ শুরু করে। ডেভিড নিজেই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের খুব কমসংখ্যক মানুষই আমার মতো এত বিশ্বনেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন।’

ডেভিডের বিদেশ সফরের ঘনঘটা নিয়ে ব্যবসা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমালোচনাও ছিল। অনেকেই তাকে বিদেশে বেশি সময় কাটানোর দায়ে অভিযুক্ত করেন। তাদের মতে, ডেভিড চেজের উন্নতির জন্য দায়িত্বে অবহেলা করেছিলেন। তিনি দূরদর্শী একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ কারণে চেজ, সিটি ব্যাংকের পেছনে পড়ে যায় সম্পদ ও উপার্জনের ভিত্তিতে। একসময় ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের ঝামেলায়ও পড়েছিল ব্যাংকটি।

১৯৮১ সালে দি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জন ম্যাকক্লয় বলেছিলেন, ‘আমার বিবেচনায় ডেভিড ইতিহাসে একজন সেরা ব্যাংকার হিসেবে স্থান পাবেন না। তিনি বরং একজন সত্যিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ববান মানুষ এবং ব্যবসায়ী মহলের সম্মানিত ও বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ ম্যাকক্লয় ছিলেন রকফেলারের বন্ধু ও চেজের সাবেক চেয়ারম্যান।

ডেভিড রকফেলার তার কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগের জন্যও সমালোচিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহকে ক্যান্সারের চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেয়ার জন্য ডেভিড এবং তত্কালীন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে অনুরোধ ও প্রভাবিত করেছিলেন। নিউইয়র্ক শহরে পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির অনুসারীরা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটান। তারা ইরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয় এবং এক বছরের বেশি সময় মার্কিন কূটনীতিবিদদের জিম্মি করে রাখে।

ডেভিড নিজের ব্যাংকের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত করতে অনেক স্বৈরশাসকের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এজন্যও তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ডেভিড ব্রুক ২০০২ সালে লিখেছিলেন, ‘তিনি পুরো জীবন কাটিয়েছেন শাসক শ্রেণীর ক্লাবে এবং তিনি এ ক্লাবের বিশ্বস্ত সদস্য ছিলেন, তা সে ক্লাবের অন্য সদস্যরা যেমনই হোক না কেন।’ ব্রুক অভিযোগ করেন, লাভের জন্য রকফেলার ‘তেলসমৃদ্ধ দেশের স্বৈরশাসক’, ‘সোভিয়েত পার্টি বস’ এবং ‘চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পেছনের অপরাধী’— সবার সঙ্গেই হাত মিলিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে জিমি কার্টার ও রিচার্ড নিক্সনের মধ্যে মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলেও তারা দুজনই ডেভিড রকফেলারকে ট্রেজারি সেক্রেটারির পদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডেভিড দুই প্রেসিডেন্টকেই হতাশ করেছেন।

১৯৭৯ সালে মারা যান ডেভিডের বড় ভাই নেলসন এ. রকফেলার। নেলসন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং নিউইয়র্কের চার মেয়াদের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নেলসনের মৃত্যুর পর রকফেলার পরিবারের হাল ধরতে হয় একাকী ডেভিডকেই।  রকফেলার পরিবারে ডেভিডকেই বলা যায় জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী সর্বশেষ সদস্য। ডেভিডদের পরবর্তী প্রজন্মে একমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন জে রকফেলার। তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গভর্নর ও যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ সালে ওয়ারেন টি লিন্ডকুইস্ট দ্য টাইমসে লিখেছিলেন, ‘কেউ তার (ডেভিড) জায়গা নিতে পারবে না। কারণটা এমন নয় যে, পরিবারের অন্য সদস্যরা ভালো, স্মার্ট, প্রতিভাবান নন; কারণটা হচ্ছে ডেভিডের জগত্টাই ভিন্ন ছিল।’

ডেভিড রকফেলারের মৃত্যুর পর একটি প্রশ্ন দুনিয়ার ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হচ্ছে, তা হলো— এবার কি দুনিয়ায় রকফেলার পরিবারের প্রতিপত্তির অবসান ঘটতে যাচ্ছে? এভিনিউ ম্যাগাজিনের সম্পাদক মাইকেল গ্রস বলেছেন, ‘রকফেলার নামটি এখনো অনেক কিছু বোঝায়। তবে পরিবারটির ক্ষমতা তাদের সদস্যদের সবার ঐক্যে, একক কেউ ক্ষমতাকে ধারণ করেন না।’

পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দুনিয়ায় আরো অনেক বিলিয়নেয়ার তৈরি হওয়ায় নিউইয়র্কে রকফেলারদের প্রভাব ধীরে হলেও কমে আসবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। জন ডি রকফেলার সিনিয়রের বংশধরদের সংখ্যা এখন দেড়শ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষত এ টেক বিলিয়নেয়ারদের যুগে রকফেলারদের ব্যবসা কিছুটা হলেও তো সেকেলে। অন্যদিকে পরিবারের বর্তমান সদস্যরা নিউইয়র্ককে কেন্দ্র করে কর্মরত নন, তারা এখন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন। এটাও পরিবারের প্রভাব কাঠামোকে শিথিল করছে।