বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সাধনার ইতিহাস আমাদের সম্যক জানা নাই। ১৮৬০-১৯০০ খৃষ্টাব্দ অবধি মুসলমানেরা যে সকল পুঁথি পুস্তক লিখিয়াছিলেন এবং প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহা আজকাল আদৌ দেখিতে পাওয়া যায় না। সে আমলের কয়েকজন খ্যাতনামা মুসলমান সাহিত্য-সাধকের বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করিতেছি।

লালন ফকিরের জন্ম হয় ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে। লালনের পূর্বতন নাম ছিল লালন চন্দ্র রায়। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট দরবেশ এবং কবি ছিলেন। অবশ্য তাঁহার মতবাদ ছিল সুফি প্রভাবিত। কুষ্টিয়া অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে কিংবদন্তি রহিয়াছে যে লালন শাহ প্রায় তিন শত বৎসর জীবিত ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ১১৬ বৎসর জীবিত ছিলেন। লালনের গুরু ছিলেন সিরাজ সাঁই। সিরাজ সাঁইয়ের বাড়ী ছিল কুমারখালি অঞ্চলে, কুষ্টিয়া কুমারখালির পার্শ্ববর্তী স্থানে অবস্থিত। কুমারখালিতে বিখ্যাত সাহিত্য-সাধক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জন্ম হয়। হরিনাথের সঙ্গে লালন শাহ এবং মীর মশাররফ হোসেনের বন্ধুত্ব ছিল। ইহাদের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা ছিল। হরিনাথ সাংবাদিক ছিলেন। সেই সম্পর্কে মশাররফ হোসেনের সঙ্গে তাঁহার পরিচয় হয়। হরিনাথ ফিকিরচাঁদ ভণিতায় বহু বাউল গান রচনা করিয়াছেন, এই সূত্রে লালন শাহের সঙ্গে তাঁহার হৃদ্যতা ঘটে। পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গের দূরদূরান্তের নিভৃত পল্লীতে লালন শাহের গান আজও শুনিতে পাওয়া যায়। লালন নিজে অধ্যাত্ম সাধনায় পটু ছিলেন; সুফি ধরনের বহু কথা তাঁহার গানে প্রকাশ করিয়াছেন। জনসাধারণের আধ্যাত্মিক আকুলতা লালন শাহের গানে অনেকখানি তৃপ্ত হয়। অবশ্য লালন শাহ গোঁড়া মুসলমান ছিলেন না। বৃটিশ শাসনে মুসলমানের মেরুমজ্জা বেশ বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল। লালন শাহের অপূর্ব গান জনসাধারণের মেরুমজ্জা, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তি সবল রাখিতে বেশ কিছু পরিমাণে সহায়তা করিয়াছিল।

মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম হয় ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৯১২ খৃষ্টাব্দে। কুষ্টিয়ার নিকটবর্তী লাহিনী পাড়া গ্রামে তাঁহার জন্ম হয়। তিনি গদ্য ও পদ্য উভয় প্রকার রচনাতেই খুব পটু ছিলেন। গদ্য রচনার জন্য তিনি আজ আমাদের নিকট স্মরণীয়। তিনি ফরিদপুর নবাব এবং পরে দেলদুয়ার নবাব এস্টেটে চাকুরী করিয়াছেন। তাঁহার ‘গাজী মিয়র বস্তানী’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’, প্রভৃতি গ্রন্থ মূল্যবান রচনা। বৃটিশ মিউজিয়ামে মীর মোশাররফ হোসেনের কয়েকখানি গ্রন্থ রহিয়াছে। তন্মধ্যে তাঁহার ‘রত্নাবতী’ উপন্যাস পরীক্ষা করিবার সুযোগ পাইয়াছিলাম। মীর সাহেবের সকল গ্রন্থ আজ পুনর্বার মুদ্রণের প্রায়োজন অনুভূত হইতেছে। তাঁহার জ্যোতির্মর সাধনা আমাদের সাহিত্য অঙ্গন সমুজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে।

হাসান রাজা চৌধুরী জন্ম ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৯২২ খৃষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন সিলেটের একজন বনিয়াদী জমিদার। তাহার জন্মস্থান লক্ষ্মণশ্রী, সিলেট। তাঁহার ভগিনী ছহিফা দাবিও একজন কবি ছিলেন। তিনি ‘ছহিফা সঙ্গীত’ নামে একখানা কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ কারন। উর্দু ও বাংলা রচনায় তিনি দক্ষ ছিলেন।

হাসান রাজার প্রধান কৃতিত্ব বাউল গান রচনায়। তাহার গ্রন্থ ‘হাছন উদাস’ নামে বিখ্যাত। তিনি ‘সৌখীন বাহার’ নামেও একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। হাসান রাজার গান আসাম ও বাংলার নানা স্থানে প্রচলিত রহিয়াছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁহার হিবার্ট লেকচারে হাসান রাজার একটা গানের উল্লেখ করেন। হাসান রাজার এই গানটি বড়ই জনপ্রিয়—

লোকে বলে বলে রে

ঘরবাড়ী ভালা নয় আমার।

কি ঘর বানাইব আমি শূন্যের মাঝার।

ভাল করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর।

আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার।

এই ভাবিয়া হাছান রাজা ঘর দুয়ার না বান্দে।

কোথায় নিয়া রাখবে আল্লায় এর লাগিয়া কান্দে।।

হাছান রাজা বুঝত যদি বাঁচব কতদিন।

দালান কোঠা বানাইত করিয়া রঙ্গীন।

(হাছান উদাস: পৃ. ৩৩)

তাঁহার সমকালে সিলেটে অনেক বেশরা ফকীর ও লোককবি জন্মগ্রহণ করেন। হজরত শাহ জালালের প্রভাববশত এবং প্রাকৃতিক অপূর্ব সৌন্দর্য নিবন্ধন মরমীয়া কাব্য এখানে প্রভূত পরিমাণে চর্চা হইত। শীতলাং শাহ একজন বিখ্যাত লোককবি ও দরবেশ ছিলেন। শীতলাং শব্দটি শুনিতে অদ্ভুত লাগে। শীতলাং শব্দটি ফারসি, অর্থ পায়ের খিরা। শীতলাং শাহ অসংখ্য গান রচনা করেন। তাঁহার বহু শিষ্য প্রশিষ্য সারা সিলেটে ছড়াইয়া রহিয়াছে।

শাহ নূর অতি উচ্চস্তরের দরবেশ এবং লোককবি ছিলেন। শাহ নূরের গান পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইয়াছিল। শেখ ভানুও একজন চমৎকার লোককবি ছিলেন। তিনি নিরক্ষর ছিলেন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও আত্মোপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার একটি গান সুপ্রসিদ্ধ।

নিশীথে যাইও রে ভ্রমর ফুলবনে।

বাড়িও আলীর জন্ম হয় ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৯১২ খৃষ্টাব্দে। তাহার জন্মস্থান আটিগ্রাম বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার অধীন। তিনি তেমন উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। তিনি সংস্কৃত জানিতেন। তাঁহার জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হইয়াছে ‘আশেকে রসূল’ গ্রন্থে। তাহাতে ইসলামী মানোভাব সুপরিস্ফুট, কিন্তু উচ্চ কবিত্বের সাক্ষ্য পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু যেমনটির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তা পবিত্র এবং উচ্চ। স্বল্প শিক্ষিত এই লোকটির বাংলা সাহিত্যের চর্চা আমাদের শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। তিনি ‘ভাঙ্গা প্রাণ’, ‘অন্তিমে মৃত্যু’, ‘শান্তিকুঞ্জ’ প্রভৃতি কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন।

খোন্দকার শামসুদ্দীনের জন্ম হয় ১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে। তিনি ‘ভাব লাভ’ নামে একখানা সুন্দর গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁহার মুদ্রিত বইখানার এক খণ্ড পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়াছে।

কাজেম উদ্দীন আল কোরায়শীর জন্ম হয় ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে এবং মৃত্যু হয় ১৯৫২ খৃষ্টাব্দে। কায়কোবাদ নামেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। তাঁহার জন্ম হয় ঢাকা জেলার অন্তর্গত আগা গ্রামে। তিনি সমাধিস্থ হন আজিমপুর গোরস্থানে। ইংরাজী শিক্ষিত কোন মুসলমান এত দীর্ঘকাল তাঁহার মত একনিষ্ঠভাবে বাংলা সাহিত্যের সেবা করিতে পারেন নাই। তাঁহার শেষের দিকের কবিতাগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। একটা আধুনিক ও সমসাময়িক জীবন চাঞ্চল্য এই সকল কবিতায় পরিলক্ষিত হয়।

কায়কোবাদের পিতার নাম নেয়ামতুল্লাহ আল কোরায়শী। কবির অল্প বয়সেই তাঁহার মৃত্যু ঘটে। কায়কোবাদ ঢাকায় থাকিয়া লেখাপড়া শুরু করেন। লেখাপড়ার দিকে তিনি অমনোযোগী ছিলেন। তিনি পাঠ্যবস্থায়ই কবিতা লিখিতে শুরু করেন। গিরিবালা নাম্নী এক সুন্দরী প্রতিবেশিনীর সঙ্গে তাঁহার পরিচয় ঘটে। তাঁহাকে উদ্দেশ্য করিয়াই তিনি ‘ভুল’ নামে একটি কবিতা রচনা করেন। এই কবিতাতে তাঁহার সাধনার চাবিকাঠি পাওয়া যায়। এই কবিতার প্রথম অক্ষরগুলি মিলাইয়া গিরিবালার নাম পাওয়া যায়।

গিয়াছিনু প্রিয়তম প্রেমের নিকুঞ্জ বনে

রিক্ত করে ফিরে এনু না পাইনু ফুল।

বাতাসে গিয়াছে ঝরে, নাই আর বৃন্ত পরে।

লাবণ্য মাটির সনে হয়ে গেছে ফুল।

গিরিবালা ধনীর কন্যা ছিলেন। তাঁহাদের বাটিতে সুন্দর ফুলের বাগান ছিল। তিনি প্রত্যহ প্রাতে কবিকে ফুল উপহার দিতেন বলিয়া কবির মুখে শুনিয়াছি।

কায়কোবাদ বিহারীলালের সমসাময়িক এবং সমধর্মী। উভয়েই ছিলেন আপনভোলা কবি। উভয়ের কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য সরলতা। উভয়ের রচনাতেই শ্লথ শব্দবিন্যাস দেখিতে পাওয়া যায়। এমনকি খণ্ড কবিতায় উভয়ের একই সুর পরিলক্ষিত হয়। কায়কোবাদের ‘শ্মশান সঙ্গীত’ এবং বিহারীলালের ‘শ্মশান সঙ্গীত’ একই অন্তর্জ্বালার প্রকাশ।

কায়কোবাদ ‘মহাশ্মশান’, ‘অশ্রুমালা’, ‘শিবমন্দির’, ‘মহরম’ প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। বৃটিশ আমলের মুসলমান কবিদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক-বোধ লইয়া কাব্য সাধনায় প্রবৃত্ত হন। স্বজাতির অধঃপতনে তাঁহার যে মনোবেদনা তাঁহার কাব্যে আছে তাহার প্রকাশ।

মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তিনি ঢাকা জেলার অধিবাসী ছিলেন। তিনি যৎসামান্য লেখাপড়া করেন। তিনি প্রথম জীবনে ত্রিপুরা জেলার রূপসার পাঠশালায় শিক্ষকরূপে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। তিনি মুসলমান, সুধাকর প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। তাঁহার সুবৃহৎ সাহিত্যকর্ম হইতেছে তোহফাতুল মুসলেমিন। তিনি আরবি ফারসি ভাষায় তাদৃশ অধিকারী ছিলেন না, এই জন্য খুলনা জেলার বাঁশদহ নিবাসী সুসাহিত্যিক অধ্যাপক মেয়ারাজ উদ্দীনের সাহায্যে এই গ্রন্থ রচনা করেন।

মুসলমান সমাজের দুরবস্থা ও দুর্দশা দর্শনে তৎকালীন চিন্তাশীল মুসলমান যুবকেরা বিপ্লবী জামাল উদ্দীন আফগানির ফারসি রচনাবলীর তর্জমা ও অনুশীলনে প্রয়াত হন। মৈমনসিংহের অধিবাসী ও কলিকাতা মাদ্রাসার শিক্ষক রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী রচনা করেন যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘সমাজ সংস্কারক’। তাহাতে জামালউদ্দীনের জীবনী ও গ্রন্থাবলীর অনুবাদ স্থান লাভ করে। ঢাকার রেয়াজউদ্দীন আহমদ ‘কৃষক বন্ধু’, ‘জোলেখা’ প্রভৃতি রচনা করেন। তিনি শেখ আবদুল রহীমের সহকর্মী হিসাবে সাংবাদিকতার কাজও করেন।

আবু মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে পাবনা জেলার জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। মুসলমান সমাজের শোচনীয় দুর্দশা দর্শনে তিনি ব্যথিত হইয়া সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। মুসলমাদের প্রাচীন ইতিহাস পাঠ করিয়া তিনি সাহিতা সেবা ও সমাজ সেবায় প্রবুদ্ধ হন। যে মুষ্টিমেয় মুসলমানগণ স্বদেশিকতার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী উহাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি ‘রায় নন্দিনী’, ‘ফিরোজা বেগম’, ‘নূরুদ্দীন’ প্রভৃতি উপন্যাস, স্পেন বিজয়, প্রেমাঞ্জলি, সঙ্গীত সঞ্জীবনী প্রভৃতি কবিতা গ্রন্থ এবং সুচিন্তা, স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা, তুর্কী নারী প্রভৃতি প্রবন্ধ পুস্তক রচনা করেন। তিনি তুরস্ক ভ্রমণ করেন।

শেখ আবদুল রহীম ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে চব্বিশ পরগণা জেলার মোহাম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। তাঁহার সাহিত্য জীবন সাংবাদিকতার মাধামে সূচিত হয়। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে তিনি সাপ্তাহিক ‘সুধাকর’ পত্রিকা রাধামাধব বসুর অর্থ সাহায্যে প্রকাশ করিতে শুরু করেন এবং ইহার পর তিনি ‘মিহির ও সুধাকর’ প্রকাশ করেন। দশ বৎসর তিনি এই কাগজ পরিচালনা ও সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকা দ্বারা মুসলমান সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়। ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে তিনি বঙ্গ-বিভাগের বিপক্ষে আন্দোলন চালান। তিনি হাফেজ নামে একখানা মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা এবং মোসলেম হিতৈষী নামক একখানা সাপ্তাহিক পত্রিকা পরিচালনা করেন। তাঁহার ‘হজরত মোহাম্মদের জীবন চরিত ও ধর্ম নীতি’ একখানি বিশ্বস্ত ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থ তাঁহার জীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি। তিনি জেহাদ, সমাজ সংস্কার, প্রণয় যাত্রী প্রভৃতিও রচনা করেন।

মোজাম্মেল হক ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে নদীয়া জেলার অন্তর্গত শান্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। তাঁহার কবিতাবলী প্রকৃত কবিত্ব মাধুর্য বিমণ্ডিত। তাহার সহজ, সরল ও মধুর কবিতাবলী আজও সকলের কাছে সমাদৃত। তিনি ‘হজরত মোহাম্মদ, অপূর্ব দর্শন, ইসলাম সংগীত, মহর্ষি মনসুর, তাপস কাহিনী, শাহনামা, টিপু সুলতান, হাতেম তাই, দরাফ খান গাজী প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ‘লহরী’ নামক একখানা কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি মোসলেম ভারতও সম্পাদনা করেন। এই মোসলেম ভারত পত্রিকাতেই নজরুল ইসলামের প্রথম বয়সের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলি প্রকাশিত হয়। তাঁহার পুত্র আফজালুল হক ও ভ্রাতুষ্পুত্র স্যার আজিজুল হক বাংলা সাহিতোর সেবায় মোজাম্মেল হকের উত্তরাধিকার বজায় রাখেন।

মোহাম্মদ নজিবর রহমান ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে পাবনা জেলার অন্তর্গত বেলতৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২৫ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে নিপতিত হন। শিক্ষকতা করিয়াই তিনি জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি আনোয়ারা, প্রেমের সমাধি, পরিণাম, গরীবের মেয়ে, দুনিয়া আর চাই না প্রভৃতি উপন্যাস ও গদ্য রচনা করেন। তাঁহার আনোয়ারা আজও সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস।

মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৮৯১ খৃষ্টাব্দে যশোহর জেলার অন্তর্গত ঘোপ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। তিনি দরজীর ব্যবসায় অবলম্বনে জীবিকা অর্জন করিতেন। খৃষ্টান পাদরীর দ্বারা দলে দলে মুসলমান খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হইতেছে দেখিয়া তিনি মর্মাহত হন এবং ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে জীবন নিবেদন করেন। তাঁহার চেষ্টার ফলে মুসলমান অশিক্ষিত সমাজের মধ্যে নূতন সাড়া পড়িয়া যায়। তিনি খৃষ্টান ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে গ্রন্থাদি রানা করেন। তাঁহার বন্ধু ও সুসাহিত্যিক শেখ জমীর উদ্দীন তাঁহার সাহিত্য ও প্রচার জীবনের সহায়করূপে দণ্ডায়মান হন। মেহেরুল্লাহ হিন্দু ধর্ম রহস্য, বিধবা গঞ্জনা, খৃষ্টান ধর্মের অসারতা, রদ্দে খ্রীষ্টীয়ান, মেহেরুল ইসলাম, পন্দেনামা প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁহার হিন্দু ধর্ম রহস্য বঙ্গীয় সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। সিরাজগঞ্জের মুন্সী মেহেরুল্লাহও সাহিত্য চর্চা করিয়া সমাজের উন্নতি সাধন করেন।

তসলিম উদ্দীন আহমদ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে দার্জিলিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২৭ খৃষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ওকালতি করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তাঁহার কোরানের বঙ্গানুবাদ বিখ্যাত। তিনি জন্মোৎসব, “প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা সাহাবিয়া, সম্রাট পয়গম্বর প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা কতেন। ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি তাঁহার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি কয়েকখানি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি রাখিয়া গিয়াছেন। তাহার সুযোগ্য পুত্র তরিকুল আলম (১৮৮৬-১৯৩২) তাঁহার সাহিত্য সাধনার ধারা অব্যাহত রাখেন। তরিকুল আলমের মত চিন্তাশীল লেখক মুসলমান সমাজে বিরল।

বেগম রোকেয়া, করিমুন্নেসা, ফয়জুন্নেসা, ছহিফা বিবি প্রকৃতি মহিলা লেখকদের দানও এ যুগে স্মরণীয়। নঈমুদ্দীন, ডা. লুৎফুর রহমান, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রভৃতি সাহিত্য সাধকদের অবদানেও ব্যাংলা সাহিত্য গৌরবান্বিত।

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন: লেখক ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক

(প্রবন্ধটি খ্যাতনামা মাহেনও সংবাদপত্রের কার্তিক, ১৩৬২

সংখ্যায় প্রকাশিত। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন রচনাবলী গ্রন্থে সংকলিত।)