সাগুফতা শারমীনের রূপকথার বইটি সুচেতা আর তার বান্ধবীদের বুকে কেন এমনভাবে বাজল আর আপনার বুকেই বা এমনভাবে কেন বাজবে, তা বলতে গিয়ে, পাঠ প্রতিক্রিয়ার নিয়ম ভেঙে, বই দিয়ে শুরু না করে যদি পাঠক-পাঠিকাকে দিয়ে শুরু করি? কেমন হয়?
কিছুতেই সুরে বাজে না। কেন বাজে না, তা জানা নেই। নিজের ভেতরের তরল ‘ফেমিনিন’টুকুকে খুঁজতে গিয়ে একেকদিন পেয়ে যায় সুচেতা। সেইসব দিন উল্লাসের রাত্রিতে লাফ দিয়ে ওঠে। ঠোঁটে এক বিশেষ গন্ধের লিপস্টিক, আর হাতের কাছে সেই কোনদিনের দোকানে গিয়ে জোর করে দৃপ্ত ভঙ্গিতে কিনে নেয়া কনডোম— এই সহযোগে কিছুক্ষণের ঊর্ধ্বশ্বাস উল্লাস। এই রান্নার মসলা আলাদা। তবু রোজ রোজ এই রূপ, গন্ধ, শব্দ, বর্ণ সহযোগে তেল রান্নার প্রবল আমিষ ভালো লাগে না। রসুন সরষে মসলার নিচে যেমন সব মাছের গন্ধ ডুবে যায়, কথাবার্তাহীন সঙ্গমে তেমন ডুবে যায় মেয়েটির একান্ত পরিচয়। সেই যেদিন সুশান্তর বন্ধুরা আসে আর প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে কথা উঠলেই সবাই বলে ওঠে, ভারতবর্ষ প্রথম শূন্যের কথা এনেছিল সভ্যতায়, তার আগে শূন্য আর অনন্তের ধারণা অন্য কোনো সভ্যতায় গণিতে আসেইনি। অমনি সুচেতার বিচ্ছিরি অভ্যেসটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সে হাত-পা নেড়ে বলে ওঠে, “না না, ওই তো ইজিপ্টের সভ্যতায় ‘হেহ’ বলে একজন দেবতা ছিলেন, যাকে ১০ লাখ এবং অনন্ত সংখ্যার প্রতীক বলে ভাবা হতো।” অথবা সুশান্তর কোনো ডাক্তার বন্ধু antibiotic-এর অতিব্যবহারের পরামর্শ দিলে সুচেতা তড়বড়িয়ে বলে ওঠে, ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধক্ষমতার রাসায়নিক সত্যাসত্য আর তজ্জনিত আসন্ন বিপদ। এসব কথায় সুশান্তর কোনো কোনো বন্ধু বাহবা দিয়ে ওঠে, কেউ কেউ এদিক সেদিক তাকায়। শুধু সুশান্তর মুখের মাংসপেশি কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু সেদিন কেন কে জানে, সুচেতার মধ্যেকার সেই ছুঁইমুই লাজবন্তী নারীটি আর বেরোয় না। আবার নতুন রেসিপিতে রান্না করার দিন, যখন কড়াইয়ের সঙ্গে খুন্তির সোহাগে ঠুনঠুন শব্দটি বাজে, সেদিন সুশান্ত এ ছুতোয় ও ছুতোয় রান্নাঘরে আসে। খাওয়ার পর কোমর বেড় দিয়ে নিয়ে যায় পর্দা দেয়া ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ঘরটায়। কেন জানি সেদিন, সেই সরীসৃপ নারী সুচেতার সমস্ত সত্তায় সমাচ্ছন্ন হয়ে সুচেতাকে পাগল করে না। তবু এই সুখ সুখ দুপুরে, পারাবত প্রেমের সাধ দিতে দিতে সুচেতা হঠাৎ একটি ছক দেখতে পায় গণিতের। খুব ভালো গাড়ি চালানোর দিনে, প্রমোশন পাওয়ার দিনে, মাইনে বাড়ার দিনে, পাড়ার কুইজে ফার্স্ট হয়ে লাফানোর দিনে, সুচেতা নারী হয়ে ওঠে না সুশান্তর কাছে। অথচ পড়ে গিয়ে গোড়ালি ফোলার দিনে, অজস্র কাতরোক্তির মধ্যে সুশান্তর অজস্র চুম্বনে, তার কোনো এক অসম্পূর্ণতা তাকে কোনো এক সম্পূর্ণতায় নিয়ে যায়। যে নারী ভালোবাসতে পারদর্শিনী, সে বাত্স্যায়নের আলোচনা-সমালোচনা করলেই কারা যেন কানে হাত দিয়ে উঃ উঃ করে ওঠে। কিছু কাজ কাজে ভালো, কথায় গরল। এমন কেন হয়? মনের মধ্যে যে উত্তরটি ছিল, তা সত্যি হয়তো। কিন্তু তাই কি সবার সত্যি? অনেকের সত্যি? মেয়েরা কখন প্রেম পায়, কখনই বা প্রেম হারায়? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর। উত্তর পায়নি সুচেতা বহুদিন। উত্তর দিলেন সাগুফতা শারমীন।
হঠাৎই সাগুফতা শারমীনের ‘উত্তর-দক্ষিণা’ বইটি হাতে পেল সুচেতা। আর পড়ে ফেলল এক নিঃশ্বাসে অনির্বচনীয় স্বাদের রূপকথার অরূপকথাগুলো। তার মধ্যে ‘গুণতরাসী’ গল্পটি যেন কেমন। সিমঁ দ্যু বভা (Simone de Beauvoir) কত তত্ত্ব দিয়ে মেয়েদের মেয়ে হয়ে ওঠার যে অলীক শর্তাবলির বর্ণনা করেছেন, তার সমস্ত তত্ত্ব, গুণতরাসী গল্পের শাপগ্রস্তা রাজকুমারীর হতবাক স্তব্ধতায়, এক লহমায় ভাষা পেয়ে গেল। রাজপুত্র সেই অধরা মাধুরীকে অবিশ্বাস করেননি, যেকোনো অলৌকিক স্পর্শে তার ব্রহ্মচর্যের দিনগুলো ভরিয়ে রেখেছিল, যে অবিশ্বাস্য পটুতা ও শ্রমদানে তার গুরুগৃহের সমস্ত কঠোর কাজ সুসম্পন্ন করে রেখেছিল দিনের পর দিন। তিনি সেই অপূর্ব সুন্দরীর প্রেমে পড়েছেন নির্দ্বিধায়, যে দিবা-রাত্র তার আকুল প্রেমালাপের প্রত্যুত্তরে কেবলই প্রতিধ্বনি মাত্র করেছে। সেই কবে প্রাচীন গ্রিস দেশে অনিন্দ্যসুন্দর নার্সিসাস, ইকো নামের শাপগ্রস্ত পরীটির প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিল, যে কিনা প্রশ্নের উত্তরে কেবলই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি করতে পারত। কিন্তু সাগুফতা শারমীন তার গল্পে দেখালেন, আজকের অদ্ভুত সময়ে পুরুষ হয়তো সুন্দরী প্রতিধ্বনিময় স্ত্রীলোককেই শুধু ভালোবেসে উঠতে পারে। সেই সুন্দরী যখন প্রেমের তপ্ত অশ্রুর ছোঁয়ায় নিজের সম্পূর্ণ সত্তাকে নিয়ে আবির্ভূত হলো, অকুণ্ঠ ভাষায় ব্যক্ত করল দৃপ্ত ভালোবাসা, আর কোনো অভিশপ্ত ক্ষণে প্রকাশ করল তার বিদ্যাশিক্ষার স্বরূপ আর ভবিষ্যতে আরো বিদ্যাশিক্ষার ইচ্ছা, তখন রাজপুত্র অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাকে ডাকলেন ‘রাক্ষসী’ নামে। সুর কেটে গেল। বীণার তার গেল ছিঁড়ে। আহা সুচেতা খুব শান্তি পেল। তার নিজের পাওয়া উত্তরগুলো ছাপার অক্ষরের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল গভীর আত্মবিশ্বাসে। সমস্ত পৃথিবীতে এমন অনেক মেয়ে হয়তো তখন উঠে দাঁড়াচ্ছে, বা গভীর বিষাদে শুয়ে পড়ছে, যারা রূপতরাসী নয়; গুণতরাসী। যারা বড় বেশি কথা বলে। হ্যারি পটারের বন্ধু হার্মিওনি গ্রেঞ্জারের মতো যারা সবকিছু পড়ে ফেলছে, জেনে ফেলছে, বলে ফেলছে বলেই, তাদের খুব কাছের মানুষও তাদের ঠিক নারীর রূপে লক্ষ করে উঠতে পারছে না, অনেকদিন ধরে।
সুচেতার কাছ থেকে খবর পেয়েই আমার বইটি পড়ার ভাগ্য হলো। এই যে আমি, সে ঠিক আমি একা নই। এই আমি, আমার ডাক্তার বন্ধুনীটি, যিনি মাঝে মধ্যেই কর্মসূত্রে নানা গ্রাম্য মহিলার অ্যাবরশন করান বা সন্তান ভূমিষ্ঠ করান, আর সেই প্রসঙ্গে নানান প্রকৃত ও অতিপ্রাকৃত গল্প শুনতে পান। এই আমি, নিজে আমি, যে একটি করপোরেটে চাকরি করে, সংসার সামলে, পড়াশোনার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না আর বিশেষ। এই আমি আমার সেই গৃহবধূ বন্ধু, যার সংসারে সবকিছু খুব দামি, সেও বড় আদরের। তবুও হঠাৎ করে তাকে অদ্ভুত সব চুটকি শুনতে হয়, যাতে তাকে তার অতিবিলাসিতার জীবনের সঙ্গে ক্রমব্যবহারে শিথিল যোনিদ্বারের আকস্মিক তুলনা শুনেও মুচকি হেসে ১ লাখ টাকার সিরামিকের বাসনকোশসে ঝাঁ চকচকে অভ্যাগতদের পরিবেশন করতে হয়। আমি সেই প্রতিবেশিনী, যে সন্তান না হওয়ার লজ্জায় বহুদিন বাড়ির বাইরে মুখ দেখাইনি। শুধু মাথা নিচু করে নানা মন্দিরে আর নানা ডাক্তারের কাছে ঘুরে গেছে একা। আমি আমার স্কুলজীবনের সেই বন্ধুটি যে খুব ভালো থেকেও ডিপ্রেশনের ওষুধ খায়। আমাদের সবার একটা নিজস্ব রূপকথার বই খুব দরকার ছিল। আমাদের কৈশোরের সেই আচার খাওয়া দুপুরগুলো, সেই পা দুলিয়ে গল্পের বই পড়া দুপুরগুলো। আমাদের সেই প্রথম সিন্ডারেলা প্রেম, প্রথম চিতপবনের নাও। আমাদের ভালোবাসা, আমাদের স্বপ্নভঙ্গ, আমাদের রাজনীতি, আমাদের চালের হাঁড়িতে রাখা চাপচাপ বিষাদ, প্রেসারকুকারের সিটিতে তীব্র আর্তনাদ। আমরা সবাই ছিলাম, ‘ঠাকুমার ঝুলির’, ‘ঠাকুরদার থলের’ নারীচরিত্রে, তাদের বিষণ্ন সাফল্যে। তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাজার রাজপুত্রে আমাদের প্রেমাস্পদরা ছিল। আমরা সেই রূপকথা খুঁজে পাইনি। সাগুফতা শারমীন খুঁজে দিলেন।
গল্পগুলো যে ভাষায় লেখা, সে আমাদের আজকের জিরো ফিগার, হাল্কাপুল্কা ফুঁ দিলে উড়ে যাওয়া বাংলা ভাষা নয়। যে ভাষা ঈষৎ পৃথুলা, প্রত্নবতী। অব্যয় ও ধন্যাত্মক সব শব্দে গ্রামবাংলার বাচনভঙ্গিটি যেমন করে দক্ষিণারঞ্জন এনে দিয়েছিলেন তুলোট কাগজের ১০০ বছর পুরনো বইটিতে, সাগুফতাও খানিক তেমনটি, খানিক শরদিন্দুর সেই অতি স্বাদু সাধু ভাষায় লেখা ইতিহাসাশ্রিত গল্পগুলোর ভাষায়, খানিক আজকের অতি আধুনিকা প্রবাসী বাঙালির ভাষায় লিখেছেন নতুন সব রূপকথা। সাগুফতা মালঞ্চমালার ঠোঁটের বর্ণনা করেছেন তেলাকুচা ফলের সঙ্গে, গায়ের রঙ নাকি মুচকুন্দ ফুল। এমন সব ফল-ফুলের কথা আমরা শহুরে অর্ধশিক্ষিত মানুষ পিতৃজন্মেও শুনিনি। এমন সব বর্ণনা আমাদের ঝট করে ডোবা পুকুর জলাসংকুল, অদ্ভুত রহস্যময় বাংলার গ্রামের সন্ধ্যাজগতে এনে দেয়। সেই গ্রাম কোথায় আছে? হয়তো আমাদের হাজার বছরের পূর্বপুরুষের জেনেটিক স্মৃতিতে। মাথার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকা ডানার শব্দ করে ওঠে এমন ভাষায়, কোথায় তুলসীতলায় সর্বংসহা শাঁখে ফুঁ দেয়।
‘পুত্র সরোবর’ গল্পটি চিরপরিচিত, তবু বড় নতুন। মেয়েদের রূপতৃষ্ণা, যৌবনের উষ্ণ প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, রানী অশ্রুলেখার প্রতি বাক্যে, প্রতি প্রত্যুত্তরে, প্রতিটি চোখের জলে নতুন করে লেখা হলো। অশ্রুলেখা সতী থাকলেন না, শুধু আমাদের মেয়েদের সত্যিগুলোর প্রতি সৎ থাকলেন। কি আরাম! আর তার স্যাঙ্গাতনী, তার প্রাণের সখী তাকে শেখালেন নারী-পুরুষের চিরকালীন চাপান উতোরের প্রাচীন কৌশল, জীবনের হাটের গোপন দরাদরির মূলমন্ত্রটি। এই কিছুদিন আগেই অ্যাবরশন করাতে আসা এক গ্রাম্য মহিলা চোখ-মুখ ঘুরিয়ে আমার ডাক্তার বন্ধুনীটিকে বলেছিল, ‘পুকুরে চান করতে গিয়ে মাছের পোনা পেটে ঢুকে হয়েছে গর্ভসঞ্চার।’ আমরা সেদিন তার গ্রাম্য ঔদ্ধত্যে অবাক হয়েছি। যখন রানী অশ্রুলেখার স্যাঙ্গাতনী, অসক্ষম লম্পট রাজার কাছে অশ্রুলেখার গর্ভের সন্তানের পিতৃপরিচয় দেয়ার কৌশল শেখাতে সেই একই কথা বলল, আমাদের নাগরিক অজ্ঞতা চমকে উঠে দেখল, কিছু মহিলা সমস্যার বান ডাকার কালে, সমাজ সংসারকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে এমনি সব তুড়ি মারা উত্তর দেন, যে উত্তর ক্ষেত্রবিশেষে সমাজকে কোঁৎ করে গিলে ফেলতে হয়। রূপকথাটি হঠাৎ করে জীবনের অনেক পুরনো সত্যিকে নতুন করে জানান দিয়ে গেল।
সব গল্প তো বলে দেয়া যায় না। তাহলে আর পড়বেন কী? তবে সীতার পাতালগমনের কথা পড়তে পড়তে যেসব প্রশ্ন আমাদের জিভের আগায় তড়বড়িয়ে আসে, সেই প্রশ্নগুলো খুব অপ্রত্যাশিত সময়ে, রাজাকে করে বসে ‘কিরণমালার মা’, সেই কামারের মেয়ে। হাতুড়ির মতো সেই প্রশ্ন করে, মাতৃত্বকে একান্ত যন্ত্রণায় ছুড়ে ফেলে, সুবিধাজনক পিতৃত্বকে সওয়াল-জবাবের হাতুড়িতে গুঁড়িয়ে দিয়ে, উড়ে চলে যায় এক সদ্যোজাত ডাকিনী। আমরা কত মেয়ে এমন কত প্রেমহীন জীবনের উপান্তে ডাইনির মতো উড়ে চলে যেতে চেয়েছি বহুতল বাড়ির জানলার পথে, কতবার।
‘চারু হারুর একাল’ পড়ে খুব কষ্ট হবে। রূপকথা যে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ নীতিকে শেষমেশ মেনে চলে, সেই অলিখিত নিয়মকে হেলায় ত্যাগ করে সাগুফতা দেখিয়ে দেবেন কেওটিক জীবনের অংকের সহজ নাস্তিক নিয়মটি। তবে এমন স্বপ্নভঙ্গ হওয়া ভালো, প্রয়োজন। এমন স্বপ্নভঙ্গ শিগগিরই ঘটলে, মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি, দুর্বৃত্তদের হাতে দেশ-কাল-সমাজকে সমর্পণ করে, কেবল আঁক কষে আর কেরানিগিরি করে হা-হুতাশ করত না। জীবনের সহজ নিয়মটি পদার্থবিদ্যার চশমা পরে বুঝে নিলে, কোন নির্ণায়ক বিধাতার শেষ বিচারের আশা করে না বসে থেকে, সাধারণ মানুষ উদ্যোগী হতো। ভাগ্যিস বোকা আর ভালো আর বুদ্ধিমান হারু হেরে গেল, আর চালাক, বাজে, দুষ্টু চারু গেল জিতে। রূপকথা থেকে দেখে শিখতে পারলে, আমাদের অনেককে আর ঠেকে শিখতে হবে না, এ আশায় বুক বাঁধলাম, আমরা সব পাঠক-পাঠিকা এবং আমিও।
‘পালঙ্ক বদল’ গল্পটিতে যে চমক আছে, তা বলে দিয়ে গল্পের ঘোড়াকে মাঝ মাঠে মারব না আমি। তবে এ গল্পে “Politics of identity” যে চমক নিয়ে এসেছে, তাকে কোনো একটি বিশেষ জাতি-ধর্মের নিরিখে না দেখে, কেবল তার চিরাচরিত সত্য যন্ত্রণার পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করতে অনুরোধ করব পাঠক-পাঠিকাদের।
কঙ্কাবতী গল্পটি, আবারো সুচেতার মনের মতো। বিদূষী বাকসিদ্ধ মহিলার বহুব্যবহূত আশ্রয় যে বিষাদের ঘুম, তার সঙ্গে নতুন করে পাঠক-পাঠিকার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন গল্পকার। ‘একটি ক্ষুদ্র পুরাতন রূপকথা’ গল্পটা পড়ে, আমাদের একান্তে তাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে কবিতার ভাষায়, ‘ঠিক কোনখানে ভালোবাসো? কোনখানে ভালোবাসা যায়?’। ‘দিলতোড় বাগ’ সেই চির অপেক্ষার গল্প। যদিও এ গল্পগুলো পড়ে গল্পের পুরুষদের ওপর রাগ হয় না। গল্পের পুরুষেরা আমাদের জীবনের অধিকাংশ পুরুষের মতোই মোটেই মন্দ নন। তারাও আমাদের এই সমাজের ‘structural violence’-এর শিকার। ‘দিলতোড় বাগ’-এর বাগিচায় শুধু রানীর নয়, রাজারও ভাঙা বুকের দীর্ঘশ্বাস। ভালোবাসার, বিশ্বাসের মূলমন্ত্রটি অজ্ঞাত থেকে যাওয়ায় জরতী যৌবন, কিংকর্তব্যবিমূঢ় পুরুষ, বিশুষ্ক নারী। তাদেরই রূপকথা।
আজকের জন্য, আজকের পৃথিবীর জন্য, আজকের পাশাপাশি থাকা দুটি বড়-ছোট দেশের জন্য, তাদের অরণ্যের জন্য, সেই অরণ্যের হূত সম্মান সম্রাট ডোরাকাটা বাঘের জন্য, বড্ড প্রাসঙ্গিক গল্প ‘উলুখড়’। কোন সব প্রকল্পের কথা মনে পড়ে যায়। কোন সুন্দর অরণ্য পেছাতে পেছাতে সমুদ্রগর্ভে ঢুকে পড়বে, এ আশঙ্কায় রাতের ঘুম উড়ে যায়। প্রকৃতি কাঁদে, অভিশাপ দেয়। রাজকন্যার মনোবিকলন হয়। হয় কী? ক্ষমতাসীন রানী, রাজা, আমলা, মন্ত্রীরা শুনতে কি পান, বাঘের চিৎকার? বনের গর্জন? কোনো উত্তপ্ত নরকের কুণ্ড বানাতে গিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় বহু প্রাণী। জাহাজের তেল পড়ে সমুদ্রে মরে যায় লক্ষ লক্ষ মাছ। সাগুফতা শারমীন মনে করিয়ে দেন প্রকৃতির ভারসাম্যের অমোঘ বাণী। দুই উদাসীন রাজার নির্বোধ রাজনীতিতে পুড়ে মরে উলুখড়। বিপন্ন হয় এই নীল সবুজ গ্রহটির উপরে বেঁচে থাকা অসংখ্য জীবন।
বইটি খুব বেশি করে মেয়েদের চোখ দিয়ে দেখা। মার্কিন লেখিকা Kathryn Stockett-এর ‘The Help’ উপন্যাসটি যেমন কোনো পুরুষ লিখে উঠতে পারতেন না, এ গল্পগুলোও হয়তো কোনো পুরুষ লিখতে পারতেন না এভাবে কখনো। ঠিক যেমন J. M. Coetzee-এর ‘Waiting for the barbarians’ উপন্যাসের বিপন্ন পুরুষদের কখনো রচনা করতে পারবেন না হয়তো কোনো লেখিকা। অর্ধনারীশ্বর যে ‘ফেমিনিন’কে আশ্রয় করে সম্পূর্ণ হন, যে গর্ভিনী ও গর্ভশূন্যা, শরীর দিয়ে, ধকধক করে জ্বলতে থাকা জরায়ু দিয়ে, ব্যথিত যোনি দিয়ে, আজকের প্রকৃতির সৃষ্টিহীনতাকে, ভালোবাসার অনুর্বরতাকে নিজের মধ্যে অনুভব করতে পারেন, তারাই এমন লিখতে পারেন। কিন্তু এর পাঠক হতে পারে সবাই। সত্যর একেকটা দিক যেমন পুরুষ ভালো করে দেখতে পারে, আর আমরা মেয়েরা তাকে পুরুষের চোখ দিয়ে বুঝি, তেমনি একেকটা দিক মেয়েরা ভালো করে খুঁজতে পারে, আর পুরুষদের সেই দেখাকে দেখতে পাওয়া দরকার। তাই সাগুফতা শারমীন, পাঠক ও পাঠিকা এবং তাদের মধ্যবর্তী অবস্থানের যেকোনো মানুষের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক। এমন রূপকথা লেখার জন্য আমরা তার কাছে বহু বছর কৃতজ্ঞ থাকব।
References:
Coetzee JM. Waiting for the Barbarians. Random House; 2015 May 28.
Kathryn Stockett| The Help. New York : Amy Einhorn Books; 2009






