ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জীবনের দুটি পর্ব নিয়ে বিশেষভাবে লেখার পরিকল্পনা ছিল আহমদ ছফার: মৃত্যুপর্ব ও নিরুদ্দেশপর্ব। কিন্তু মৃত্যুপর্ব নিয়ে ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ লেখার পরই পরলোকগমন করেন ছফা, নিরুদ্দেশপর্ব লেখার সুযোগ আর তার হয়নি। এছাড়া ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নামে পৃথক একটি নিবন্ধও লেখেন ছফা। এই দুই রচনার বাইরেও নানা সময়ে দেয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আলাউদ্দিন খাঁ বিষয়ে তিনি নানা মতামত প্রকাশ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমি যদি সারা জীবন ব্যয় করে একটি উপন্যাস লিখতে পারতাম! আর এই ‘একটি উপন্যাসে’র বিষয় হিসেবে তিনি তার চিন্তায় স্থান দিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খাঁকে।
বোঝা যাচ্ছে, আহমদ ছফার চিন্তায় একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নিবন্ধে ছফা লিখছেন: ‘আলাউদ্দিন খান সাহেব অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করে, অনেক কষ্ট করে, দ্বারে দ্বারে স্বর্ণমুষ্টি ভিক্ষার মাধ্যমে সুদীর্ঘ জীবনের সাধনায় সংগীত আত্মস্থ করেছিলেন। এই আশ্চর্য মানুষটির জীবন এবং তার সাধনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে একটা পবিত্র আতঙ্কের স্রোত শিরদাঁড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে—এ মানুষটির জীবনই তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।’ একই লেখার অন্যত্র জানাচ্ছেন: ‘আলাউদ্দিন খান সাহেব তার দীর্ঘ জীবনের দুশ্চর তপস্যায় মিয়া তানসেনের ঘরানার সংগীতকে শুধু অধিগত করেননি, অন্যান্য প্রচলিত ঘরানার মর্মবস্তুর সঙ্গে সংশ্লেষ-বিশ্লেষ ঘটিয়ে সংগীতের কান্তিকে অধিকতর উজ্জ্বল এবং ব্যঞ্জনার মধ্যে অধিক দিব্যতা সঞ্চার করে সুরকে এমন দুরধিগম্য উচ্চতায় স্থাপন করলেন যেখানে সুর ব্যক্তিগত অর্জনের সংকীর্ণ সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার একটা অমোঘ দাবি তুলে ধরল।’
ছফার চিন্তার কেন্দ্রে আলাউদ্দিন খাঁর স্থান পাওয়ার কারণ কি কেবলই এই ‘ত্যাগ-তিতিক্ষা’র মধ্য দিয়ে ও ‘সুদীর্ঘ জীবনের সাধনায় সংগীত আত্মস্থ করা’ এবং সুমহান সুরস্রষ্টা হয়ে ওঠা? নাকি এর পেছনে অন্য কারণও নিহিত আছে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ছফাকল্পিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বয়ানে: ‘আমি বাউনবাইরার একটা চাষার পোলা। আল্লার মেহেরবানি ছিল, তানসেনের সিলসিলার সংগীত আমি ধারণ করেছিলাম।’ সম্ভবত এই বাউনবাইরার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সন্তান তথা পূর্ব বাংলার সন্তান কিংবা বাঙালি মুসলমান সমাজের একজন হওয়ার কারণেই আহমদ ছফার চিন্তার কেন্দ্রে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ।
১.
আলাউদ্দিন খাঁর পুত্র আলী আকবর খাঁকে একবার তার এক বন্ধু অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন বাংলায় একটা আত্মজীবনী রচনা করেন। উত্তরে আলী আকবর বলেছিলেন, ‘যা সরোদে বলতে পারিনি, তা কি মুখে বলতে পারব?’ এ উত্তর থেকে আমরা বুঝতে পারি, একজন সংগীতসাধক সুরের মাধ্যমে তার জীবনকে, জীবনের নানা ঘটনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
শুধু সংগীতসাধক বললে ভুল হবে। যেকোনো শিল্পীই সম্ভবত এ কাজ করে থাকেন। নানা শিল্পমাধ্যমের মধ্য দিয়ে একজন শিল্পী জীবনকে মূর্ত করতে চান; বহু মানুষের সংস্পর্শে জীবনে ঘটে যাওয়া নানাবিধ ঘটনা তাকে যেসব বোধ ও মহাবোধ উপহার দেয় তা-ই একজন শিল্পী সম্ভবত তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকাশের প্রয়াস পান। যদি তা-ই হয়, তবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। তিনিও জীবনের নানা ঘটনাকে তার সৃষ্ট সুরের মধ্য দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।
এক ভাষার শিল্পী যখন অন্য ভাষার শিল্পীর কোনো শিল্পকর্মের মুখোমুখি হন তখন তার একটা বড় কাজ হয়ে থাকে তর্জমার মধ্য দিয়ে অন্য শিল্পীর শিল্পকর্মকে অনুধাবনের চেষ্টা করা। আহমদ ছফা মূলত এই কাজই করার চেষ্টা করেছেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সুরকে—যার অক্ষর ‘সরগম’—ছফা চেষ্টা করেছেন তার শিল্পভাষায় অনুবাদ করতে। প্রশ্ন হলো একেবারে জীবনসায়াহ্নে এসে কেন ছফা এ কাজের প্রয়াস পেলেন এবং অনুবাদকর্ম অসম্পূর্ণ রেখেই পরপারে পাড়ি জমালেন? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ‘সুরসম্রাটের মৃতুস্বপ্নে’।
২.
একদিন মধ্যরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর। তার স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন তার বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন। ঘুম ভাঙার পর তার বড় অস্থির অনুভূত হতে থাকে। কন্যাসম পিয়ারিকে ডেকে গড়গড়াটা এনে দিতে বলেন। এর মধ্যে হাজির হন কন্যা অন্নপূর্ণাও। মেয়ে এসে বাদ সাধেন। বলেন, ‘বাবা ডাক্তারের বারণের কথা তোমার মনে নেই, হুঁকা খাওয়া ও যন্ত্র স্পর্শ করা একেবারে নিষেধ।’
মেয়েকে দেখে আলাউদ্দিন খাঁ নানা কথা বলতে শুরু করেন। তিনি জানান: ‘শোন মা, এই আলাউদ্দিনরে মাইনষে কতকিছু কয়—সুরের রাজা, সুরের সম্রাট, হেই তা কতকিছু। কিন্তু আমি তামাম জীবনে সাধনা কইরা যা পাই নাই, বড়দা ফকিরালি কইরা তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি জিনিস পাইছিল। এই আলাউদ্দিনরে বেবাক দুনিয়ার মাইনষে চিনে। কিন্তু ফকির আফতাবউদ্দিনের নাম শুনছে কয়জন? এই আলাউদ্দিন তো তার পায়ের নখের যোগ্যও নয়। আল্লা তাইনেরে সিরাতুল মোস্তাকিমের পথে ফকির কইরা ডাইকা নিয়া গেল। আর আমি এই আধা সের চাউলের মহাজন পেটের ধান্দা মিটাইবার লাগি দুনিয়ার মাইনষেরে বাজনা শুনাইয়া বেড়াইলাম।’
কথা বলতে বলতেই তিনি পিয়ারিকে আবার গড়গড়া আনার কড়া নির্দেশ দেন। অবশেষে পিয়ারি গড়গড়া এনে দিতে বাধ্য হন। তামাক টানার ফাঁকে তিনি অন্নপূর্ণাকে বলেন: ‘শুন মা, তোমার বড় জ্যাঠা স্বপ্নে আইসা একটা মজার কথা কইল। বড়দা আমারে ডাইকা কইল—শুন আলম সারা জিন্দেগি তুই তো উল্টা-সিধা ঘুইরা মরলি, অহন তর আসল সংগীত শিক্ষার সময় হইছে।’ স্বপ্নে এসে জ্যাঠার এসব জ্যাঠামি অন্নপূর্ণার পছন্দ হয়নি। কেননা সে জানে, ‘তার পিতা সর্বভারতের সুরসম্রাট। তার কাছে এসে সমস্ত কলাবিদেরই প্রণত হতে হয়। ভারতবর্ষের সংগীত সাধনার সমস্ত ধারা তার মধ্যে এসে এমন এক পূর্ণতা লাভ করেছে, তার সামনে প্রণিপাত করা ছাড়া কারো কোনো উপায় নেই।’
এসব আলাপের মধ্যেই আলাউদ্দিন খাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মদিনা বেগমের ঘুম ভেঙে যায়। স্বামীর কাছ থেকে যখন শোনেন তার স্বপ্নে বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন দর্শন দিয়েছেন, তখনই তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তিনি জানেন, তার স্বামীর মধ্যে ফকির আফতাবউদ্দিনের মতো একজন ছন্নছাড়া বৈরাগী মানুষ আছে। তিনি বুক দিয়ে আগলে না রাখলে এই মানুষ বহু আগেই ঘরছাড়া হতেন। স্ত্রীকে তিনি জানালেন: ‘বড়দা হাতের সারেঙ্গিখানা ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া এমন একটা সুর বাজাইলেন, আমি আর কোনোদিন কোথাও শুনি নাই। শরীর-মন একেবারে ঠাণ্ডা অইয়া জুড়াইয়া যায়। আমি কইলাম, বড়দা এইটা কোন রাগ বাজাইলেন? বড়দায় কইল, এই রাগের নাম নাই।’
ওস্তাদ অন্নপূর্ণাকে সরোদখানা নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ডাক্তারের বারণ থাকায় তিনি এবারো বাদ সাধলেন। অবশেষে পিয়ারি তার হাতে সরোদটা তুলে দিলেন। সরোদ হাতে পেয়ে শরীরে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন ওস্তাদ: ‘একটা মীড় বাজাতেই অন্নপূর্ণার শরীরে যেন বিদ্যুৎ স্পর্শ খেলে গেল। এ রকম অপূর্ব বাজনা তার বাবার কাছ থেকে কোনোদিন শোনেননি।’ অন্নপূর্ণা জিজ্ঞেস করলেন: ‘বাবা এটা কোন রাগ তুমি বাজাচ্ছ?’ ওস্তাদ ঘোরের মধ্যেই হিন্দিতে জবাব দিলেন: ‘বেটি মুঝে মালুম নেহি, বড়ভাই সাহেব খোয়াবমে এয়সায় তো বাতলায়া। উনহনে বোলা, আলম তামাম জিন্দেগি তোম যন্তর বাজায়া, আভি আপনা অন্তর বাজাও। মায়নে আপনা অন্তর বাজানে কি কোশেশ কর রাহা।’
আলাউদ্দিনের বাজনা শুনে মদিনা বেগমের মনপ্রাণ এক গভীর ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। তার মনে হয়, ‘ওই মানুষকে [আলাউদ্দিন খাঁ] আর কেউ ধরে রাখতে পারবে না। ফকির আফতাবউদ্দিনের বেশ ধরে সংগীত স্বয়ং তাকে নিয়ে যেতে এসেছে।’ মদিনা বেগম স্বামীকে জানালেন: ‘আপনে হুইন্যা লন, তাজ্জব জিনিস দেখলাম। আপনে যখন বাজাইতেছিলেন, দেখলাম, গন্ধরাজ গাছের কলিগুলো ফুটফুট কইর্যা ফুইট্যা গেল। রাজ্যের পাখ-পাখালি আইস্যা গাছ-গাছালিতে বইয়া গেল। আর দেখলাম, উঠানের মরা দূর্বার জট থেইক্যা নতুন নতুন শীষ জাইগ্যা উঠল।’ প্রিয়তমার মুখের এ সংবাদ শুনে ওস্তাদের মুখে হাসি ফুটল। তিনি বললেন: ‘ভালা সংবাদ শুনাইলা। মিয়া তানসেনের সংগীত মরা মানুষেরে প্রাণ দিতে পারত। সেই সংগীতের প্রাণ আমি ধইর্যা রাখতে পারছি। প্রমাণ অইয়া গেল।’
ওস্তাদের বাজনা থামল। কিছুক্ষণ তিনি খুব ছটফট করলেন। তারপর যখন ছটাফটানি থামল, তখন ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘আমার শিবপুরের কথা মনে অইতাছে। বাউনবাইরার কথা মনে অইতাছে।’ এই কথা বলে তিনি একে একে তার প্রিয়জনদের স্মরণ করলেন। এর মধ্যে ফজরের আজান হলো। পিয়ারি জায়নামাজ বিছিয়ে দিলে তিনি ‘নামাজের বিছানায় কোনো রকমে দাঁড়ালেন। এক রাকাত নামাজ কোনোভাবে শেষ করে যেই উঠতে গেছেন অমনি ইয়া ইলাহি বলে ঢলে পড়লেন।’
৩.
একটু আগে যেই প্রশ্নের অবতারণা করেছিলাম এখন আসি তার উত্তরে।
বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন যেদিন আলাউদ্দিন খাঁর স্বপ্নে এসে ধরা দিলেন, সেদিন তার মনে হলো, আজীবন তিনি পেটের দায়ে, জনতুষ্টির জন্য সুর সৃষ্টি করেছেন। তার সংগীত সিরাতুল মোস্তাকিমের পথ ধরতে পারেনি। ছফাও কি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই একই অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন? সেই অপূর্ণতার বোধই কি তাকে দিয়ে আলাউদ্দিন খাঁর সেই অন্তিম সুরকে অনুবাদ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে? এ সুরের অনুবাদই কি ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’?
মৃত্যুই সম্ভবত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যা মানুষকে তার ফাইনেস্ট কাজটি করার জন্য পৃথিবীর সীমানার বাইরে কোনো নির্জন স্থানে স্থাপন করে। কিন্তু বেলা ফুরিয়ে যায় বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজটি অসম্পূর্ণ বা অপূর্ণ থেকে যায়।
৪.
আলাউদ্দিন খাঁর মৃত্যুমুহূর্তের বাইরেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা পাওয়া যায় ছফার এ সংক্ষিপ্ত অসমাপ্ত উপন্যাসে। জানা যায়, ঘরের লোকদের সঙ্গে আলাউদ্দিন খাঁ সবসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় ভাষায় কথা বলতেন। এ উপন্যাস থেকে ঠাওর করা যায়, শুধু মৃত্যুই সে সময় ওস্তাদকে জাপটে ধরেনি, একটা ক্ষয়িষ্ণু সময়ও তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল। ছফার বর্ণনায় উঠে এসেছে মাইহার রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু দশার বর্ণনা, ‘রাজা আছেন কিন্তু রাজত্ব নেই। সরকার রাজ্য অধিগ্রহণ করেছে। রাজ্যহীন রাজা আগের দিনের ঠাটবাট বজায় রাখতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। রাজকুমারগুলো অকর্মা। বংশবৃদ্ধি আর ঋণ-বৃদ্ধি ছাড়া তাদের কোনো কাজ নেই।’
অন্নপূর্ণার জীবনে নেমে আসা বিভীষিকার বর্ণনাও পাওয়া যায় ছফার লেখায়। স্বামী রবিশঙ্করের প্রতিষ্ঠার জন্য অন্নপূর্ণাকে প্রকাশ্যে সংগীতচর্চা করতে বারণ করেছিলেন পিতা আলাউদ্দিন খাঁ। তার কারণ, ‘রবিশঙ্করকে মিয়া তানসেনের সংগীতের ওপর ভর করে দাঁড়াতে হবে। এই ভারতবর্ষে স্ত্রীরা স্বামীর জন্য তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলি দিয়েছে। অন্নপূর্ণাকেও সারা জীবনের অর্জনের বোঝা বুকে নিয়ে এ মাইহারের জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় আটকে থাকতে হবে।’ বাবার এ নির্দেশে রুষ্ট হয়েছিলেন অন্নপূর্ণা, ‘স্বামী খুবই মূল্যবান মানলাম, কিন্তু আমার কি মূল্য নেই? তাহলে বাবা আমাকে পতিভক্ত একজন সাধারণ রমণী হিসেবে গড়ে তুললেন না কেন? কেন তিনি আকাশের বিদ্যুতের মতো সুরের বিদ্যুৎ ধারণ করার যোগ্য করে তুললেন আমাকে?’ রুষ্ট হলেও শেষমেশ পিতার আদেশই তিনি শিরোধার্য করেছিলেন।
মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বুঝতে পারেন, রবিশঙ্করের সঙ্গে অন্নপূর্ণার সম্পর্ক টিকবে না এবং অন্নপূর্ণার প্রিয়তম পুত্রও তাকে ছেড়ে যাবে। এ রকম এক সঙ্গিন দশায় তার হাতে মিয়া তানসেনের সংগীত শেখানোর মহান দায়িত্ব তুলে দেন: ‘এই মহান সংগীতের ধারা ভারতবর্ষের তিন হাজার বছরের মুনিঋষিসাধক পুরুষদের ধারা। একে তো শুকিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তোমার মধ্যে সেই সংগীতপ্রবাহ নতুন করে প্রাণ পেয়ে বেঁচে উঠবে।’ তার মনে হয়েছে পুত্র আলী আকবর খাঁ এবং প্রধান শিষ্য রবিশঙ্কর কেউই এ কাজের যোগ্য নয়, ‘রবিশঙ্কর বলো, আলী আকবর বলো, এরা মিয়া তানসেনের ঘরানার সংগীত প্রচার করবে, শেখাতে পারবে না। তেজারতির মোহ তাদের এত বেশি পেয়ে বসবে তারা এক জায়গায় থিতু হয়ে কোনোদিন বসতে পারবে না।’
৫.
আলাউদ্দিন খাঁর সবচেয়ে বড় যে কৃতিত্ব ছফা দিয়ে থাকেন তা হলো, ধ্রুপদি সংগীতের পূর্বমহিমা (অরা) ভেঙে দেয়া এবং রাজদরবার থেকে এ সংগীতকে সাধারণের কাতারে নামিয়ে আনা। ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নিবন্ধে ছফা জানাচ্ছেন, ‘এ যাবৎকাল ধ্রুপদ-সংগীত রাজা-বাদশাহদের দরবারে চর্চিত হয়ে আসছিল। সামন্তপ্রভুদের মর্যাদার স্মারক হিসেবে ধ্রুপদ-সংগীত চিহ্নিত হয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সংগীতের চল একেবারে ছিল না বললেই চলে। এই সংগীতের যারা চর্চা করতেন তারা নিজেদের ঘরানার মধ্যেই সংগীতচর্চা সীমাবদ্ধ করে রাখতেন। আপন পুত্র-কন্যা এবং আত্মীয়-স্বজনের বাইরে অন্য কোনো শিক্ষার্থীকে সংগীত শিক্ষা দিতেন না। অনেক সময় জীবিকার তাগিদে বাধ্য কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষক কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাইরের লোককে সংগীত শিক্ষা দিলেও সংগীতের বিশুদ্ধ অংশটি আপন ঘরানার লোকদের জন্য চোখের মণির মতো সযত্নে গোপন করে রাখতেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে ধ্রুপদ-সংগীত কখনো বিস্তারিত এবং প্রসারিত হতে পারত না।’
এখানে ছফা সমীপে একটা প্রশ্ন রাখি, যে মহিমা দূর হওয়ার কথা ছফা বলছেন তা কি আসলেই দূরীভূত হয়েছে? এটা ঠিক যে যারা এ সংগীতের ধারেকাছে যেতে পারতেন না, তাদের অনেকে হয়তো এ শাস্ত্রে কামেল হয়েছেন, যাদের এ সংগীত শোনার সুযোগ ছিল না, তারা এখন চাইলে প্রবেশাধিকার নিতে পারে। কিন্তু সে মহিমা কি আসলেই দূর হয়েছে? নাকি মহিমার ধরন পাল্টেছে? আমের পক্ষে কি সম্ভব হয়েছিল আর্মি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে সুবিখ্যাত সুরস্রষ্টাদের গানের মর্ম অনুধাবন করা? কিংবা এ দেশ, যে দেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামক অঞ্চলে জন্মেছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ, সে দেশের ধ্রুপদি সংগীত কি আমের কাতারে নেমে এসেছে? নাকি এ সংগীত আরো দূরবর্তী হয়েছে? আলাউদ্দিন খাঁ যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যে সংস্কৃতি তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তা কি তার জন্মভূমিতে সাফল্য লাভ করেছে?
৬.
শুভময় ঘোষের অনুলিখনে বা অন্যদের স্মৃতিকথায় আলাউদ্দিন খাঁ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আমরা পাই সেসব বর্ণনায় তার জীবনের কতটুকুই বা আর পাওয়া যায়! তার জীবনকে আসলে পাওয়া যাবে তারই সৃষ্ট সব সুরে। সেই সুরের ভাষা বোঝা আমাদের মতো সাধারণের পক্ষে দুরূহ বলেই হয়তো আহমদ ছফা আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের ভাষায় তার সুরকে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছেন। এবং সেই অনুবাদও নিঃসন্দেহে সংগীতময়, কেউ চাইলে ছফার এ লেখনীকে আবার সুরে রূপ দিতে পারেন।
মেহেদী হাসান: লেখক ও গবেষক






