ইংরেজদের কলে তৈরি সবচেয়ে সূক্ষ্ম সুতার চেয়েও সূক্ষ্ম সুতায়, হাতে বোনা মসলিন বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর বস্ত্র হিসেবেই রয়ে যাবে।
এখন থেকে ঠিক ২০০ বছর আগে ১৮১৭ সালে যখন ইউরোপে ১ টাকার মসলিনও রফতানি হয়নি, সামান্য কিছু পাঠানো হয়েছে জেদ্দা ও বসরায়, ধরে নেয়া হয়েছে মসলিনের মৃত্যু ঘটেছে। ফোর্ট উইলিয়ামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব বিভাগও চিন্তিত হয়ে পড়ে। ঢাকার মসলিনের বর্তমান অবস্থা ও মসলিন বাণিজ্যের দুরবস্থার অবসান ঘটানোর জন্য কী করা যায়, তা জানতে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৪ সালে ঢাকার কমিশনারকে নির্দেশ দেয়া হয়। তখন নিয়মিত কমিশনার না থাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন আই ডানবার। ২২ মে তিনি পত্রাকারে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন পাঠান।
ঈষৎ সংক্ষেপে ডানবারের প্রতিবেদনটি অনুসৃত হলো এবং সে সঙ্গে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’ গ্রন্থ থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ও উপস্থাপন করা হলো।
ইংরেজরা মসলিন তাঁতিদের আঙুল কেটে দিয়েছিল, এটি যে কেবলই একটি মিথ, ডানবারের প্রতিবেদন এবং কোম্পানির রাজস্ব বিভাগের উদ্বেগ তা প্রমাণ করে। আবদুল করিমও মনে করেন আঙুল কাটার মতো ঘটনা ঘটার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
মসলিন সুতার উত্স ঢাকার ফুটি কার্পাস জমি হয় জঙ্গলে ঢেকে যাচ্ছে, নতুবা কম মূল্যমানের কৃষিপণ্যের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে। ডানবার বললেন, এ জমিতে নীল চাষ হোক, হোক কুসুম তেলের বীজের চাষ। বাংলার চাষীদের জন্য নীল আরেক বেদনার অধ্যায়।
ঢাকা কমিশনারের পত্র তারিখ: ২ মে ১৮৪৪
প্রেরক: আই ডানবার
ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ঢাকা
প্রতি: সদর বোর্ড অব রেভেনিউ
ফোর্ট উইলিয়াম
মহোদয়গণ
আমি যথাযথ সম্মানের সঙ্গে আপনাদের বোর্ডের ৬ ফেব্রুয়ারির ৩০ নং স্মারকের পত্রটি গ্রহণ করেছি, সে সঙ্গে বিগত মাসের ২৯ তারিখের পত্রটিও— যাতে ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন তন্তুর বর্তমান অবস্থা এবং এর বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য জরুরি কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
আমি কালক্ষেপণ না করে মিস্টার আই এ প্রাইমের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করি কিন্তু তিনি আমাকে কোনো তথ্য সরবরাহ করতে সমর্থ হননি, যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমি প্রতিবেদন প্রণয়ন করব। আমার দাপ্তরিক পত্রের জবাবে তিনি সংক্ষেপে কেবল জানিয়েছেন তার অভিমত হচ্ছে, ঢাকার মসলিনের পুনর্জাগরণের তেমন কিছু করার নেই, কারণ একই ধরনের ইংরেজি পণ্য চরম সস্তা। স্থানীয় ক’জন মসলিন কাপড় উত্পাদনকারী ও শহরের ক’জন ডিলার আমার অনুরোধে উপস্থিত হয়েছেন। যেসব প্রশ্ন তাদের জিজ্ঞেস করা সমীচীন বলে আমি মনে করেছি, তারা তার খোলামেলা জবাব দিয়েছেন। ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী সর্বজনাব ল্যাম্ব, টেয়লর ও ওয়াইজ, যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞও আমাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। এসব উত্স থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে ঢাকার মসলিন শিল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এই প্রতিবেদন দাখিল করতে সমর্থ হয়েছি। আমি মনে করি আমি যা লিখেছি সাধারণভাবে বলতে গেলে, তা যথার্থ শুদ্ধ এবং এর ওপর নির্ভর করা যায়।
১৭৮৯ থেকে ঢাকায় কাপড় উত্পাদনের চাহিদা কমে গেছে। এখানে উত্পাদিত যে কাপড় ঢাকার আড়ং থেকে ইউরোপে রফতানি হতো ১৭৯৯ সালে তার আর্থিক মূল্য ছিল ১২ লাখ ৫৬ হাজার ১৬০ টাকা ১৫ আনা ৭ পয়সা।
১৮১৩ সালে এ রফতানি সাড়ে ৩ লাখ টাকা ছাড়াতে পারেনি। ১৮১৭ সালে ঢাকা থেকে ইউরোপে মসলিন রফতানি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে আসে। তখনই কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি অবলুপ্ত হয়।
তখন থেকে ঢাকার কাপড়ের বাণিজ্য কেবল ভারতীয় বাজার এবং জেদ্দা ও বসরায় সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে ঢাকার কাপড় উত্পাদনকারীদের নিচের কয়েকটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়।
প্রথমত. সূক্ষ্ম মসলিন, সাদামাটা ও ফুলেল, ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা সূক্ষ্মতম (২৫০) সুতার চেয়ে সূক্ষ্ম দেশী কাটা সুতায় তৈরি, আংশিক মুসলমান তাঁতিদের তৈরি, প্রধানত হিন্দু তাঁতিদের। সবচেয়ে সূক্ষ্ম সুতায় বোনা মসলিন পাঠানো হতো দিল্লির দরবারে, লক্ষৌ, লাহোর, নেপালে আর দেশের অভ্যন্তরে মুর্শিদাবাদ ও রংপুরে। এই ধরনের কাপড় বছরে অর্ধলক্ষ টাকায় তৈরি হতো। ডক্টর উরে মনে করেন, মসলিনের সমকক্ষ কোনো কাপড় ইংল্যান্ড প্রস্তুত করতে সমর্থ নয়। আগের মতো গুণসম্পন্ন মসলিন তৈরি করা সম্ভব নয় বলে যে মনে করা হয়, তাও যথার্থ নয়।
দ্বিতীয়ত. পোশাক হিসেবে ব্যবহূত মধ্যম মানের কাপড়। ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা ৪০ থেকে ২০০ সুতায় মূলত হিন্দু তাঁতিরা এ পোশাক তৈরি করে থাকেন। এপার বাংলায় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দু ও মুসলমান— উভয় ধর্মাবলম্বীরা এ পোশাক পরিধান করে থাকেন। এছাড়া কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা, রংপুর, দিনাজপুর ও অন্যান্য জেলায় রফতানি করা হয়। এ ধরনের পোশাক বাণিজ্যেই সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়ে থাকে। বছরে এ বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ টাকা। তবে ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা সুতার দাম বাদ দিলে থাকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
তৃতীয়ত. মিশ্রিত কাপড় সিলেট ও আসাম থেকে আমদানি করা তুলা মুগা ও তসুর রেশমের সুতায় তৈরি। ৪০ থেকে ১০০ মাপের ইংরেজি সুতাও এ কাপড়ে ব্যবহার হয়। মূলত হিন্দু নারীরা কাপড় তৈরি করেন এবং ঢাকায় মুসলমান নারীরা তাতে এম্ব্রয়ডারির কাজ করেন। কাপড় রফতানি হয় জেদ্দা ও বসরায়। কলকাতায় ৩ শতাংশ রফতানি শুল্ক আদায় করা হয়। বিদেশের বন্দরে ঢাকা ও কলকাতার ব্যবসায়ীদের ১০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। মূলত আরবীয় ও মেসোপটেমীয় অধিবাসীরা এই পোশাক ক্রয় করে থাকেন। মক্কায় বৃহৎ বার্ষিক মেলার সময়ও বিক্রি হয় (সম্ভবত হজের কথা বলা হয়েছে)। এটি ২ লাখ টাকার ব্যবসা হলেও গত কয়েক বছরে তা অনেকটাই নেমে গেছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এর কারণ। ২ লাখ টাকার একটি বিভাজন:

চতুর্থত. স্বর্ণ ও রৌপ্য তন্তুতে এম্ব্রয়ডারি করা এ কাপড় পাগড়িতে ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবসাটি পুরোপুরি মুসলমানদের হাতে। এর পরিমাণ বার্ষিক ১৬ হাজার টাকা। ভারতের উজান রাজ্যগুলোয় এবং কখনো কখনো ইউরোপে রফতানি হয়।

পঞ্চমত. মসলিন ও কাশ্মীরি শাল ও ওড়না। ইউরোপে রফতানি হয়। ব্যবসায়ের আকার বার্ষিক ২০ হাজার টাকা।
শাল ও মসলিনের দাম ৮,০০০ টাকা।
সিল্কের দাম ও কারিগরের বেতন ১২,০০০ টাকা।
ষষ্ঠত. শাড়ি, ধুতি— মুসলমান তাঁতি, নিম্নবর্ণ হিন্দু তাঁতিদের তৈরি। এর বাজার বার্ষিক ৫০ হাজার টাকা। ফরিদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ত্রিপুরায় এর উত্পাদন হয়ে থাকে।
ঢাকার বিদেশ বাণিজ্যের অবলোপনের কারণ ইংল্যান্ডের উত্পাদন ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার। সাধারণ হ্যান্ডলুম কারখানায় যে খরচ পড়ে, ইংল্যান্ড তার চেয়ে অনেক সস্তায় তন্তু বয়ন এবং কাপড় প্রস্তুত করতে পারে। ভারতে শ্রম ব্যয় এত কম হওয়ার পরও যন্ত্রের উত্পাদনের সঙ্গে তা কুলিয়ে উঠতে পারে না। একই কারণে অতীতে শিল্পের অন্যান্য শাখায় রফতানি বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতা কাটার কাজে আগে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হতো, কিন্তু সুলভ ও সস্তা ইংলিশ সুতা আসার পর একই মানের জিনিস অনেক সস্তায় পাওয়ায় এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ঢাকায় প্রতি বছর ৩ লাখ টাকার ইংলিশ সুতা আমদানি হচ্ছে। সুতাকাটা শিল্প বয়ন শিল্পের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সস্তা ইংলিশ কাপড় উভয়কে মার দিয়েছে। এখন প্রতি বছর ঢাকায় দেড় লাখ টাকার ইংলিশ কাপড় আমদানি হচ্ছে। এই কাপড়গুলো স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত কাপড়ের মতো টেকসই না হলেও এটা ক্রেতার বিবেচনায় আসছে না। তারা তাদের আসন্ন চাহিদা সবচেয়ে কম ব্যয় করে মেটাতে চায় বলেই আমদানি করা কাপড়ের চাহিদা বেড়ে গেছে।
ব্রিটিশদের দক্ষতা ও যন্ত্রনির্ভর শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে ঢাকার উত্পাদন খাতের ক্রমাবনতি ঘটছে। ভারতীয় মসলিনের ব্রিটেনের বাজারে ঢোকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করারোপ (ডানবার মনে করেন যা প্রায় আমদানি নিষেধাজ্ঞার সমতুল্য) মসলিনের পতনের অন্যতম কারণ। ইংলিশ কাপড় উত্পাদনকারীরা এখনো শৈশব পর্যায়েই, ঢাকা থেকে রফতানি করা কাপড় নিঃসন্দেহে তাদের ব্যবসায়ের ওপর বৈরী প্রভাব ফেলত, কিন্তু ক’বছর আগে তাদের শুল্ক অত্যন্ত কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডে ভারতীয় মসলিনের চাহিদা বৃদ্ধি ঘটেনি। যদি ইংল্যান্ডের কাপড় উত্পাদনকারী শুল্ক একেবারে উঠিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সন্দেহ নেই তুলনামূলক সস্তা হওয়ার কারণে ব্রিটিশ মসলিন ইউরোপ থেকে ঢাকার মসলিনকে একেবারে হটিয়ে সে বাজার দখল করে নিতে পারবে।
যেসব কারণে ঢাকার কাপড়ের বাণিজ্য মার খেয়ে গেছে, তার মোকাবেলা করা কিংবা সরকারের কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে তা থেকে পরিত্রাণ লাভের কোনো উপায় নেই... এর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে কিছুই করার নেই।
ভারতে উত্পাদিত তুলা থেকে ব্রিটেনে তৈরি সুতা বাংলায় কাটা সুতার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করা হয়, ইংলিশ উত্পাদনকারীর দ্রব্য ভারতে আমদানির ওপর প্রায় নিষেধাজ্ঞার কাছাকাছি শুল্ক আরোপ করা যায়, তাহলে ঢাকার শিল্প পূর্বাবস্থায় ফিরতে পারে। এটা প্রত্যাশিত কোনো পদক্ষেপ নয় কাজেই আমরা এই উপসংহারে পৌঁছতে পারি যে, ঢাকার মসলিন এমনই জরাগ্রস্ত যে, কালক্রমে এর অবস্থা আরো খারাপ হতে হতে সূক্ষ্ম বয়ন শিল্প একসময় সম্ভবত হারিয়ে যাবে আর প্রাচ্যের রাজপুরুষ ও বিশিষ্টজনের আদৃত এবং পৃথিবীর যেখানেই দেখা গেছে প্রশংসিত ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের নামও আর উচ্চারিত হবে না।
কাপড় উত্পাদনজনিত বাণিজ্যের কারণে ঢাকার যে সমৃদ্ধি যদিও তা বিলীন হয়ে গেছে এবং যদিও এটা সত্য যে এ বিলুপ্তির পুনর্জাগরণের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, নিঃসন্দেহে কিছু সহায়তা করার সুযোগ তো রয়েছে আর তা হচ্ছে ইউরোপীয় উত্পাদনকারীদের এখান থেকে পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহ। এক্ষেত্রেই সবচেয়ে জনহিতকর সহায়তাই সম্ভব এবং সরকারের সম্পদ সর্বাধিক সুবিধার জন্য এ খাতে বিনিয়োগ করা যাবে। এখানে উত্পাদিত বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য ইউরোপে একটি তৈরি বাজার পেতে পারে। নীল ও কুসুম ফুল বীজ (সানফ্লাওয়ার) এরই মধ্যে জেলায় পরিচিত করানো হয়েছে পোশাক উত্পাদনের জন্য বিনিয়োগ করা যে মূলধন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে, তার খানিকটা ক্ষতিপূরণ এতে করা যাবে। তবে তুলা চাষের জন্য জেলার জমি যতটা উপযুক্ত এ রকম অন্য কোনো স্থানীয় কৃষিপণ্য শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ঢাকা জেলার (মসলিনের) যে কাঁচামাল উত্পাদিত হতো, তার সমকক্ষ কিছু ভারতের অন্য কোথাও উত্পন্ন না হওয়ায় ঢাকার উত্পাদনকারী সেলিব্রিটির মর্যাদা পেয়েছে। স্থানীয় তুলার মতো মূল্যবান ও বিচিত্র ধরনের কোনো পণ্য পাওয়া গেলে পতিত ও জঙ্গলে পরিণত হওয়া বিশাল কার্পাস জমি অথবা কম গুরুত্ব ও কম মূল্যবানের পণ্যের দখলে চলে যাওয়া এই জমি ইংল্যান্ডে রফতানি করার মতো পণ্যের চাষাবাদে লাগানো সম্ভব হবে।
[দীর্ঘ পত্রে ডানবার সাহেব বিকল্প কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন, যা এখানকার রায়তদের যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ দেবে, ইংল্যান্ডের উত্পাদনকারীদেরও দেবে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল। তবে কোনোভাবেই মসলিনের পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা আর নেই, যেকোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।]
মসলিন সরবরাহকারী পাইকার ও দালাল ১৭৩৩
যেসব দালাল ও পাইকার ১৭৩৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মসলিন সরবরাহের চুক্তি করে এবং অগ্রিম টাকা নেয়, তাদের তালিকা:

বিষ্ণুদাস সামু পাইকার বাকি অন্য সাতজন একই বছরের মার্চে আরো ১৮.৪৬৪ টাকার মসলিন সরবরাহের চুক্তি করে।
পরোক্ষভাবে, বিশেষ করে টাকা বিনিয়োগ করে ঢাকার যেসব ব্যবসায়ী মসলিন রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা হচ্ছেন শেঠ মাহতাব রায়, শেঠ স্বরূপ চাঁদ, শিবরায় নয়ন চাঁদ, লেদু পরনাক (জগৎ শেঠের গোমস্তা), ধন রাম, খোসালচাঁদ, মতিচাঁদ, আলমচাঁদ, নিমচাঁদ, অনুপচাঁদ, কৃষ্ণচাঁদ, কিঙ্কর দাস, রামরাম সেন, শান্তি রাম, বলরাম রায়, হরিকৃষ্ণ ও আনন্দ বাম।
পাইকার, দালাল, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন মুসলমান বাকিরা হিন্দু, বাঙালির সংখ্যা অবাঙালির তুলনায় কম।
ঢাকা আড়ং, সোনারগাঁও আড়ং, বাজিতপুর আড়ং ও জঙ্গলবাড়ি আড়ং থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে নওয়াব মুর্শিদকুলী খান মোগল সম্রাটকে ৯৯,০৮১ টাকার মসলিন উপঢৌকন পাঠান।
মসলিনের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক ভূমিকা ছিল দালাল ও পাইকারদের। তারা কোম্পানির সঙ্গে কমিশন ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ হতো আবার তাঁতির কাছ থেকে কমিশন আদায় করত।

মসলিন বৈচিত্র্য
সুতার সূক্ষ্মতা ও বুনন সৌকর্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নামের মসলিন তৈরি করা হতো; মলবুস খাস, মলমল খাস, ঝুনা, রঙ্গ, আব-ই-রওয়ান, সরকার-ই আলী, খাস্সা, শবনম, আলিবালি, তনজেব, তরান্দাম, নয়ন-সুখ, বদন-খাস, সর-বন্দ, সরবুটী, কামিছ, ডোরিয়া, চার-কোনা ও জামদানি। ঐতিহাসিক আবদুল করিম উইলিয়াম বোল্টের ১৭৭০ সালের একটি রচনার উদ্ধৃতি দেন:
ঢাকাবাসীর আব-ই-রওয়ান সম্পর্কে দুটি মুখরোচক গল্প বলতেন। ১ম, একবার সম্রাট আওরঙ্গজেব তার মেয়েকে নগ্ন দেহে থাকার জন্য ভর্ত্সনা করেন। রাজকন্যা তখন প্রতিবাদ করে বলেন যে, তিনি তখন সাতটি জামা পরিহিত ছিলেন।
২য়, একদিন একখানি আব-ই-রওয়ান ঘাসের উপর শুকাতে দেয়া হয়। কোন এক কৃষকের গরু ওই মাঠে চড়তে গিয়ে বহু মূল্যবান আব-ই-রাওয়ানখানি সমেত ঘাস খেয়ে ফেলে। এ অপরাধে রুষ্ট হয়ে নওয়াব আলীবর্দী খান কৃষককে ঢাকা থেকে বের করে দেন।
১৭৪৭-১৭৯৭ মসলিন রফতানির ৫০ বছর
১৭৪৭-১৭৯৭ এই পঞ্চাশ বছরে মসলিন রফতানি অর্ধেকে নেমে আসে।

আঙুল কাটার মিথ
ব্রিটিশ পণ্য চালু করতে গিয়ে কোম্পানির ইংরেজরা মসলিন তাঁতিদের আঙুল কেটে দেয়। সোনারগাঁওয়ের একটি পুকুরের কথাও বলা হয়, যেখানে দক্ষ তাঁতিদের কাটা আঙুল নিক্ষেপ করা হয়েছে। মসলিন তাঁতিদের আঙুল কাটার কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। গবেষক যোগীশ চন্দ্র সিংহ এবং আবদুল করিম আঙুল কাটার ঘটনা অযৌক্তিক মনে করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য যেখানে তাদেরই নিয়ন্ত্রণে, বাণিজ্যের এ হাতিয়ার তারা নষ্ট করতে যাবে কেন?
তবে এটাও সত্য কোম্পানি শাসনে অন্যসব পেশাজীবীর মতো তাঁতিদের ক্ষেত্রেও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আঙুল কাটার নয়।






