ভিএস নাইপল। অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী
একজন আগন্তুক যখন মিগুয়েল স্ট্রিস্ট ধরে গাড়ি চালিয়ে যাবে, তার চোখে এটাকে বস্তির বেশি কিছু মনে হবে না। কিন্তু আমরা যারা এখানে বসবাস করি, আমরা এ স্ট্রিটটিকে দেখি আমাদের পৃথিবী হিসেবে, যেখানে একজন অন্যজনের চেয়ে ভিন্ন, প্রত্যেকেই যার যার মতো আলাদা: ম্যানম্যান একটা পাগল, জর্জ একটা স্টুপিড, বিগ ফুট একজন উত্পীড়ক, হ্যাট অভিযাত্রী, পোপো দার্শনিক এবং মর্গান আমাদের ভাঁড়।
কিংবা আমরা তাকে ভাঁড় হিসেবেই দেখতাম। কিন্তু বহু বছর পর পেছনে ফিরে দেখে এটাই মনে হচ্ছে, আমরা তাকে যে সম্মান দিয়েছি, তার চেয়ে বেশি তার প্রাপ্য ছিল। এটা অবশ্যই তার নিজের দোষ। মর্গান সেই সব মানুষের একজন, যারা সেধে ভাঁড়ামি করতে যায় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না লোক হাসাতে পারে তার নিস্তার নেই। আর মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য সারাক্ষণই কোনো না কোনো পাগলামি উদ্ভাবন নিয়ে ব্যস্ত থাকত। একবার মুখে দেশলাই ঢুকিয়ে সিগারেট দিয়ে তার আগুন ধরানোর চেষ্টা দেখে আমরা যখন হেসে উঠলাম, মর্গান বারবার এটাই করতে থাকল।
হ্যাট বলত, ব্যাটা যাচ্ছে তা-ই, সারাক্ষণ মানুষ হাসানোর তালে থাকে, যেখানে আমরা সবাই জানি সে নিজে বড্ড সুখে নেই।
আমার কখনো কখনো মনে হতো মর্গান বুঝতে পারছে যে তার কৌতুক জমছে না। আর এতে সে এমন বিপন্ন হয়ে পড়ছে যে আমাদের নিজেদের নির্দয় ও বাজে মনে হতো।
আমার এ জীবনে দেখা প্রথম শিল্পী মর্গান। সে তার প্রায় সবটা সময়ই এমনকি যখন ভাঁড়ামি করত, তখনো সৌন্দর্যের কথা ভাবত। সে আতশবাজি তৈরি করত। আতশবাজি পছন্দ করত এবং আতশবাজি নিয়ে তার কাছে তত্ত্বের কোনো শেষ ছিল না। মহাজাগতিক নৃত্যতত্ত্ব কিংবা জীবন নৃত্যতত্ত্ব। কিন্তু এসব আলোচনা মিগুয়েল স্ট্রিটে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যেত। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মজা করার জন্য আরো বড় বড় শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে। মর্গানের কাছ থেকে শেখা এ রকম একটি বড় শব্দ ‘পাইরোটেকনিশিস্ট’ আমি এ আলেখ্যটির শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেছি। এর মানে আতশবাজির কারিগর।
ত্রিনিদাদের হাতেগোনা কয়েকজন তার কাছ থেকে আতশবাজি কিনত। দ্বীপের বড় সব উৎসব— ঘোড়দৌড়, কার্নিভাল, ডিসকভারি ডে, ইন্ডিয়ান সেন্টিনারিতে সবাই যখন রাম, মিউজিক ও সুন্দরীদের নিয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠত, মর্গান তখন রাগে ফেটে পড়ত।
মর্গান কখনো কখনো কুইন্স পার্ক সাভানায় গিয়ে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৈরি করা আতশবাজি দেখত এবং তা আকাশে ছড়িয়ে পড়ার পর জনতার উল্লাসধ্বনি শুনত। খুব মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসত এবং ছেলেমেয়েদের পেটাত। তার ১০টা সন্তান। স্ত্রী গায়ে-গতরে এতই বড় যে তাকে পেটাতে সাহস পেত না।
হ্যাট বলত, আমরা বরং দমকল বাহিনীকে খবর দিয়ে দিই। পরের ২ বা ৩ ঘণ্টা সে তার বাড়ির পেছনের দিকে উঠানে গিয়ে আহাম্মকের সব কাণ্ড-কারখানা করত। আতশবাজি পাগলের মতো ছুড়ে ফেলত আর তার স্ত্রী চেঁচাত, ‘মর্গান তোমার গাধামি বন্ধ করো। তুমি ১০টা সন্তান পয়দা করেছ। তোমার একটা বউ আছে। এখন তোমার সব ছেড়ে চলে যাওয়ার এবং মরার অধিকার নেই।’
মর্গান ষাঁড়ের মতো গর্জন করে এবং কলাই করা টিনের বেড়ায় আঘাত করতে থাকে।
সে চিত্কার করে বলে, ‘সবাই আমাকে মারতে চায়, সবাই।’
হ্যাট বলত, ‘এখন আমরা আসল মর্গানকে শুনতে পাচ্ছি।’
এ উন্মত্ততার বাতিক মর্গানকে সত্যিকারের আতঙ্কে পরিণত করে। এ বাতিকটা যখন তার ওপর কাজ করত, তার ধারণা আমাদের যান্ত্রিক মেধা বাকু চাচা তাকে পেটানোর জন্য সবসময়ই তৈরি থাকে। রাত ১১টার দিকে এ ধারণাটা তার মাথায় বিস্ফোরিত হতো।
সে বেড়ায় আঘাত করতে থাকে এবং চিত্কার করে, ‘বাকু, ভুঁড়িওয়ালা অপদার্থ কুত্তির বাচ্চা, বেরিয়ে আয়। পুরুষের মতো আমার সঙ্গে লড়াই কর।’
বাকু তখন বিছানায় তার পেটের ওপর সোজা হয়ে শুয়ে বেদনাময় সুরে রামায়ণ পড়ছে।
বাকুও বিশালদেহী একজন মানুষ, মর্গান আকারে অনেক ছোট, তার হাত দুটো মিগুয়েল স্ট্রিটে সবচেয়ে ছোট হাত, আর কব্জি দুটো সবচেয়ে চিকন।
মিসেস বাকু এসে বলত, ‘মর্গান তুমি তোমার মুখটা বন্ধ করে ঘুমোতে যাচ্ছ না কেন?’
মিসেস মর্গান জবাব দিত, ‘ওই চিকনা পায়ের মাগী, আমার স্বামীকে ছেড়ে আমি যা বলছি, শুনতে পাচ্ছিস? তুই গিয়ে তোর নিজের পুরুষের দেখাশোনা কর।’
মিসেস বাকু বলত, ‘তুই তোর মুখ সামলা, নতুবা আমি এসে এক থাপ্পড়ে তোর চেহারা পাল্টে দেব।’
মিসেস বাকুর উচ্চতা চার ফুট, দৈর্ঘ্য তিন ফুট, প্রস্থও তিন ফুট। আর মিসেস মর্গান লম্বায় ছয় ফুটেরও বেশি, ভারোত্তোলনকারীদের মতো শরীরের গঠন।
মিসেস মর্গান বলল, ‘তুই তোর ভুঁড়িওয়ালা স্বামীটাকে বলিস না কেন ওই ঘ্যানঘ্যানে ছাইপাশ পড়া বাদ দিয়ে যেন মোটরগাড়ি মেরামত করে।’
মর্গান ততক্ষণে রাস্তায় এসে তার হাস্যকর ভঙ্গিতে আমাদের সঙ্গে হাসাহাসিতে যোগ দেয়। বলে, ‘শুনছ মেয়েমানুষের কথা!’ হিপ পকেট থেকে বোতল বের করে চুমুক দিয়ে রাম খায় এবং বলে, ‘তাকাও আর দেখতে থাকো। ওই ক্যালিপসোটা জানো তো?
তারা আমার আরো ক্ষতি করার চেষ্টা করে করুক ততই আমি ত্রিনিদাদে ভালো থাকি।
আমার বেলায়ও তা-ই। আগামী বছর এ সময় আতশবাজি বানানোর জন্য ইংল্যান্ডের রাজা ও আমেরিকার রাজা আমাকে মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে। মানুষ কখনো চোখে দেখেনি এমন আতশবাজি বানিয়ে দেব।’
হ্যাট কিংবা অন্য কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তাদের জন্য আতশবাজি বানাবে নাকি?’
মর্গান বলল, ‘কী বানাব? কিচ্ছু না। আগামী বছর এ সময় ইংল্যান্ডের রাজা আর আমেরিকার রাজা আতশবাজি বানানোর জন্য আমাকে মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে। মানুষ কখনো চোখে দেখেনি এমন আতশবাজি।’
আর ততক্ষণে বাড়ির পেছনের উঠান থেকে মিসেস বাকুর কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘তার বড় ভুঁড়ি আছে, কিন্তু তোর স্বামীর কী আছে, আগামী বছর এ সময় তোর স্বামীর পাছায় বসার মতো মাংস থাকবে কিনা, জানি না।’
পরদিন সকালে মর্গান একেবারে সোজা ও শান্ত, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে বলতে শুরু করেছে।
মর্গান যতটা না মানুষের মতো, তার চেয়ে বেশি পাখির মতো। কেবল এমন নয় যে, সে দেখতে দেশলাইয়ের কাঠির মতো, তার লম্বা ঘাড় এবং পাখির মতো এদিক-ওদিক ঘোরাতে পারে। তার চোখ দুটো উজ্জ্বল ও অস্থির। যখন সে কথা বলত, মুখ থেকে শব্দ ছুড়ছে এমন নয়, ঠোকরাচ্ছে, ঠোকরে শস্যদানা তুলছে। হাঁটত দ্রুত ও লঘু পদক্ষেপে, কাঁধের ওপর দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখত কেউ তাকে অনুসরণ করছে কিনা।
হ্যাট বলল, ‘কেন সে এমন হয়েছে জানো? তার বউটার কারণে। বউকে সে খুব ভয় পায়, খুব খারাপ এ স্প্যানিশ মেয়েমানুষটি, তার রক্তে আগুন।’
বোয়ি বলল, ‘সেজন্যই তাহলে সে আতশবাজি বানাতে চায়?’
হ্যাট বলল, ‘মানুষ যে কত আজব। কখনো তাদের বোঝা যায় না।’
মর্গান নিজের চেহারা নিয়েও কৌতুক বানিয়েছে। যখন সে টের পেত কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে, সে তার হাত ও পায়ের পাতা ছুড়তে থাকত।
মর্গান তার নিজের স্ত্রী ও ১০ সন্তান নিয়েও কম কৌতুক করেনি। বলেছে, ‘এটা আমার কাছে একটা অলৌকিক ব্যাপার মনে হয়, আমার মতো মানুষের ১০টা সন্তান। বুঝতেই পারিনি, কেমন করে এটা করে ফেললাম!’
এডওয়ার্ড বলল, ‘তুমি কেমন করে নিশ্চিত বাচ্চাগুলো তোমার?’
মর্গান হেসে ওঠে এবং বলে, ‘আমার সন্দেহ আছে।’
***
হ্যাট মর্গানকে পছন্দ করত না।
বলত, ‘কেন তা বলা মুশকিল। তার মধ্যে কিছু ব্যাপার আছে, যা আমি সহ্য করতে পারি না। আমার সবসময় মনে হয়, সে বাড়াবাড়ি করছে। আমি সবসময়ই অনুভব করি, সে সবকিছু নিয়েই মিথ্যে কথা বলছে। আমি এটাও মনে করি, সে নিজের ব্যাপারেও মিথ্যে বলছে।’
আমার ধারণা হ্যাটের কথার মানে আমরা কেউই বুঝিনি। মর্গান খানিকটা ঝামেলার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যেমন চায়, তাকে দেখামাত্রই আমরা হেসে উঠি, আমাদের পক্ষে এটাও বেশ কঠিন হয়ে ওঠে।
এখনো তার আতশবাজির পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত আছে, যখন তখন মর্গানের বাড়ি থেকে বিস্ফোরণের শব্দ আসে এবং আমরা রঙিন ধোঁয়ার ঝাপটা দেখতে পাই। এটি আমাদের স্ট্রিটের লোকদের নিত্যকার বিনোদনের একটি। কিন্তু সময়ও চলে যায়, মর্গান দেখে কেউ তার আতশবাজি কিনতে আগ্রহী নয়। সে তার আতশবাজি নিয়েও কৌতুক করতে শুরু করল। তার বাড়িতে একেকটি বিস্ফোরণের পর রাস্তার অট্টহাসিতে সে তৃপ্ত নয়।
হ্যাট বলল, ‘একটা মানুষ যখন যে জিনিসটা নিয়ে সারাক্ষণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, যদি সেটা নিয়ে নিজে হাসাহাসি করে, সে জানে না, এটা হাসির না কান্নার।’
হ্যাট সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, ‘মর্গান একটা আস্ত মূর্খ।’
আমার মনে হয়, হ্যাটের কারণে আমরা মর্গানকে নিয়ে উপহাস করা বন্ধ করে দিলাম।
হ্যাট বলল, ‘এতে তার ভাঁড়ামি করাটা বন্ধ করা যাবে।’
কিন্তু কাজ হলো না।
মর্গান আগের চেয়েও বুনো হয়ে উঠল এবং প্রতি সপ্তাহে দু-তিনদিন বাকুকে তার সঙ্গে লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ দিতে থাকল। সে তার সন্তানদের আগের চেয়েও বেশি পেটাতে শুরু করল।
আর আমাদের হাসানোর সর্বশেষ একটি চেষ্টা করল।
আমি মর্গানের চতুর্থ ছেলে ক্রিসের কাছে এটা শুনেছি। আমরা মিগুয়েল স্ট্রিটের কোণে একটি ক্যাফেতে বসেছিলাম।
ক্রিস বলল, ‘এখন তো এটা তোমাকে বলা অপরাধ।’
আমি বললাম, ‘আমাকে বলার দরকার নেই। বুড়োটা কি আবার ঝামেলা শুরু করেছে?’
ক্রিস মাথা নাড়ল, তারপর একটা কাগজ বের করে আমাকে দেখাল, এর শিরোনাম: অপরাধ ও শাস্তি।
ক্রিস বেশ গর্বের সঙ্গে বলল, ‘এটা দেখো।’
বেশ লম্বা একটা তালিকা, তাতে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—
মারামারির জন্য
১) বাড়িতে পাঁচ ঘুষি
২) রাস্তায় সাত ঘুষি
৩) স্কুলে আট ঘুষি
ক্রিস আমার দিকে তাকিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘কেমন ঠাট্টা? এসব করলে তো ঘুষিও কৌতুক হয়ে যাবে।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু তুমি যে বললে আমার সঙ্গে কথা বলা অপরাধ? এটা কোথায় আছে?’
ক্রিস আমাকে দেখাল—
রাস্তার ছোকরাদের সঙ্গে কথা বলা চার ঘুষি
রাস্তার ছোকরাদের সঙ্গে মারামারি আট ঘুষি
আমি বললাম, ‘কিন্তু আমাদের সঙ্গে কথা বললে তোমার বাবা তো কিছু মনে করছে না। তোমরা কথা বললে অসুবিধে কোথায়?’
ক্রিস বলল, ‘এটা তো মোটেও কিছু নয়। রোববার এসো এবং দেখো কী ঘটে।’
আমি দেখতে পেলাম ক্রিস দারুণ খুশি।
রোববার আমরা প্রায় ছয়জন গেলাম। মর্গান আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, আমাদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেল। তারপর মর্গান গায়েব হয়ে গেল।
অনেক চেয়ার ও বেঞ্চ পাতা, যেন কোনো কনসার্ট শুরু হবে। এক কোণে একটি ছোট টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘দাঁড়াও।’
আমরা সবাই দাঁড়ালাম, মর্গানের অভ্যুদয় ঘটল, তার মুখে হাসি, হাসিমুখে চারদিক দেখে নিল।
আমি হ্যাটকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে হাসছে কেন?’
হ্যাট বলল, ‘ম্যাজিস্ট্রেটরা যখন কোর্টে আসে, এভাবে হাসিমুখেই ঢোকে।’
মরগানের বড় ছেলে উচ্চৈঃস্বরে ডাকল, ‘অ্যান্ড্রু মর্গান।’
অ্যান্ড্রু মর্গান এসে বাবার সামনে দাঁড়াল।
বড় ছেলে বেশ উচ্চৈঃস্বরে পড়ে শোনাল, ‘অ্যান্ড্রু মর্গান তুমি মিসেস ডরোথির উঠানে তেঁতুল গাছে ঢিল ছোড়ার অভিযোগে অভিযুক্ত; মার্বেল কেনার জন্য তুমি তিনটি বোতাম ছেঁড়ার অভিযোগে অভিযুক্ত; তুমি ডরোথি মর্গানের সঙ্গে মারামারি করার অভিযোগে অভিযুক্ত; তুমি তিনটি মিসরি ও দুটি চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত। তুমি কি দোষ স্বীকার করছ, না নির্দোষ দাবি করছ?’
অ্যান্ড্রু বলল, ‘দোষী।’
কাগজে কিছু লেখালেখি করে মর্গান উপরের দিকে তাকায়।
‘তোমার কি আর কিছু বলার আছে?
অ্যান্ড্রু জবাব দেয়, ‘আমি দুঃখিত স্যার।’
মর্গান বলল, ‘যুগপৎ শাস্তি চলবে। ১২ ঘুষি।’
একের পর এক মর্গানের সন্তানদের বিচার হলো এবং তাদের দণ্ড দেয়া হলো। এমনকি সবচেয়ে বড় ছেলেও কিছু শাস্তি পেল।
মর্গান তারপর উঠে দাঁড়াল এবং বলল, বিকালে এ শাস্তি কার্যকর করা হবে।
সে আবার চারদিক তাকিয়ে হেসে রুম ত্যাগ করল।
***
তার এ কৌতুকটির ফল উল্টো হলো।
হ্যাট বলল, ‘না, না, না, এভাবে নিজেকে নিয়ে, নিজের সন্তানদের নিয়ে ভাঁড়ামি করা আবার রাস্তার লোকদের ডেকে এনে দেখানো ঠিক নয়। না, এটা মোটেও ঠিক নয়।’
আমার মনে হলো, তার এ কৌতুকটি যেভাবেই হোক ভয়ঙ্কর এবং আতঙ্কজনক।
সেই সন্ধ্যায় মর্গান যখন রাস্তায় এল, তার চেহারায় হাসি স্থির হয়ে আছে, সে আমাদের কাছ থেকে যে অট্টহাসি প্রত্যাশা করেছিল, তার কিছুই পেল না। কেউ দৌড়ে তার কাছে গেল না। কেউ তার পিঠ চাপড়ে এটাও বলল না যে, ‘আজকাল মর্গান পাগল হয়ে গেছে, সন্তানদের কী রকম পেটাচ্ছে শোনেননি?
এ রকম কেউ বলেনি। এমনকি কেউ তাকে কিছুই বলেনি।
মর্গান যে এতে ভেঙে পড়েছে, তার চেহারাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে রাতে মর্গান সত্যিই ভীষণ মাতাল হয়ে যায় এবং তার সঙ্গে লড়াই করার জন্য সবাইকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। সে এমনকি আমাকেও চ্যালেঞ্জ করে।
মিসেস মর্গান সামনের গেটে তালা মারল। মর্গানের দৌড়ঝাঁপ যা কিছু এ সীমানার মধ্যেই হয়। সে পাগলা ষাঁড়ের মতোই ক্ষেপে যায়, সে হাঁফ ছাড়ে আর বেড়ায় গুঁতাতে শুরু করে। বারবার সে বলতে থাকে, ‘মানুষ মনে করে আমি পুরুষ না? আমার বাবার আট সন্তান, আমি তার ছেলে। আমার ১০টা ছেলেমেয়ে। তোদের সবগুলোকে একত্র করলে যা হবে, আমি তার চেয়ে বড় পুরুষ।’
হ্যাট বলল, ‘শিগগির সে কাঁদতে শুরু করবে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বে।’ সে রাতে ঘুমানোর আগে আমি অনেকক্ষণ মর্গানকে নিয়ে ভাবি। তার ভেতরের যে ছোট্ট দানব, যার কারণে তার যে এ অবস্থা, সেজন্য আমি দুঃখ বোধ করি। সেজন্যই এত কিছু উল্টোপাল্টা ঘটছে বলে আমার ধারণা। আমি কল্পনা করি, তার ভেতর লাল রঙের দেঁতো হাসি দেয়া একটা দানব কাঁটা দিয়ে তাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে।
***
মিসেস মর্গান ও ছেলেমেয়েরা গ্রামে চলে যায়।
মর্গান আর রাস্তায় বেরিয়ে আসে না। আমাদের সান্নিধ্য চায় না। সে তার নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। একটার পর একটা ছোট ছোট বিস্ফোরণ এবং প্রচুর ধোঁয়া।
এছাড়া মিগুয়েল স্ট্রিটের আমাদের দিকটায় শান্তি বিরাজ করছে। এ নির্জনতায় মর্গান কী ভাবছে, আমি তা-ই কল্পনা করতে থাকি। পরের রোববার খুব বৃষ্টি হলো, সবাই আগে আগে বিছানায় যেতে বাধ্য হলো। রাস্তা ভেজা এবং চকচকে, রাত ১১টা বাজতেই ঢেউটিনের চালে বৃষ্টির টাপুরটুপুর ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই।
রাস্তায় একটি সংক্ষিপ্ত ও তীব্র চিত্কার নির্জনতাকে ভেঙে দিল, আমরা জেগে উঠলাম। আমি শুনতে পাই, জানালা পাট পাট খুলে যাচ্ছে আর মানুষ জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে? কী হয়েছে?
‘এটা মর্গান, এটা মর্গান, মর্গানের কিছু একটা হচ্ছে।’
আমি ততক্ষণে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছি এবং মর্গানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, আমি কখনো পাজামা পরে ঘুমায়নি, সেই শ্রেণীর নই।
অন্ধকারে মর্গানের উঠানে একজন নারীর অবয়ব দেখলাম, মিগুয়েল স্ট্রিট ও আলফোনসো স্ট্রিটের মাঝখানে নর্দমার পেছনে যে দরজা, সে নারী সেদিকে ছুটেছে।
তখন টিপটিপ বৃষ্টি, খুব জোরেও নয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চারপাশে একটা ছোট জমায়েত হয়ে গেল।
পুরো ব্যাপারটাই রহস্যময়— চিত্কার, একজন মেয়েমানুষের গায়েব হয়ে যাওয়া। অন্ধকার বাড়ি, সবই।
আমরা তারপর মিসেস মর্গানের চিত্কার শুনলাম, ‘টেরেসা ব্ল্যাক, টেরেসা ব্ল্যাক, তুমি আমার পুরুষটার সঙ্গে কী করছ?’— এ বড় যন্ত্রণার কান্না।
মিসেস বাকু আমার পাশে। বলল, ‘আমি তো সবসময়ই এ টেরেসার কথা জানতাম কিন্তু মুখে কুলুপ দিয়ে রেখেছি।’
বাকু বলল, ‘হ্যাঁ, তুমি তো সবই জানো, তোমার মায়ের মতন।’
বাড়ির ভেতর আলো জ্বলল।
আবার তা নিভে গেল।
আমরা মিসেস মর্গানের গলা শুনলাম, ‘তুমি আলোকে এত ভয় পাচ্ছ কেন? তুমি না পুরুষ, আলো জ্বালো, দেখি তুমি কত বড় পুরুষ হয়েছ।’
আবার আলো জ্বলে ও নিভে যায়।
আমরা মর্গানের গলা শুনি, কিন্তু স্বর এত নিচু যে কী বলছে আমরা বুঝতে পারছি না।
মিসেস মর্গান বলল, ‘এ যে বীরপুরুষ।’ আবার বাতি জ্বলল।
আমরা মর্গানের বিড়বিড় আবার শুনলাম।
মিসেস মর্গান বলল, ‘কী বীরপুরুষ না?’
আলো নিভে গেল, আবার আলো জ্বলল।
মিসেস মর্গান বলছে, ‘বাতি জ্বেলে রাখো। বেরোও, রাস্তার মানুষকে বীরপুরুষ দেখাই। এসো, তাদের দেখাই পুরুষ মানুষ কেমন হয়।
তুমি তো কাপুরুষ নও, সত্যিকারের পুরুষ। তুমি শুধু আমার সঙ্গেই ১০টা বাচ্চা বানাওনি। অন্য মহিলার সঙ্গেও বানাতে চলেছ।’
আমরা মর্গানের স্বর শুনি— ঘ্যানঘ্যানে অসুখী স্বর।
মিসেস মর্গান বলল, ‘কিন্তু এখন তুমি আর কিসের ভয় পাচ্ছ? তুমিই না সেই ভাঁড়? ক্লাউন? এসো, রাস্তার মানুষ তাদের ক্লাউনকে দেখুক, দেখুক তুমি কত বড় মানুষ। তাদের দেখতে দাও তুমি কেমন পুরুষ।’
মর্গান ততক্ষণে বিলাপ শুরু করেছে, কথা বলতে চেষ্টা করছে।
মিসেস মর্গান বলছে, ‘তুমি যদি আর একবার বাতিটা নেভাও তাহলে তোমার ওই শুটকো লেজটা দেশলাই কাঠির মতো ভেঙে ফেলব। বুঝেছ?’
তারপর সামনের দরজা খুলে গেল এবং আমরা দেখলাম মিসেস মর্গান আমাদের মর্গানের কোমর চেপে ধরে রেখেছে। বস্তুত তার পরনে কোনো কাপড় নেই, তাকে এত চিকন দেখাচ্ছে যে মনে হচ্ছে বালকের দেহে বুড়ো মানুষের মাথা।
মর্গান আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না, তাকিয়ে আছে মিসেস মর্গানের মুখের দিকে। সে তার মুষ্টি থেকে বেরোনোর জন্য মোচড়াচ্ছে। কিন্তু মিসেস মর্গান তো একজন শক্তিশালী মহিলা।
মিসেস মর্গান আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল না, তাকাচ্ছিল তার বাহুবেষ্টনীতে বন্দি পুরুষ মানুষটির দিকে।
মিসেস মর্গান বলে যাচ্ছে, ‘দেখো, এই আমার বীরপুরুষ। আমি এই মানুষটাকেই বিয়ে করে সারা জীবন তার দাসীগিরি করেছি?’ তারপর সে হাসতে শুরু করে, নোংরাভাবে ঘেঙর ঘেঙর করতে থাকে।
মুহূর্তের জন্য আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন তোমরা হাসো, সে কিচ্ছু মনে করবে না। সে তো সবসময়ই চায় মানুষ তাকে দেখে হাসাহাসি করুক।’
একজন মোটাসোটা মহিলা একজন টিঙটিঙে পুরুষমানুষকে যেভাবে ধরে রেখেছে, এটাই হাস্যকর এবং আমরা হেসে ফেললাম। এটা সেই ধরনের হাসি, যা আস্তে আস্তে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা দম ফাটানো হাসিতে পরিণত হয়।
মিগুয়েল স্ট্রিটে আসার পর সত্যিকার অর্থে মর্গান এই প্রথম মানুষের উপহাসের পাত্র হচ্ছে।
আর ঘটনাটি তাকে পুরোপুরি ভেঙে দিল।
পরদিন সারা দিন আমরা রাস্তায় তার জন্য অপেক্ষা করলাম। আমরা আমাদের অট্টহাসিতে তাকে অভিনন্দন জানাব। কিন্তু আমরা তাকে দেখতেই পেলাম না।
হ্যাট বলত, “আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার মা আমাকে প্রায়ই বলত, ‘ছেলে তুই সারা দিন হাসাহাসি করছিস, আমি বাজি ধরে বলতে পারি, রাতে তোকে কাঁদতে হবে’।”
***
সে রাতে আমার ঘুম আবার বিঘ্নিত হয়, চিত্কার ও সাইরেনের শব্দে।
আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি আকাশ লাল, লাল ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন।
মর্গানের বাড়িতে আগুন লেগেছে।
কী যে ভয়ঙ্কর আগুন! খবরের কাগজের ফটোগ্রাফার বেয়ে বেয়ে অন্যের বাড়ির উপরে উঠে ছবি তুলছে। মানুষ আগুনের দিকে নয়, তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
পরদিন খবরের কাগজে ডানপাশে উপরের দিকে একটা ফার্স্টক্লাস ছবি ছাপা হয়েছে, তাতে জনতার মধ্যে আমাকেও দেখা যাচ্ছে।
সে কী আগুন! ১৯৩৩ সালের পর পোর্ট অব স্পেনের সবচেয়ে সুন্দর আগুন। সে সময় পোর্ট অব স্পেনসহ সব জায়গায় ট্রেজারিতে আগুন দেয়া হয়েছিল আর তখন ক্যালিপসো গান বাঁধা হয়েছিল—
কী গৌরবময় সুন্দর দৃশ্য
ট্রেজারি জ্বলছে আগুনে।
যে কারণে মর্গানের বাড়ির আগুনটা এত চমত্কার হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে বাড়িতে জমে থাকা আতশবাজি। এই প্রথম সবাই বুঝতে পারল কী বিস্ময়কর মর্গানের আতশবাজির সৌন্দর্য। যারা মর্গানকে তাচ্ছিল্য করত, তারা হীন বোধ করল। আমি নিজে এরপর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি। কিন্তু মর্গানের বাড়িতে সে রাতের যে আতশবাজি, একে হারানোর মতো কিছু আজ পর্যন্ত নজরে আসেনি।
মর্গান আর আতশবাজি বানায়নি।
হ্যাট বলল, “আমি যখন ছোট ছেলে ছিলাম, আমার মা বলত, ‘যদি কোনো মানুষ কিছু চায়, জীবন দিয়ে চায়, তাহলে সে পেয়ে যায় কিন্তু যখন পেয়ে যায়, সে এটাকে আর পছন্দ করে না’।”
***
আমরা যেমনটা ভেবেছিলাম, ব্যাপারটা আদালতে এসে খোলাসা হলো। আগুন লাগানোর অপরাধে মর্গানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হলো। খবরের কাগজের লোকেরা কুৎসা আইনে গা বাঁচিয়ে মর্গানকে নিয়ে বিস্তর কৌতুক করল। একটি শিরোনাম আমার মনে আছে: আতশবাজির কারিগরের আগুনবাতিক।
আমি খুশি হয়েছি যে মর্গান শাস্তি থেকে রেহাই পেয়েছে।
লোকজন বলাবলি করেছে, মর্গান ভেনিজুয়েলায় চলে গেছে। তারা বলেছে, মর্গান পাগল হয়ে গেছে। তারা বলেছে, মর্গান কলম্বিয়ায় গিয়ে জকি হয়েছে। তারা অনেক কিছু বলেছে— মিগুয়েল স্ট্রিটের লোকজন সবসময় সবকিছুর অতিরঞ্জন করে থাকে।






