এই জীবন প্রকাশেই স্থায়িত্ব পায়
আর নীরবতায় মৃত্যু।
এ কারণেই সুখ-দুঃখের প্রকাশ দিয়েই আমরা জীবিত।
আর অমরত্ব লাভ করি কর্মে।
— রশিদ চৌধুরী
কবে এক বালক শো-কেসের রূপকথা দেখে পাগল হয়ে যাওয়ায় আমরা খুলে দিয়েছিলাম আমাদের স্নানঘরের শ্রাবণ। আর তাতে ভেসে গিয়েছিল অন্ধদের সমস্ত ব্যারিকেড। তাদের ধুলো পড়া, বানমারা হিব্রু উদগারসমূহকে আমরা অক্লেশে গিলে ফেলেছিলাম আশ্চর্য এক মাছের মতন। এভাবে শুরু হয় মাত্স্যন্যায়, মৌষল পর্ব, অরাজকতা আর নিঃশৃঙ্খলার দিন। ক্রমেই আমরা শান্তিজল ছুড়ে ফেলে নিজস্ব রক্তে ডুব দিয়ে আকাঙ্ক্ষা রেখেছি দেশপ্রাণের। সেই আধো হেলেনিক আঁশগন্ধে উলটকমল এই মুক্ত চোখ প্রজন্মের নাম ‘রশিদ চৌধুরী’।
শিল্পী রশিদ চৌধুরী আপাদমস্তক, সর্বাঙ্গ মনে, ঔদার্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া উচ্ছল জীবনাদর্শের প্রতীক একজন কর্মনিষ্ঠ মানুষের নাম। তার ব্যক্তিজীবন থেকে শিল্পী জীবন পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল তার মানুষী রূপসত্তা।
রশিদ চৌধুরী ছিলেন চিরবাঙালির প্রতীক, আর চিরতারুণ্যের বৈভবে গড়া বিশ্ব নাগরিকও তিনি; ছিলেন বাংলা অন্তঃপ্রাণের একজন নিষ্ঠাবান চর্চাবিদ এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত দেশজ শিল্পরূপাশ্রয়ে আধুনিকতার পরিমণ্ডল ছোঁয়া বিশ্বশিল্পের সক্রিয় সেবক। শিল্পসাধনায় প্রতিবাদী ও সংবেদনশীল মেজাজের, আত্মনিবেদিত এই লোকান্তরিত সৃজন শিল্পীর প্রাণ আকুল করা উজ্জ্বল স্মৃতির সৌরভ আজো ছুঁয়ে যায় তার ভালোবাসার মানুষের হূদয়। তাই সাধ জাগে-অন্তত এটুকু অনুকূলতা তো সৃষ্টি করতে পারি, যাতে তার সৃজিত শিল্পসকল চির-উষ্ণতার আলিঙ্গনে প্রজন্ম পরম্পরার বাঙালি মানসে তাকে জানার আগ্রহ জাগায়! সৃজন শিল্পের সমৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষেত্রে একটি আলোকিত উঠোনের, একটি মহান অনুকরণীয় আদর্শের দিকদর্শন আমরা তার কাছে পেয়েছিলাম, তার উত্তরাধিকার অর্জনের চেষ্টা করলে খুব একটা অন্যায় হবে বলে মনে করি না।
শিল্পী জয়নুলের যোগ্য উত্তরসূরি রশিদ চৌধুরীও বাংলাদেশে শিল্পচর্চার প্রসারে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। জয়নুলের চিত্রকলায়
মুনশিয়ানার মতোই রশিদেরও ছিল মেধা ও বুত্পত্তি। কিন্তু উভয়েই শিল্পকলা প্রসারে আত্মনিয়োগ করতে গিয়ে নিজস্ব শিল্পচর্চায় নিজেরাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন! ফলে সঙ্গত কারণেই সক্ষমতার বিচারে সৃষ্ট শিল্পসম্ভারের সংখ্যা ও মান বিচারে আরো উত্কর্ষ ও অধিক হতে পারত তা বলাই বাহুল্য।
দেশ ও জাতির শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে রশিদের অংশগ্রহণ ও অবদান ঐতিহাসিক মানদণ্ডে এক অনন্য নজির, তাতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু এসব মানদণ্ডের বিপরীতে আমাদের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতার বহরটি লজ্জাজনকভাবেই হ্রস্ব, এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। ফলে জীবদ্দশায় তারও মনঃকষ্টের কারণ হয়েছে, প্রতিকূল অর্থকষ্টকে মোকাবেলা করতে গিয়ে। বিশেষ করে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভগ্ন স্বাস্থ্য ও হূদয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে তার সর্বশেষ আবেদনটি কতটা মর্মান্তিক হতে পারে, তা সহজেই প্রণিধানযোগ্য।
‘আমি রশিদ চৌধুরী এই মর্মে জানাচ্ছি যে দুরূহ রোগে আক্রান্ত হয়েছি, বর্তমানে শয্যাশায়ী। বিগত চার বৎসর নবনির্মিত সংসদ ভবনের অভ্যন্তরীণ বয়নচিত্রের জন্য প্রচুর শ্রম বিনিয়োগ করেছি। অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে ভগ্ন স্বাস্থ্যে জীবনধারণের প্রয়োজন ও ঋণ মুক্তির প্রচেষ্টায় বর্তমানে স্বাস্থ্যের আরো অবনতি ঘটেছে।
বিশেষ করে নভেম্বর ১৯৮৫ সালে সার্ক সম্মেলনের জন্য শিল্পকর্ম সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নগরপূর্ত বিভাগ ক্রয় করে। তার মূল্য বাবদ যে সামান্য অর্থ আমার প্রাপ্য। ...তাহাও আজ অবধি পরিশোধ করা হয় নাই।’
একজন শিল্পী, যার জীবন কেবল শিল্পসাধনার ওপর নিয়োজিত, সামান্য কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জীবন ধারণ করে থাকেন। তাদের দুরবস্থার প্রতি জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবেদন জানাচ্ছি।
আজ আর বিষয়টি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না যে, সারা জীবন বড় মাপের শিল্প সৃষ্টি করে বিশাল বিশাল কর্ম-স্বাক্ষরের প্রমাণ রেখে যে মানুষটি আমাদের ঋণী করে গেছেন নানাভাবে, তিনি নিজে কেন আর্থিক ঋণের দায় এড়াতে পারেননি শেষ পর্যন্ত! এমনকি দুরারোগ্য কর্কটে অকালমৃত্যু বরণ করার আগে শেষ দিনগুলোতেও তার আর্থিক নিরাপত্তাহীন অসহায়তা আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি।
শিল্পীর প্রতি পৃষ্ঠপোষক, রাষ্ট্রের ও ব্যক্তির অমানবিক আচরণের ঘটনা শিল্প ইতিহাসে বিরল নয়! কিন্তু রশিদ চৌধুরীর প্রতিও মৃত্যু-পরবর্তী অবহেলা প্রদর্শন করেছে বিশেষ করে সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, তার ব্যাখ্যায় একে ‘অকৃতজ্ঞতা’র ও দায়িত্ব অবহেলার পরাকাষ্ঠা হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। বিশেষত লক্ষণীয় যে শিল্পী রশিদের মৃত্যুর পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি তার শিল্পকর্মের সঠিক পরিসংখ্যান ও প্রদর্শনী, কিংবা গবেষণাধর্মী কোনো প্রকাশনার উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি। মৃত্যুর ১৪ বছর পর বক্ষমান রচনার লেখক যখন কলা ভবন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী, তখন তার বিশেষ উদ্যোগে ও শিল্পীর অনুজ ভ্রাতা জুলফিকার আলী চৌধুরীর আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম মরণোত্তর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় কলা ভবনের নন্দন গ্যালারিতে।
আজ থেকে ১৮ বছর আগে কলা ভবন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী হিসেবে রশিদ চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে এমএফএ চূড়ান্ত পর্বে ‘মোহন এষণা’ শিরোনামে অভিসন্দর্ভ রচনা করতে হয়েছিল। এ বিষয়ের সাক্ষাত্কার পর্বে প্রখ্যাত শিল্পী যোগেন চৌধুরী ও শিল্প ইতিহাসবিদ প্রণব রঞ্জন রায় পরীক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিষয় বিবেচনা ও রচনাশৈলী সম্পর্কে তাদের মন্তব্য তথা প্রশংসা ছিল আমার জন্য খুবই সম্মানের। ঘটনাচক্রে এই সাক্ষাত্কার পর্বের কিছুদিন আগে কলা ভবন নন্দন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় রশিদ চৌধুরীর মৃত্যুর ১৪ বছর পর তার প্রথম একক প্রদর্শনী। তখন পর্যন্ত টেক্সটাইল আর্ট বিষয়ে এমএফএ পর্বে বাংলাদেশী ছাত্র হিসেবে আমিই প্রথম। স্বভাবতই বাংলাদেশের প্রয়াত প্রখ্যাত ট্যাপেস্ট্রি শিল্পী হিসেবে রশিদ চৌধুরীর পরিচিতি শিল্পবোদ্ধা মহলে বেশ। মাঝে মধ্যেই তার শিল্পকর্ম, প্রদর্শনী বিষয়ে আগ্রহমূলক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হতো। সে সময়েও আমি যে তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতাম, তা নয়। কেননা আমার চারুকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যে বছর শুরু হয়, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে তিনি মারা যান। ফলে তাকে চাক্ষুষ দেখার সুযোগ পাইনি, তা বলাই বাহুল্য। যতদূর মনে পড়ে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে তার সম্পর্কে তেমন কোনো বিশেষ উচ্চবাচ্যও ছিল না তখন। যদিও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার অবদান সম্পর্কে কারো কারো কিছু কিছু তথ্য, মন্তব্য ও বয়ন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ আমাকে উৎসাহী করে তুলেছিল। এদের মধ্যে শিল্পী চন্দ্র শেখর দে, শিল্পী রঞ্জিত দাস, শিল্পী হাসি চক্রবর্তী ছিলেন অগ্রগণ্য। পরবর্তীতে শিল্পী মতলুব আলী, শিল্পী রফিকুল আলম তাদের সাহচর্যে এসে রশিদ চৌধুরী সম্পর্কে জানার পরিধি বিস্তারিত হয়। তারা প্রত্যেকেই আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক।
আমিও ততদিনে চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র হিসেবে ট্যাপেস্ট্রি বয়ন নিয়ে উৎসাহী হয়ে ব্যাপক উদ্যমে বুনতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগে এ বিষয়ের পাঠদানে (!) রশিদ চৌধুরীর বয়নচিত্র সম্পর্কিত কোনো তথ্যই জানতে
পারিনি। না এটা কোনো বিস্ময় না হলেও অস্বাভাবিকতা নিশ্চয়ই! পরে এমএফএ পর্যায়ে বয়ন শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়া। এ অবস্থায় আমার অভিসন্দর্ভের বিষয় নির্বাচনের পর ব্যাপক তথ্য তালাশী দিতে গিয়ে পেয়ে যাই শিল্পী রশিদ চৌধুরীর অনুজ ভ্রাতা জুলফিকার চৌধুরীকে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তার অগ্রজ শিল্পী ভ্রাতার কাজের প্রতি আগ্রহ এবং আমার অভিসন্দর্ভের কাজে তার
তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা ছিল অসাধারণ প্রাপ্তি। সেই প্রথম আমার রশিদ শিল্প ভাণ্ডারের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়। যে সুযোগে তার তরফের পারিবারিক সংগ্রহেরও সন্ধান পাই। বলতে দ্বিধা নেই আমার মুগ্ধতা, অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে এ ঘটনায়।
কলা ভবনে আমার বিভাগীয় প্রধান শিল্পী শিবপ্রসাদ কর চৌধুরী সেবার ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করলে পারিবারিক সংগ্রহ থেকে শিল্পকর্ম প্রাপ্তির সহযোগিতার কথা জানাই। যার প্রাথমিক সম্ভাবনার কথা আমি জুলফিকার ভাইকেও বলে গিয়েছিলাম এবং তার সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছিলাম। শিব দা প্রস্তাব শুনেই তত্কালীন কলা ভবনের অধ্যক্ষ যোগেন দার সঙ্গে কথা বলতে তখনি আমাকে নিয়ে গেলেন। ওই এক বৈঠকেই সব সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আমার দায়িত্ব হলো প্রদর্শনী কিউরেট করা এবং যেহেতু এই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিসন্দর্ভ রচনা করছি, তাই প্রদর্শনী স্মারক প্রকাশনায় আমি লিখব তাও চূড়ান্ত হলো। আর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী কেজি সুব্রামনিয়াম, শিল্পী ঋতেন মজুমদার, শিল্পী দিনকর কৌশিক, শিল্পী শোভন সোম, শিল্পী যোগেন চৌধুরী, শিল্পী সনৎ কর, শিল্প ইতিহাসবিদ প্রণবরঞ্জন রায়, শিল্পী শিব প্রসাদ কর চৌধুরী, শিল্পী ঝনক ঝনকার নার্জারী প্রমুখ।
প্রদর্শনী স্মারক প্রকাশনায় আমার পক্ষ থেকে যা বলা বা লেখা হয়েছিল, লোকজ বাংলার অতুলনীয় বুনন শিল্পের ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ ছিল রশিদ চৌধুরীর উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী প্রয়াস। এ পর্যায়ে বয়ন চিত্র বা ট্যাপেস্ট্রি তার অন্যতম সফল সাধনার স্মারক। বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের পরিমণ্ডলে শিল্পী রশিদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রি হিসেবে সমধিক পরিচিত। জীবিত অবস্থায় এই বিশেষ মাধ্যমে তিনিই ছিলেন একক ও অনন্য। রঙিন সুতোর টানাপড়েনে আমৃত্যু তিনি ছবি এঁকেছেন বা বলা যায় ছবি বুনেছেন। রশিদ টেম্পারা, একোয়াটিন্ট, এনগ্রেভিং, জলরঙ, গোয়াশ, তেলরঙ ও টেরাকোটা নিয়ে নিরন্তর কাজ করেছেন।
রশিদের তাবৎ শিল্পকর্ম আবহমান বাংলার মর্মকে স্পর্শ করে উত্থিত হয়েছে। তার চিত্রসম্ভার প্রথমদিকে শাগাল প্রভাবিত হয়ে ক্রমেই সোনাভান, বেদেনী, সোনার বাংলা, ষড়ৈশ্বর্যের পালা, রাধা কৃষ্ণ, কালী, দুর্গা, মনসা, পুরান মিথ তথা ভারতীয় ত্বের ধ্রুব ঐতিহ্যের মননবীজ, সমূহ চৈতন্যের স্রোত বেয়ে উঠে আসে বোধের জমিতে। এ তার সচেতন প্রয়াস। যেখানে একজন সৃষ্টিশীল স্বাধীন শিল্পীর সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা সমধিক ফলপ্রসূ ও অপরিহার্য হয়ে উঠে বলেই ধারণা। মৃত্যুর এক যুগ পর শিল্পীর এ প্রদর্শনীর আয়োজন নিঃসন্দেহে শুভ উদ্যোগ। ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সাধ্যমতো সংগ্রহ যা করা গেছে, সংখ্যার বিচারে তা নিতান্তই সামান্য। তবে রশিদ চৌধুরীর অনুদঘাটিত এ যাবতকালের কর্মসম্ভারের অন্দরমহল থেকে সামান্য হলেও বহিরাঙ্গনে আজ এর শুভ উদ্বোধন তাত্পর্যপূর্ণ বৈ কি।
আমার অভিসন্দর্ভের কাজে তথ্য উপাত্ত সূত্র হিসেবে মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক-এর একটি রশিদ চৌধুরীবিষয়ক বিশেষ সংখ্যার খোঁজ করতে গিয়ে এক বিরল শিল্পসখার সাক্ষাৎ ও স্নেহ সান্নিধ্য আমাকে আজীবন ঋণী করে রেখেছে। তিনি চারুকলার প্রাক্তন শিক্ষার্থী শিল্পী রশিদ চৌধুরীর সহপাঠী সম্পাদক প্রকাশক মীজানুর রহমান বা প্রিয় মীজান ভাই। তার ধানমন্ডির বাসায় একবার উপস্থিত হলে উল্লেখিত সংখ্যাটির অবশিষ্ট একমাত্র কপিটি ফটোকপি করার জন্যও হাতছাড়া করতে চান না বলে সাফ জানালেন। আমার প্রয়োজন জানার পরও তার এই সিদ্ধান্ত শুনে একটু খারাপ লেগেছিল বটে! কিন্তু কী ই বা করার উনি তো আমার পূর্বপরিচিতও কেউ নন। যা মাঝে মধ্যে বইপাড়া আজিজ মার্কেটে বগলদাবা করে বই (মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা) ও বউ (সাহানা ভাবি) দুটোই নিয়ে আসতেন যখন, তখন তাকে দেখেছি। যা-ই হোক আমার নৈরাশ্যের মুখখানাকে উজ্জ্বল করে দিতে বললেন, ‘আমি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কলকাতা আসছি, তখন এর একটা ফটোকপি তোমার জন্য শান্তিনিকেতন নিয়ে আসব।’ বলা বাহুল্য এই আশ্বাসে খুব আশ্বস্ত না হতে পারলেও আস্থা রেখেছিলাম।
ফল হিসেবে এক অপরাহ্নে শুভ্রতার প্রতীক সাদা চুলের মানুষটি আমাকে চমকিত করে দিয়ে কলা ভবন চত্বরে ফটোকপির প্যাকেটটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, পরের কয়েক দিনে তার বোলপুর বাসের সময় আমাকে রশিদ পাঁচালি শুনিয়ে, শিখিয়ে কখনো বিস্ময়াভিভূত কখনোবা জিজ্ঞাসার মাত্রা বাড়িয়ে ও প্রশমিত করে দিয়ে আমাকে তৈরি হতে সহায়তা করলেন। সাক্ষাৎ পাঠ ছিল এই অপ্রচলিত পাঠদানে। এমনি ছিল আমার জন্য মীজান ভাইয়ের আপন স্কুলটি। যেখান থেকে অনায়াসে শেখা যেত শিখতে চাইলে। তার কাছ থেকে রশিদ সম্পর্কে জানার অনেক কথাই বলেছি ‘মোহন এষণা’য়।
বলা হয়নি এমন কথাও রয়ে গেছে বিস্তর। যেমন শিল্পী হাসি চক্রবর্তীর এই কথাটি সেগুলোর একটি— ‘...তত দিনে স্যার চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায়। কেন ছেড়েছিলেন চট্টগ্রাম?’
যে ভূমি তিনিই কর্ষণ করেছেন নিজ হাতে, সে ভূমি কি আঘাত হেনেছিল তাকে, জানতে পারিনি কোনো দিন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে জেনেছি, যারা তার ব্যক্তিগত চরিত্র বিশ্লেষণে ত্রুটি খুঁজতে তত্পর, নিয়মকানুনের যুক্তি ছুড়ে যারা নিত্য তাকে বধ করেন, তাদের চরিত্রে সততার চেয়ে ঈর্ষার পরিমাণ বেশি। নিছক গোছানো পারিবারিক লোক ছিলেন না তিনি, শিল্পের বেসাতি করে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার কূটকৌশলও জানা ছিল না তার। তিনি একজন মহৎ শিল্পী ছিলেন, একজন পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনযাপনের স্রোতে গা ভাসিয়ে যে নিজস্ব পরিমণ্ডল আমরা গড়ে তুলি, একসময় তারই ঘূর্ণিপাকে নিজেরা বাধা পড়ে যাই। স্বার্থপরতা তখন আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে, সে নাগপাশ থেকে আমাদের মুক্তি মেলে না কিছুতে। অর্থের লোভ, যশের মোহ আমাদের অন্ধ করে দেয়। যুক্তি আর অন্যমনস্কতার দোহাই দিয়ে সে অন্ধতা কি ঢাকা পড়ে? অন্ধ আমরা, তাই একজন বড় মাপের মানুষকে ছোট একটা বাটখারা দিয়ে পরিমাপ করতে গিয়ে বারবার ভুল করি। সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই। তার প্রতি আমাদের এই অন্যমনস্কতা ক্ষমার যোগ্য নয়। একজন প্রকৃত গুরুর শিষ্য হয়ে ক্ষমাহীন রয়ে গেলাম আজীবনের জন্য। তার অনুসারী ছিলাম বলে যে নগ্ন উক্তি আমাকে উদ্দেশ্য করে ছুড়ে দেয়া হতো, ‘ওই রশিদের চেলা আসছে’— সেই স্বীকৃতিটুকুই আজ আমার সান্ত্বনা, আমার স্বস্তি, আমার মুক্তি।
এই কালজয়ী শিল্পীর সৃষ্টি ও তার যাপন কথাকে এ ছোট্ট কলেবরে ধরা সম্ভব নয়। সে চেষ্টাও অমূলক। এ কথা অনস্বীকার্য যে তার ঘটনাবহুল, বর্ণিল আত্মত্যাগী শিল্প মানসকে বিস্তারিত জানতে ও বুঝতে ব্যাপক গবেষণার বিকল্প নেই।
শিল্পী রশিদ চৌধুরীর মৃত্যুর ৩১ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। তার অবদান শিল্পকলায় যেভাবে প্রাসঙ্গিক যতটা গুরুত্বের দাবি রাখে, রশিদ তা থেকে বরাবরই বঞ্চিত। এই নিবন্ধে তাকে নিয়ে খানিকটা কথালাপের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করার মাধ্যমেই বর্তমানের দৃশ্যকলাজগতের প্রবণতা তার প্রাসঙ্গিকতাকে, তাকে বিবেচনা করা যাবে হয়তো। এই আলোচনা, বিতর্ক, মতবিনিময় প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলেই মঙ্গল। আর এ কথা অনস্বীকার্য যে সামগ্রিক বিবেচনার ক্ষেত্রটিতে রশিদ চৌধুরী আবির্ভূত হবেন গুরুত্বপূর্ণ সোপান হিসেবে এবং তার বিশেষ অবদানের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়ে উঠবে বিগত ও এ কালের চারুশিল্পের পটভূমি। যেখানে তার চিন্তাকর্ম তথা অবদান আজকেও প্রয়োগধর্মী হয়ে ওঠার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জয়তু চারুকৃৎ পথিকৃৎ শিল্পী রশিদ চৌধুরী।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।






