মোগল আমলের সবচেয়ে প্রেমময় ও নান্দনিক স্থাপনা আগ্রার তাজমহল। সেই সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আজ অবধি ভারত ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে প্রেমের অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে স্থাপত্যটি। আর তাজমহলের মাধ্যমে যে নামটি বিশ্বের ইতিহাসে চির অমর হয়ে রয়েছে সেটি মুমতাজ মহল। তাজমহলের রূপকার মোগল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী ও সম্রাট আওরঙ্গজেবের মা। মোগল ইতিহাসের অন্যতম বিশ্বস্ত, প্রখর বৃদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, দূরদর্শী, প্রেমময় ও খ্যাতিমান নারী মুমতাজ মহল।

অভিজাত পারস্য ঘরানায় মুমতাজ মহলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৫৯৩ সালে আগ্রার মোগল দুর্গে জন্ম নেন তিনি। বাবা আবুল হাসান আসফ খান ছিলেন শাহজাহানের পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিশ্বস্ত অমাত্য। পারিবারিক পরিচয়ে তিনি জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানের ভাই। সেই হিসেবে শাহজাহানের মামা। আসফ খানের বিশ্বস্ততার গল্প জাহাঙ্গীরের আমল ছাড়িয়ে শাহজাহানের আমলেও সমাদৃত ছিল।

যা-ই হোক, জন্মসূত্রে মুমতাজ মহলের নাম ছিল আরজুমান্দ বানু বেগম। ছোটবেলা থেকেই তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এ দুই ভাষায় চমত্কার কবিতা রয়েছে তার। শৈশবে শাহজাদা খুররমের সঙ্গে (পরবর্তী সময়ে সম্রাট শাহজাহান) প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তিনি। ১৬১২ সালে তাদের বিয়ে হয়। এ সময় আরজুমান্দ বানু বেগমকে মুমতাজ মহল উপাধি দেয়া হয়। বিয়ের সময় মুমতাজ মহলের বয়স ছিল ১৯ বছর। শাহজাহানের ২০ বছর।

যদিও মুমতাজ মহল শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে তাদের দাম্পত্যকে অত্যন্ত প্রেমময় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন ইতিহাসবিদরা। মুমতাজ মহল বেঁচে ছিলেন ১৬৩১ সাল অবধি। ৩৮ বছরের স্বল্প জীবনে তিনি শাহজাহানের ঔরসে ১৪ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তাদের মধ্যে শাহজাহানের প্রিয় কন্যা জাহানারা, দারা শুকো, রওশন আরা বেগম, শাহ সুজা, পরবর্তী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব রয়েছেন। চতুর্দশ সন্তান গহর আরা বেগমের জন্মের সময় মারা যান মুমতাজ মহল। মৃত্যুর পর প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতি অমর করে রাখতে তাজমহল নির্মাণ করেন শাহজাহান। এটা মূলত মুমতাজ মহলের সমাধিসৌধ।

মোগল ইতিহাসে জাহাঙ্গীর পত্নী নূরজাহানের প্রভাব ও বিচক্ষণতা সর্বজনবিদিত। বলা হয়ে থাকে, জাহাঙ্গীরের দরবারে বড় ভাই আসফ খানের উত্থান ও প্রভাবের পেছনে অবদান ছিল তখনকার সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের। মুমতাজ-শাহজাহানের বিয়েতেও তার সরাসরি সমর্থন ছিল। নূরজাহানের মতোই বিচক্ষণ ছিলেন মুমতাজ মহল। সম্রাট শাহজাহানের অনেক স্ত্রী থাকলেও হেরেমের কর্তৃত্ব ছিল মুমতাজের হাতে। তিনি মোগল হেরেমের অন্যতম প্রতাপশালী পাদশাহ বেগম বা মুখ্য কর্ত্রী ছিলেন। শাহজাহান তাকে মালিকা-ই-জাহান ও মালিকা-ই-জামান উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তার জায়গির। তিনি বছরে ১০ লাখ রুপি পারিতোষিক পেতেন। মোগল হেরেমে এজন্য মুমতাজ মহল অনেকের কাছে ঈর্ষার পাত্রী ছিলেন।

শাহজাহানের মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে ওঠা থেকে শুরু করে সব ভালো ও খারাপ সময়ে পাশে ছিলেন মুমতাজ। সম্রাটকে সাহস জুগিয়েছেন। তিনি সম্রাটের এতটাই বিশ্বস্ত ছিলেন যে হেরেমের আলোচনার বাইরেও দরবার সাম্রাজ্য পরিচালনার নানা বিষয়ে দুজনে কথা বলতেন। মতামত ভাগাভাগি করে নিতেন। সম্রাটের উজুক বা শাহি সিলগালা থাকত মুমতাজের কাছে। দরবারে ঘোষিত সব ফরমান বা শাহি নির্দেশনা, রাজকীয় চিঠি আগে মুমতাজের কাছে আসত। এরপর তিনি তা সিলগালা করে সম্রাটের নামে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতেন।

ব্যক্তিজীবনে মুমতাজ মহল বেশ কোমল হূদয়ের একজন নারী ছিলেন। পুরো সাম্রাজ্য থেকে অসহায়, দরিদ্র মানুষ ও বিধবারা তার কাছে আসতে পারতেন। তিনি তাদের দুঃখগাথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। প্রতিদিন বিকালে সম্রাট শাহজাহান হেরেমে আসতেন। এ সময় তিনি সম্রাটের সঙ্গে এসব নিয়ে গল্প করতেন। অর্থাৎ খোদ সম্রাট ও সাম্রাজ্যের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অসহায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধের কাজ করতেন মুমতাজ মহল। ওই সময়ের কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও স্থাপত্যবিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন মুমতাজ।

প্রিয়তমা সম্রাজ্ঞীর এমন সামাজিক কাজকর্মের জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দ রেখেছিলেন শাহজাহান। এসব কাজে মুমতাজের একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন, শাতি-উন-নিসা। তিনি শাহজাহান-মুমতাজের প্রিয় কন্যা জাহানারার গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কথিত আছে, সমাজের কল্যাণে শাতি-উন-নিসার মাধ্যমে মুমতাজ মহল নিজের অর্থ, অলংকার, পেনশন সব দরিদ্র মানুষকে দান করে দিয়েছিলেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, শাহজাহানের ওপর মুমতাজ মহলের প্রভাব এতটাই ছিল যে বিভিন্ন সময় তা সাম্রাজ্য পরিচালনার কাজেও সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। ওই সময় সম্রাটের পক্ষে গুজরাট শাসন করতেন সাইফ খান। তিনি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন। সম্রাটের উত্তরমুখী অভিযানের সময় ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন সাইফ খান। সম্রাট তাকে শাস্তি দিতে মনস্থির করলে এগিয়ে আসেন মুমতাজ মহল। তার কৌশলী প্রচেষ্টায় রেহাই পান সাইফ খান। সাইফ খান মুমতাজ মহলের আত্মীয় ছিলেন।

আপন ভাই শায়েস্তা খানের বাংলার জায়গির পাওয়ার পেছনেও মুমতাজ মহলের প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়। বাংলার ইতিহাসে শায়েস্তা খানের আমল সুখ-সমৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ওই সময় জিনিসপত্রের দাম এতটাই সস্তা ছিল যে সাধারণ মানুষ এখনো শায়েস্তা খানের আমলের তুলনা সামনে আনেন।

তবে সমাজসেবক, কোমল হূদয়ের মানুষ—এমন পরিচয়ের বাইরে অনেক ইতিহাসবিদ মুমতাজ মহলকে অনিষ্টকারী রাজনৈতিক চরিত্র দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ইতালীয় পর্যটক ও ইতিহাসবিদ নিকোলাও মানুচ্চি তার লেখায় ওই সময় হুগলিতে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞের পেছনে মুমতাজ মহলকে দায়ী করেছেন। অনেক ইতিহাসবিদ সম্রাট শাহজাহানের কিছু পরিমাণ হিন্দুবিরোধিতার মূলে মুমতাজ মহলের প্রভাবকে দায়ী করেন। যদিও মুমতাজের হিন্দুবিরোধী মনোভাবের সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেননি।

ইতিহাসে অবশ্য মুমতাজ মহল প্রখর বুদ্ধিমত্তা কিংবা রাজনৈতিক বিচক্ষণতার তুলনায় প্রেমময় চরিত্র হিসেবে বেশি চিত্রিত হয়েছেন। মুমতাজ মহলের নাম বলতেই মোগল ইতিহাসের একজন প্রেমময় ও বিশ্বস্ত স্ত্রী, মাতা ও সম্রাজ্ঞীর কথা জানা যায়, যিনি অভিজাত পরিবারে জন্ম নিয়ে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। সুখে-দুঃখে সবসময় স্বামীর পাশে থেকেছেন। সাম্রাজ্য পরিচালনায় নিজ যোগ্যতায় স্বামীকে সহায়তা করেছেন। মোগল হেরেমের ঐতিহ্য মেনে একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়েছেন। অবশেষে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে চতুর্দশ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছেন।

মুমতাজ মহল মৃত্যুর পর যেন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিলেন। কেননা শেষ বয়সে উত্তরাধিকার যুদ্ধে সন্তানদের একের বিরুদ্ধে অন্যের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়ে শাহজাহান প্রিয়তমা স্ত্রীর শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করেন। তীব্র প্রেম থেকে তিনি মুমতাজ মহলকে চির অমর করতে চেয়েছিলেন। অমর করতে চেয়েছিলেন তাদের দুজনের ভালোবাসা ও দাম্পত্যকে। এ উপলব্ধির নিদর্শন আগ্রার তাজমহল। আজও হাজারো মানুষ যমুনার তীরে অবস্থিত শ্বেতশুভ্র তাজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। মুগ্ধতা ছড়ায় শাহজাহান-মুমতাজের প্রেম।

জাহানারা বেগম

সম্রাট শাহজাহান ও সম্রাজ্ঞী মুমতাজ মহলের ১৪ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাহানারা বেগম। রূপ ও বুদ্ধিমত্তার কারণে একজন রাজকুমারী হয়েও কয়েকশ বছরের মোগল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেন জাহানারা। ছোটবেলা থেকেই কোমল হূদয় ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগ সম্রাটের চোখে জাহানারাকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়। শাহজাহান-মুমতাজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান, নয়নের মণি বিবেচনা করা হয় জাহানারাকে। ভাই দারা শুকো, আওরঙ্গজেবের পছন্দের বোন তিনি। বড় বোন হিসেবে ভাইয়েরা তাকে সম্মান করেছেন। আমৃত্যু অবিবাহিত ছিলেন জাহানারা।

১৬১৪ সালে জাহানারা বেগমের জন্ম। ১৬৩১ সালে যখন মা মুমতাজ বেগম মারা যান তখন জাহানারার বয়স মাত্র ১৭ বছর। তবে সেই বয়সেই ভীষণ বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতী ছিলেন জাহানারা। শাহজাহানের আরো স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যে হেরেমে নিজের কর্তৃত্ব জারি করতে সক্ষম হন।

বলা হয়, জাহানারা বেগম একজন সম্রাজ্ঞীর মতো বাবার পাশে থেকেছেন। টানা ২৭ বছর দক্ষতার সঙ্গে হেরেম সামলেছেন। মায়ের মতো সম্রাটের উজুক বা শাহি সিলগালার দায়িত্বও ছিল তার হাতে। ওই সময় জাহানারাকে ‘বেগম সাহিব’ উপাধি দেয়া হয়। শাহজাহানের রাজত্বে মুমতাজ মহলের মৃত্যুর পর জাহানারা বেগমকে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারী হিসেবে ধরা হয়। তিনি ছিলেন জেনানা মহলের পাদশাহ বেগম বা মোগল সাম্রাজ্যের মুখ্য কর্ত্রী। বাবার প্রতি আজীবন অনুরাগ পোষণ করেছেন জাহানারা। বাবার নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ শাহজাহানের সেবার ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

এমনকি শাহজাহানের শেষ বয়সে যখন চার ছেলের মধ্যে উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয়, তখন পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে প্রাসাদ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জাহানারা। শাহজাহান ও মুমতাজের সবচেয়ে বড় ছেলে দারা। পিঠাপিঠি হওয়ায় দুই ভাইবোনের মধ্যে মিল ছিল অনেক। তাদের পছন্দ-অপছন্দ, উদারনৈতিক ধর্ম বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা অনেকটা একই রকম হওয়ায় উত্তরাধিকার যুদ্ধে জাহানারা দারা শুকোকে সমর্থন দেন। মোগল রীতিতে দারা সিংহাসনের যোগ্য দাবিদার ছিলেন। তবে শেষ অবধি উত্তরাধিকার যুদ্ধে জয়ী হয়ে সিংহাসনে বসেন আওরঙ্গজেব। সম্রাট হওয়ার পরও তিনি জাহানারাকে অসম্মান করেননি।

 

অনিন্দ্য সাইমুম ইমন: সাংবাদিক