ফেরাউনের নজর থেকে মুক্ত। অনুসারীদের নিয়ে মরুভূমি অতিক্রম করছেন মুসা (আ.)। তার গন্তব্য জেরুজালেম। কিন্তু মাঝপথেই ক্লান্ত হয়ে উঠল বনি ইসরাইল। তারা হা-হুতাশ শুরু করে দিল নবি মুসার সামনে গিয়ে। ‘মিসরে বিনা পয়সায় মাংস পাওয়া যায়। যদি খেতে পারতাম। সেখানে শসা, তরমুজ, পেঁয়াজ, পেঁয়াজকলি ও রসুনের কথা মনে পড়ছে। আমাদের ভেতরটা যেন শুকিয়ে যাচ্ছে।’
বাইবেলে বর্ণিত হিব্রু জাতির এ হা-হুতাশ কতটা জল ঘোলা করেছিল, সে ভিন্ন কথা। কিন্তু এখান থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়। সে যুগেও পেঁয়াজ এমন কোনো উপাদেয় খাদ্য হিসেবেই বিবেচিত ছিল, যার কথা ভেবে দূর থেকে আক্ষেপ করা যায়। পেঁয়াজের সঙ্গে প্রথম কখন মানুষের যোগাযোগ, তা হলফ করে বলা মুশকিল। কিন্তু প্রাচীন অধিকাংশ সভ্যতায় পেঁয়াজের হরেক কিসিমের ব্যবহার আগ্রহী পাঠকের চোখ কপালে ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট। মানবজাতি যাযাবরি দিন পার করে কৃষিতে যখন মন দেয়, তখন থেকেই পেঁয়াজ ও পেঁয়াজজাতীয় সবজি চাষ গুরুত্ব পায়। কৃষকরা বরাবরই দ্রুত ফলনশীল ও বৃহৎ কন্দবিশিষ্ট ফসলের আবাদে গুরুত্ব দেয়। এভাবেই মধ্য এশিয়ায় পেঁয়াজ আবাদ হতে থাকে এবং তা ক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে। কেবল উপাদেয় খাদ্য হিসেবে না, পানীয়, ভ্যাম্পায়ার প্রতিরোধ, জাদু প্রতিরক্ষা এবং শারীরিক চিকিৎসার ওষুধ হয়ে ছড়িয়ে গেছে পেঁয়াজ।
পেঁয়াজের প্রথম আলোচনা দেখা যায় মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের তীরবর্তী অঞ্চলে তখন গড়ে উঠেছিল আক্কাদীয়, ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় সাম্রাজ্য। নদীর পলি জমে অঞ্চলটি হয়েছিল উর্বর। পরিণত হয়েছিল শস্য, পশুপালন, খেজুর, বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি চাষের উপযোগী ভূমিতে। সেখানে খাদ্যপণ্য ও শস্য বেচাকেনা হতো সবসময়। তারই দলিল হিসেবে কাজ করে ইয়েল ব্যাবিলনিয়ান ট্যাবলেট নামে পরিচিত তিনটি কিউনিফর্ম ট্যাবলেট। খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালের দিকে লেখা ট্যাবলেটে ৪০টি রেসিপি সাজানো; সেখানে প্রথম দিকেই রয়েছে পেঁয়াজ, রসুন ও পেঁয়াজকলির নাম। প্রথম ট্যাবলেটে ২৫টি জুসজাতীয়, ২১টি মাংসজাতীয় ও চারটি সবজিজাতীয় রেসিপির নাম রয়েছে। প্রায় ক্ষেত্রেই উপস্থিত রয়েছে পেঁয়াজ ও রসুন। সেখানে রান্নায় উপাদেয় স্বাদ তৈরি করার জন্য ব্যবহার হতো পেঁয়াজ। মেসোপটেমিয়ার মতোই প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায়ও ছিল পেঁয়াজ খাওয়ার প্রচলন। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মিসর সফর করেন। সেখানে দুপুরের রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহার দেখেছেন তিনি। হিরোডোটাস গিজার পিরামিড সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। সে সময় সেখানে শিলালিপিতে লেখা ছিল কীভাবে শ্রমিকদের জন্য পেঁয়াজ, রসুন ও পেঁয়াজকলি রান্না করা হতো। পিরামিডটি তৈরি করা হয় ২৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। অর্থাৎ অত আগেও মিসরীয়দের কাছে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজকলি ব্যবহার হয়েছে খাদ্য উপকরণ হিসেবে। তখন পেঁয়াজকে তুলনা করা হয়েছে সাদা দাঁতের সঙ্গে। খুব সম্ভবত পেঁয়াজের ছোট কোনো জাত সেখানে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতিতে পেঁয়াজকে মনে করা হয়েছে বিশ্বজগতেরই একটা ছোট রূপ। আর তাই পেঁয়াজ উৎসর্গ করা হতো প্রকৃতির দেবী আইসিসকে। রোমান ঐতিহাসিক প্লিনি দি এল্ডারের জবানে জানা যায়, মিসরীয়রা সমাধিসৌধের ওপরে এবং মমির সঙ্গেও পেঁয়াজ রেখে দিত। ফলে পেঁয়াজের ব্যাকটেরিয়াবিরোধী সক্ষমতার কথা তাদের অগোচরে ছিল না বলেই প্রমাণিত।
গ্রিক ও রোমান সভ্যতার জনগণও পরিচিত ছিল পেঁয়াজের সঙ্গে। প্লিনি তার ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ বইয়ে গ্রিসে আবাদ হওয়া বিভিন্ন ধরনের পেঁয়াজের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে ছিল সার্দিয়ান, সামোথ্রেসিয়ান, আলসিদেনিয়ান, সেতানিয়ান, সিস্তান ও আশকেলনিয়ান পেঁয়াজ। হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াডেও উঠে এসেছে পেঁয়াজের প্রসঙ্গ। পেঁয়াজ সেখানে পানীয়ের সঙ্গে মিশ্রিত করে খাওয়া হতো। যুদ্ধের আগে সতেজতার জন্যও পেঁয়াজ দেয়া হতো। দুটি চর্চার কথাই উল্লেখ করেছেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস। এছাড়া জেনাফোনের সিম্পোজিয়ামেও পাওয়া যায় পেঁয়াজের ঘ্রাণ। অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণকারীরা তাদের স্বাস্থ্য ও সতেজতার জন্য রসুন আর পেঁয়াজ খেতেন। পেঁয়াজকে মজাদার ও স্বাদু হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের শেষদিকে যখন হোমার ওডিসি লেখেন, সেখানে তিনি শুকনা পেঁয়াজকে জাদুকরী ওষুধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রসুনও সে তালিকা থেকে বাদ পড়েনি। দেবী সিরসে অডিসিয়াসের বন্ধুদের জাদুর মাধ্যেমে শূকর বানিয়ে ফেলে। কিন্তু অডিসিয়াস রসুন ব্যবহারের মাধ্যমেই তার হাত থেকে রক্ষা পান। গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফ্যানেসও তার কমেডিতে রসুন ও পেঁয়াজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর সে প্রসঙ্গটা আসত পরিচ্ছন্নতার জন্য। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (৩৫৬-৩২১ খ্রিস্টপূর্ব) খুব সম্ভবত ফিলিস্তিন অভিযানের পর গ্রিকরা আশকেলনের পেঁয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। রোমানরাও পেঁয়াজ পছন্দ করত বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য। এমনকি সঙ্গে করে নিয়ে ভ্রমণ করত। তারাই উত্তর ইউরোপে পেঁয়াজের প্রচলন ঘটতে সহায়তা করেছিল। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এক রোমান যোদ্ধার থেকে এমন একটি রেসিপি পাওয়া যায়। তিনি পেঁয়াজ রোদে শুকিয়ে পরে ছায়ায় শীতল করে কোনো পাত্রে জমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। রোমান সংস্কৃতিতে মনে করা হতো পেঁয়াজকলি খেলে কণ্ঠস্বর আরো মধুর হয়। যেহেতু ভালো নেতা মানে ভালো বক্তাও। ফলে এর গুরুত্ব ছিল। সম্রাট নিরো (৩৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দ) এজন্য নিয়মিত পেঁয়াজকলি খেতেন। হিপোক্রেটাসকে (৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) গণ্য করা হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক। তিনি রসুন ও পেঁয়াজের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন তার লেখায়।
পেঁয়াজের গুণাগুণ বিবেচনা করেই চীনেও তা বিভিন্ন সময় খাওয়া হতো। যদিও সন্ন্যাসী ও অতীন্দ্রিয়বাদীরা পেঁয়াজ খাওয়াকে নিষিদ্ধ বিবেচনা করতেন। বিশেষ করে পেঁয়াজ খাওয়ার পর নিশ্বাসে তার ছাপ থেকে যাওয়ায়। চীনে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দে লেখা কনফুশীয় কিতাব লি জিতে বিভিন্ন ধরনের আচার আচরণ নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে লেখা আছে পেঁয়াজ খাওয়ার কথা। তবে চতুর্থ শতকে তাও মতবাদের অনুসারীরা যে পাঁচটি তীব্র গন্ধযুক্ত খাদ্য খেতে নিষেধ করেন, তাদের মধ্যে পেঁয়াজ ও রসুনের নামও ছিল। অনেক চৈনিক বৌদ্ধ এখনো পেঁয়াজ খেতে বারণ করেন। হান সাম্রাজ্যের আমলে (২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-২২০ খ্রিস্টাব্দ) পোকামাকড়কে ঘরের বাইরে রাখার জন্য দরজায় পেঁয়াজ ও রসুন রেখে দেয়া হতো। প্রাচীন সংস্কৃত কিতাবাদিতেও পেঁয়াজকে শক্তিশালী ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। চতুর্থ শতকের নিদর্শন বাওয়ার পাণ্ডুলিপিতে ভারতীয় সংস্কৃতিতে রসুন ও পেঁয়াজ সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। কোরিয়ায় পেঁয়াজ খাওয়ার চর্চা চলছে স্মরণাতীত কাল থেকে। থ্রি কিংডম পিরিয়ড (৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত প্রাপ্ত লিপিতে রসুন ও পেঁয়াজ চাষাবাদের নজির পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় প্রতিটি সভ্যতার কুলজিতে পেঁয়াজ চাষাবাদের ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মানবজাতির মধ্যে কৃষি সভ্যতার বিকাশের দিন থেকেই অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে পেঁয়াজ।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক





