ব্রিটিশ ভারতের জনসংখ্যা গণনার সর্বপ্রথম প্রচেষ্টা শুরু করেন বুকানন হ্যামিল্টন ও উইলিয়াম অ্যাডাম। বুকানন ছিলেন একজন ভুগোলবিদ, ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ। কয়েক বছরের রাজস্বের তদারকির পর তারা উপমহাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে জরিপের কাজ শুরু করেন। এটাই ইতিহাসে ১৮৭১-৭২ সালের আদমশুমারি বলে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশে এটাই প্রথম বড় পরিসরে চালানো আদমশুমারি। এ বৃহৎ আদমশুমারিতে তৎকালীন বিশালসংখ্যক মানুষকে সংযুক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বর্ণনা করা হয়। আদমশুমারির পরও বিভিন্ন জটিল ও কঠিন সমস্যা থেকে যায়। এ লেখার মধ্যে ১৮৭১-৭২ আদমশুমারির কিছু দালিলিক প্রমাণ থেকে বোধগম্য একটি চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করব।
আদমশুমারির প্রথম গ্রহণযোগ্য সংখ্যা সংগ্রহ করা হয় এবং ধারণ করা হয় একটি ব্রিটিশ ভারতের ১৮৭১-৭২ সালে জরিপের কাগজে। পরবর্তী বছর তা প্রকাশ হয়। দক্ষতা ও গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুত করেন এইচ ওয়াটারফিল্ড, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্য ও পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান। এ আদমশুমারিতে পৃথক পৃথক ধর্মের অনুসারীদের তালিকা করা হয়। ধর্মের তালিকার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টানসহ নাম না জানা অন্য ধর্মাবলম্বীদের রাখা হয়। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আদমশুমারিতে প্রধান ধর্মগুলোর অবস্থান সম্পর্কে গোছানো ধারণা পাওয়া যায়। আদমশুমারিতে দেখা যায়, হিন্দু ও শিখ ধর্ম মিলিয়ে সংখ্যা ছিল সাড়ে ১৪ কোটি, যার মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল ১৩ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ জন। শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল ১১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩৬ জন। মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছিল ৪ কোটি ৮৮ লাখ ২ হাজার ৫৩৭, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বী ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৫১, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ৮৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৮ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ছিল ৫৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৯৮ জন। তাদের মধ্যে কিছু ধর্মের নাম জানা যায়, আবার কিছু ধর্মের নাম জানা সম্ভব হয়নি। সব ধর্মের মানুষের সামষ্টিক হিসাব অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৪৮ জন এবং এ সংখ্যাকে গ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত ছিল কয়েকটি অঞ্চলে। এসব অঞ্চলের ওপর আলাদাভাবে জরিপ করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা নিশ্চিত করেন আদমশুমারির গণনাকারীরা।
১৮৭১-৭২ সালের আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু। হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলায়। আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলায় সব মিলিয়ে হিন্দু ছিল ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার ৪১৮ জন। আসামে ছিল ২৬ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৭, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ২ কোটি ৬৫ লাখ ৬৮ হাজার ৭১, আজমীরে ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৬, অযোধ্যায় ১ কোটি ৩ হাজার ৩২৩, পাঞ্জাবে ৬১ লাখ ২৫ হাজার ৪৬০, মধ্য প্রদেশে ৫৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৭২, বেরারে ১৯ লাখ ১২ হাজার ১৫৫, মহিশুরে ৪৮ লাখ ৭ হাজার ৪২৫, কোডায় ১৫ লাখ ৪ হাজার ৪৭৬, ব্রিটিশ বার্মায় ৩৬ হাজার ৬৫৮, মাদ্রাজে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ এবং বোম্বেতে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮৯ হাজার ৩২৯ জন। সব মিলিয়ে ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮।
এরপর দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বী ছিল মুসলমানরা। আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, বাংলায় মুসলমান ধর্মাবলম্বী ছিল ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৩১ জন, আসামে ছিল ১১ লাখ ৪ হাজার ৬০১, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ৪১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪৮, আজমীরে ৬২ হাজার ৭২২, আযোধ্যায় ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৭০৪, পাঞ্জাবে ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬৮৫, মধ্যপ্রদেশে ২ লাখ ৩৩ হাজার ২৪৭, বেরারে ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯৫১, মহিশুরে ছিল ২০ লাখ ৮ হাজার ৯৯১, কোডাগুতে ১১ হাজার ৩০৪, ব্রিটিশ বার্মায় ৯৯ হাজার ৮৪৬, মাদ্রাজে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫৭ ও বোম্বেতে ছিল ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৪৫০ জন। সব মিলিয়ে ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৮৮ লাখ ২ হাজার ৫৩৭।
১৮৭১-৭২ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও বাংলায় ছিল বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম। আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, বাংলায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মানুষ ছিল ৮৪ হাজার ৯৭৪ জন। আসামে ছিল ১ হাজার ৫২১, পাঞ্জাবে ৩৬ হাজার ১৯০, মধ্যপ্রদেশে ৩৬ হাজার ৫৬৯, মহিশুরে ১৩ হাজার ২৬৩, কোডাগুতে ১১২, ব্রিটিশ বার্মায় ২ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৮৩১, মাদ্রাজে ২১ হাজার ২৫৪ ও বোম্বেতে ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ১৩৭ জন। সব মিলিয়ে ব্রিটিশ ভারতে বৌদ্ধ ও জৈন জনগোষ্ঠী ছিল ২ কোটি ৮৩ লাখ ২ হাজার ৮৫১ জন।
ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাও। বাংলায় তাদের সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭৬৩। আসামে ছিল ১ হাজার ৯৪৭, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ২২ হাজার ১৯৬, আজমীরে ২৪৯, আযোধ্যায় ৭ হাজার ৭৬১, পাঞ্জাবে ২২ হাজার ১৫৪, মধ্য প্রদেশে ১০ হাজার ৪৭৭, বেরারে ৯০৩, মহিশুরে ২৫ হাজার ৬৭৬, কোডাগুতে ২ হাজার ৪১০, ব্রিটিশ বার্মায় ৫২ হাজার ২৯৯, মাদ্রাজে ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬০ ও বোম্বেতে ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৬৩ জন। মোট খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৮ জন।
আদমশুমারি অনুসারে, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও জৈন ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও ব্রিটিশ ভারতে ছিল। তাদের অনেকেই পাহাড়ি উপজাতি, আদিবাসী, পারসিক ও জৈন ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন জায়াগায় বসবাস করত। বাংলায় তাদের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ৫৮। আসামে ছিল ১৬ হাজার ৬৪৯ জন, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ছিল ৫৮৬, আজমীরে ৬৫, পাঞ্জাবে ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১৯, মধ্যপ্রদেশে ২০ লাখ ৪১ হাজার ২৭৬, বেরারে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫০, মহিশুরে ৫৭, কোডাগু ছিল ১০, ব্রিটিশ বার্মায় ১ লাখ ১০ হাজার ৫১৪, মাদ্রাজে ৪ হাজার ৩২৮ জন ও বোম্বেতে ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ২২০ জন। সব মিলিয়ে অন্যান্য ধর্মের মানুষ ছিল ৫১ লাখ ২ হাজার ৮২৩ জন।
উপজাতি ও হিন্দু ধর্ম চর্চাকারী আদিবাসীর সংখ্যা ছিল এক কোটিরও বেশি। বাংলায় এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১১ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৩, আসামে ছিল ১৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৮৮, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৪, অযোধ্যায় ৯০ হাজার ৪৯০, পাঞ্জাবে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭২০, মধ্যপ্রদেশে ১৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮৩৫, বেরারে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৯, মহিশুরে ৮৯ হাজার ৬৭, কোডাগু ৪২ হাজার ৫১৬, ব্রিটিশ বার্মায় ১০ লাখ ৪ হাজার ৯৯১ ও বোম্বেতে ছিল ৭ লাখ ১১ হাজার ৭০২ জন। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ১৬ হাজার ৮২৫।
কিছু লোকের ধর্মীয় সনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি। এমন লোকের সংখ্যা ৯০ লাখের কাছাকাছি। এ আদমশুমারি তৈরির সময় এমন সব মানুষের তালিকাও করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তারা। উপনিবেশ আমলে ভারতের জনসংখ্যার প্রথম বিস্তৃত চিত্র দেখা যায় ১৮৭১-৭২ সালের আদমশুমারি। নিজেদের শাসনের সুবিধার জন্য শাসকগোষ্ঠী আদমশুমারিটি পরিচালনা করলেও পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে এর ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী।
রুদ্র ইকবাল: সাংবাদিক, বণিক বার্তা








