সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে পৃথিবীর অনেক মহানায়কের রাষ্ট্র বিপ্লব কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ভারতের সুভাষ বোস সে রকম ব্যর্থতার অন্যতম উদাহরণ। অন্যদিকে সময়োচিত সিদ্ধান্ত—ভ্লাদিমির লেনিনের একটি ট্রেনযাত্রার সিদ্ধান্ত পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক এক বিপ্লবকে কীভাবে ত্বরান্বিত করেছিল তার উদাহরণ সেন্ট পিটার্সবার্গের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে।

১৯১৭ সালের ১০ মার্চ নিজের সেনাবাহিনীর বিদ্রোহে সেন্ট পিটার্সবার্গে যখন জার নিকোলাসের ক্ষমতার দুর্গ ভেঙে পড়ছিল, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তখন সুদূর জুরিখে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। জার সরকারের কোপানলে পড়ে তিনি দীর্ঘ এক দশক মাতৃভূমিতে পা রাখতে পারেননি। তাই জারের পতন সংবাদটি যে তার জন্য বিশেষ সুবাতাস বয়ে এনেছিল তা বলাই বাহুল্য। তার ওপর যখন শোনা গেল প্রিন্স লেভবের (Prince GeorgyYevgenyevich Lvov) নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন নতুন সরকার নির্বাসিত রাজনৈতিক কর্মীদের দেশে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে তখন দেশে ফেরাটা লেনিনের জন্য আরো বেশী কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠল।

কিন্তু ফেরার পথে বহুবিধ বাধা পথরোধ করে দাঁড়াল তার সামনে। প্রথমত, তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না নতুন সরকার তার দেশে ফেরার ব্যাপারটা কীভাবে নেবে। তিনি ১৫ মার্চ জারের পতন সংবাদটি পাওয়ার পর চেষ্টা করেছিলেন নতুন সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু সেখান থেকে আশাপ্রদ কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। সরকার অনেক নির্বাসিত বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে দেশে ফেরার জন্য অনুমতি দিলেও লেনিনের ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানাল না। দ্বিতীয়ত, তিনি এমন একটি দেশে আছেন, যে দেশটি নিরপেক্ষ হলেও এ দেশ থেকে বের হতে হলে তৃতীয় একটি দেশের সাহায্য প্রয়োজন। নতুন সরকারের কাছ থেকে অনুকূল সাড়া না পেয়ে তিনি বিকল্প পথের সন্ধানে নামলেন।

তখন প্রথম মহাযুদ্ধের ঘোরতর লড়াই চলছিল ইউরোপজুড়ে। সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের যুদ্ধ বলে সেই যুদ্ধকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন লেনিন। প্রথম মহাযুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি। মিত্রপক্ষের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স; লেনিনের দেশে ফেরার ব্যাপারে এ দেশ দুটোই সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এ দুই দেশই মহাযুদ্ধে রাশিয়ার মিত্র। সংগত কারণেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স সরকারের সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হলেন লেনিন।

এরই মধ্যে সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত লেনিনের কয়েকজন রাজনৈতিক সহচর তৃতীয় একটি বিকল্প সামনে নিয়ে আসলেন। তারা পরামর্শ দিলেন রাশিয়ার শত্রু জার্মানির সাহায্য নেয়া যায় কিনা। কিন্তু লেনিন জানেন, যে কারণে তিনি রাশিয়ার জার সরকারের চক্ষুশূল, একই কারণে জার্মানির কাইজারেরও চক্ষুশূল। তাছাড়া রাশিয়ার সাথে চলমান যুদ্ধে জার্মানি শত্রুদেশ। তিনি শত্রুদেশের সাহায্য চাইতে পারেন না নৈতিক কারণেও। সব মিলিয়ে দেশে ফেরার ব্যাপারটা জটিল হয়ে উঠেছিল। অথচ তখনই দেশে ফেরার জন্য তার রুশ কর্মীরা উদগ্রীব ছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কায়েম করার একটা সুযোগ দেখা গিয়েছিল তখন। সময় থাকতে সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে না পারলে এতদিনের সব কষ্ট বৃথা যাবে।

সেই দোলাচাল অবস্থায় এগিয়ে এলেন তার বিশ্বস্ত একজন সুইস রাজনৈতিক কর্মী ফ্রিটজ প্লাটেন। তার মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত জার্মানির রাষ্টদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। প্লাটেনের পরিকল্পনামতে জার্মানি সরকারের সাথে লেনিনের একটা বোঝাপড়া হয়। জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের আরো কয়েকজন এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে নানা মতলববাজও ছিল বলে লেনিন তাদের পরিকল্পনাকে বাদ দিয়েছিলেন। শেষমেশ প্লাটেনের মধ্যস্থতায় যে পরিকল্পনা করা হয় সেটিই চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রহণ করা হলো। 

পরিকল্পনাটি ছিল জার্মানির ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে লেনিন ও তার দলটিকে একটি সিল করা ট্রেনে করে সীমান্ত পার করে বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়ে সুইডেন পৌঁছে দেয়া হবে। সুইডেন থেকে আরেকটি ট্রেনে উত্তরে ফিনল্যান্ড ঘুরে রাশিয়ার সীমান্তে প্রবেশ করবে দলটি। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি কড়াকড়িভাবে গোপন থাকবে বলে দুই পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণ গোপন থাকেনি সেটা যাত্রাপথের কোথাও কোথাও প্রমাণিত হয়েছিল।

পরিকল্পনার শুরুতে লেনিনের শর্ত থাকে জার্মানির ওপর দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময় তাদের জন্য এমন একটি ট্রেনের ব্যবস্থা করতে হবে যেটাকে একটা দূতাবাসের মতো মর্যাদা দিতে হবে। ওই ট্রেনে জার্মানির কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তাদের লোকজন কিংবা মালপত্রের ওপর কোনো রকম তল্লাশি, কাস্টমস চেকিং কিছুই করা যাবে না। অন্য কোনো সামরিক-বেসামরিক লোক সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না। ট্রেনটিকে সম্পূর্ণভাবে সিল করে দিতে হবে।

দেশে ফেরার ব্যাপারে লেনিন তখন মরিয়া হয়ে থাকলেও এ শর্তগুলোর ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। অন্যদিকে জার্মান সরকারও লেনিনের এ শর্তগুলো মেনে নিল। কারণ জার্মানিও মরিয়া ছিল রাশিয়াকে বিপাকে ফেলার ব্যাপারে। জার্মান সরকার লেনিনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ঘোরতর বিরোধি হয়েও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে লেনিনকে ব্যবহার করতে চাইছিল যেকোনো উপায়ে। রাশিয়ার এ পরিস্থিতিতে লেনিনের দেশে ফেরা মানে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়া। পরিকল্পনা সফল হলে বিশ্বযুদ্ধে পূর্ব ফ্রন্ট নিয়ে জার্মানিকে বেশি মাথা না ঘামালেও চলবে। বাকি শক্তি দিয়ে পশ্চিম ফ্রন্টে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে।

কোনো কোনো গবেষক বলেন দুই পক্ষের জন্য এ চুক্তিটা ছিল একটি শয়তানি চুক্তি। আবার কেউ কেউ বলেছেন এটাই প্রকৃত উইন উইন সিচুয়েশন।

লেনিন ও তার স্ত্রী নাদিয়া (নাদেজদা ক্রুপস্কায়া) ছাড়াও দলটিতে ছিল মধ্যস্থতাকারী ফ্রিটজ প্লাটেনসহ আরো ৩৩ জন, যাদের অন্তত ২০ জন বলশেভিক নেতাকর্মী। ছিলেন দুই জার্মান সামরিক কর্মকর্তা, যাদের দায়িত্ব ছিল দলটিকে পাহারা দিয়ে সীমান্ত পার করে দেয়া। দুই পক্ষের শর্ত অনুযায়ী পথে রাশিয়ানদের কেউ ট্রেন থেকে নামাতে পারবে না।

৯ এপ্রিল ১৯১৭ ছোট্ট একটা লোকাল ট্রেনে করে দলটি জুরিখ থেকে রওনা হয়ে ৬৫ মাইল দূরে জার্মান সীমান্ত শহর গোতমাদিগেনে পৌঁছে গেল অল্প সময়ের মধ্যে। সুইস কাস্টমসের বেড়াজাল পেরিয়ে দলটি নিরাপদে জার্মানির ভেতর প্রবেশ করল। সেখানে অপেক্ষায় ছিল কালো রঙের লোকোমোটিভ ও সবুজ রঙ করা আট বগির বিশেষ একটি ট্রেন। জার্মান সরকারই সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছিল।

ট্রেনের আট কম্পার্টমেন্টের মধ্যে তিনটা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং পাঁচটা ছিল কাঠের আসনের তৃতীয় শ্রেণীর। এছাড়া মালপত্র রাখার জায়গা এবং একটি বাথরুম ছিল ট্রেনের শেষ প্রান্তে। লেনিন ও তার স্ত্রী তৃতীয় শ্রেণীর একটি কম্পার্টমেন্টে উঠেছিলেন। বাকিগুলো অন্যদের ভাগ করে দেয়া হয়। ট্রেনের শেষ প্রান্তে তৃতীয় শ্রেণীর একটা কামরায় উঠেছিল দুই জার্মান অফিসার। সব কম্পার্টমেন্টে আসা-যাওয়ার জন্য মাঝখানে করিডোরের দরোজা ছিল। তবে জার্মান অফিসারদের কম্পার্টমেন্টের সীমান্তে মেঝেতে চক দিয়ে একটা দাগ টেনে দেন ফ্রিটজ প্লাটেন। বলে দেয়া হয় ওই দাগটা রাশিয়া ও জার্মানির সীমান্ত। রাশিয়ার কেউ জার্মানির সীমান্তে পা দেবে না, জার্মানির কেউ রাশিয়ার অংশে ঢুকতে পারবে না। কেবল ফ্রিটজ প্লাটেনই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দুদিকে যাতায়াত করতে পারবে এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ঘটাবে। রাশিয়ার অংশে লিখে দেয়া হয় sealed। ব্যাপারটা পুরোপুরি অফিশিয়াল ঘোষণা না হলেও দুই পক্ষই সেটাকে সম্মান করেছে সমস্ত ভ্রমণপথজুড়ে। সেই কারণেই ওই ট্রেনটিকে Sealed Train হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।

সেই সময়ে বৃহত্তর জার্মানি ছিল ছোট ছোট কিছু সামন্ত রাজ্য এবং বিভিন্নমুখী রাজনৈতিক সত্তার এক ধরনের জগাখিচুড়ি। ওই সময় যেকোনো রাশিয়ানের জন্য জার্মানির ভূখণ্ড ছিল শত্রু এলাকা। সেই শত্রু এলাকা পার হওয়ার জন্য ট্রেনটিকে চারটি রেলওয়ে সিস্টেমের মধ্য দিয়ে যাত্রা করতে হবে। সিল করা ট্রেনটাকে রেলপথের বিভিন্ন সময়ের ট্রেনের সাথে এমনভাবে সমন্বয় করা হয়েছিল যেন যাত্রাপথে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন অঞ্চলে ইঞ্জিন বদলাতে হলেও যাত্রার ধারাবাহিকতা এবং টাইমটেবিল যেন ঠিক থাকে সেটা লক্ষ রাখা হয়েছিল। আবার যুদ্ধের সময় সৈন্য চলাচলের পথে যেন কোনো বাধা না হয় সেভাবে প্রধান লাইনগুলো এড়িয়ে ছোট ছোট স্থানীয় রেলপথ ব্যবহার করা হয়েছিল।

লেনিনের দলের সবাই উঠে পড়লে ট্রেনের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং সে রাতের মতো ট্রেনটাকে নিকটস্থ শহর সিঙ্গেনের প্লাটফর্মে নিয়ে রাখা হয়। পরদিন ভোরে ট্রেনটাকে স্টুটগার্টের লাইনে নিয়ে যাত্রা শুরু করা হবে। থেমে থাকলেও সে সময়ে ট্রেন থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।

পরদিন ভোরে জনা পঁয়ত্রিশেক যাত্রী নিয়ে ট্রেনটা যাত্রা করল সিঙ্গেন থেকে। ঘুম ঘুম চোখে যাত্রীরা দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর এবং ছোট ছোট সুন্দর গ্রামগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল। অধিকাংশ মাঠই কৃষকশূন্য। কৃষকদের সবাইকে যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একনাগাড়ে চলতে চলতে স্টুটগার্ট স্টেশনে পৌঁছার পর যাত্রাবিরতি করল ট্রেনটি। এখানে ইঞ্জিন বদলানো হবে। যাত্রাবিরতি হলেও ট্রেন থেকে কারো নামার সুযোগ নেই। রাশিয়ানদের দলটা নিরাপত্তার জন্য কামরার ভেতরেই বসে থাকল। এমনকি নড়াচড়া করাও বারণ ছিল।

ইঞ্জিন বদলানোর পর ট্রেনটা যাত্রা করল ফ্রাঙ্কফুর্টের দিকে। এ পথটা বেশ দীর্ঘ। ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছে আরেক দফা ইঞ্জিন বদলানো হবে। তারপর ট্রেন বার্লিনের পথে রওনা হবে।

ট্রেনটা যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট পৌঁছল, তখন স্টেশনে সন্ধ্যাকালীন ব্যস্ততার সময়। এর মধ্যে কোনোভাবে সেখানে ফাঁস হয়ে গেল লেনিনের দলটির উপস্থিতির কথা। খবর চাউর হয়ে যাওয়ার পর স্টেশনে উপস্থিত বাড়ি ফেরা জার্মান সৈনিকরা তার বগির চারপাশে ভিড় করে এবং কখন যুদ্ধে শেষ হবে সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন করার চেষ্টা করে। কিন্তু লেনিন নিজেকে একেবারে আড়াল করে রাখেন সবরকম কৌতূহলী প্রশ্ন থেকে। এমনকি রাশিয়ান সমাজতন্ত্রীদের প্রভাবশালী এক নেতার প্রতিনিধিও তার সাক্ষাৎ লাভে ব্যর্থ হয়।

ফ্রাঙ্কফুর্টে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় অবস্থান করেছিল। পরদিন খুব সকালে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বার্লিনের উদ্দেশে রওনা হলো। বিলম্ব পুষিয়ে নিতে ট্রেনটিকে দ্রুততার সাথে চলতে হচ্ছিল। কারণ বার্লিন থেকে সুইডেনের ফেরি ধরার জন্য ট্রেনটাকে ঠিক সময়ে সাসনিজ ফেরিঘাটে পৌঁছতে হবে। ফেরি ধরার ব্যাপারটাকে এত বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল যে খোদ জার্মানির ক্রাউন প্রিন্স উইলহেমের ট্রেনকে ২ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল লেনিনের ট্রেনটাকে পথ করে দেয়ার জন্য।

কিন্তু ট্রেনটা যখন বার্লিন প্রবেশ করে ততক্ষণে ফেরির সময় পার হয়ে গেছে। ট্রেনটি রাজধানীর পাশ দিয়ে উত্তর প্রুশিয়া রেলওয়ে রুট ধরার জন্য নির্ধারিত স্টেশন স্টেটিনে পৌঁছে যায়। এখান থেকেই সাসনিজের ফেরি ধরার জন্য রওনা হতে হবে। এরই মধ্যে সেদিনের ফেরি মিস হয়ে যাওয়ায় ট্রেনটি পরবর্তী ২০ ঘণ্টার জন্য সেই স্টেশনে অপেক্ষা করে। 

এ বিলম্ব হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত প্রচলিত আছে। একটা দল প্রচার করে বার্লিনে অপেক্ষার সময় জার্মান সরকারের সাথে লেনিনের বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছিল। ট্রাঙ্ক ভর্তি করে ৪০ মিলিয়ন মার্ক লেনিনকে দেয়া হয়েছিল রাশিয়ায় গিয়ে বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য। কিন্তু গবেষকরা তার কোনো সত্যতা পাননি। লেনিনের সাথে জার্মান সরকারের উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার সাক্ষাৎ হওয়ার তথ্যপ্রমাণও মেলেনি। ফ্রিটজ প্লাটেন পুরো ব্যাপারটিকে স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

লেনিনকে বহনকারী ট্রেনটিকে স্টেটিন থেকে সাসনিজ ফেরিঘাটে পৌঁছানোর জন্য রুগেন দ্বীপে যেতে হবে, সেই দ্বীপটি একটি সেতু দ্বারা জার্মানির মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত। সেখান থেকে কুইন ভিক্টোরিয়া নামের একটা ফেরিতে করে দলটি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুইডেনের ট্রেলেবর্গে পৌঁছবে। সুইডেন তখন নিরপেক্ষ দেশ বলে বিবেচিত।

সমুদ্রযাত্রাটি বেশি দীর্ঘ না হলেও বাল্টিক সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কারণে দলের কেউ কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করেছিল। সুইডেনের সমুদ্রতীরবর্তী শহর ট্রেলেবর্গ পৌঁছে গেল ফেরি। ফেরিঘাটে শহরের মেয়র এবং সেখানকার সমাজতান্ত্রিক দলের লোকজন লেনিনের দলটিকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকলেও তাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো যায়নি। কারণ এর পরই একটি সার্ভিস ট্রেন তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, যেটি ১৫ মিনিটের মধ্যে স্টেশন ত্যাগ করবে পরবর্তী গন্তব্য মালমো শহরের উদ্দেশে। এখন তিনি একটি যুদ্ধবিরোধী নিরপেক্ষ দেশে অবস্থান করছেন, তাই সিলড ট্রেনের দরকার ছিল না আর।

মালমো শহরে পৌঁছার পর পার্টির উদ্যোগে লেনিনের দলটিকে একটি বড় হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ সমৃদ্ধ একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। জার্মানির অংশের ট্রেনযাত্রা খুব কঠোরভাবে সিল করা হয়েছিল বলে তিনদিন ধরে খাওয়াদাওয়া খুব সীমিত ছিল। ফলে মালমো শহরের বিলাসবহুল হোটেলে নানা সুস্বাদু সুইডিশ খাবারের পর্বতপ্রমাণ স্তূপগুলোর ওপর ক্ষুধার্ত দলটির আগ্রাসনটা বেশ জমাট ছিল এবং খাবারের ডিশগুলো খুব তাড়াতাড়ি তলানিতে নেমে গিয়েছিল। খাওয়াদাওয়া সেরে আর অপেক্ষা করা গেল না। পরবর্তী গন্তব্য সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম।

স্টকহোমগামী রাতের ট্রেন ধরার জন্য ছুট দিল দলের সবাই। শুক্রবার সকাল ৯টায় সুইডেনের রাজধানীতে পৌঁছে যায় দলটি। স্টকহোমে পৌঁছার পর সেখানকার মেয়র, স্থানীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার এমনকি একটি নিউজরিল ক্যামেরাম্যান (সেই দিনগুলোতে এটা একেবারেই অভিনব ব্যাপার ছিল) সবাই জড়ো হয়েছিল লেনিন ও তার কমরেডদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। শহরে একটি ব্যস্ত দিন কাটাল সবাই, সুইডিশ সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে নানা বৈঠক হলো। মার্কেটে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটাও করল কেউ কেউ।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দলটি তাদের নির্ধারিত ট্রেনে ওঠার পর উৎসবের আমেজে তাদের বিদায় জানান হলো সুইডিশ সমাজতন্ত্রীদের পক্ষ থেকে। পরবর্তী গন্তব্য ৬০০ মাইল দূরে ফিনিশ সীমান্তের কাছাকাছি সুইডেনের শেষ শহর হাপারান্দা। সেই রাত এবং পরের সমস্ত দিনজুড়ে ট্রেনটি একই গতিতে হিমশীতল বনভূমিগুলোর মধ্য দিয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে চলল এবং সন্ধ্যায় হাপারান্দা স্টেশনে পৌঁছে গেল। সীমান্তের ওপাশে ফিনল্যান্ডের সীমান্ত শহর তোর্নিও। হাপারান্দা থেকে তোর্নিওর মাঝে একটি নদী মোহনা আছে। নদীটা বরফে জমে ছিল সেই সময়। দলটিকে নদী পার হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কুকুর টানা স্লেজগাড়ির সাহায্য নিতে হয়েছিল। 

নদী পেরিয়ে তোর্নিওতে পৌঁছার পর সীমান্ত কর্মকর্তাদের তল্লাশি ও জেরার মুখে পড়ে দলটি। সে সময় ফিনল্যান্ড ছিল রাশিয়ার অধীন স্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল। লেনিন একটু শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন জেরা ও তল্লাশির কারণে। কিন্তু তল্লাশিতে আপত্তিকর বা সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি বলে ছেড়ে দেয়া হলো দলটিকে।

ইস্টার সানডের সন্ধ্যাবেলা তোর্নিও স্টেশন থেকে ট্রেনটা দক্ষিণ দিকে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হলো। বরফে জমাট হয়ে থাকা পাইনের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বাদামি ধূসর দিগন্ত পেরিয়ে বরফরাজ্য ছাড়িয়ে ট্রেনটা এগিয়ে চলল আরো দক্ষিণে। রাজধানী হেলসিংকিকে স্পর্শ না করে শিল্প শহর টামপেরের পাশ দিয়ে রাশিয়ার সীমান্ত শহর বেলুস্ট্রভের দিকে চলতে থাকল।

৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার যাত্রাপথের শেষ অংশ এটি। যেতে যেতে দলটি আশঙ্কা করছিল বেলুস্ট্রভ স্টেশনে হয়তো তাদের জন্য অপেক্ষা করছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। কিন্তু ট্রেনটা প্লাটফর্মে ঢোকার আগ থেকেই তারা দেখতে পেল হাজার হাজার শ্রমিক-জনতা অপেক্ষা করছে তাদের বরণ করার জন্য। স্টেশনে নামার সাথে সাথে লেনিনকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে সবাই নাচতে শুরু করল। ওখান থেকে সর্বশেষ গন্তব্য সেন্ট পিটার্সবার্গের দূরত্ব খুব বেশি নয়। লেনিনের দলটি তখনো নিশ্চিত হতে পারছিল না রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে কী রকম অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

কিন্তু ট্রেনটা যখন সেন্ট পিটার্সবার্গের ফিনল্যান্ড স্টেশনের কাছে পৌঁছল তখন ৩৫ জনের দলটির জন্য, লেনিনের জন্য কী বিপুল বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সেটা তারা কেউ কল্পনাও করেননি। পুরো রাজধানী ভেঙে পড়েছিল লেনিনকে অভ্যর্থনা জানাতে। দূর থেকে লেনিনের ট্রেনের লোকোমোটিভের মাথায় জ্বলতে থাকা তিনটি বাতি দেখা যাওয়ামাত্রই লোকজন হুড়মুড় করে লাইনের দুই পাশে ছুটে এল। ধীরে ধীরে ট্রেনটি যখন প্লাটফর্মে প্রবেশ করছিল তখন সামরিক বাহিনীর চৌকস একটি দল ব্যান্ড বাজিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানাল সেই নেতাকে, যিনি আধুনিক দুনিয়ার সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন ছয় মাসের মধ্যে। 

সিলড ট্রেনের সেই সফল অভিযাত্রার জন্য জার্মানিকে দায়ী করে অন্য এক বিশ্বনেতা উইনস্টন চার্চিল ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন:

Full allowance must be made for the desperate tasks to which the German war leaders were alreadz committed. Nevertheless it was with a sense of awe that they turned upon Russia the most grisly of weapons. They transported Lenin in a sealed truck like a plague bacillus from Switzerland to Russia.


তথ্যসূত্র:

১. The German-Bolshevik Conspiracy: Helphand-Paruvs, Lenin’s ‘Sealed Train’ and The Russian Revolution of October 1917 by D. M. Pretorius

২. Lenin’s Journey that Shook the 20th century by Nigel Devereux

৩. Lenin’s Sealed Train by John Simkin

৪. Vladimir Lenin’s Return Journey to Russia Changed the World Forever by Joshua Hammer


হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক