সম্প্রতি ইসরায়েলের সুখ্যাত লেখক আমোস ওজের জুদাস উপন্যাসটি বাজারে এসেছে। এ উপলক্ষে তার সঙ্গে কথা হয় নিউইয়র্ক টাইমসের। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, বিশ্বখ্যাত গল্পকার আন্তন চেখভ যদিও কবেই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন কিন্তু ওজের খুব ইচ্ছে— তার সঙ্গে একবার দেখা হোক। ইচ্ছে স্রেফ গল্পগুজব করার। তা যদি হয়, তাহলে তিনি ধন্য হয়ে যাবেন। এর কারণ হিসেবে ওজ জানালেন, এ গল্পগুজবই আসলে আজকের গল্প আর উপন্যাসের সেই দূরবর্তী চাচাতো ভাই বা বোন, যদিও পরিবারের এ সদস্যকে তারা মেনে নিতে রাজি নয়। তো পাঠকের জন্য ভাষান্তর করে দেয়া হলো লেখকের সাম্প্রতিক এ আলাপচারিতা—

আপনার প্রিয় লেখকদের নিয়ে কিছু বলুন...

আসলে আমার এমন কোনো বুক শেলফ নেই, যেখানে কোনো প্রিয় লেখক সবসময় থাকেন। তারা সেখানে আসেন, আবার চলেও যান। তাদের মধ্যে দু-একজন অন্যদের তুলনায় বেশি বেশি আসেন। যেমন— চেখভ, সারভান্তেস, ফকনার, আগনন, ব্রেনার, ইজহার, আলতারম্যান, বিয়ালিক, আমিহাই, ল্যাম্পাদুসা’র ‘ইল গেত্তাপারদু’, কাফকা এবং বোর্হেস। কিছু সময় থমাস মান তো কিছু সময় এলসা মোরান্তে ও নাতালিয়া গিঞ্জবুর্গ।

 

তো লেখালেখির কাজে কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশি তাড়া করে?

ছোট করে বলি যদি, যখনই একটা সাহিত্যকর্ম হঠাত্ করেই অতি পরিচিত কোনো বিষয়কে গভীর অপরিচিত করে তোলে কিংবা এর বিপরীতটা, যখন কোনো সাহিত্যকর্ম অপরিচিত কিছুকে খুব অন্তরঙ্গভাবে পরিচিত করে তোলে, আমি তাতে মুগ্ধ হই (কেঁদে ফেলি বা হাসি, কিংবা রেগে উঠি বা কৃতজ্ঞ হয়ে উঠি, অথবা আরো বিচিত্র ধরনের উত্তেজনা-উচ্ছ্বাসে ডুবে যাই।)

 

শিশুকালে আপনি পাঠক হিসেবে কেমন ছিলেন? সে সময়ের কোন কোন বই আর লেখক আজো আপনাকে সবচেয়ে বেশি তাড়া করে? 

গোগ্রাসে গিলা যাকে বলে, আমি সবকিছুই পড়তাম। তা যা-ই হোক না কেন। আমি ইলেকট্রিক হিটারের ব্যবহার নির্দেশিকা পড়তাম, আমি উপন্যাস পড়তাম, যা আমার মাথার ওপর দিয়েই যেত। আমি কবিতা পড়তাম, যার ভাষাগত সংগীতময় অনুভূতিটাই কেবল আমি উপভোগ করতে পারতাম। আর অর্থটা আমার বোধে একেবারেই ধরা পড়ত না। আমি সব ধরনের সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন পড়তাম। এমনকি লিফলেট, বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক মেনিফেস্টো, চটি পত্রিকা, কমিকস কিছুই বাদ পড়ত না। সব, সব পড়তাম।

 

যদি বলি, কোন বইটি আপনাকে আজকের এই লেখক করে তুলেছে? তাহলে কী বলবেন?

বলতে গেলে প্রায় সব ভালো বই-ই আমাকে অল্প হলেও পাল্টে দিয়ে যায়। তবে আজ আর সাহিত্য সম্পাদকের কাছে আমার সেই উপন্যাস পাঠানোর সাহস পাব না। শের উড এন্ডারসনের গল্প ‘উয়াইনসবার্গ, ওহাইয়ো’, আগননের ‘ইন দ্য প্রাইম অব হার লাইফ’ এবং  এম ওয়াই. বার্ডিচেওস্কিওর ছোটগল্প থেকে অনেক কিছু শিখেছি বলে নয়। ‘ওয়াইনসবার্গ, ওহাইয়ো’ আমাকে শিখিয়েছিল, অনেক সময় একটা গল্প যত আঞ্চলিক ও গ্রামীণ হয়ে ওঠে, ততই তা সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে। আমি আমার প্রথম দিকে এই ধাঁচের সাহিত্যিক স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়েই লিখেছি। আর সেই উপন্যাসটা হলো ওই— ‘এ টেল অব লাভ অ্যান্ড ডার্কনেস’।

 

জীবিত বা মৃত কোন লেখকের সঙ্গে দেখা হলে সবচেয়ে খুশি হবেন? তখন আপনি তার কাছে কী জানতে চাইবেন?

আমার খুব ইচ্ছে আন্তন চেখভের সঙ্গে আধঘণ্টা কাটানোর। আমি তাকে একটা ড্রিংক কিনে দিতাম। তার সঙ্গে সাহিত্যের কোনো বিষয়ে কথা বলব না। এমনকি তার সাক্ষাত্কার নিতেও চাইব না। তার কাছে দু-একটা উপদেশও চাইব না। শুধু গল্পগুগুজব করব। আমি চেখভের হতাশা ও সহানুভবের অনন্য মিশেল খুব পছন্দ করি। (আর গল্পগুজব— যা আসলে এ দুইয়েরই মিশ্রণ— সে আসলে গল্প আর উপন্যাসের দূরবর্তী চাচাতো ভাই বা বোন, যদিও তারা একে অন্যকে প্রকাশ্যে রাস্তায় আর হ্যালো বলে না। কারণ উপন্যাস আর গল্প নিজেদের পারিবারিক সদস্য হিসেবে এই চাচাতো ভাই বা বোনটিকে নিয়ে বেশ বিরক্ত।)

 

আপনার রাত্রি জাগার সঙ্গী এখন কোন কোন বই?

দু-এক সপ্তাহ আগে আমার এক প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মী, ইসরায়েলের ঔপন্যাসিক এ বি ইয়েহোশুয়া তার স্ত্রীকে অসুস্থতার কারণে হারালেন। রিভকা ইয়েহোশা ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, তারা দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তা প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে। ৩০ বছর আগে ইয়েহোশুয়া প্রকাশ করলেন, ‘ফাইভ সিজন’। এটি অপূর্ব উপন্যাস। একজন চমত্কার মনের মানুষ, যে কিনা তরুণ বয়সেই তার স্ত্রীকে হারাতে বসেছেন। ফাইভ সিজনস উপন্যাসটি বিপত্নীক হিসেবে প্রধান চরিত্রটির প্রথম বছরটির বর্ণনা। আমি এ উপন্যাস এখন মগ্ন হয়ে পড়ছি। অনেক সময় চোখে জল চলে আসে। আবার এর প্রশংসায় মন ভরে ওঠে। আমার তখন ভাবতে লোভ হয়, বরং জীবনই অনেক সময় সাহিত্যকে নকল করে।

 

আপনি সর্বশেষ যেসব মহত্ বই পড়লেন, তার কয়েকটা নিয়ে বলুন...

আমি লেনিন’স কিসেস পড়লাম। দুঃসাহসী, হাস্যরসাত্মক, কষ্টের ও একই সঙ্গে চাঙ্গা করা দুর্দান্ত একটি উপন্যাস। লিখেছেন চীনের এক বড় লেখক, ইয়ান লিয়ানকে। শুধু আবেগঘন, দুঃসাহসী রাজনৈতিক প্যারোডিই নয়, উপন্যাসটা আরো বেশি কিছু। একই সঙ্গে শয়তানি ও মূর্খতা এবং দুঃখ-বিষাদ ও অনুরাগের ওপরও উপন্যাসটিতে এক নিবিড়-নিখুঁত পর্যালোচনা রয়েছে। আমি আবারো অনিতা শাপিরার লেখা ডেভিড বেন-গুরিয়নের জীবনী পড়লাম। পুনরায় আবিষ্কার করলাম ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ও জনকের মহত্ত্ব। ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে তিনি ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদের জাগরণ এবং ইহুদিবাদের ওপর এর যে সহিংস ক্রোধ, তার কারণও ঠিকঠাক অনুভব করতে পেরেছিলেন। ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা অন্তরঙ্গভাবে আলোচনায় বসেছিলেন। দুটি যৌক্তিক জাতীয় আন্দোলনের মাঝে একটি সুদূরপ্রসারী আপসরফার উপায় খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। দুই আন্দোলনের নেতারাই এই ক্ষুদ্র মাতৃভূমিকে নিজের বলে দাবি করে থাকেন। আর তা অবশ্যই যৌক্তিক, কোনো ভুল নেই।

 

যেসব লেখক স্বীকৃতি পাননি বা যাদের দিকে দৃষ্টি পড়েনি, এমন কয়েকজনকে নিয়ে বলুন। ইসরায়েলে কি এমন লেখক আছেন, যাদের লেখা অনুবাদ করার জন্য বড়সড় পদক্ষেপ নেয়া উচিত মনে হলেও নেয়া হয়নি? আপনি কি এক্ষেত্রে কারো নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চান?

ইসরায়েলের দুজন বড় লেখক আছেন। এস. ইজহার এবং ইয়েহোশুয়া কেনাজ। হিব্রু ভাষার বাইরে তাদের নাম বলতে গেলে কেউ শোনেনি। ইজহারের লেখা বলতে গেলে জয়েসের মানের। আর কেনাজ তার সেরা লেখাগুলো আপনাকে অবশ্যই মার্সেল প্রুস্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।

 

কোন জাতের লেখা আপনি পড়ে বিশেষ মজা পান? আর কোন জাতের লেখা আপনি পারলে এড়িয়ে চলেন?

সম্প্রতি আমার সুলিখিত স্মৃতিকথা, জীবনী পড়ার বেশ ভালো অভ্যাস হয়েছে। সেসব লেখা হতে পারে শিল্পী, রাষ্ট্রনেতা কিংবা কোনো ব্যর্থ মানুষের। এরই মধ্যে সাইমন সেবাগ মন্টিফিওরের লেখা ‘স্তালিন’, রেইনার স্টাচ লিখিত ‘কাফকা’, নভোকভের লেখা ‘নিকোলাই গোগল’ পড়লাম।

 

উপন্যাসের কোন নায়ক বা খলনায়ক আপনার প্রিয়? এ নিয়ে বলেন?

দন কিহোতে— এই প্রধান আধুনিক উপন্যাসের নায়ক এবং খলনায়ক। এটা প্রথম উত্তরাধুনিক উপন্যাসও বটে। আর বলতে গেলে প্রথম বিনির্মাণপন্থী উপন্যাসও। দন কিহোতে লেখা হওয়ার পর সাহিত্য ও সিনেমায় যে কত হাজার চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, যাদের মধ্যে এর প্রভাব লক্ষ না করে পারবেন না। এমনকি আমার মনে হয়, দন কিহোতের পর যেসব মানুষ এসেছে পৃথিবীতে, তাদের মধ্যেও এর কিছু না কিছু প্রভাব রয়েছে।

 

ধরুন, আপনার কোনো একটি বই কোনো প্রেসিডেন্ট পড়ুক চাইছেন। তাহলে কোন বইটির কথা বলবেন? ধরুন রাষ্ট্রনেতাটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী...

দুর্ভাগ্যবশত আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক নেতার সংখ্যা অনেক। আমার দেশেও। তারা আদৌ বই পড়েন— এ কথা শুনলে আমি নিজেই বিস্মিত হব। তবে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে আমি তার বিদায় উপলক্ষে প্রশংসাসহ আমার একটা বই উপহার দিতে চাই। সেটা হলো— ‘টেল অব লাভ অ্যান্ড ডার্কনেস। আর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্ভবত ‘রিচার্ড থ্রি’ পড়লেই উপকৃত হবেন।

 

আপনি কার কাছে নিজের জীবনের গল্পটি লিখে রেখে যেতে চান?

আমার সব সন্তানই চমত্কার লেখক। গভীর আত্মীয়তাবোধ, সহমর্মিতা আর পরিহাসের মিশেলে ভারসাম্য রক্ষা করে তাদের কেউ একজন মনে হয় লিখে ফেলতে পারবে আমার গল্পটা।