সুতোর বল বা গোলাকে ফার্সি ভাষায় বলা হতো জুলাহ, যা কাপড় তৈরির অত্যাবশকীয় উপাদান। সেখান থেকেই জোলা নামটি এসেছে। সেদিক থেকে মুসলিম তাঁতিরা জোলা নামে পরিচিতি অর্জন করে। তাঁতিদের স্মরণাতীত কাল থেকেই বাংলায় জোলা হিসেবে অভিহিত করা হতো। এটা তাদের বংশ নয় বরং পেশা। যেহেতু পেশা থেকেই বংশ এসেছে, সেহেতু জোলাকেও বংশ ভাবা হয়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে, তাঁতি সম্প্রদায়ে যারা জোলা নামে খ্যাত ছিল তাদের আদি পরিচয় ছিল বৌদ্ধ। ইসলামের আগমনের পর উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নাথ-ই ইসলামে দীক্ষিত হন, তারা জোলা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু জোলা বলে খুবই নিচু বংশ বুঝে অনেকেই তাদের হেয় করে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রত্যাশিত নয়।
আর্থসামাজিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশে জোলারা সার্বিকভাবে ভালো নেই। বাংলাদেশে তাঁতিদের নানা শ্রেণী আছে। জামদানির তাঁতি, মসলিনের তাঁতি, বেনারসি, সিল্ক, খাদি ও টাঙ্গাইলের তাঁতি ভিন্ন। তারা একেক অঞ্চলে একেকভাবে বিভক্ত। অঞ্চলভেদে তাঁতের ধরনের ওপর নির্ভর করেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। জামদানির তাঁতিরা সপ্তাহে যে পরিমাণ ইনকাম করে, টাঙ্গাইলের তাঁতিরা কিন্তু তা করছে না। টাঙ্গাইলের তাঁতিরা হয়তো সপ্তাহ হিসেবে মজুরি পাচ্ছে। মাসে তারা ১০-২৫ হাজার টাকা আয় করছে। গামছা তাঁতিরা কিন্তু আবার মাসে ৫ হাজার টাকাও ইনকাম করতে পারছে না। বেনারসি তাঁতিরা আবার ইনকাম করছে মাসে ২০ হাজার টাকার ওপর। কোনো সপ্তাহে তারা ৫ হাজার টাকা পাচ্ছে, কোনো সপ্তাহে তারা পাচ্ছেই না। উৎপাদন না থাকায় তাদের আয় আগের মতো নেই। সব তাঁতি আবার সমান আর্থসামাজিক অবস্থানে থাকে না। অঞ্চলভেদে কারো অবস্থান ভালো, তারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। অনেকে যোগাযোগ করতে না পেরে হারিয়েই গেছে। কিছুদিন আগেও তাঁতের দিকে মানুষের যে মনোযোগ ছিল, সেটা কিন্তু কমে আসছে। তাঁতের ব্যবসা সার্বিকভাবে কিছুটা সংকটের মধ্যে আছে। তাঁত সংকটে থাকার মানে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জোলারা সংকটে থাকা।
জোলাদের আলাদা করে কোনো নকশা প্রণয়ন করে কিংবা প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না সে অর্থে। যেটুকু তারা পায়, সেটাও গতানুগতিক। আলাদা কোনো কোর্স কারিকুলাম নেই, যার মধ্য দিয়ে তারা বিদ্যমান ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে, এখন যেভাবে বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিকতা আসছে সামনে, সেক্ষেত্রে আমাদের তাঁতি ও জোলারা অতটা সক্ষম না। তারা যুগের পর যুগ ধরেই পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মাত্র। নতুন ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে অগ্রগতি হয়নি, আসেনি নতুন নকশা। নতুন ফ্যাশনপ্রবণতা অনুসারে তার সঙ্গে তাঁতিদের জন্য ট্রেনিং সেন্টার খোলা কিংবা মাঠ পর্যায়ে তাদের অবহিত করা বা তাদের সন্তানদের প্রণোদনা দেয়া হয়নি। যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিছু জিনিস হয়তো কাগজেকলমে শুরু হয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক তো দূরের কথা, বাংলাদেশকে কাভার করে; সেভাবে কার্যকর হয়নি। সরকার যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে, তা আলোচনার পর্যায়েই থেকে গেছে। সেগুলো কার্যকর করা হয়নি। কিছুদিন আগে যে মসলিন নিয়ে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, সেটাও আটকে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে পরিকল্পনায়ই থমকে গেছে সব, ফলে দিনশেষে জোলাদের জন্য তা ফলপ্রসূ হয়নি।
যারা আগে থেকে তাঁত নিয়ে কাজ করছে; তাদের আমরা হ্যান্ডলুম আর্টিস্ট বলি। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এ পেশায় দিতে চায় না। দিনে অটোরিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করে, শাড়ি থেকে তারা সেটা পায় না। তিনদিনে একটা শাড়ি ওঠে না, সপ্তাহে তার আয় হয় না ২ হাজার টাকা। উৎপাদনও কমে গেছে। ফলে ওই টাকায় তাদের ফ্যামিলি রান করা সম্ভব না। আগে তো তারা সেভাবে সম্মানও পেত না, অবজ্ঞা করা হতো। ইদানীং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক সাপোর্টটা পাচ্ছে না। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভিন্ন পেশায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে জোলা পরিচয়ই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন করে কোনো চিন্তাও সেভাবে এগোচ্ছে না।
জোলাদের কাপড় বোনার শিক্ষাটা মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। দেশীয় শিক্ষা পদ্ধতিতে বিভিন্ন টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি ও কলেজে গ্র্যাজুয়েশন এবং ডিপ্লোমার সুযোগ আছে। সেখানে প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে কাজ হয়। কিন্তু তাঁতের সঙ্গে তাদের সরাসরি সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনো বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। অথচ চীন ট্রাডিশনাল ও প্রাচীন তাঁত নিয়ে নতুনভাবে এগোচ্ছে। বিপরীত দিকে বাংলাদেশে কেবল আরএমজি নিয়েই কাজ করছে। টেকসই ফ্যাশন কনসেপ্ট নিয়ে সেভাবে ভাবা হচ্ছে না এখানে। সেটা না করার কারণেই কাঁচামাল চীন ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করতে হয়। জোলারা তো ঐতিহ্যগতভাবেই রয়েছেন। তারা ফ্যাশন দুনিয়ার সমকালীন প্রবণতা টের পাচ্ছেন না, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা মার্চেন্ডাইজিংয়ে ও বাইং হাউজে জয়েন করছেন; তারা ফ্যাব্রিক ইনোভেশন নিয়ে কাজ করছে না। ফলে দুদিক থেকেই আমরা পিছিয়ে। আমরা আরএমজি দিয়ে কেবল সস্তা শ্রম বিক্রি করছি। পণ্য উৎপাদন করছি, কিন্তু ফ্যাব্রিক বিক্রি করতে পারছি না। একাডেমিকভাবে শিক্ষিতরাও সেভাবে কাজে লাগাতে পারছে না তাদের অর্জিত শিক্ষা। ফাইভার নিয়ে যারা কাজ করে, তারা যে পাইনাপেল, কলাগাছের আঁশ থেকে ফ্যাব্রিক নিয়ে কাজ করবে, সেটা নিয়ে তারা এগোচ্ছে না। অথচ এটা এগিয়ে নিলেও তারা তাঁত শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারতেন। যারা জোলা আছেন, তাদের কার্যক্রমও সনাতন পর্যায়ে। ফলে আমরা কেবল শ্রমিক হয়েই থেকে গেছি।
জোলাদের সেভাবে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। আমরা গবেষণার স্বার্থে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ করেছি। জোলাদের বসবাস তো সাধারণত প্রত্যন্ত অঞ্চলেই। তারা নিজেরাও নিজেদের জোলা পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। লুকাতে চায়। সে সম্মান তারা সমাজ থেকে পায়নি ও পায় না। এখন যেহেতু তারা পেশা পরিবর্তন করছে, তাই বলতেও চায় না আগে জোলার কাজ করত। সিরাজগঞ্জের মতো জায়গাগুলোয় আগে যে পরিমাণ কাজ হতো, এখন সেটা হয় না। জোলাপল্লী থেকেই অনেকের ব্যবসা পরবর্তীকালে ‘গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ রূপ নিয়েছে। চলে এসেছে বড় ব্যবসায়, কিন্তু আগের পরিচয় ধরে রাখিনি।
জোলাদের যদি আমরা আর্থসামাজিকভাবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব। শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। অবশ্যই সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে জড়িত করতে হবে। সরকারের উচিত প্রাইভেট খাতকে নিয়ে কাজে নামা। তাদের যে আলাদা ডিজাইন ও মার্চেন্ডাইজিং টিম আছে, সেখান থেকে সরকার সহযোগিতা নিতে পারে। শুধু প্রণোদনা দিয়ে শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার চিন্তা সুদূরপ্রসারী হবে না।
প্রযুক্তিগত সংশ্লিষ্টতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার নতুন উদ্ভাবন। সরকার পৃথক ফ্যাব্রিক নিয়ে কাজ করতে পারে। জোলাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি বিক্রির ব্যবস্থাও করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরকে সরকার জড়িত করলে রফতানি, সরবরাহ চেইন দিয়ে তাদের বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল ভর্তুকি কিংবা ঋণ দিয়ে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না। তারা যদি বিক্রি করতে না পারে, তাহলে ঋণ নিতে নিতে কেবল ঋণগ্রস্তই হবে। ব্যবসা করতে পারবে না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক যে মেলাগুলো হয়, সেখানে যে হারে ভারত ও চায়না থেকে প্রতিনিধিত্ব করা হয়। আমাদের উচিত নিজেদের ফ্যাব্রিকগুলো নিয়ে সেখানে তেমনভাবেই হাজির হওয়া। তাহলে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব।
তার পরও একটা বিষয় বেশ অদ্ভুত। জোলাদের যারা কাজটাকে ভালোবেসে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করছেন, তারা কিন্তু এটা ছাড়তে পারছেন না। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো অন্য পেশা দিয়ে নিজেদের চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু অভ্যস্ত ও পুরনোরা কিন্তু এটা ছাড়তে পারেন না। তারা ভালোবেসে ফেলেছেন পেশাটাকে। তারা গান গাইতে গাইতে শাড়ি বুনে চলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। এটা তাদের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। একটার পর একটা সুতো বসিয়ে তারা যেন স্বপ্ন বুনে চলছেন। একটা শাড়ি আর এক খণ্ড কাপড়ের পেছনে তারা এত সময় ও মনোযোগ নিয়ে কাজ করছেন, এটা অদ্ভুত। অনেকের হারানোর বেদনা আছে, না বলা গল্প তারা ধারণ করেন। তারা শিল্পের মধ্যে ডুবে আছেন। হয়তো খুব কম টাকা আয় করেন, কিন্তু তারা নিজেদের সুখী মনে করেন। কারণ মানুষ যা ভালোবাসে, তার সঙ্গে বসবাস করতে পারার চেয়ে বড় আর কী সুবিধা আসতে পারে জীবন থেকে।
নুসরাত জাহান নিপা: তাঁত শিল্প গবেষক ও প্রভাষক, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি









