ফরাসি কবি মালার্মে বলেছিলেন, কবিতা গড়ে ওঠে ‘শব্দ’ দিয়ে। চিত্রকলা সম্পর্কেও এ রকম ভাবেন অনেক তাত্ত্বিক যে, ছবির প্রধান উপাদান ‘ইমেজ’ বা প্রতিমাকল্প। গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের নরনারীর বিলেতে বিশেষ যাপন ‘ইমেজ’ নিয়ে যে প্রদর্শনী, তার ভূমিকা-স্বরূপ উপস্থাপনায় উদ্ধৃত করা যায় ডেভিড ফ্রিডবার্গের একটি উক্তি, যাতে তিনি বলেছেন— ‘দ্য পাওয়ার ইজ উইথ দ্য ইমেজেস’। আবার প্রশ্ন আসতে পারে শিল্পের নির্মাণে ‘আইডিয়া’, ‘কনসেপ্ট’ বা ভাবনার অবস্থান কী রূপ? এ কথা ঠিক, শুধু ‘আইডিয়া’ দিয়ে শিল্প হয় না, যদি না শব্দ বা ইমেজ সেই ভাবনার প্রকৃষ্ট বাহন হয়ে ওঠে। সফল শিল্পকলায় প্রতিমাকল্পই ভাবনাকে স্পন্দিত করে। ভাবনার ভেতর প্রাণসঞ্চার করে। এ দুয়ের সুষ্ঠু সমন্বয় যেকোনো শিল্পের প্রাথমিক শর্ত।
সমসাময়িককালে যে আধিপত্যকামী মানসিকতা, যে আত্মপ্রচার অতীত থেকে বর্তমানকে বিচ্ছিন্ন করার উত্কট প্রচেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠছে, এমন সময় বার্মিংহাম মিউজিয়ামে চলছে ‘নাইটস অব দ্য রাজ’ সম্মেলক প্রদর্শনী। যেখানে উপস্থাপিত হয়েছে বিলেতে বাংলাদেশী অভিবাসী সমাজের একটি অংশের অতীত সামাজিক যাপনকল্প। বিলেতে বাঙালিদের রেস্টুরেন্ট ব্যবসাসংশ্লিষ্ট পূর্বাপর ইতিহাস তুলে ধরতে ব্রিটেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্মিংহামের মিউজিয়ামে শুরু হয়েছে এক অভিনব প্রদর্শনী।
বাংলাদেশীদের বার্মিংহাম শহরে তখনকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের বাস্তবতা প্রদর্শনীর প্রতিমাকল্প নির্মাণের মূল ভিত্তি ভূমি। এ কথা তো অনস্বীকার্য যে, বার্মিংহাম যেহেতু ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র, তাই আজকের বিশ্বায়নজনিত সংকটের সবচেয়ে প্রগাঢ় প্রতিফলনগুলোও দৃশ্যমান হয় এ শহরে। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা বাংলাদেশী অভিবাসীদের এই একটি শহরকে ভিত্তি করে সারা বিলেতের সামগ্রিক ‘বাঙালি অভিবাসীর অর্জন’কে সংগ্রামের প্রতিমাকল্পে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল ১৮১০ সালে। ব্রিটেনে প্রথম কারি হাউজ বা বাংলাদেশী খাবারের দোকান। শেখ দীন মোহাম্মদ তা শুরু করেছিলেন সেন্ট্রাল লন্ডনে পোর্টম্যান স্কোয়ারের কাছে জর্জ স্ট্রিটে। নাম রেখেছিলেন ‘হিন্দুস্তানি কফি হাউজ’। সেখানে ভারত ফেরত ব্রিটিশদের জন্য তিনি বাংলার রান্না চালু করেছিলেন। খাঁটি ভারতীয় আমেজ সৃষ্টির জন্য হুঁকোয় ‘ছিলিম’ তামাক সেবনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। কিন্তু তার ব্যবসা সফল হয়নি। একসময় দীন মোহাম্মদ দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন দেউলিয়া হয়নি। বরং অন্যদের মধ্যে স্বপ্ন পল্লবিত হয়েছে পরবর্তীতে।
জীবনে অর্থ-সমৃদ্ধির জন্য প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশী প্রবাসীরা তখন সকাল-বিকাল কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অবধি রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন। আজকের বিলেতে প্রতিষ্ঠিত কারি ইন্ডাস্ট্রিজের ৮৫ ভাগ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত এই ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা। তাদের ব্যবসায়িক বুদ্ধি, প্রচারণা কৌশল, খদ্দের আকর্ষণের জন্য ‘বার্মিংহাম প্লানেট’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ছবিও রয়েছে প্রদর্শনীতে। একটির প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, ‘লাস্যময়ী মেয়েরা পানীয় পরিবেশন করে।’ ব্রিটিশ মেয়েরা কীভাবে বাংলাদেশীদের বিয়ে করে তাদের ব্যবসায় এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করেছেন, তার ছবিও রয়েছে।
প্রদর্শনীর প্রধান বিষয় অভিবাসী শ্রমিক, যারা অনেকেই বাংলাদেশে অখ্যাত গ্রাম থেকে বিলেতের শহরে আসে মূলত কাজের সন্ধানে এবং ক্রমে বিপন্নতার অন্তিমে পৌঁছে! ফলে স্থাপনার চিত্রপটজুড়ে একটি মানুষী অবয়ব গড়ে উঠেছে তাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর পারস্পরিক সংযুক্তিতে। পেছনের দেয়ালে সিনেমার পোস্টারে যৌন আবেদনময় যুবতীর ছবি, বিশ্লিষ্ট ‘ইমেজ’ যেখানে সংক্ষুব্ধ ‘আইডিয়া’য় রূপান্তরিত। আছে সিলেটের গ্রামের ভূদৃশ্য, যা রেস্টুরেন্ট সাজানোর উপকরণ হয়েছিল।
রেস্টুরেন্টের বাঙালি কর্মচারীর শয়নকক্ষের ছবিতেই প্রতিমাকল্প সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও স্পষ্টভাবে বাস্তবতার নিগূঢ় শূন্যতাকে প্রতীকায়িত করেছে। এ স্থাপনা চিত্রের আঙ্গিক ও কৃেকৗশলে উপস্থাপন করা। কতকগুলো ছবির প্রতিমাকল্প বিশ্লিষ্ট এ আয়োজন মানব অনুপস্থিতিকে ছাপিয়ে বিশাল শূন্যতায় অসংখ্য ইমেজের ভিত্তি তৈরি করেছে। শূন্যতার এ করুণায় স্পন্দিত হয় এক নিরবয়ব প্রতিমা। যেখানে উপস্থাপিত হয়েছে ট্রানজিস্টার, টুপি, জায়নামাজ, পান-সুপারি, খাবনামার মতো অতি সাধারণ উপকরণের উপস্থিতিতে। বার্মিংহামের কোনো অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকার নির্জন কামরা কিংবা রেস্টুরেন্টের ওপর স্টাফদের শয়নকক্ষের দৃশ্যচিত্র শেষ পর্যন্ত তা আর দরিদ্রতায় নয়, বরং সংগ্রামী মানুষের যাপনচিত্রের রূপ সাধারণত্বের উছিলায় এক অজানা অলক্ষ্য সত্যে পৌঁছে। স্মৃতিকাতরতায় বরং উদ্যমের স্মৃতির চিত্রল ভাষ্য নির্মাণের প্রয়াস। যেখানে আইডিয়া ইমেজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্য একটি অংশে সরাসরি খাদ্য উপকরণ, রন্ধনশালার সরঞ্জাম ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে। থরে থরে সাজানো হয়েছে তখনকার প্রবাসী বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট কর্মীদের জীবনযাপনের কিছু অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যেমন— বিল বই, পোস্টার, মেনু, বিজনেস কার্ড ইত্যাদি। আছেন একদা রেস্টুরেন্ট কর্মী, সম্মানিত বাঙালি পরিচয়ে বাংলা জানা রজার মাস্টার।
বার্মিংহামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা খ্যাতনামা দেয়ালচিত্রী মোহাম্মদ আলী এ প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা। আর এর পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বার্মিংহাম মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি ও হেরিটেজ লটারি ফান্ড। প্রদর্শনীটি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে, চলবে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত। তিনি বলছিলেন কেন এ প্রদর্শনী করছেন তার গল্প। তার বাবাও রেস্টুরেন্ট মালিক ছিলেন। পারিবারিক রেস্টুরেন্ট ‘রাজপুত’-এ নিজেও ছোটবেলায় ওয়েটারের কাজ করেছেন। আলী বলেন, আমি জানতাম আমি কী খুঁজছি, যা অনেকের কাছেই ছিল মূল্যহীন। আবার অনেককে বোঝাতে হয়েছে নিজেরা কোথা থেকে কেমন করে এসেছেন, বংশধররা যাতে ৫০ বা ১০০ বছর পরেও তাদের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারে, সেজন্যই আপনাদের সাহায্য চাই। আমার বাবা ওয়াতির আলীর পরিচয় দেয়াতেও অনেকে এগিয়ে এসেছেন, যা তার পার্সোনাল জার্নির মধ্য দিয়ে মাইনোরিটি কমিউনিটির গল্পের মাধ্যমে আবিষ্কার করা নিজেকে। তার প্রতিষ্ঠান সউল সিটি আর্টস এ প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা।
এই ‘ভিনদেশে’ শহরের স্থাপত্যের ভেতর যে অমানবিক শূন্যতা পরিব্যাপ্ত থাকে, সেটাকেই খুঁটিনাটি যাপন অনুষঙ্গের প্রতিমাকল্পের বিভিন্ন বিন্যাসে ধরতে চেয়েছেন। ইনস্টলেশনে এ সভ্যতার অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। নানা রকম বিন্যাসে অতীত সত্যের ওপর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলো ফেলার চেষ্টা আছে।
আউটসাইডার আর্ট নয়, নয় ব্রাত্যর গল্প কোনো, বরং ইনসাইডার শিল্পযজ্ঞের তল্লাটে তথাকথিত সামাজিক সমতল সৃষ্টিতে লিপ্ত সংগ্রামী প্রেক্ষাপটে নানা শূন্যতা পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকে। তার ওপর সংস্থাপিত হয়েছে মুখ। সে মুখরা মুখর, নৈর্ব্যক্তিক, শঙ্কাদীর্ণ, নৈরাশ্যময়, স্বপ্নবানও। সেই মুখর যাপনের চারপাশ থেকে তর্জনী উঁচিয়ে থাকা কিংবা শহরের নিঃসীম বিমানবিকতাও এভাবেই যেন ধরা পড়ে আচম্বিতে।
বিলেতে একটা বড় অংশ বাংলাদেশীদের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় যে অর্জন, দ্বিতীয়-তৃতীয় বা নতুন প্রজন্মের কাছে এ কাজ যথেষ্ট আগ্রহের নয়, তবে এই দীর্ঘ সংগ্রামে একনিষ্ঠ থেকেছে যে পূর্বজদের শ্রম-স্বপ্ন সাফল্যের অংশ আজো আগামীর বংশধরদের জন্য এ স্থাপনা আলেখ্যে সেই গল্পের টুকিটাকি অত্যন্ত মুনশিয়ানায় তুলে ধরা হয়েছে, যা একদা বিলেতে আসা অনভিজ্ঞ শ্রমিকের জীবনসংগ্রাম থেকে আজকের মূলধারার ব্যবসা তথা অর্থনীতির গর্বিত অংশীদার। এ গল্পের নাম না জানা অসংখ্য কলাকুশলীর সামান্য অংশই এখানে স্থান পেয়েছে। যদিও তথাপি তারা সংখ্যায় অল্প হলেও তা নিঃসন্দেহে এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কুশীলবকে যথার্থই প্রতিনিধিত্ব করে। তারাই যেন মুখপাত্র হয়ে বার্মিংহাম মিউজিয়ামের মতো প্রাচীন গৌরবান্বিত শিল্পকেন্দ্রে সগর্বে হাজির নাজির থাকে। উচ্চকিত হয় একটি অনগ্রসর দেশে জন্ম নেয়া বিপুল ঘামে শ্রমে নির্মিত স্বপ্নবান প্রজন্মের গাঁথা। সেই দেশের নাম বাংলাদেশ। আর প্রজন্মান্তরে তারা নির্দ্বিধায় বাংলাদেশী।
নিজেকে খুলে দেখতে চাইলেন। রেস্টুরেন্টের ভাগাড় তার নানাবিধ কুড়ানো বস্তুর (কাগজ বা অন্যকিছু) সন্নিবেশ করেছেন, কিন্তু তা বস্তুর নিজস্ব ক্ষয়িত সৌন্দর্য নিয়ে। যে অতীত হয়েছে, হারিয়ে গেছে আবার হারিয়ে ও হারিয়ে যায়নি, অন্যভাবে পাওয়া, বিনম্র অভিবাদনে। এ যেন স্বদেশ হারিয়ে সাদৃশ্যময় ভাষা-সংস্কৃতির বিভ্রমে নিজেদের খোঁজার নমুনা।
এ প্রদর্শনী বিলেতে বাঙালি অভিবাসী ইতিহাসের গায়ে শিল্পময় উল্কি আঁকা। অন্যত্র আছে বাংলাদেশী পাসপোর্ট, ডাকটিকিট লাগানো সিলমোহরযুক্ত খাম। বাংলাদেশীদের মালিকানাধীন বিলেতের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের রসুইঘর আর কর্মীদের অন্তঃপুরে প্রবেশাধিকার ব্রিটিশ কারি ও শিল্পপ্রেমীদের। আগ্রহের বিষয় বাংলাদেশীদের মালিকানায় মেইনস্ট্রিম খাদ্য সংস্কৃতির নেপথ্য বৃত্তান্ত জানানোর অপরিহার্যতা, তা অবশ্যই সংস্কৃতির সংরাগে। আধুনিক উপস্থাপনার উপাঙ্গ অডিও, ভিডিও, সাক্ষাত্কার, ধারা বর্ণনা, মৌখিক ইতিহাস, অতীত শাসিত বয়ান, এসবের মিলিত দেয়ালচিত্র ও মেঝেয় দণ্ডায়মান ভাস্কর্য, স্থাপনা, প্রতিচিত্র— সব মিলে একটি ইন্টারেক্টিভ শিল্প প্রযোজনা।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক শিল্পীকে স্বপ্ন ধরার জাল নিজের মতো করে বুনে নিতে হয় প্রথমে, তারপর বসে থাকা— বিশ্বের চলাচলের পথ ধরে, নিজের আসন বিছিয়ে, চুপটি করে নয়, সজাগ হয়ে।’ শিল্পী মোহাম্মদ আলী এ কাজটি করেছেন যুগপৎ সজাগ হয়ে যথেষ্ট দরদ দিয়ে। আর এই অতীত শাসিত গল্প বয়ান ‘স্থাপনা শিল্পে’ ‘রূপ’কে ‘ভাব’-এ রূপান্তর হয়ে উচ্চকিত থাকে— বিলেতে ‘আমাদের গল্প, কারি সাম্রাজ্যের বীরদের গল্প’ তথা স্থাপনা শিল্পালেখ্য হিসেবে স্মৃতি-শ্রুতির অকপট বয়ান হয়ে!






