পিতৃগৃহ ইংল্যান্ডের চেস্টারে হলেও রবার্ট বসবাস করতেন আন্দালুসিয়ায়। ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমে অবস্থিত উপদ্বীপটিতে তখন আরব সভ্যতার স্বর্ণযুগ। মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানকে আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেন রবার্ট। সেটাই তাকে এনে দেয় ইউরোপজোড়া খ্যাতি। ১১৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘‌মাসাইলি খালিদ লি মারইয়ানুস আল রাহিব’ অনুবাদ করেন তিনি। পরের বছর ১১৪৫ সালে করেন ‘‌কিতাবুল মুখতাসার ফি হিসাবিল জাবর ওয়াল মুকাবালা’ অনুবাদ। প্রথমটি ইউরোপে প্রচারিত আলকেমি শাস্ত্রের প্রথম পুস্তক। দ্বিতীয়টিতে বীজগণিতের সঙ্গে পরিচিত হয় ইউরোপ। ষোলো শতক পর্যন্ত বইটি পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠিত হয়েছে। গণিতবিদ হিসেবে এখনো সমাদৃত লেখক আল খাওয়ারিজমি। বাস্তবিক অর্থে আধুনিক বীজগণিতের পাটাতন নির্মাণে আরব গণিতবিদরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা কেবল মাঝ সমুদ্রের নাবিকদের জন্য পথ দেখানো ধ্রুবতারার সঙ্গেই তুলনীয়। 

মুহম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি জন্মগ্রহণ করেন ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। গণিতবিদ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করলেও অবদান রেখেছেন জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল ও ত্রিকোণমিতিতে। প্রতিটা শাখায়ই তার বিচরণ পৃথকভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তার নাম থেকে গণিতের বিশেষ শাখা ‘‌অ্যালগরিদম’ নামের উদ্ভব। স্প্যানিশ শব্দ ‘‌গুয়ারিজমো’ অর্থ সংখ্যা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, সেটাও তার নামেরই অপভ্রংশ। খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন তিনি। আব্বাসীয় আমলে জ্ঞানবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় যে ‘‌বায়তুল হিকমা’ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে কাজ করতেন মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিতরা। ৮৩০ সালে প্রকাশিত ‘‌কিতাবুল মুখতাসার ফি হিসাবিল জাবর ওয়াল মুকাবালা’ থেকেই পরবর্তী সময়ে অ্যালজেব্রা নামের উদ্ভব, যেখানে আলোচিত হয়েছে বীজগণিতের বিচিত্র সমস্যাবলি। বিশেষ করে দ্বিঘাত সমীকরণ ও লঘূকরণের মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরেন আল খাওয়ারিজমি। তার আগে ডায়োফ্যান্টাস অব আলেকজান্দ্রিয়া বীজগণিত নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও আল খাওয়ারিজমি ছিলেন মৌলিক ও স্বাতন্ত্র্যময়। বীজগণিতীয় অজ্ঞাত রাশিকে তিনি ‘‌শাইয়া’ নামে অভিহিত করেছেন, অজ্ঞাত রাশির বর্গকে অভিহিত করেছেন ‘‌মাল’ হিসেবে। এভাবেই সমীকরণ সাজিয়েছেন ও সমাধান করেছেন। উদাহরণ হিসেবে— 

x2 =40x-4x2

5x2 =40x (উভয় পক্ষে 4x2 যোগ করে)

x2 =8x

আল খাওয়ারিজমি x-এর মান বের করেছেন ৮। আর এভাবে বহুপদী সমীকরণের বহুমাত্রিক সমাধান হাজির করেছেন পুস্তকে। কিতাবুল জাবর পুস্তকের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ‘‌খলিফা আল মামুন আমাকে উৎসাহিত করেছেন হিসাবনিকাশ নিয়ে কিছু লিখতে। বিশেষ করে উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ভাগ, আইন, ব্যবসা, লেনদেন, জমি পরিমাপ, খাল খনন এবং অন্যান্য কাজে জরুরি।’ 

সাবিত ইবনে কুররা আল হাররানি পরিচিত বীজগণিতের পণ্ডিত হিসেবে। ৮২৪ সালে হাররানির জন্ম, বেঁচে ছিলেন ৯০১ সাল পর্যন্ত। তিনি নিওপ্লেটোনীয় মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুসা বিন শাকিরের পুত্র মুহম্মদের সঙ্গে পরিচিত হন। ইউরোপের মেডিসি পরিবারের মতো জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মুসার পরিবার ছিল সমকালে সমাদৃত। মুসা বিন শাকিরের তিন ছেলে মুহম্মদ, আহমদ ও হাসান ছিলেন জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ও বই সংগ্রাহক। মুহম্মদ বিন মুসার সঙ্গেই সাবিত বাগদাদ যাত্রা করেন ও খলিফার সঙ্গে পরিচিত হন। ঐতিহাসিক ইবনে নাদিম ও আল কিফতির দাবি, সাবিত ইবনে কুররার প্রতিভা বিস্তৃত ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাজুড়ে। গ্রিক ও সিরীয় ভাষায় লিখিত পুস্তক তিনি আরবিতে অনুবাদ করেন। ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, অ্যাপোলোনিয়াস, টলেমি ও অন্যান্য গ্রিক পণ্ডিতের লেখা আনেন আরবিতে। ইউরোপীয় পণ্ডিত সিএফ কারমোডি তার লেখা লাতিনে অনুবাদ করেন, যা ইংরেজিতে ‘‌দি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ওয়ার্কস অব সাবিত ইবনে কুররা’ নামে পরিচিত। আব্বাসীয় আমলে লেখা গ্রন্থটিতে তিনি নক্ষত্রের গতি ও কৌণিক অবস্থানকে গাণিতিক উপায়ে ব্যাখ্যা করেছেন। বীজগণিত ও জ্যামিতি বিস্তারিত এসেছে ‘‌অন দ্য ভেরিফিকেশন অব প্রবলেমস অব অ্যালজেব্রা বাই জিওমেট্রিক্যাল প্রুফস’ বইতে, বর্তমানে পাণ্ডুলিপিটির কপি তুরস্কের হায়া সোফিয়ায় আছে। বীজগণিতীয় আলোচনায় সাবিত ইবনে কুররার দাবি, অধিকাংশ বীজগণিতীয় সমস্যাকে তিনটি উপায়ে বা উসুলের মাধ্যমে সমাধানে আনা যায়। সবচেয়ে পরিচিত দুটি সমীকরণ হলো—

x2+mx = n

x2+b = ax

সাবিত ইবনে কুররা বীজগণিতীয় সমস্যায় জ্যামিতির ব্যবহার করেছেন, যা খাওয়ারিজমির দেখিয়ে যাওয়া পথের চেয়ে স্বতন্ত্র। তৎকালীন বাগদাদের গাণিতিক চর্চায় দুটি বিপরীত প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথম প্রবণতায় পারসিক ও ভারতীয় উৎসের প্রভাব ছিল। আল খাওয়ারিজমি ছিলেন এ ধারার পুরোধা পুরুষ। তিনি পারসিক ও ভারতীয় উৎসের তথ্য ব্যবহার করেছেন অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল তৈরির ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় প্রবণতায় প্রাচীন গ্রিক জ্ঞানকে আরবীয়করণের প্রচেষ্টা ফুটে ওঠে। সেখানে ইউক্লিড ও টলেমি পেয়েছেন ভিন্ন মাত্রা। সাবিত ইবনে কুররা ছিলেন এ দ্বিতীয় প্রবণতার প্রথম সারির পণ্ডিত।

উমর খৈয়ামকে সবাই কবি ও দার্শনিক হিসেবেই চেনে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তার লেখা ৬০০ রুবাইয়াত বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফিটজেরাল্ডের করা অনুবাদ প্রকাশ হয় ১৮৫৯ সালে। তবে উমর খৈয়ামের পাণ্ডিত্যের দ্যুতি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। বীজগণিত নিয়ে তার লেখা পুস্তক ‘‌অন দ্য প্রুফস অব দ্য প্রবলেমস অব অ্যালজেব্রা অ্যান্ড মুকাবালা’। ১৯৫০ সালে এইচ জে জে উইন্টার বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। বইয়ের ভূমিকায় উমর খৈয়াম দাবি করেছেন, ‘‌বীজগণিত হলো অজ্ঞাত সাংখ্যিক ও জ্যামিতিক পরিমাণকে নির্ণয় করার শিল্প।’ উমর খৈয়াম সংখ্যা ও পরিমাপে তার শিল্পচৈতন্যকে ছড়িয়ে রেখেছেন। পরিমাপযোগ্য হিসেবে তিনি চার ধরনের বিষয়কে উপস্থাপন করেন। রেখা, তল, ঘন বস্তু ও সময়। একই মানুষের মধ্যে কবিত্ব ও গণিতের মতো বিপরীত বৈশিষ্ট্য কীভাবে একত্র হতে পারে, তা এখনো ঐতিহাসিকদের বিস্মিত করে।

উমর খৈয়ামের বীজগণিতে জ্যামিতির প্রভাব স্পষ্ট। তিনি প্রথমে রৈখিক ও পরবর্তী সময়ে দ্বিপদী সমীকরণের সমাধান করেছেন। প্রমাণের ক্ষেত্রে সাহায্য নিয়েছেন ইউক্লিডের এলিমেন্টসের। দেখিয়েছেন, ঘন সমীকরণকে কনিকের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। যদিও তিনি পুস্তকের শেষ দিকে স্বীকার করেছেন, মুহম্মদ ইবনে লাইস আবুল জুদ ঘনের সমীকরণ সমাধানে কনিকের ব্যবহারের প্রচেষ্টা করেছেন তার আগে। এছাড়া উমর খৈয়াম উপবৃত্ত ও অধিবৃত্তের সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। কনিকের ছয় ধরনের সমীকরণকে তিনি বিবেচনায় নিয়েছেন। সেগুলো হলো—

1. x3+ ax = b

2. x3+ b = ax

3. x3= ax + b

4. x3+ ax2 = b

5. x3 + b = ax2

6. x3 = ax2 + bx

দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান উমর খৈয়াম পূর্ববর্তী গণিতবিদদের আদলেই করেছেন। তবে ঘন সমীকরণের ক্ষেত্রে মুনশিয়ানা ছিল উল্লেখযোগ্য। গ্রিক গণিতবিদদের অনুসিদ্ধান্তকে এগিয়ে নেন। এখনো তার কাজ প্যারিস ও লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিসে বিদ্যমান। ইউক্লিড নিয়ে আলোচনা সংরক্ষিত রয়েছে মিউনিখে।

ইবনে আল বান্না আল মারাকাশি জন্মগ্রহণ করেছেন ১২৫৬ সালে। মারাকাশের আজদ আরব গোত্রে জন্ম, পদবি ইবনে আল বান্না। ছিলেন একই ধারে গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষবিজ্ঞানী। অন্তত ১৭ জন শিক্ষকের কাছে থেকে বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন। তার মধ্যে মুহম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া আশ-শরিফ আল মারাকেশির কাছে শিখেন ইউক্লিডের এলিমেন্টস। পাটিগণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ নেন যথাক্রমে মুহম্মদ ইবনে আলি ও আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে মাখলুফ আস সিজিলমাসির কাছ থেকে। ১৩২১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শতাধিক বই রচনা করেন। গণিতশাস্ত্রে লিখিত সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘‌তাখলিসি আমাল আল-হিসাব’, যেখানে আলোচনা করেছেন ভগ্নাংশ, বর্গ ও ঘনর যোগফল নিয়ে। তাছাড়া ‘‌তানবিহুল আলবাব’ গ্রন্থে হাজির করেছেন চাষবাস-সংক্রান্ত হিসাবনিকাশ, মুসলিম আইন ও উত্তরাধিকারবিষয়ক আলোচনা, নামাজের সময় পরিমাপ ও বিভিন্ন প্রকার পরিমাপ-পদ্ধতি তুলে এনেছেন। ইউক্লিডের এলিমেন্টসের আলোচনাকেও এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। ‘‌রাফ আল-হিজাব আন উজুহু আমালাল হিসাব’ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন বর্গমূল ও ভগ্নাংশ নিয়ে। 

আবুল হাসান ইবনে আলি ইবনে মুহম্মদ ইবনে আলি আল-কোরায়শি আল-কালাসাদি জন্মগ্রহণ করেন ১৪১২ সালে গ্রানাডায়। বীজগণিতে তাকে আরব বিশ্বের মহারথী বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বীজগণিতীয় প্রতীক ব্যবহারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বীজগণিতের ওপরে তার লেখা পুস্তকের নাম ‘‌আত তাবসিরা ফি ইলমিল হিসাব’। খাল খনন, উত্তরাধিকার হিসাব ও পরিমাপ দিয়ে আলোচনার শুরু। ধাপে ধাপে তা বীজগণিতীয় বিভিন্ন রাশি ও অনুসিদ্ধান্তে ঠেকেছে। ১৪৮০ সালে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার বাহিনী যখন গ্রানাডায় অভিযান চালায়, তখন মাতৃভূমি ত্যাগ করে তিনি তিউনিসিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন ১৪৮৬ সালে। আল খাওয়ারিজমি ও উমর খৈয়ামের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি বীজগণিতীয় সমীকরণে প্রভূত উন্নতি আনয়ন করেন। তিনি আরবি বর্ণমালার মাধ্যমে গাণিতিক সংকেত প্রকাশ করতেন। ব্যবহৃত প্রতীকগুলো হলো—যোগ বোঝাতে ওয়া (ﻭ), বিয়োগ বোঝাতে ইল্লা (إلا), গুণ বোঝাতে ফি (في), ভাগ বোঝাতে আলা (على), বর্গমূল বোঝাতে জাদাহ (ﺝ), অজ্ঞাত রাশি বোঝাতে শাইয়া (ﺵ), বর্গ বোঝাতে মোরাব্বা (ﻡ), ঘন বোঝাতে মোকাআব (ﻙ), সমান বোঝাতে ইয়াদিলু (ﻝ)।

আবু কামিল শুজা ইবনে আসলাম ইবনে মুহম্মদ ইবনে শুজা জন্মগ্রহণ করেছেন ৮৫০ সালে। তিনি আল হাসিব আল মিসরি বা মিসরীয় গণিতবিদ নামে পরিচিতি অর্জন করেন। প্রথম গণিতবিদ হিসেবে তিনি অমূলদ সংখ্যার ব্যবহার করেন। তার গাণিতিক পদ্ধতিকে পরবর্তী সময়ে ফিবোনাচ্চি ব্যবহার করেন। বীজগণিত ও জ্যামিতিতেও অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রথম মুসলিম গণিতবিদ হিসেবে তিনি অষ্টম ঘাত পর্যন্ত সমীকরণ সমাধান করেন। x5 কে পাঠ করেছেন মাল মাল শাইয়া অর্থাৎ x2×x2× x , এভাবেই ঘাতকে পাঠ করার রীতি গড়ে তোলেন। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন আল খাওয়ারিজমির পর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় বীজগণিতবিদ হিসেবে তার নাম উদ্ধৃত করে গেছেন। আবু কামিলের প্রধান পুস্তকের নাম কিতাবু ফিল জাবর ওয়াল মুকাবালা। আল খাওয়ারিজমির বইয়ের নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তিনি বইটিতে আল খাওয়ারিজমিকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন। পূর্ণ সংখ্যা, ভগ্নাংশ, অমূলদ সংখ্যা, বর্গমূল, বর্গ, ঘন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি। বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই জ্যামিতির মাধ্যমে বীজগণিতীয় সমস্যা সমাধানের উপায় বাতলেছেন। বাতলে দিয়েছেন অজ্ঞাত রাশি খুঁজে বের করার নানা পদ্ধতি। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আল খাওয়ারিজমির উদ্ধৃত করা ছয়টি বিশেষ সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে আলোচিত হয়েছে বহুভুজ ও গণিতের অন্যান্য বিষয়। পরবর্তী সময়ে বইটিতে টীকা সংযুক্ত করেছেন অন্য দুই গণিতবিদ আল ইসতাখরি আল হাসিব এবং আলি ইবনে আহমদ আল ইমরানি। দুঃখজনকভাবে উভয় পাণ্ডুলিপিই বিলুপ্ত। আবু কামিলের রচনার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ইউরোপের ফিবোনাচ্চি ও জন অব সেভিলের রচনাবলি। বস্তুত ফিবোনাচ্চি ছিলেন তার থেকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত, তার লেখা ‘‌লিবার অ্যাবাচি’ গ্রন্থে আবু কামিলের ছাপ স্পষ্ট। চতুর্দশ শতাব্দীতেই আবু কামিলের রচনার কিয়দংশ অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপে, যার অনুবাদক উইলিয়াম অব লুনা। পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকেই তার বইটির হিব্রু অনুবাদ করেন মোরদেখাই ফিনজি।

কিতাবু ফিল জাবরের বাইরেও আবু কামিলের গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে কিতাবুত তারাইফ ফিল হিসাব, কিতাব আল মুখাম্মাস ওয়াল মুয়াশশার, কিতাবুত ত্বাইর, কিতাবুল মিসাহা ওয়াল হিনদাসা। বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রতিটি পুস্তকই অনন্য। জ্যাক সেসিয়ানো সমগ্র মধ্যযুগে কয়েকটি গাণিতিক সমস্যার জন্য আবু কামিলকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করেন। আর আবু কামিলের থেকেই প্রভাবিত ছিলেন পারসিক গণিতবিদ আবু বকর মুহম্মদ ইবনে হাসান আল কারাজি। ৯৫৩ সালে তেহরানের নিকটবর্তী কারাজ শহরে জন্ম তার। গণিতের ওপর লেখা গ্রন্থগুলো হলো আল বাদি ফিল হিসাব, আল ফাখরি ফিল জাবর ওয়াল মুকাবালা এবং আল কাফি ফিল হিসাব। তিনি বীজগণিতীয় রাশি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নতুন পথ উন্মোচন করেন। তার বীজগণিতীয় কৌশলগুলো পরবর্তী সময়ে পাটিগণিতেও ব্যবহার শুরু হয়। বহুপদী রাশির মধ্যে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। আল কারাজিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বীজগণিতীয় ক্যালকুলাসের সূত্রপাত করেন। প্যাসকেলের ত্রিভুজেরও প্রথম বর্ণনা তিনিই দেন। আবিষ্কার করেন দ্বিপদী সমীকরণ সমাধানের অনুসিদ্ধান্ত।

আবুল জুদ মুহম্মদ বিন আহমদ বিন আল লাইস ছিলেন দশম শতাব্দীর গণিতবিদ। বিখ্যাত পণ্ডিত আল বিরুনির সমসাময়িক তিনি। ঘনের সমীকরণ সমাধানে তিনি কনিক ব্যবহার করেন। যদিও উমর খৈয়াম এর সফল প্রয়োগের কারণে জনপ্রিয়, তবু অন্তত এক শতক আগেই আবুল জুদ এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। বীজগণিতের ইতিহাসে শারাফুদ্দিন মুজাফফার ইবনে মুহম্মদ আল তুসির নামও অন্যতম। ১১৩৫ সালে ইরানের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতে ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। ১১৬৫ সালে পড়াশোনার জন্য দামেস্কে চলে যান, সেখান থেকে পরবর্তী সময়ে আলেপ্পো ও মসুলে স্থানান্তরিত হন। শারাফুদ্দিন তুসিরই ছাত্র কামাল উদ্দিন ইবনে ইউনুস, আর কামাল উদ্দিনের ছাত্র নাসির উদ্দিন তুসি। উভয়েই ছিলেন নিজ নিজ সময়ের প্রথিতযশা গণিতবিদ। শারাফুদ্দিন বর্গমূল ও ঘনর সমীকরণে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। তবে তার ‘ট্রিটিজ অন ইকুয়েশন’কে বীজগণিতীয় জ্যামিতির সফল প্রচেষ্টা হিসেবে দাবি করা হয়, যার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় ইউরোপীয় দার্শনিক ও গণিতবিদ দেকার্তের রচনায়। 

আবুল ওয়াফা আল বুজজানি কিতাবুল হিন্দাসিয়াহর লেখক। তিনি আল খাওয়ারিজমি, ইউক্লিড ও ডায়োফ্যান্টাসের বীজগণিতীয় রচনায় টীকা সংযোজন করেন। তার আলোচিত বীজগণিতীয় মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো উদ্ধৃত করা হয়। নাসির উদ্দিন তুসি মুসলিম যুগের অন্যতম প্রধান চিন্তক। তার লেখা ‘‌ওয়াইদ উল হিন্দাসিয়া’ ছিল জ্যামিতির বই। ভারতীয় ও গ্রিক বীজগণিত, জ্যামিতি ও পাটিগণিতীয় সমস্যা উদ্ধৃত করা হয়েছে সেখানে। অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত হলেও আবদুল ইবনে তুর্ক ছিলেন মুসলিম আমলের প্রথম দিককার বীজগণিতবিদ। আল বুজজানি তার থেকেই প্রভাবিত হয়েছেন। বীজগণিতের ওপর লেখা বই ‘‌লজিক্যাল নেসেসিটিজ ইন মিক্সড ইকুয়েশন’ বইতে বীজগণিত নিয়ে আলোচনা আল খাওয়ারিজমির ‘‌কিতাবুল জাবর’-এর সঙ্গে তুলনীয়। জ্যামিতিক প্রমাণাদি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো তিনি আল খাওয়ারিজমির চেয়েও এগিয়ে গেছেন।   

ইউরোপে বীজগণিতের সূত্রপাতে আরব গণিতবিদরা পথিকৃৎ হয়ে থেকেছেন। তাদের বইয়ের অনুবাদ ও তাদের রীতিপদ্ধতি সহযোগিতা করেছে পশ্চিমা রেনেসাঁ ও আলোকায়নে। এমনকি আঠারো শতকের গণিতবিদ লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি যখন মিসর, সিরিয়া, গ্রিস ও সিসিলি ভ্রমণ করেছেন, তখন রপ্ত করেছেন আরবীয় পদ্ধতি। লিবার অ্যাবাচিতে আল খাওয়ারিজমি ও আবু কামিলের প্রভাব নজরে পড়ে। মুসলিম সভ্যতার সে পণ্ডিতদের অন্য অনেক পরিচয়ের ফাঁকে হয়তো গণিতবিদ পরিচয় ফিকে হয়ে যায়। তবে তারা যে বিশ্বকোষীয় বৈশিষ্ট্যের ছিল, সেটা সত্য। যেমনটা আধুনিক দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তার ‘‌আ হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি’ পুস্তকে দাবি করেছেন, ‘‌আরব দার্শনিকরা বিশ্বকোষ ঘরানার পণ্ডিত। তারা আলকেমি, জ্যোতিষশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রাণিবিজ্ঞান ও দর্শনের প্রতি একই সঙ্গে সমান আগ্রহী ছিলেন।’ (আ হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি, দশম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪২৪)  

আহমেদ দীন রুমি:  লেখক