মধ্যযুগে রচিত বাংলা কাব্যে ধান-চাল ও চালজাত খাদ্যসম্ভার নিয়ে রচিত হয়েছে অসাধারণ কালজয়ী কয়েকটি কাব্য। বাংলা সাহিত্য নিয়ে যারা চর্চা করছেন তাদের সবাই এ খবর রাখেন। এর মধ্যে কয়েকজন কবি সুপরিচিত। যেমন: মহাকবি আলাওল, রাঢ় বাংলার বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর, মেদিনীপুরের শ্রীকৃষ্ণ কিঙ্কর, রামেশ্বর, রামাই পণ্ডিত প্রমুখ।
প্রথমেই আলাওলের বিখ্যাত পদ্মাবতী কাব্যের কয়েকটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করছি, যেখানে বাদশাহী ভোজনবিলাস তথা রাজভোগ্য অন্নের বর্ণনা রয়েছে। এ বর্ণনায় রয়েছে সেকালে এ দেশে উৎপাদিত উৎকৃষ্ট স্বাদের নানা রকম চালের কথা। কবি ও সুফি সাধক মালিক মুহম্মদ জায়সী পদ্মাবতী-রত্নসেন-আলাউদ্দীন খলজীর লোককাহিনী অবলম্বনে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দি ভাষায় রচনা করেছিলেন। ‘পদ্মাবৎ’। এটি বাংলা ভাষায় রূপ দিয়ে অমর হয়ে আছেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল। আলাওল বাংলায় ভাষান্তর করে সেখানে বাংলার সমাজ ও পরিবেশের ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। কাব্য মুখ্যত রাজন্যবর্গের কাহিনী হলেও সে যুগের কৃষকদের দ্বারা উদ্ভাবিত নানা জাতের অতি মনোহর চালের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেটি অসাধারণ।
চঢ়ে জো চাউর বরনি ন জাহি।
বরণ বরণ সব সুগঁধ বগাহী॥
রায়-ভোগ ঔ কাজর-রানী।
ঝিনরা রূদরা দাউদখানী॥ ৷৷
বাসমতী কজরী রতনারী।
মধুকর ঢেলা ঝীণা সারী॥
সিঁউ কাঁদৌ ঔ কুঁবর-বিলাসু।
রামরাস আরৈ অতি বাসূ॥ ৷
লৌগচুর লাচী অতি বাঁকে।
সোনখরীকা কপূরা পাকে॥
কোরহন বড়হন জয়ন মিলা।
ঔ সংসার তিলক খুঁড়বিলা ॥ ৷
ধনিয়া দেবল ঔর অজানা।
কঁহ লগি বরনৌ জারত ধানা।
সোংধে সহস বরণ অস সুগঁধ বাসনা ছুটি।
মধুকর পুহুপ জো বন রহে, আই পরে সব টুটি।
কত রকমের চাল যে রান্না করা হলো তা বর্ণনা করা যায় না। বিচিত্র বর্ণের সব সুগন্ধি চাল। রাজভোগ ও কাজররানি চাল; ঝিনোয়া, রুদোয়া ও দাদখানি চাল, বাসমতী, কজরী, রতনারী চাল, মধুকর, ঢেলা ও ঝিনাসারি চাল। ঘিউ কাঁদো ও কুঁয়রবিলাস চাল, অতি সুগন্ধযুক্ত রামরাস চাল। লবঙ্গচুর ও লাচীর মতো অতি মনোহর চাল; সোনখরিকা ও কর্পূরার মতো সুসিদ্ধ চাল। কোরহন, বড়হন, জড়হ জাতীয় চালও রান্না হলো। আর রান্না হলো সসার তিলক ও খড়বিলা চাল। ধনিয়া, দেওল এবং আরো অজানা সব চাল রান্না হলো কেমন করে, বর্ণনা করব সেসব অতি বিচিত্র বর্ণ-গন্ধময় স্বাদু চালের! মৌমাছিরা পর্যন্ত সে সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ফুলের বন ছেড়ে দৌড়ে এল!
দক্ষিণ রাঢ় ভূমির বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর মঙ্গলকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। মধ্যযুগে প্রায় ৪০০ বছরব্যাপী বাংলার বহু কবি অনেক ধরনের মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন। বিভিন্ন শ্রেণীর মঙ্গলকাব্য রয়েছে যার মধ্যে মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল কাব্য উল্লেখযোগ্য। কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর বিরচিত অন্নদামঙ্গল কাব্যের ‘রন্ধন’ নামক কবিতায় উল্লেখ পাওয়া যায়, সে সময়ের দেশজ ধানের কয়েকটি নাম। অনেক রকম ব্যঞ্জন রান্না হয়েছে। এরপর নানা ধরনের চালের ভাত রান্নার পর্ব। এ পর্বে উল্লেখ করা হলো বহু ধরনের ধানের নাম:
দীর্ঘ কবিতাটির কয়েকটি চরণ:
অতুলিত অগণিত রান্ধিয়া ব্যঞ্জন।
অন্নরান্ধে রাশি রাশি অন্নদামোহন॥
মোটা সরু ধান্যের তন্ডূল তর তমে।
আসু বোরো আমন, রান্ধিলা ক্রমে ক্রমে॥ ৷
দলকচু ওড়কচু ঘিকলা পাতরা।
মেঘহাসা কালমনা রায় পানিতরা॥
কালিন্দী কনকচুর ছায়াচুর পুদি।
শুয়াশালি হরিলেবু গুয়াখুরি সুদি॥
বিশালী পোয়াল বিড়া কলামোচা আর।
কেজুড়ি খাজুরছড়ী চিনা ধলবার॥
দাদুসাহি বাঁশফুল ছিলাট করুচি।
কেলেজিরা পদ্মরাজ দুদসার লুচি॥
কাঁটারাঙ্গি কোঁচাই কপিলাভোগ রান্ধে।
ধুলে বাঁশগজাল ইন্দ্রের মন বান্ধে॥
বাজাল মরিচশালি ভুরা বেনাফুল।
কাজলা শঙ্করচিনা চিনি সমতুল॥
মাকুমেটে মষিলোট শিবজটা পরে।
দুধপনা গঙ্গাজল মুনিমন হরে॥
সুধা দুধকমল খড়িকামুটি রান্ধে।
বিষ্ণুভোগ গন্ধেশ্বরী গন্ধভার কান্ধে॥
রান্ধিয়া পায়রারস রান্ধে বাসমতী
কদমা কুসুমশালি মনোহর অতি॥
রমা লক্ষী আলতা দানার গুঁড়া রান্ধে।
জুতী গন্ধমালতী অমৃতে ফেলে বান্ধে॥
লতামউ প্রভৃতি রাঢ়ের সরু চালু।
রসে গন্ধে অমৃত আপনি আলুখালু॥
অন্নদার রন্ধন ভারত কিবা কয়।
মৃত হয় অমৃত অমৃত মৃত হয় ॥৷
ভারতচন্দ্রের উল্লিখিত কবিতাটিতে হারিয়ে যাওয়া দেশজ ধানের অনেক নাম (৫০টি) পাওয়া যায়। ধান গবেষকদের জন্য এ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরু উন্নত জাতের ধান রাঢ় বাংলায় জন্মাত—কথাটি কবি ‘রন্ধন’ নামক কবিতায় উল্লেখ করেছেন।
শ্রীকৃষ্ণ কিঙ্কর আঠারো শতকের কবি। কবির আদি নিবাস মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানাধীন খেপুত নামক গ্রামে। বর্ধমানের জমিদার চিত্র সেন রায়ের শাসনকালে (১৭৪০-৪৪) কবি শ্রীকৃষ্ণ কিঙ্কর ‘লক্ষ্মী সরস্বতী’ নামক কাব্য রচনা করেন পয়ার ছন্দে (৫৮ লাইনে)। এতে রয়েছে ৫০ রকমের ধানের নামোল্লেখ। লক্ষ্মীদেবীর বিভিন্ন অঙ্গ হলো বিভিন্ন প্রকার ধানের উৎপত্তিস্থল। কবির কল্পনায় ‘লক্ষ্মী সরস্বতী’ পুঁথিতে উঠে এসেছে যেভাবে:
গলায় জন্মে গুয়াথুবি গন্ধমালতী।
গয়াবলি গোপালভোগ সূৰ্য্যসম জ্যোতি॥
বক্ষস্থলে জন্মিল কার্তিকাজাত ধান্য।
আউস মাকড়ি, আশ্বিনে সীতা, কার্তিকা অঘ্রাণ॥
... ... ... ...
পিঠে পিড়াবাঁক পাতসাভোগ পায়রারস॥
বক্ষস্থলে বোরোধান্য জনমিল পশ্চাত।
... ... ... ...
ভুজে হৈল ভুলিভোগ সাচি বলি যাকে।
চন্দনকাঠি চড়ইনখা জন্মালেন বক্ষে॥
... ... ... ...
সিতায় সিন্দুর ভেদি পায়ের আলতা।
রক্তবর্ণে জন্মে ধান্য নামে মউলতা॥
... ... ... ...
লক্ষ্মীর কজ্জ্বলে জন্মে লক্ষ্মীকাজল ধান্য।
সেই ধান্যে ব্রহ্মসেবা ত্রিলোকেতে ধন্য ॥
মস্তক ভেদিয়া ধান্য জন্মে মতিহার;
ব্রহ্মার ভোগেতে লাগে অন্ত নাই যার॥
চিকুরে জন্মিল চন্দ্র উদয় চূড়ামণি।
ঊর্ধ্বলোকে পূজে যাকে তিন লোকে গণি॥
লক্ষ্মীর ললাটে ধান্য জন্মে লীলাবতী।
সেই ধান্যে তুষ্ট হয় বৈকুণ্ঠের পতি॥
সিতায় জন্মিল সিতা সালিরাম সাতি।
সেই ধান্য ভূঞ শিবরাম রসবতী।
লক্ষ্মীর চক্ষুতে ধান্য জন্মে চন্দ্রসেনি।
ইন্দ্রাদি অমর ভুঞ্জে দেবঋষি মুনি॥
প্রণালীর পথে ধান্য জন্মে পদ্মনাল
বাস্তু নিজ আদি জন্মে দশ দিকপা॥
নাসাপুটে নিশ্বরি ললাটে সালি লুচি।
হাসে ভোগজীরা ভুবনের হাসি॥
... ... ... ...
ওষ্ঠে পৃষ্ঠে ললাটে জন্মিল বহু ধান্য।
শ্বেত পীত নীল রক্ত আদি চারি বর্ণ॥
ঝাড়াওড়া পশ্চাতে জন্মিল স্থলে স্থলে।
কাঙ্গাল দুঃখিনী খায়্যা বাঁচে আগদলে॥
কাঙ্গাভেট জন্ম হৈল স্থলে স্থলে কত।
অকালে সকালে হয় বাগদির ভাত॥
এইমত ধান্য কত জন্মে এই ধাম।
কৃষ্ণকিঙ্কর কহে আর কত লব নাম॥
গরিব কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ কোন ধরনের ধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, কবি তা-ও বলেছেন। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সংসারে দেবী লক্ষ্মীর আসন যেমন চিরকালের তেমনি তাদের আদি কৃষক হলেন শিব। শিব ও কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগে রচিত হয়েছে বেশকিছু কাব্য। এর মধ্যে অন্যতম কবি রামেশ্বর রচিত ‘শিবায়ন’। এ কাব্যের একটি অংশ ‘ধানের নাম ও গীত সমাপ্তি।’ এখানে রয়েছে প্রায় ৬০ প্রকার ধানের নাম ও পরিচয়। এখান থেকে কিয়দংশ উদ্ধৃত করছি:
কৃষ্ণশালি কুঙরভোগ কুঙর পূর্ণিমা
কলমীলতা কনকলতা কামোদ গরিমা॥
খেজুরথুপি খয়েরশালি ক্ষেমা গঙ্গাজল।
গয়াবলি গোপালভোগ গৌরি কাজল॥
গন্ধমালতী গুয়াথুপি আর গুলাপকর।
চামরশালি চন্দনশালি কৈল্য তারপর॥
ছত্রশালি জটাশালি জগন্নাথ-ভোগ।
জামাঞিলাডু জলারাঙ্গী জীবন সংযোগ॥
... ... ... ...
পাতসাভোগ পায়রারস পরমসুন্দর।
পিপিড়াবাঁক তিলসাগরী হৈল্য তারপর॥
বাঁকশালি বাঁকই বুয়ালি দাড়বাঙ্গী।
বাঁকচুর বুড়ামাত্তা রামশালি রাঙ্গী॥
... ... ... ...
মাট্যা দেখি মহিষনাদ মতি মউলতা।
কৌকলস মতিচুর মুক্তাহার তথা॥
সীতশালি শঙ্করশালি আর শঙ্করজটা।
এই মত আর কত হৈল ধান্যঘটা॥
লক্ষ নাম লক্ষ্মী হৈয়া কৈল লোকহিত।
কত নাম কব তার কহিল কিঞ্চিত॥
বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধান হলো প্রকৃত ধন। সব ধরনের উৎসব-আনন্দের প্রধান উৎস। বাংলার হিন্দু সম্প্রদায় ধানকে লক্ষ্মী স্বরূপায় প্রতিষ্ঠিত করে নানা উৎসবে মেতে ওঠেন। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগের কবি কৃষ্ণরাম দাস পয়ার ছন্দে রচনা করেন ‘কমলামঙ্গল’ নামে একটি অসাধারণ কাব্য। কবির কল্পনায় ধনধান্যর দেবী লক্ষ্মীর আবরণ ও আভরণ হলো অজস্র ধান। কাব্যের কিয়দংশ:
পদাঙ্গে লক্ষ্মীর অঙ্গ আলতা পরিধানে।
কিরণ দেখিতে যেন আলতা সমানে॥
তবেতো কনকচুর পরিলেন পাঙ্গুলি।
নূপুর গরুড় ধান্য সীতাভোগ গুলি॥
বাকনল পাতামল কামিনী উজ্জ্বলে।
কিক্কিণী জামাইনাডু আর পদ্মদলে॥
খইহার ধান্যের মালা পরিল গলায়।
দোসুতি শীতলজিরে হরিভোগ তায়॥
পারিজাত ধান্যের পরিলা বক্ষ হার।
উরুর উপরে পরেন বড়ো শোভা তার॥
সূর্যভোগ চন্দ্র মনি কোমরে পরিল।
নয়ানে অঞ্চল লক্ষ্মীকাজল করিল॥
মুক্তাশালি সিঁথায় সিন্দুর শোভা পায়।
করবী আঁটিল ধান্য কামিনী জটায়॥
লক্ষ্মীভোগ পুণ্যভোগ কোঁপায় রাখিল।
মুক্তাঝুরি পাটখোপ পিঠেতে দুলিল॥
সম্মানে সাজান কৈল তাড়দুই বাহে।
হইল মধুমরিচ রোসনকোশা তাহে
বাজু বন্ধ নীলাবতী আর খয়েরচুর।
অঙ্গুরি তুলসী রাকই বেড়িল প্রচুর॥
কবির কল্পনায় দেবী লক্ষ্মী হয়েছেন ধানলক্ষ্মী। দেবীর পায়ের আলতা হলো কিরণ ধান, কনকচূড় ধান দেবীর পাসুলি, খইহার ধান গলার হার, সাতনরী হার হলো পারিজাত ধানের মালা। লক্ষ্মীকাজল ধান দিয়ে তৈরি দেবীর কেশরাজির অলংকার। দেবীর মাথার সিঁথি থেকে পায়ের নূপুর—সর্বত্রই ধানের ব্যবহার—কী অপরূপ বর্ণনা!
কিংবা কবি আলাওল, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর, শ্রীকৃষ্ণ কিঙ্কর, রামেশ্বর, কবি কৃষ্ণরাম দাসের উল্লিখিত কাব্যেই শুধু অসংখ্য ধানের পরিচয় রয়েছে তা নয়; উল্লিখিত কবিদের বহুকাল আগে কবি রামাই পণ্ডিত ‘শূন্যপুরাণ’ কাব্যগ্রন্থে ১০৪ প্রকার ধানের নাম উল্লেখ করেছেন। কবি রামাই পণ্ডিতকৃত ধানের বর্ণনার কিছু অংশ:
জৌধান বুনেন গোসাঞি ছিছরা আমলো।
আলাচিত্র ফেফেরি দেখিতে জেবা কালো॥ ৷
সনাখড়কী দুঙ্গাভোগ আর অঙ্গিকল।
আর মুক্তাহার বুনেন দ্বিগুণ জার ফল ॥
কাল মুগড় বুনেন গোসাঞি ছড়া মারিবার তরে।
নাগর যুয়ান বুনেন পরভু বাছিয়া ভাঙরে॥
তুলাশালি বুনেন পরভু তুলাহার গাত্র।
অসতি বুনেন পরভু বাত্ৰ গন্ধ সত্ৰ॥
ধানমাসে ধান বুনেন বককড়ী।
গোতমপলাল বুনেন পাতল যার ছড়ি॥
পাঙ্গুসিয়া ভাদ্দমুখী বুনেন খেমরাঅ।
তুলসধান বুনেন বিরিঞ্চ দুধুরা আ।
গুজুরা বোয়ালি দাড় হাতি পাঞ্জর।
বুড়ামাত্তা ধান বুনেন দেখিতে সুন্দর॥
হাটিআ হুটিআ কআ তিলসাগরী আর।
জার মৃক্তাম ধৰ্ম্ম বৈল অগুসার॥
লতামৌ মৌকলস আর খেজুর ছড়ি।
পব্বতজিরা গন্ধতুলসী আর দলাগুড়ি॥
বন্ধী বাঁশগজা আর সীতাশালি।
হুকুলি হরিকালী বুনেন কুসুমশালি॥
রক্তশাল চন্দনশাল বুনেন এক ভিতে।
বাজদল উড়াশালি বুনেন তুরিতে॥
জলার ধান বাঁকুই বুনে লোটাইয়া জাঅ।
আখল পলিএ দাঅ বিড়া বঅ লাঅ॥
৷কিছু ধান দেখতে ভারি সুন্দর, কোনো ধান মনোমুগ্ধকর সুগন্ধি ছড়ায়, কোনোটির ফলন অধিক। আবার কোনো ধানের বর্ণ মিশমিশে কালো। রাজা-বাদশাহদের ভোগ্য ধান যেমন রয়েছে পাশাপাশি রয়েছে বাঁকুই ধান, যা গরিব মানুষের জন্য। এর ফলন এমনই যে এ ধান নিয়ে যেতে নৌকার প্রয়োজন হয়।
শ্রী চৈতন্যকে উপলক্ষ করে বাংলায় কাব্য রচিত হয়েছে প্রচুর। এ রচনাগুলো বাংলার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। শ্রী চৈতন্যের আহার বা তিনি কোন ধরনের খাবার পছন্দ করতেন—এ বিষয়গুলো নিয়েও কাব্য রচিত হয়েছে। দয়মন্তী ছিলেন শ্রী চৈতন্যের দাসী। বারো মাস তিনি শ্রী চৈতন্যের জন্য শুষ্ক খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুত করতেন। যেগুলো বিভিন্ন লোকের মারফত নীলাচলে পাঠানো হতো। দয়মন্তী প্রস্তুতকৃত শ্রী চৈতন্যের শুষ্ক খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ছিল শালিধানের খই। তার খাদ্যতালিকার কিয়দংশ বর্ণিত হলো:
নারিকেল খণ্ডনাড়ু আর নাড়ু গঙ্গাজল।
চিরস্থায়ী খণ্ডবিকার করিল সকল॥
চিরস্থায়ী ক্ষীরসার মণ্ডাদি বিকার।
অমৃত কর্পূর আদি অনেক প্রকার॥
শালি ধান্যের খৈ পুন ঘৃতেতে ভাজিয়া।
চিনিপাকে উখড়া কৈল কপূর্রাদি দিয়া॥
Countless generations walked here
Ever since humanity dawned on this planet
Some honoured, but many obscure!
Like flowers that bloom in the wilderness
Without an eye to adore their beauty!
GRAINS OF SANDS...; THE MISTIQUE TRAIL
[লেখকের অনুমতিক্রমে তার বাংলা সাহিত্যে ধান গ্রন্থ থেকে সংকলিত]
মাহবুব সিদ্দিকী: বাংলাদেশের নদ-নদী, পরিবেশ ও স্থানীয় ইতিহাসের গবেষক





