আমার বাবা কি ঠাকুর্দা কখনও চাকরি করেননি। ঠাকুর্দা উপেন্দ্রকিশোরের প্রতিভা ছিল, রেনেসাঁসের সময়কাল মানুষদের প্রতিভার মতোই বহুমুখী। তিনি লিখতেন, ছবি আঁকতেন, বেহালা বাজাতেন, গান রচনা করতেন। হাফটোন ব্লক তৈরির ব্যাপারে তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ। তিনি যে ছাপাখানা বসিয়েছিলেন, অচিরে তা দেশের সেরা ছাপাখানা বলে গণ্য হয়। ১৯১৫ সালে, ৫২ বছর বয়সে, আমার জন্মের ছ’ বছর আগে, তিনি মারা যান। তাঁর বড় ছেলে সুকুমার আমার বাবা। ছাপার কাজ শিখবার জন্য ঠাকুর্দা তাঁর এই বড় ছেলেকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ম্যাঞ্চেস্টার স্কুল অব প্রিন্টিং টেকনোলজির শেষ পরীক্ষায় তিনি প্রথম হন। ঠাকুর্দার জীবদ্দশাতেই তিনি দেশে ফেরেন, তারপর বিয়ে করে যোগ দেন তাঁর বাবার ব্যবসায়ে।
বাবা মারা যান ছত্রিশ বছর বয়সে। ছাপাখানাটা তাঁর মৃত্যুর পরে আর বছর তিনেক চলেছিল। তারপর ব্যবসার হাত-বদল হতে উত্তর কলকাতার মস্ত বড় বাড়ি ছেড়ে আমাদের উঠে আসতে হয়।
আমি আমার বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমাকে নিয়ে মা তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে চলে এলেন। আমার এই মামা থাকতেন শহরের দক্ষিণ প্রান্তে। তিনি যদি না অত উদারভাবে সেদিন আমাদের আশ্রয় দিতেন, আমাদের জীবনে তা হলে তার পরিণতি হত ভয়াবহ। মামার দিক থেকে এটা ছিল প্রত্যুপকারের ব্যাপার। কলকাতায় তাঁর ছাত্রাবস্থায় বাবার কাছে তিনি যে সাহায্য পেয়েছিলেন, এ তারই প্রতিদান। তখনও তিনি বিয়ে করেননি। কাজ করতেন একটা বিমা-কোম্পানির আপিসে। অবিবাহিতা এক বোনের প্রতিপালনের দায়িত্বও তাকে বহন করতে হত। সেই অবস্থায় মা এসে তার ভাইয়ের সংসারের কাজকর্ম, নিত্যদিনের খরচপত্র, রান্নাবান্না ইত্যাদির দায়িত্বভার নিজের হাতে তুলে নিলেন। সংসারের রোজগার বাড়াবার জন্যে এক বিধবাশ্রমে গিয়ে সূচিশিল্প শেখাবার কাজও নিয়ে নিলেন তিনি। তার জন্য নিত্য তাঁকে শহরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত বাসে যাতায়াত করতে হত। কিন্তু এই যে আমার জীবনের পশ্চাত্পট, এর মধ্যে সিনেমা কী করে জায়গা করে নিল?
উত্তরে বলি, যখন ইস্কুলের ছাত্র, তখন থেকেই আমি চলচ্চিত্রের ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। কোথায় পড়াশুনোয় মন দেব, তা নয়, পাঠ্যবই শিকেয় তুলে তখনই আমি সাগ্রহে পড়ছি ‘পিকচারগোয়ার’ আর ‘ফোটোপ্লে’; হেড্ডা হপার আর লুয়েলা পার্সনেসর লেখায় যেসব হলিউডি গুজব থাকত, গোগ্রাসে সেগুলো গিলে চলেছি। ডিয়েনা ডার্বিন যে আমার প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর চেহারা কিংবা অভিনয় নৈপুণ্যই তার একমাত্র কারণ নয়, তাঁর ‘সোপ্রানো’ কণ্ঠের কাজ ছিল চমত্কার। ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার আর জিঞ্জার রজার্সও ছিলেন আমার প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। এঁদের প্রতিটি ছবিই যে আমি বারবার দেখেছি, সে শুধু এইজন্য যে, আর্ভিং বার্লিন আর জেরোম কার্নের দেওয়া সুরের রহস্যকে আমি তখন আমার অন্তর দিয়ে বুঝে নিতে চাইছিলাম।
আমার কলেজ-জীবনের যখন সূচনা তখনই কোনও একটা সময়ে আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা পালটে যায়। তারকা নয়, আমার মন চলে যায় পরিচালকদের দিকে। এটা হয়েছিল সম্ভবত দুটি বই পড়বার ফলে। চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে এই যে দুখানি বই, এর লেখক পুডভকিন। তখনই আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, গ্রেটা গার্বো, মারলিন ডিয়েট্রিখ, গ্যারি কুপার কি ক্যারি গ্র্যান্ট সম্পর্কে আমার আগ্রহ ক্রমে ঝিমিয়ে পড়ছে, আর তার জায়গায় আর্নস্ট লুবিশ, জন ফোর্ড, ফ্র্যাংক কাপরা, উইলিয়াম ওয়াইলার কি জর্জ স্টিভেন্স সম্পর্কে এসে যাচ্ছে একটা আগ্রহের জোয়ার। ‘সাইড অ্যান্ড সাউন্ড’ পত্রিকার একটি সংখ্যা এই সময় হঠাৎ আমার হাতে এসে যায় ও আমি তার গ্রাহক হই। উত্তেজনায় আমি তখন টগবগ করে ফুটছি। যেন একটা নতুন জগতের দরজা খুলে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে। নামজাদা সব অভিনেতা-অভিনেত্রী কী করছেন না করছেন চলচ্চিত্রে শুধু তাতেই আর তখন আটকে থাকছে না আমার আগ্রহ, একই সঙ্গে নজর করে দেখছি যে, ক্যামেরাটাকে কোথায় কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, কোন দৃশ্য কোথায় কাট করা হচ্ছে, ছবির গল্পাংশ কীভাবে উন্মোচিত হচ্ছে, আর কী কী সেই বৈশিষ্ট্য, যা একজন পরিচালকের কাজকে আরেকজনের কাজ থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
আরেকটা বিষয়ও ইতিমধ্যে দখল করেছিল আমার কল্পনাকে। যেমন চলচ্চিত্র, তেমন তাতেও আমি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। বিষয়টা হচ্ছে পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সংগীত। ভারতীয় সংগীত বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতের আবহের মধ্যে আমি বড় হয়ে উঠেছি। আমার মাতৃকুলে বলতে গেলে প্রায় সকলেরই ছিল স্বাভাবিক গানের গলা। তবে, খুব ছেলেবেলার রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি ওয়ালজ আর মার্চও শুনতাম। জন্মদিনের উপহার হিসেবে একটা খেলনা গ্রামোফোন পেয়েছিলাম আমি। তার রেকর্ড ছিল আজকালকার কমপ্যাক্ট ডিস্কের মতন। তাতেই বাজত এই সুর। অর্থাৎ পাশ্চাত্য সংগীতে রপ্ত হবার যে সুযোগ, সেটা আমার সেই ছেলেবেলাতেই ঘটেছিল।
ভোর্জাকের নিউ ওয়র্লড সিম্ফনি, চাইকোভস্কির পিয়ানো কনচের্টো, লিটসের হাঙ্গারিয়ান র্যাপসডি—জনপ্রিয় এই যে সব ক্ল্যাসিক্স, ইস্কুলে পড়বার সময়ে এগুলির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। শুনে একেবারে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। হাত খরচার পয়সা জমিয়ে তখন থেকেই রেকর্ড কিনতে শুরু করি। প্রথম প্রথম তো অল্প দামে পাওয়া যায় বলে চোরাবাজার থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড রেকর্ড কিনতাম। হিজ মাস্টার্স ভয়েস বার করেছিল বেটোফোনের এগমন্ট ও কোরিওলান ওভারচার্স-এর রেকর্ড। কালো লেবেলের সেই রেকর্ডের প্রতিটি যে আট আনা (সেই সময়কার হিসাবে দু’ পেনি) দিয়ে কিনেছিলাম, সেটা মনে আছে। পরে সিম্ফনি ও কনচের্টোর বিভিন্ন নতুন রেকর্ড কিনি, তবে পয়সায় কুলোত না বলে প্রথম দিকে কোনও মাসেই একটার বেশি মুভমেন্টের রেকর্ড কেনা সম্ভব হত না।
ফিল্ম আর পাশ্চাত্য সংগীত এ দুটি ব্যাপারেই এত সময় চলে যেত যে, পড়াশোনায় তখন আর বিশেষ মন দিতে পারিনি। ট্রিগোনোমেট্রি, ফিজিকস আর কেমিস্ট্রির দাপট সহ্য করে বিজ্ঞান নিয়ে আমার কলেজ-জীবনের প্রথম দুটো বছর কোনও রকমে কাটিয়ে দিই।
কলেজের থার্ড ইয়ারে উঠেই ঠিক করি আর সায়েন্স নয়, এবারে হিউম্যানিটিজের কোনও বিষয় নিয়ে ডিগ্রি করব। বিখ্যাত রাশিবিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ আমার পিতৃবন্ধু। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের তিনি প্রধান কর্মকর্তা। তিনি বললেন, ইকোনমিকস নিয়ে যদি পড়ি তো বিএ পাস করবার সঙ্গে সঙ্গেই তার ইনস্টিটিউটে আমার চাকরি হয়ে যাবে। ‘চাকরি’ শব্দটা তখন জাদুর কাজ করত। তাতেই ভুলে গিয়ে আমি তাঁর কথায় রাজি হয়ে যাই। পরে অবশ্য এর জন্যে অনেক আক্ষেপ করেছি। ইকোনমিকস আমার একটুও ভাল লাগত না। স্রেফ মুখস্থবিদ্যার জোরে একটা সেকেন্ড ক্লাস অনার্স পেয়ে পাস করি।
আমার বয়স তখন আঠারো বছর। তখনই ঠিক করি যে, আর পড়ব না। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম যে, আমি কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হব। ঠাকুর্দা ও বাবা দুজনেই ছবি আঁকতেন। পেইন্টিং আর ইলাস্ট্রেশন, দুই ধরনের কাজই করেছেন তারা। আঁকার ব্যাপারে আমারও একটা স্বাভাবিক ঝোঁক তো ছিলই। মায়ের কথাটা তাই আমার মনে ধরল; ভেবে দেখলাম যে, ভারতীয় শিল্পবিদ্যায় হাতেখড়ি হয়ে গেলে সে নেহাত মন্দ হবে না। তবে কিনা পেইন্টার হয়ে উঠব এমন চিন্তা কখনই হয়নি, ও ব্যাপারে বস্তুত কোনও আকর্ষণই আমি বোধ করিনি।
অতএব, ১৯৪০ সালে শান্তিনিকেতনে গিয়ে সেখানকার কলাভবনে ভর্তি হই।
এবারে প্রাচ্য পৃথিবীর শিল্পকলার ঐশ্বর্যময় জগতের দরজাটা আমার চোখের সামনে খুলে গেল। চিনে ল্যান্ডস্কেপ, জাপানি কাঠখোদাই আর ভারতীয় মিনিয়েচার হঠাৎ ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিল আমার চেতনাকে। প্রাচীন শিল্পৈশ্বর্যের জন্যে ভারতবর্ষের যেসব জায়গার খুব খ্যাতি, তিনজন বন্ধুর সঙ্গে সেই সময়েই আমি সেখানে যাই। অজন্তা ইলোরা আর খাজুরাহো দেখে আমার চোখ খুলে যায়। শান্তিনিকেতনে থাকাটা আরেক দিক থেকেও আমার জীবনে খুব কাজে লেগেছিল। আমাদের ক্যাম্পাসের চারদিকেই তো গ্রামের ছড়াছড়ি। স্কেচ করবার জন্যে প্রায়ই তখন আমরা সেইসব গ্রামে চলে যেতাম। আমি শহরে জন্মেছি। বড় হয়ে উঠেছিও শহরেই। গ্রাম-বাংলার রূপ বৈচিত্র্যের সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয় ঘটল।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর বাদে কলকাতার উপরে জাপানিরা যেদিন বোমাবর্ষণ করে, সেই দিনই আমি শান্তিনিকেতন ছাড়ি। আমার শিক্ষক নন্দলাল বসুকে আমি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, পেইন্টার হবার কোনও ইচ্ছাই আমার নেই। ফলে, কোর্স শেষ না করেই যে আমি চলে এলাম, তিনি এতে বাধা দেননি। তবে বলেছিলেন যে, আড়াই বছরের মধ্যেই আমার আঁকার ক্ষমতার প্রভূত উন্নতি হয়েছে এবং জাপানি ক্যালিগ্রাফিক তুলি ব্যবহারেও আমি রীতিমত দক্ষ হয়ে উঠেছি। আমি যে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হতে চাই, এটা শুনে তিনি তাঁর শুভেচ্ছা জানান।
মূল ‘পথের পাঁচালী’ পড়বার পরে আমি তার সংক্ষিপ্ত সংস্করণটিও পড়ে ফেলি। পড়ে বুঝতে পারি যে, সংক্ষেপণের কাজটা অতি সুন্দরভাবে করা হয়েছে। তিনশো পৃষ্ঠার বইকে নামিয়ে আনা হয়েছে একশো পৃষ্ঠায়। অথচ যেগুলি প্রধান চরিত্র, তার একটিও বাদ পড়েনি, প্রধান প্রধান ঘটনাগুলোরও সবই বজায় রয়েছে। মূল বইয়ের তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ব্যয়িত হয়েছে পরিবারটির জীবনযাপনের বর্ণনায়। পরিবারটি তাদের গ্রাম থেকে কাশীতে চলে যাবার পরবর্তী যে কাহিনী, তা বর্ণিত হয়েছে আরেকটি বইয়ে। কথা প্রসঙ্গে তিনি (ডি. কে. গুপ্ত, তিনিই সত্যজিেক ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন) একদিন আমাকে বলেন যে, ‘পথের পাঁচালী’র এই যে সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, এর ভিত্তিতে চমত্কার একটা ফিল্ম তৈরি হতে পারে। কথাটা আমার মনে ধরেছিল। যাই হোক, সংক্ষিপ্ত সংস্করণের জন্য অতঃপর আমি ছবি আঁকতে লেগে যাই।
কমার্শিয়াল আট আমার জীবিকা। তারই থেকে আমার উদরান্নের সংস্থান হচ্ছে। অথচ আমার মন পড়ে রয়েছে সংগীতে আর চলচ্চিত্রে। দুটি ব্যাপারেই কিছু সহমর্মী মানুষের সন্ধান আমি পেয়েছিলাম। মোটামুটি সেই সময়েই একদিন ‘সমসাময়িক’ নামে এক ত্রৈমাসিক সাংস্কৃতিক পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ আমার চোখে পড়ে। লেখকের নাম ‘একেলা’। প্রবন্ধটিতে তিনি পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধিত্সার কথা সবিস্তারে লিখেছিলেন। ‘সমসাময়িক’-এর মাত্র দুটি সংখ্যা বেরিয়েছিল, কাগজটি তারপর বন্ধ হয়ে যায়। এটি সম্পাদনা করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী। খুবই শিক্ষিত মানুষ তিনি। খোঁজখবর করে জানা গেল যে, ‘একেলা’ তাঁরই ছদ্মনাম। এটা জানবার পরে আমি একদিন তাঁর দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটে যাই। বাড়ির ভৃত্য আমাকে বৈঠকখানা-ঘরে নিয়ে যায়। নাকের নিচে বাটারফ্লাই গোঁফ, চৌধুরীমশাই সেখানে বসে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। ঘরের এক কোণে মস্ত-চোঙা-লাগানো একটা গ্রামোফোন। কম্পটন ম্যাকেঞ্জির সম্পাদনায় ‘গ্রামোফোন’ বলে যে পত্রিকা বার হত, আমি তার গ্রাহক। তাতে এই রকমের গ্রামোফোনের বিজ্ঞাপন দেখেছি। তাই দেখামাত্র চিনতে পারলাম এটা ই. এম. জি.র একটা হাতে-তৈরি মডেল। ঘরের এক দিকের দেওয়ালে উইনস্টন চার্চিলের মস্ত একটা ছবি ঝুলছে। অন্য দেওয়ালে ঝুলছে ‘মোনা লিসা’র একটি মেডিচি-প্রিন্ট।
নিজের পরিচয় দিয়ে চৌধুরীমশাইকে জানালাম যে, ছদ্মনামে প্রকাশিত তাঁর লেখাটি আমি পড়েছি। এও বললাম যে, আমারও ওই একই রোগ, আমিও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের ভক্ত। শুনে তিনি হেসে বললেন, “যাক, আমি তা হলে একলা নই।”
চৌধুরীমশাইয়ের বাড়িতে সেদিন ঘণ্টাখানেক ছিলাম। বাঁশের পিন লাগিয়ে তিনি তাঁর গ্রামোফোন-যন্ত্রে কিছু রেকর্ড বাজিয়ে শোনালেন। তার মধ্যে হাইডনের কোয়ার্টেটও ছিল। সেটা যখন বাজছে, তখন চৌধুরীমশাইয়ের আট-বছরের পুত্রটি এসে ঘরে ঢুকে, বলে, “বাবা, এ তো ওপাস ওআন, নাম্বার ওয়ান! তা-ই না?” বলা বাহুল্য, ছেলেটি ভুল বলেনি।
উঠে আসবার আগে সেদিন জিজ্ঞেস করি যে, রেকর্ড শোনবার জন্যে মাঝে-মধ্যে তাঁর বাড়িতে আসতে পারি কি না। চৌধুরীমশাই বললেন, “যখনই ইচ্ছে হয় সন্ধ্যের দিকে চলে আসবেন।” পরে তাঁর ‘অটোবায়োগ্রাফি অভ অ্যান আনেনান ইন্ডিয়ান’ পড়ে জানতে পারি যে, সেই সময়ে খুবই কষ্টেসৃষ্টে তাঁকে সংসার চালাতে হচ্ছিল। যেদিন তাঁর বাড়িতে যাই, সেদিন অবশ্য তাক-ভরা দুষ্প্রাপ্য বই, গ্রামোফোনের পাশে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা রেকর্ড আর ছেলেপুলেদের দেখে তাঁর এই কষ্টের দিকটা আন্দাজ করা যায়নি।
একই সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয় আমারই মতো ফিল্ম-পাগল কিছু মানুষের সঙ্গে। শনিবার বিকেলে ফিল্ম দেখা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তারই সূত্রে এঁদের সন্ধান পেয়ে যাই। এঁদের মধ্যে বংশী চন্দ্রগুপ্তের—পরে যিনি আমার ছবির আর্ট ডিরেক্টর হন—নামই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সঙ্গে অবশ্য চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে আলাপ হয়নি। সেই সময়ে, মাঝে-মধ্যে ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের লাইব্রেরিতে যেতাম। এটা যেতাম বিশেষ করে ‘থিয়েটার আর্টস’ পত্রিকার সর্বশেষ সংখ্যা পড়বার জন্যে। সেখানেই বংশীর সঙ্গে আলাপ হয়। ঘাড়-অব্দি-নেমে-আসা চুল দেখে বংশীকে প্রথমটায় নাচিয়ে ভেবেছিলাম। পরে শুনলাম, নাচিয়ে নয়, আঁকিয়ে। কাশ্মীর থেকে ১৯৪৩ সালে সে কলকাতায় আসে। তারপর ক্যালকাটা গ্রুপের সদস্য হয়ে যায়। পেইন্টার হিসাবে বংশী ছিল শক্তিমান, তবে ছবি এঁকে এখন পয়সা পাওয়া যায়, তখন যেত না। বংশী অবশ্য লড়াই করবার জন্যে তৈরি হয়েই এখানে এসেছিল। আমার সঙ্গে যখন পরিচয় হয়, তখন সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এক-কামরার একটা ফ্ল্যাটে থাকে, তাতে আসবাবপত্র কিছু নেই, দু’ বেলার খাবার পাড়ার একটা রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে আসে। যেমন আমি, তেমন সেও দেখলাম চলচ্চিত্র-শিল্পের মস্ত ভক্ত, অতএব আমাদের সম্পর্কটা গোড়ার থেকেই দিব্যি জমে যায়। এ-দেশে যে-সব ফিল্ম তখন তৈরি হত, তা ছিল আমাদের দুজনেরই ঘোর অপছন্দের ব্যাপার; এবং দুজনেই ভাবতাম এ নিয়ে কিছু একটা করা দরকার।
আমাদের জীবনের সব থেকে নাটকীয় ঘটনাগুলির মধ্যে একটি হল জাঁ রেনোয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্কার। তাঁর ‘দ্য রিভার’ ছবির লোকেশন বাছাই করতে আর সেই ছবিতে অভিনয় করবার জন্য কাকে-কাকে নেওয়া হবে সেটা ঠিক করতে ১৯৪৯ সনে তিনি কলকাতায় আসেন।
ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছিল বলি। একদিন সকালবেলায় স্টেট্সম্যান পত্রিকার ব্যক্তিগত কলামের উপরে চোখ বুলোতে-বুলোতে অল্প কয়েক লাইনের একটি বিজ্ঞপ্তিতে আমার নজর আটকে যায়। তাতে বলা হয়েছিল যে, জাঁ রেনোয়া গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে রয়েছেন। ইংরেজি ভাষায় তিনি যে একটি ফিল্ম তুলছেন, তার শুটিং হবে এ-দেশে, আর সেই ছবিতে অভিনয় করবার জন্য এখানেই তিনি কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন করবেন।
আমার আপিস থেকে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। কালক্ষেপণ না করে আমি হোটেলে চলে যাই; রেনোয়ার সঙ্গে দেখা করে বলি যে, আমি তাঁর কাজের খুবই অনুরাগী। আসলে তাঁর কাজের মধ্যে তখনও পর্যন্ত একমাত্র হলিউডের ফিল্মগুলিই আমার দেখা হয়েছে, তার মধ্যে আবার ‘দ্য সাদার্নার’ ছবিটি আমার বিশেষ প্রিয়। এই ছবিটি দেখেই আমি বুঝতে পারি যে, ফিল্মের চরিত্রগুলির মধ্যে কেউ পুরোপুরি ভাল হবে আর কেউ পুরোপুরি মন্দ, এমনটা হবার কোনও দরকারই করে না, ভালয়-মন্দে মেশানো মানুষও তারা হতে পারে। বাইরের দৃশ্য দেখাতে হলে স্টুডিয়োর মধ্যে তার নকল সেট না-বানিয়ে দৃশ্যগুলির শুটিং যে বাইরে গিয়ে লোকেশন বেছে সেখানে করাই শ্রেয়, সেটাও ওই ছবি দেখে বুঝি। রেনোয়া বেশ হূদ্যতার সঙ্গেই আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। একজন ভারতীয় যে তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কে এত-সব খবর রাখে, তাতে বিস্ময় প্রকাশও করলেন তিনি। ব্রাজিলিয়ান স্ত্রী দিদো, দীর্ঘদিনের ফরাসি আর্ট-ডিরেক্টর ইউজেন লুরিয়ে আর ক্যামেরাম্যান ক্লাইড দে’ভিনাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। শুনলাম যে, আপাতত তাঁরা মাসখানেক এখানে কাটিয়ে তারপর ফিরে যাবেন। শুটিংয়ের জন্যে ফিরে আসবেন পরের বছর। ব্রিটিশ ফিল্ম ম্যাগাজিন ‘সিকোয়েন্স’-এ আমি রেনোয়ার সঙ্গে আমার এই সাক্ষাত্কারের বিষয়ে লিখেছিলাম। তাতে বলি: “রেনোয়া মানুষটি এতই বিনয়ী আর নম্র যে, আমার মনে হচ্ছিল, কথাবার্তায় যদি না অতিমাত্রায় সতর্ক থাকি তো সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে-করতে এক সময়ে হয়তো আমিই ওঁকে উপদেশ-পরামর্শ দিতে শুরু করব!”
কলকাতার কাছাকাছি জায়গাগুলোতে রেনোয়া তাঁর লোকেশন বাছাই করতে যেতেন। সেই সময়ে বার কয়েক তাঁর সঙ্গী হবার সৌভাগ্য হয়েছিল। চাকরি করতাম বলে আমার পক্ষে অবশ্য একমাত্র সপ্তাহান্তিক দিনগুলোতেই তাঁর সঙ্গে যাওয়া সম্ভব হত। দীর্ঘ পথের সারাটা সময়ই নানারকম প্রশ্ন করতাম তাঁকে। প্রশ্ন তাঁর ফরাসি ও মার্কিন, দ্বিবিধ ছবি নিয়েই। তিনি ধীরস্থিরভাবে প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দিতেন। নিও-রিয়ালিস্টদের আগেই যে তিনি সরাসরি লোকেশনে গিয়ে শুটিং করতে শুরু করেন এবং ‘দ্য রুলস্ অভ দ্য গেম’-এ ডিপ ফোকাস ব্যবহার করেন অরসন ওয়েলসের ‘সিটিজেন কেন’-এর অন্তত চার বছর আগেই, এটা আমি তাঁরই কাছে জানতে পারি। মাঠ-ময়দান, মানুষজন, পাকা বাড়ি, কুঁড়েঘর, কচুরিপানায় ভর্তি ডোবার ধারে কলাগাছের ঝাড়—এসব দৃশ্য এত খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তিনি দেখতেন যে আমার তাক লেগে যেত। কথাবার্তার মাঝখানে হঠাৎ-হঠাৎ বলে উঠতেন, ‘আঃ’ ‘উঃ’। বুঝতাম যে, মস্ত এক চিত্রকরের চোখ দিয়ে দেখেছেন বলেই বিস্ময়সূচক ওই ধ্বনিগুলি তাঁর গলা থেকে মাঝে-মাঝে বেরিয়ে আসছে। তাঁর এই প্রতিক্রিয়া দেখে আমারও চোখ খুলে যাচ্ছিল। ছবি তোলবার ভাবনাটা যে তিনিই আমার মাথায় ঢুকিয়ে দেন, তাও স্বীকার করব। আমি চলচ্চিত্রকার হতে চাই কি না, বস্তুত এই প্রশ্নটা তিনি আমাকে করেও ছিলেন। উত্তরে আমি বলি, “হ্যাঁ”। তাতে তিনি বলেন, “কোনও বিষয় পেয়েছ?” উত্তরে ‘পথের পাঁচালী’র কাহিনীটা খুব সংক্ষেপে আমি তাঁকে জানাই। ওই কাহিনী নিয়ে একটা ছবি তৈরি করার ইচ্ছেটা তো ইতিমধ্যে আমাকে পেয়ে বসেছিল। রেনোয়ার সঙ্গে গাড়িতে করে ওই যে গ্রামাঞ্চলের পথ ধরে যাচ্ছিলাম আমি, তখন ওই ছবির ভাবনাই অধিকার করে রেখেছিল আমার চিত্তকে। বড় উপন্যাসটি নয়, ভাবছিলাম তার সংক্ষিপ্ত সংস্করণের কথা, কেননা চিত্রনাট্যের সঙ্গে এটির ছিল সাযুজ্য। রেনোয়া আমাকে উত্সাহ দেন। তাঁকে আমি কয়েকটি বাংলা ফিল্ম দেখাই। তাতে তিনি বলেন, যা আমাদের বিষয়, তাতে মার্কিন চলচ্চিত্রের নকলনবিশি করা আমাদের উচিত হবে না। “হলিউডের যে জগৎ, তা থেকে তোমরা অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়াতে পারো।”
হলিউডে ফিরে যাবার আগে রেনোয়া আমাকে তাঁর একটি ফটোগ্রাফ দেন। পিছনে লেখা: “মানিক রায়কে। তার বিয়ের অপেক্ষায় থাকব। জাঁ রেনোয়া।”
আমার বড় মামার ছোট মেয়েকে আমি বিয়ে করি। ইনি আমাদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। ফিল্মে আর সংগীতে আমাদের রুচি ছিল একই জাতের। এই ধরনের বিয়েতে প্রচলিত প্রথার সায় নেই বটে, তবে আমার মায়ের তরফে এতে কোনও আপত্তি ওঠেনি। আমার রোজগার ইতিমধ্যে বেড়ে গিয়েছিল, ফলে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে উঠে যাওয়া আমাদের পক্ষে তখন আর শক্ত ছিল না। বস্তুত, বিয়ের আগেই মাকে নিয়ে আমি আলাদা ফ্ল্যাটে উঠে যাই। তবে বিবাহিত একজন লোকের থাকবার পক্ষে সেটা বড্ড ছোট। ফলে কিছুদিন বাদেই ফের আমরা ফ্ল্যাট পালটাই। এই নতুন ফ্ল্যাটটি শহরের আরও দক্ষিণ দিকে। সেখান থেকে হেঁটে আমার মামাবাড়িতে যাওয়া যায়।
পরের বছরই রেনোয়া সদলবলে শুটিং করতে আসেন। আমার বন্ধু বংশী ইতিমধ্যে গোটা দুই বাংলা ছবিতে আর্ট ডিরেক্টরের কাজ করেছিল। এবারে সে ‘দ্য রিভার’ ছবির আর্ট ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়—প্রোডাকশন ডিজাইনার লুরিয়ের অধীনে তাকে কাজ করতে হবে। হরিসাধন কাজ পেলেন রেনোয়ার একজন সহকারী হিসেবে। ছবির চিত্রনাট্যের একটি কপি আমাকে পড়তে দেয়া হয়েছিল। উপন্যাসের লেখিকা রুমার গডেনের সহযোগিতায় হলিউডে বসে রেনোয়া এই চিত্রনাট্য তৈরি করেন। রেনোয়া তাঁর শুটিংয়ের কাজ কীভাবে করেন, নিয়মিত গিয়ে সেটা দেখবার জন্য আমার আগ্রহের অন্ত ছিল না। কিন্তু ইতিমধ্যে আমাকে যেহেতু (বিলিতি এক আমদানি-কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে) আমাদের কোম্পানির আর্ট ডিরেক্টর করে দেওয়া হয়েছিল, তাই সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সপ্তাহান্তিক ছুটির দিনে মাত্র বার দুয়েক গিয়ে শুটিং দেখি। বংশী অবশ্য শুটিং শেষ হবার পরে রোজই সন্ধ্যার দিকে একবার এসে রেনোয়ার কাজকর্মের পদ্ধতির কথা বিস্তারিতভাবে আমাকে বলে যেত। আমি সে সব সাগ্রহে শুনতাম।
‘পথের পাঁচালী’র পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য কখনও তৈরি করা হয়নি। থাকবার মধ্যে ছিল শুধু একতাড়া কাগজে লেখা কিছু নোট আর কিছু স্কেচ। ছবিতে এই কাহিনী কোথায় কীভাবে ফুটবে, সেটা বোঝবার জন্য পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের দরকারও যে আমার ছিল না, তার কারণ, একে তো পুরো কাহিনীটাই আমার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল, তার উপরে আবার ডি.কে’র করা সারাংশ আর চিত্রনাট্যের মূল উপাদানের মধ্যে সাযুজ্যও ছিল কম নয়। সে-কথা আগেই বলেছি। ছবির কাহিনী থেকে মূল বইয়ের প্রচুর চরিত্র বাদ দেওয়া হয়। পুরুতঠাকুর হরিহর রায় ও তাঁর পরিবার, অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী সর্বজয়া, মেয়ে দুর্গা, ছেলে অপু, আর বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক দূর সম্পর্কের দিদি ইন্দির ঠাকরুন, হরিহরের ছেলেমেয়েরা যাকে পিসি বলে ডাকে—বাস, মূলত এই ক’টি চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ছবির কাহিনী। ছবির পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বলে মূল বইয়ের একটানা অনেক বাগিবস্তার বর্জন করে ঘটনাগুলিকে আমি একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নিই, ফলে ছবির কাহিনীতে একটা নতুন বুনট তৈরি হয়ে ওঠে। পিসিটিকে যে আমি আরও অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখি, তার কারণ আমি জানতাম যে, নানা রকমের নাটকীয় ঘটনায় ভরা ওই পরিবেশ থেকে যদি হঠাৎ তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় তো দর্শকদের পক্ষে সেটা একটা নৈরাশ্যজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। মূল বইয়ে অপুর জন্মের কিছুদিন বাদেই তিনি মারা যান। সেক্ষেত্রে ছবিতে তিনি যখন মারা যান, দুর্গার বয়স তখন দশ-এগারো। একটা বাঁশঝাড়ের মধ্যে অপু আর দুর্গা তাঁর মৃতদেহ দেখতে যায়। মৃত্যু যে কী, তা তারা সেই প্রথম জানল।
দুর্গার মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়েও একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাই। জংলা জায়গা, প্রবল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, আর তারই মধ্যে আনন্দে আত্মহারা হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে দুর্গা। ফলে নিউমোনিয়া হয়ে সে মারা যায়। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার ফলেই যে তার মৃত্যু ঘটল, মূল বইয়ে তা দেখানো হয়নি। ঝড়ের দৃশ্যের পরে-পরেই তার অসুস্থ হওয়া—এটা আমিই দেখাই। জঙ্গলের ঝড়বাদলের মধ্যে তার ওই আত্মহারা নাচ, দুর্গার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে এটাকেই আমি তুলে ধরি। দুর্গার মৃত্যুর পরে আমার কাহিনীতে ধীরে ধীরে উপসংহার টানি এবং দেখাই পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে হরিহর তাঁর পরিবার নিয়ে কাশীতে চলে যাচ্ছেন।
‘পথের পাঁচালী’র চেহারা যে সাধারণ বাংলা ফিল্মের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে, তা আমি জানতাম। ফলে দৃশ্যের পর দৃশ্যে কাহিনী কীভাবে এগোবে, সেটা দেখিয়ে দেবার জন্য পারম্পর্য বজায় রেখে বিস্তারিতভাবে আমি তার স্কেচ করে ফেলব বলে মনস্থ করি। সে-কাজ করবার পরে খেয়াল হয় যে, টাকা জোগাবার লোক পাওয়ার আগে উপন্যাসের চিত্রস্বত্বটা আমার পাওয়া দরকার। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, বিদেশ থেকে আমি ফিরে আসবার পরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ মারা যান। চিত্রস্বত্বের জন্য তাঁর অবর্তমানে এবারে আমাকে তাঁর বিধবা পত্নীর সঙ্গে কথা বলতে হবে।
যা-ই হোক, যে পরিকল্পনা আমি করে রেখেছিলাম, তাতে সবসময়েই চলচ্চিত্রে-উত্সাহী কিছু তরুণের সমর্থন আমি পেয়েছি। সেই সঙ্গে এটাও উল্লেখ করব, যে-কাজ আমি করতে চাইছিলাম এবং যে-ভাবে সেটা করতে চাইছিলাম, আমার স্ত্রীরও তাতে পূর্ণ সমর্থন ছিল। আপত্তি উঠেছিল মায়ের দিক থেকে। তাঁর আপত্তি এইখানে যে, যাতে আমার আয়ের অঙ্ক লাফিয়ে-লাফিয়ে বাড়ছে, সেই পাকা চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এমন একটা কাজ আমি করতে চলেছি, আমাদের পরিবারে আর কেউ যা ইতিপূর্বে করেননি। এদিকে আমাকে সমর্থন করে চলেছে বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর সুব্রত মিত্র। সুব্রতর বয়স তখন বছর কুড়ি। ক্যামেরাম্যান হবার বাসনা ছিল তার। সেই জন্যই, রেনোয়ার অনুমতি নিয়ে সে ‘দ্য রিভার’ ছবিতে রেনোয়ার কাজ নিয়মিত দেখেছে।
নানা ধরনের, নানা মেজাজের বই লিখেছেন বিভূতিভূষণ। তার মধ্যে কয়েকটি তো তাঁর মস্ত কীর্তি। তবে তাঁর অবস্থা বিশেষ সচ্ছল ছিল না। দেশের নানা জায়গায় নানা রকমের কাজ করবার পরে তিনি স্কুল-মাস্টারির কাজ করতে শুরু করেন। বিভূতিভূষণের জন্ম ব্রাহ্মণ-বংশে। ‘পথের পাঁচালী’র অপুর বাবার মতো বিভূতিভূষণের বাবার বৃত্তিও ছিল যজমানি। অল্পবয়সে বিভূতিভূষণের বিয়ে হয়েছিল, তবে বিয়ের পর এক বছরের মধ্যেই তাঁর স্ত্রী-বিয়োগ হয়। তারও বাইশ বছর বাদে তিনি দ্বিতীয় পত্নী গ্রহণ করেন।
‘পথের পাঁচালী’র চিত্রস্বত্ব নিয়ে কথা বলবার জন্য আমি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধবা স্ত্রী শ্রীমতী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাই। বইখানার সংক্ষিপ্ত সংস্করণের জন্য আমি যে-সব ছবি এঁকে দিয়েছিলাম, ভদ্রমহিলা জানালেন যে, সেগুলি তাঁর খুবই ভাল লেগেছে। একই সঙ্গে বললেন যে, আমার বাবা আর ঠাকুর্দার লেখারও তিনি মস্ত ভক্ত। আমাদের প্রতি তাঁর ব্যবহার ছিল খুবই সৌজন্যপূর্ণ। ফিল্ম তুলবার জন্য যে টাকা দরকার, সেটা যদি আমাদের জোগাড় হয়ে যায়, তো চিত্রস্বত্ব নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না, এই আশ্বাসও তাঁর কাছে পাওয়া গেল। শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই চণ্ডীদাস চট্টোপাধ্যায় বললেন, আমাদের কাজ কীভাবে এগোচ্ছে, সে-বিষয়ে তাঁকে যেন ওয়াকিবহাল রাখি। এর পরে আমরা প্রযোজক খুঁজতে লেগে যাই।
প্রথমে যাই মিঃ বি.এন. সরকারের কাছে। হলিউডের দুনিয়ায় লুই বি. মেয়ারের যে-রকমের নামডাক, বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে নিউ থিয়েটার্সের মিঃ সরকারের খ্যাতি অনেকটা সেই রকমের। ভদ্রলোক আস্ত একটা স্টুডিয়ো আর ল্যাবরেটরির মালিক, তার উপরে আবার বাংলা সিনেমার নামজাদা সব অভিনেতা-অভিনেত্রী আর ডাকসাইটে সব পরিচালক তাঁর কাছে বাঁধা-মাইনের চাকরি করেন। মিঃ সরকারের সেই আগেরকার প্রতিপত্তি অবশ্য সেই সময়ে আর ছিল না, তবে গিয়ে-গিয়েও যেটুকু যা ছিল, তাও নেহাত কম নয়। স্কেচবুকখানা সঙ্গে নিয়ে আমি একদিন তাঁর আপিসে গিয়ে দেখা করি। মিঃ সরকার অতি সজ্জন, খুবই সহূদয়ভাবে আমাকে তাঁর ঘরে বসিয়ে আমার যা বক্তব্য সবই মন দিয়ে শুনলেন, তারপর দুঃখপ্রকাশ করে বললেন যে, তিনি দুঃখিত, কিন্তু সদ্য একটা বড় রকমের প্রোডাকশনে তিনি হাত দিয়েছেন, সুতরাং ঠিক এক্ষুনি তিনি আমাকে সাহায্য করতে পারছেন না। তারপর সস্নেহে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ছ’মাস বাদে আমি যেন তাঁর সঙ্গে আবার দেখা করি, তখন তিনি নিশ্চিত আমাকে সাহায্য করবার চেষ্টা করবেন।
এর পরে যে সচ্ছল প্রযোজকের কাছে যাই, তিনি হলেন কল্পনা মুভিজের মিঃ ভট্টাচার্য। ছবিটা আমি কীভাবে তুলতে চাইছি, তিনি তা শুনলেন, আমার করা স্কেচগুলিও দেখলেন, তারপর বললেন যে, হ্যাঁ, এ-ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ রয়েছে। তবে কিনা, মনঃস্থির করবার জন্য দিন দশেক সময় চাই। ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হল, একটু যেন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বললাম, ঠিক আছে, দশ দিন বাদে আবার আমি যোগাযোগ করব। এর তিনদিন বাদেই বিভূতিভূষণের শ্যালক চণ্ডীদাস চাটুজ্যে মশাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন যে, ওঁরা একটা সমস্যায় পড়ে গেছেন। কী সমস্যা? না ‘পথের পাঁচালী’র চিত্রস্বত্ব নিয়ে কথা বলবার জন্য কল্পনা মুভিজের মিঃ ভট্টাচার্য গিয়ে শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। নামজাদা ডিরেক্টর দেবকী বসুকে দিয়ে তাঁরা ছবিটা তোলাবেন। শুনে, উত্কণ্ঠাভরে জিজ্ঞেস করলাম, “মিসেস ব্যানার্জি তাতে কী বললেন?” চণ্ডীবাবু বললেন, তিনি তাতে রাজি হননি। মিঃ ভট্টাচার্যকে তিনি বলে দিয়েছেন যে, এ-ছবি সত্যজিৎ রায়ই তুলবেন; আর কেউ এ ছবি তুলুন, এটা তিনি চান না। প্রযোজকের তালিকা থেকে মিঃ ভট্টাচার্যকে অতএব ছাঁটাই করতে হল।
দ্বিতীয় দফার এই নৈরাশ্যের পরে এল তৃতীয় দফার নৈরাশ্য। এবারে যে প্রোডিউসারটি আমার বাড়িতে আসেন, দেখতে বেশ হূষ্টপুষ্ট হলেও বস্তুত তিনি ডায়াবেটিসের রোগী। চিত্রনাট্য শুনতে-শুনতে তিনি-তিন বার তিনি আমাকে বাধা দেন, কেননা তাঁর টয়লেটে যাবার দরকার হয়েছিল। চিত্রনাট্য তাঁর পছন্দ হয়, কিন্তু যে-ছবি একেবারেই গতানুগতিক নয়, তার পিছনে টাকা ঢালবার মতন উত্সাহ তাঁর ছিল না।
এই সব অভিজ্ঞতার ফলে আমি একটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে যাই। এই সময়ে একদিন আশিস বর্মন এসে আমাকে বলেন যে, কেটারিং ব্যবসায় অনিল চৌধুরি বলে এক ভদ্রলোক তাঁকে সাহায্য করেন, আর এই অনিল চৌধুরীর সঙ্গে এক অল্পবয়সী প্রযোজকের চেনাশুনো রয়েছে। সদ্য ইনি একটা নতুন ছবিতে টাকা ঢেলেছেন, এখন আমার কাজে টাকা ঢালতেও এঁকে হয়তো রাজি করানো যেতে পারে।
অনিল চৌধুরির সঙ্গে পরিচয় হল। ভদ্রলোক মোটামুটি আমারই বয়সী। কথা বলে মনে হয় বুদ্ধিমান মানুষ। অনিলবাবু আমাকে তাঁর সেই প্রোডউসার বন্ধুর কাছে নিয়ে যান। তিনি তখন মদ্য কলকাতার এক জনাজীর্ণ হোটেলে থাকতেন।
‘পথের চাঁচালি’র চিত্রনাট্য দেখে অনিলবাবু খুবই উত্সাহিত হয়ে ওঠেন। তাাঁর বন্ধু মিঃ দাসের কাছ থেকে কিন্তু স্টপষ্ট কোনও আশ্বাস পাওয়া গেল না। পরে তিনি অনিলবাবুকে বলেন যে, তাঁর প্রযোজিত যে ছবিটি সদ্য মুক্তিলাভ করেছে, তার থেকে ভাল রকমের লাভ হলে আমাদের ছবিতে তিনি টাকা খাতাটতে পারবেন। কিন্তু তাঁর সেই ছবিতে লাব হল না, সেটা একেবারেই মার খেয়ে গেল। ফলে দাসও জানালেন যে, আমাদের ছবির জন্য টাকা দেওয়া তাঁর পক্ষো সম্ভব হবে না। অবশ্র অনিলবাবু আমার সঙ্গে রয়ে গেলেন।
কিন্তু এত সব যে ধাক্কা খাচ্ছিলাম, আমর উত্সাহ তাতেও ঝিমিয়ে যায়নি। প্রযোজক ধরবার চেষ্টা চালাতে-ছালাতেই আমি কোন চরিত্রে কে অভিনয় করবেন, টো নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করতে থাকি। আমি চাইছিলাম এমন সব অভিনেতা-অভিনেত্রী, যাঁর পেশাদার নন। আবার একই সঙ্গে এটাও আমি বুঝতে পারছিলাম যে, কয়েকটি চরিত্রে— যেমন বাবা মা আর বুড়ি পিসির চরিত্রে- অভিনয় করবার জন্য পেশাদারি দক্ষতার দরকার হবে। ‘বাইসিকল থিম’-এ যাঁকে বৈবজ্ঞের ভূমিকায় নামানো হয়েছিল, তিনিই ছিলেন ও-ছবির একমাত্র পেশাদার অভিনেত্রী। মা সর্বজয়ার ভূমিকায় আমি সে-ক্ষেত্রে আমার এক বন্ধুপত্নীকে দিনে অভিনয় করার বলে ঠিক করি। ইতিপূর্বে ইনি মঞ্চে বার কয়েক অভিনয় করেছেন। গ্রামের বউ-মানুষ বলতে যা বুছি, এই ভদ্রমহিলা অবশ্য মোটেই সেই গোত্রের নন। ইনি শহুরে পরিবারের গ্র্যাজুয়েট মহিলা। তা সে যা-ই হোক, আমার মনে হয়েছিল যে, চেহারার দিক থেকে ওই ভূমিকায় এঁকে ঠিকই মানিয়ে যাবে। এঁর জামাকাপড় যদি বেখাপ্পা না হয়, সেইসঙ্গে গ্রামে এই জাতীয় চরিত্রের পক্ষে যে-কাজ যেভাবে করা স্বাভাবিক, সেই কাজ যদি সেইভাবে করিয়ে নেওয়া হয় এাঁকে দিয়ে, আর সংলাপের কথাগুলো যদি ইনি ঠিকঠাক বলতে পারেন, তা হলে আর কোনও অনুবিধা হবে না। বাবার ভূমিকায় আমরা কানু বন্দ্যোপাদ্যায়কে নেব বলে মনস্থ করি। ইনি পেশাদা রঅভিনেতা। নাটক আর চিব, দুই ক্ষেত্রে অবিনয়েরই অবিজঅ াএঁর আছে। হরিহরের চরিত্রে এঁকে চমত্কার মানাবে।
পুত্রকন্যার ভূমিকায় কারা অভনয় করবে, এবারে চলতে থাকে তার খোঁজ। আমার চই বছর-ছয়েকের একটি ছেলে, আর মোটামুটি এগারো-বআরো বছরের এটি মেয়ে। ভারতে চিত্রাভিনয় শেখাবার কোনও ব্যবস্থা তখন ছিল না। সেটা থাকলে শিক্ষার্থীদের ছবির অ্যালবামও পাওযা যতে আর তা থেকে বাছাই ও করে নেওয়া যেত। শিশু-অভিনেতা খুঁজে বার করবার উপায মাত্র দুটি। হয় ইস্কুলে-ইস্কুলে ওই বয়সে শিশুর খোঁজ করো, আ নয়তো কাগজে বিজ্ঞাপন দাও। ইস্কুলে খোঁ৮ করার পরিশ্রমটা অপুর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হল। ফলে আমরা এই মর্মে একটা বিজ্ঞাপন দিলাম যে, অভিভাবকরা তাঁদের ছ’-সাত বছর বয়সের ছেলেদের নিয়ে যেন অমুক দিন অমুক সময়ে অমুক ঠিকানায় চলে আসে। ছেলটির রং হওয়া চাই ফর্সা, চেহারা হওয়া চাই সুশ্রী, তা ছাড়া অভিনয়ের একটা স্বাভাবিক ক্ষমতাও তার থাকা চাই। আমাদের ফ্ল্যাটটি ছোট। সেখানে ইন্টারভিউ নেওয়া সম্ভব নয় বলে একটা বড় মাপের ঘরের ব্যবস্থা করতে হল। ঘরটা যার মাধমে পাই, সেও ছাত্র। তার সঙ্গে আমার মিল এইখানে যে, যেমন আমি তেমন সেও চলচ্চিত্র আর পাশ্চাত্ত্য ধ্রুপদী সংগীতের অনুরাগী।
আর তার পরে-রেই হঠাৎ আমার স্ত্রী একদিন অপুর দেখা পেয়ে যান। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে খেলার মাঠে ছেলেটি তার দাদা আর বন্ধুদের সঙ্গে খেরা করছে, এই সময়ে সে তাঁর চোখে পড়ে। আমাকে ডেকে দেখাবামাত্র বুঝলাম যে, তাঁর ভূল হয়নি। চেহারার দিক থেকে অপুর ভূমিকায় এক চমত্কার মানাবে।
ছেলেটির নাম সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়। ইস্কুলে যায়? হ্যাঁ। মঞ্চে উঠে কখনও অভিনয় কিংবা আবৃত্তি করেছে? না। একটা ছবির মুখ্য কোনও ভূমিকায় যদি তাকে অভিনয় করতে বলা হয়, তো কেমন লাগবে তার ? এ ব্যাপারে তার নিজের কোনও মতামত আছে বরে মনে হল না। বাবা-মা যদি রাজি হন তো সেও রাজি। “মা যা করতে বলবেন, ত-ই করব।”
দুর্গার খোঁজ পওয়াটাও ধেখা গেল একই রকমের শক্ত ব্যাপার। মেষে পর্যন্ত অবশ্য আশিস বর্মন এসে একটা আশার কথা শোনালেন। মেয়েদের একটা ইস্কুলের এক শি্ষয়িত্রীকে তিনি চেনেন। সেখানে গিয়ে তিনি এমন একটি ছাত্রীর দেখা পেযেছেন, দুর্গার ভূমিকায় যাকে নাকি দিব্যি মানিয়ে যাবে।
বর্মন ঠিকই বলেছিলেন। খোঁজ খবর করে জানা গেল যে, মেয়েটির বাব এককালে ফুটবল খেলতেন। বুক ডিজাইনার হিসাবে আমার খ্যাতির কথা তিনি শুনেছেন, যে- কোনও রবিবারের সকালে যদি তাঁর বাড়িতে যাই তো এই নিয়ে তিনাি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। তা-ই গেরাম, মেয়েটি বাপ-মা’র সঙ্গে কথা বললাম, চা খেরাম। উমা দাশগুপ্ত তাঁদের ছোট মেয়ে। তাকে দেখবামাত্র টিক করে ফেললাম যে, ছবিটা তোলা আদৌ যদি সম্ভব হয় তো দুর্গার ভূমিকায় ঋকেই নামাব। লাইকা ক্যামেরাটা সঙ্গেই ছিল। বারি ছাতে গিয়ে সেই ক্যামেরা দিয়ে মেয়েটির কয়েকটি চবি তুলি। মেয়েটি একটু লাজুক প্রকৃতির। অথচ দুর্গা তো ওই যাকে বলে দস্যি-মেয়ে। উমাকে তাই ভেংচি কাটতে বলি। তা মুখবিকৃতি করতে মেয়েটির কোনও সংকোচ দেখা গেল না।
অপুর আর দুর্গার ঝামেরা তো মিটল। বাকি রইলেন বুড়ি পিসি। মনে হল তাঁর খোঁজ আর-একটু সময় নিয়ে করলেও চলবে। প্রযোজক যদি জোগাড় হয়ে যায় তো বাচ্চা দুটিকে নিয়ে শুটিংয়ের কাজ শুরু করে দেব। এমন বিস্তর দুশ্য তো রয়েছে, যখানে শুধু ওই বাচ্চা দুটিই থাকবে, আর-কেউ থাকবে না।
‘পথের পাঁচালি’র বাজেট ছিল মাত্র সত্তর হাজার টাকার। কিন্তু এই যে, সামান্য অঙ্কের বাজেট, এটা দেখেও মামুলি অনেক প্রযোজকের মনে হয়েছিল যে, বড্ড বেশি ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। “আপনাদের ছবিতে না আছ স্টা, না আছে গান, এমনকি মারপিটের দৃশ্যও নেই। তা হলে এত খরচা হবে কেন? অঙ্কটাকে আর -একটু নামিয়ে আনতে পারেন না?”
এই সব শুনে, খরচ কমাবার জন্যে এমন সব উপাযের কথা আমার মাথায় আসে, তখনকার দিনে যা একেআর উাদ্ভাট বলে গন্য হত। ঠিক করলাম যে, আমাদের শুটিং করব শোলো মিলিমিটারে, তারপর হল-এ মুক্তিলাভের সময় সেটাকেই পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারে ‘ব্লো আপ’ করে নেব। তাতে খরচ পড়বে অর্ধেকেরও কম। তা যদি হয়, তবে একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?
সে এক দারুণ উত্তেজনার সময়। এক বন্ধু একটা ‘বোলেক্স’ ধার দেন। সেইসঙ্গে কিছু নেগেটিভও কিনে ফেলা হয়। তারপর সেইসব নিয়ে, পরীক্ষামূলক কিছু শত নেবার জন্যে, আমরা একটা গ্রামে চলে যাই। সুব্রত মিত্র াতো ক্লড নোয়ার কাজ দেখবার সুযোগ পেয়েছিল, সেও আমাদের সঙ্গে যায়। এটা ইতিমধ্যে ঠিক করে ফেলছিলাম যে, সে-ই হবে এ-ছবির ক্যামেরাম্যান। শুনে সে প্রথমটায় একটু গঁইগুঁই করেছল। তাতে তাকে বকুনি দেয বলি, “এতে এত ভাববার কিছু নেই। স্টিটল ফোরেটাগ্রাফির ব্যাপাটা তুমি ভলই জানো। এই যেত লোকেশনে গিয়ে বুভি ক্যামেরায় ছবি তোলা, এটা তো তারই ঠিক পরের ধাপ। মিটার দিয়ে আলোটা মেপে নেবে, তারপর লেন্স আর অ্যাপারচারের ঢাকনা সরিয়ে তুলে যাবে তোমার চবি। ক্যামেরার কাজের রহস্য নিয়ে পেশাদার ফোটেগ্রাফারার যে০-সব বড়-বড় কথা বরেন, তা সে ফ অর্থহীন বুকনি ছাড়া আর কিস্যু নয়।”
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধায় শেষ জীবনে যেখানে শিক্ষকতা করতেন, তাঁর প্রিয় সেই গোপালনগর গ্রামটাই আমরা বেছে নিই আমাদের কাজের জন্য। বইয়ের মধ্যে যে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের কথা তিনি বলেছেন, তারই মেজাজ রয়েছে এই গোপালনগরে। তখন একেবারে ভরা বর্ষার সময়। হাঁটুভর কাদা ভেঙে আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। তারপর একটা পুকুরে পা ধুয়ে মুরু করলাম আমাদের ফোটোগ্রাফি। ক্যামেরার কাজ আমি সেদিন নিজেই করি। বাইরের উঠোনের এদিকে একটা বাঁশঝাড়। তার মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে। ম্লান হয়ে এসেছে দিনের আলো। উচ্ছাকৃতভাবে সেই ম্লান আলো আর সেই বৃষ্টির মধ্যেই আমি ছবি তুলেছিলাম। তোলা হয়েছিল আশপাশের কিচু ডিটেলসের দৃশ্রও। বাতাসে কাঁপছে পদ্মাপাতা, পুকুরের জলে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, হাওয়া লেগে কলার পাতা দুলছে, এই রকমের কয়েকটা দৃশ্য সেদিন তুলে নেওয়া হয়।
ষোলো মিলিমিটারে দেখা গেল, ছবিগুলি একেবারে চমত্কার এসেছে। যেমনটা ভেবেছিলাম, ঠিক সেইরকম। কিনত কলকাতায় তো একে পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারে ব্লো আপ করবার কোনও ব্যবস্তা নেই, তাই বোম্বাইয়ের এক ল্যাবরেটরিতে এগুলো পাঠাতে হয়। যখন সেগুলিফিরে এল, তখন দেখলাম, কৌশলটা আদপেই খাটেনি। প্রতি সেকেন্ডে চব্বিশটা ফ্রেম, এই স্পিডে একটা দারুন গোলমাল বাধিয়েছে। বোম্বাইয়ের ল্যাবরেটরিকে এই নিয়ে প্রশ্ন করে জানা গেল, তাঁরা তাঁদের সাধ্যমতো কাজ করেছেন। অর্থ্যাৎ সমস্যাটা রযেই গের, অবস্থা সেই যথাপূর্বম।






