গত শতকের চল্লিশের দশকে পূর্ব বাংলার মুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবারের যে শিক্ষিত তরুণরা কমিউনিস্ট বা বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, সরদার ফজলুল করিম ছিলেন তাঁদের একজন। তবে অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁর যেখানে তফাতটা ছিল, সেটা হলো তিনি এসেছিলেন একেবারে গ্রামীণ কৃষিজীবী পরিবার থেকে। সে সময় এবং পরবর্তীকালেও দেখা গেছে, ভালো ছাত্ররাই সাধারণত বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হতেন। এর ভালো-মন্দ দুটি দিকই ছিল। এখানে কারো নাম উল্লেখ না করেও বলা যায়, সেই উজ্জ্বল তরুণদের অনেকেই পরে তাঁদের মেধা ও প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের ঔজ্জ্বল্য অর্জনে প্রয়াসী হয়েছেন। পার্টি এমনকি রাজনীতি থেকেও দূরে সরে গেছেন। আপন আগ্রহ এবং পারিবারিক চাপ দুইই এক্ষেত্রে কাজ করেছে। নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্র— তার ভীতি ও প্রলোভনের একটা বড় ভূমিকা তো ছিলই। মোট কথা, কিছুদিনের জেল বা ফেরারি জীবন এবং সংগ্রাম ও ত্যাগের অধ্যায় পেছনে ফেলে তাঁরা ভিন্ন পথে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন। এ প্রসঙ্গে আত্মস্বীকৃতি হিসেবে কেউ হয়তো পরে ‘জীবনের মোহের কাছে হেরে যাওয়া’র কথা বলেছেন। আবার পার্টি-শৃঙ্খলার নামে যেভাবে ভিন্নমতকে দমন করা হয়েছে, একমাত্রিক চিন্তা-চেতনার পোষকতা করা হয়েছে, তাকেও অনেকে আপন প্রতিভা বিকাশ এবং মনন বা স্বাধীন চিন্তাচর্চার অনুকূল বিবেচনা করেননি। শুধু এ দেশ বা উপমহাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের বেলায়ই এই ব্যাপারটা দেখা যায়। একটা সময় ছিল, যখন ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি মাত্রই পার্টিতে ‘রেনিগেড’ হিসেবে চিহ্নিত হতো। তেমন ব্যক্তি শ্রেণীশত্রু বা প্রতিক্রিয়াশীলদেরও অধম, সুতরাং সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। এমন একটা পরিবেশে মধ্যবিত্ত পটভূমি থেকে আসা মেধাবী তরুণদের অনেকেই আগে-পরে পার্টি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। দু-দিক থেকেই যাকে বলে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়মে ব্যাপারটা ঘটেছে। মুনীর চৌধুরী সম্পর্কে বলতে গিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত যেমনটি বলেছেন, ‘তিনিও থাকতে চাইলেন না, আমরাও তাঁকে দূরে ঠেলে দিলাম।’ চল্লিশের দশকে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই তরুণদের অনেকে পরে জীবনের নানা ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি তাঁদের অবদানে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের কেউ হয়েছেন শীর্ষ আমলা বা কূটনীতিক, কেউ স্বনামখ্যাত অধ্যাপক বা সাংবাদিক। আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী। মেধাবী ও বুদ্ধিমান তাঁরা, যে পেশাতেই গেছেন প্রতিভা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল নিয়ে সরদার ফজলুল করিমও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন। আবার পার্টির নির্দেশে সে চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক কর্মী-সংগঠকের জীবন বেছে নিতে দ্বিধা করেননি। যখন ও যতদিন পার্টি করেছেন, প্রায় ধর্মবিশ্বাসীর আনুগত্য নিয়েই পার্টির সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেছেন। এ ব্যাপারে মনে হয় এক রকম অপ্রতর্ক্য অবস্থানই ছিল তাঁর। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে পার্টির একজন প্রথম সারির কর্মী বা নেতা হিসেবে দলীয় নীতি ও রণকৌশল প্রশ্নে পার্টি ফোরামে অনুষ্ঠিত আলোচনা-বিতর্কে তিনি যে অংশ নেননি, তা নয় (পার্টির ২৮ সদস্যের প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২৮ নং সদস্য ছিলেন তিনি)। তবে তাত্ত্বিক বলতে যা বোঝায়, সেই ভূমিকায় তিনি বোধহয় কখনই ছিলেন না। একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে মাঠে-ময়দানে পার্টির বক্তব্য ও কর্মসূচি প্রচার এবং মেহনতি মানুষ বিশেষ করে কৃষকদের অধিকার সচেতন করার কাজেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় সবটা ব্যয়িত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, আগে-পরে যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করেছেন, যাঁর পরিচিতি দেশের একজন অগ্রগণ্য বিদ্বান ও সমাজচিন্তক হিসেবে, পার্টির নীতি নির্ধারণে তাঁর তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা প্রভাব ছিল না। অবশ্য সেই চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে পার্টির নিজস্ব নীতি বা রণকৌশল বলে আসলে কিছু ছিল কি? তা নির্ধারিত হতো মূলত আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট রাজনীতির আলোকে এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে। আর বাইরের সে নীতি-কৌশল ব্যাখ্যায় পারঙ্গমতাকেই সেদিন তত্ত্ববাগীশতার পরাকাষ্ঠা বলে গণ্য করা হতো। অথচ সরদার ফজলুল করিমের মতো একজন মানুষের বিদ্যাবুদ্ধি এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা অর্থাত্ গ্রামপ্রধান এ দেশের জনজীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অভিজ্ঞতা যদি সেদিন পার্টির নীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, নিশ্চয়ই এ দেশের সমাজ পরিবর্তনকামী রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা ও গতি পেত।

জীবনের সুদীর্ঘ সময় তাঁর কেটেছে কারান্তরালে, রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে। মাঝে আইনসভার সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন রাজনীতি তাঁর উপযুক্ত ক্ষেত্র নয়। কিংবা সামাজিক-সাংসারিক বাস্তবতা, নিজের ও পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের প্রয়োজন তাঁকে সে পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। স্বাধীনতার আগে কয়েক বছর বাংলা একাডেমির চাকরিসূত্রে জীবিকা সংস্থানের নিশ্চয়তা তাঁকে সারস্বত সাধনায় আত্মনিয়োগের সুযোগ করে দেয়। স্বাধীনতার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ফিরে আসেন। শিক্ষাদানের কাজটিকে তিনি প্রকৃতই উপভোগ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিকালীন ও পরবর্তীকালে তিনি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কতটা সফল বা ছাত্রপ্রিয় ছিলেন, তা যারা  শ্রেণীকক্ষে তার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে তাঁর নিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের প্রতি বাত্সল্য, সরল ও অহমিকাবর্জিত আচরণ তাঁকে যেমন বাইরে, তেমন শিক্ষাঙ্গনেও সবার শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল। অনেকেই তাঁকে দেখত, আজকের দিনে প্রায় দুর্লভ হয়ে আসা, আদর্শবান শিক্ষকের প্রতিমূর্তি হিসেবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্র কারো কাছ থেকেই পাননি। অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না পেয়েই তাঁকে চাকরি থেকে অবসর নিতে হয়েছে। তাঁকে প্রফেসর করা হয়নি, কারণ আক্ষরিক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত পদোন্নতির শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি। তাঁর পিএইচডি ছিল না, তথাকথিত স্বীকৃত মানের গবেষণা পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ ছাপা হয়নি। যদিও একাডেমিক অর্থেও তিনি যে ক’টি দরকারি বা মূল্যবান কাজ করেছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে অনায়াসেই ওই পদোন্নতি দেয়া যেত। তাঁকে সেই সম্মান দিতে না পেরে তাঁর বিভাগীয় সহকর্মীরা (যাদের কেউ কেউ হয়তো তাঁর সরাসরি ছাত্রই ছিলেন) ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ কতটা লজ্জিত বা আদৌ লজ্জিত কিনা আমরা জানি না। এ দেশে বহুজনকেই বিভিন্ন সময়ে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান দেয়া হয়েছে। সরদার ফজলুল করিম সে সম্মান থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। এ নিয়ে তাঁর মনে কি কোনো দুঃখ ছিল? আমরা জানি না।

    শুরু থেকে প্রায় সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ দেশের কমিউনিস্ট তথা বাম রাজনীতির সব পর্যায়েই সন্তপ্রতিম কিছু মানুষের সাক্ষাত্ আমরা পেয়েছি। রাজনৈতিক পরিচয় ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে যাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত সততা, আদর্শনিষ্ঠা, ত্যাগ, সেবাপরায়ণতা, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনপ্রণালী ইত্যাদি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য সবার শ্রদ্ধা বা সম্ভ্রম আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের এই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে পার্টি একটা সময় পর্যন্ত জনগণের মধ্যে সংগঠন বিস্তার ও রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সফলও হয়েছে বলা যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই প্রবীণ বিপ্লবীরা তাঁদের এ গুণগুলো লাভ করেছিলেন অগ্নিযুগের স্বদেশকর্মীদের কাছ থেকে। অনুশীলন বা যুগান্তর গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের পূর্বসংস্রবের সূত্রে। তাঁদের সংস্পর্শে পরবর্তী প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যেও যে কম-বেশি এই গুণগুলোর অনুসরণ বা চর্চা হয়নি, তা নয়। পার্টি থেকেও সাধারণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও তাদের স্বার্থের সঙ্গে একাত্মতাবোধের পাশাপাশি সরল জীবন যাপনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। যদিও অনেকের বেলায়ই রাজনৈতিক কৌশলের ঊর্ধ্বে তা অন্তরের বিশ্বাস ও প্রাত্যহিক জীবনাচরণের অংশ হয়ে ওঠেনি। নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী কমিউনিস্টদের বেলায় এ কথাটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এ অবস্থায় রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন কিংবা সরদার ফজলুল করিমের মতো মহত্ পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের সুনাম ও সুকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে বটে। কিন্তু তাঁদের জীবনকে অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত মনে করা হয়নি। এ ব্যাপারে পরিবর্তিত বিশ্ব ও সামাজিক বাস্তবতার যুক্তি তো ছিলই। রণেশ দাশগুপ্ত ও সত্যেন সেনের শেষজীবন কেটেছে স্বদেশ থেকে নির্বাসিত এবং এককালের রাজনৈতিক সতীর্থ ও বন্ধুদের দ্বারা পরিত্যক্ত অবস্থায়। আর দেশে থেকেও সরদার ফজলুল করিম তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোয় উপেক্ষা-উদাসীনতার শিকার হয়েছেন।

   প্লেটো বা রুশোর গ্রন্থের অনুবাদ আমাদের দেশে পরেও হয়েছে এবং হবে। আগামীতে হয়তো এ দেশেও কেউ মূল গ্রিক বা ফরাসি থেকে সরাসরি এই অনুবাদের কাজটি করবেন। হয়তো আরো পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ দর্শনকোষও আমরা পাব। সেদিনও কিন্তু সরদার ফজলুল করিমকে তাঁর পথিকৃত্ ভূমিকার জন্য আমাদের স্মরণ করতে হবে। এই কাজগুলো করার পেছনে তাঁর ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ পাঠকের প্রয়োজন মেটাবার তাগিদই হয়তো প্রাথমিকভাবে কাজ করেছিল। তবু তিনি কাজগুলো করার কথা ভেবেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন আর কেউ তা ভাবেনি। তবে যার জন্য আমাদেরকে ভবিষ্যতেও তাঁর শরণাপন্ন হতে হবে, তা হলো তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী রচনা ও দিনলিপি। এ দেশের বিগত প্রায় এক শতাব্দীর সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্তরঙ্গ পরিচয় লাভের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই সরল আটপৌরে ভাষায় লেখা এই রচনাসম্ভার কেবল সাধারণ পাঠকের কৌতূহলই মেটাবে না, আগামী দিনেও গবেষক ও ঐতিহাসিকদের জন্য মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও চিন্তক

morshedshasan@gmail.com