বাগদাদ নগরী! আব্বাসীয় শাসনামলে পৃথিবীর চোখ ঝলসানো এক মুসলিম নগরী। অষ্টম-দশম শতাব্দীর মুসলিম শাসনামলের কেন্দ্রবিন্দু। অষ্টম শতাব্দীতে উমাইয়া খিলাফতের পরাজয়ের পর বাগদাদ শহর আব্বাসীয় রাজবংশের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে ইসলামের ইতিহাসে খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক বাগদাদ নগরী। আব্বাসীয় শাসনামলে ইসলামের ইতিহাসের অনেক কালজয়ী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে বাগদাদ জড়িত হয়ে পড়ে। আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ শুধু অনন্য নগরীই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের সাক্ষী। অষ্টম শতাব্দীর আব্বাসীয়দের রাজধানী বাগদাদ নগরী স্থাপত্যকলা, শৈল্পিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও ছিল মনোমুগ্ধকর। বাগদাদ নগরীর পাশেই দজলা বা টাইগ্রিস নদী। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর অন্যতম একটি। এর স্রোতের সঙ্গে ভেসে গেছে রক্তের বন্যা, সৃষ্টি হয়েছে অনন্য বিপ্লব। কান পাতলে শোনা যায় ইতিহাসের অনেক গল্প। টাইগ্রিস নদীর তীরেই যেমন আব্বাসীয় ক্ষমতার প্রতীক বাগদাদ। তেমনই এর পাশেই আব্বাসীয় শাসকরা গড়ে তোলেন বিশাল বিখ্যাত জ্ঞানভাণ্ডার বাইতুল হিকমাহ বা হাউজ অব উইজডমের। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাদপীঠ বাইতুল হিকমা ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, অনুবাদ কেন্দ্র, শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের পাদপীঠ। এটিকে ইসলামী স্বর্ণযুগের একটি প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

আব্বাসীয় রাজবংশের সব শাসকই বিশেষ করে খলিফা আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.), খলিফা হারুন অর রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.), খলিফা আল মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) প্রত্যেকের শাসন ছিল ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে উদার নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাজত্ব পরিচালনা করা। ফলে তাদের রাজত্বকাল দীর্ঘায়িত হয়। এ সময় একক আরবীয় জাতীয়তাবাদের পতন ঘটে এবং বাগদাদ নগরী হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার। আব্বাসীয় যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আব্বাসীয় যুগ ছিল গোটা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ। খলিফারা ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানপিয়াসী। তাদের উদার ও অপরিসীম দানে মুসলিম সভ্যতা পূর্ণ বিকাশ লাভ করে স্বর্ণযুগের দিকে নিয়ে গেছে।

অষ্টম শতাব্দীতে বাগদাদ নগরীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের শুরু খলিফা আল মনসুরের হাত ধরে। তার সময়ে সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, চিকিৎসা, দর্শন ও জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা এবং গ্রিক ও ভারতীয় পণ্ডিতদের দুষ্পাপ্য গ্রন্থাবলি অনূদিত হয়। খলিফা আল-মনসুর নিজেও বিজ্ঞানচর্চা করতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান

নিয়ে গবেষণা ছিল তার প্রিয় বিষয়। কথিত আছে, রাজকীয় কাজ থেকে একটু অবসর পেলেই খলিফা মনসুর জ্যোতির্বিজ্ঞান সাধনায় ডুবে যেতেন। এ কারণে অনেক ইতিহাসবিদ খলিফা মনসুরকে আরব জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সর্বপ্রথম বলে উল্লেখ করেছেন।

Maqamat_hariri

ইয়াহিয়া ইবনে ওয়াসিতির আঁকা বাগদাদের লাইব্রেরি ছবি: ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান ইনভেনশন্স

সাম্প্রতিক সময়েও গবেষকরা দেখিয়েছেন খলিফা হারুন অর রশীদ ছিলেন অষ্টম, নবম শতাব্দীর বিশ্বের একজন মহান শাসক। তার সময়ের বাগদাদ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তার ক্ষমতায় থাকার সময় ছিল খিলাফত শাসনামলের স্বর্ণযুগ। বলা হয় বিখ্যাত আরব্য রজনীর কল্পকাহিনী আলিফ লায়লার একটি চরিত্র খলিফা হারুন অর রশীদ। তার আমলে বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত মনীষীদের মিলনভূমি ছিল বাগদাদ। বিশ্বের প্রায় সব নামকরা ইতিহাসবিদ মনে করেন বাগদাদ নগরীর শিল্প, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অনেক সেরা কাজ খলিফা হারুন অর রশীদের শাসনামলেই সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এটাও মনে করেন আলিফ লায়লার বাগদাদ নগরী ও খলিফা হারুন অর রশীদ এ নাম দুটো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। খলিফা হারুন অর রশীদের সময়ে আরব্যোপন্যাস লেখা না হলে হয়তো ‘রবিনসন ক্রুসো’ এবং সম্ভবত গ্যালিভারের ভ্রমণ কাহিনী রচিত হতো না।

জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় বাগদাদের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো ‘‌বাইতুল হিকমাহ’ (House of wisdom)। খলিফা হারুন অর রশীদের সময়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও খলিফা আল মামুনের সময় এটি উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে বাইতুল হিকমাহ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রন্থভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হতো। বাইতুল হিকমাহ ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, অনুবাদ কেন্দ্র, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়ে সম্পৃক্ত।

কোনো শাসকের কৃতিত্ব মূল্যায়নের মানদণ্ড যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলন এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধন হয়, তাহলে আল-মামুন শুধু আরব ইতিহাসে নয়, বরং তাকে সমগ্র বিশ্বের শাসকদের পর্যায়ভুক্ত অবশ্যই করতে হবে। তার সময়ে আব্বাসীয় যুগ ছিল জ্ঞানচর্চা, বিকাশ ও বিশ্বে ইসলামকে আন্তর্জাতিকীকরণের যুগ। জ্ঞানপিপাসু খলিফা মামুন নিজেও ধর্ম, দর্শন, তর্ক, আইনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তার উদার মনোভাবের কারণে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিখ্যাত পণ্ডিতরা তার দরবার অলংকৃত করেন। এ বিখ্যাত পণ্ডিতরা ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, আইন ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর গবেষণা, পর্যালোচনা করে দিবারাত কাটাতেন। খলিফা মামুন বুঝতে পেরেছিলেন যথার্থ শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্যেই দেশ ও জাতির কল্যাণ নিহিত। এজন্য তিনি সব কাজেই মাদ্রাসা-মসজিদকে ব্যাপকভাবে স্থায়ী আয়ের আওতায় নিয়ে আসেন। তিনি চীন দেশের অনুকরণে কাগজের কল স্থাপন করেন। খলিফা মনসুরের সময় বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদ শুরুর যে ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, খলিফা মামুনের সময় তার পুরোপুরি বিকাশ ঘটে। তিনি এথেন্স, সিরিয়া, এশিয়া, মিসর প্রভৃতি দেশ থেকে প্রাচীন গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়ে এগুলো বিখ্যাত পণ্ডিতদের দ্বারা অনুবাদ করান। তিনি প্লেটো, অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, হিপোক্রেটস প্রভৃতি দার্শনিকদের গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। কোস্টা, গ্রিক, সিরীয় ও ক্যালডীয় ভাষার গ্রন্থাবলি, মানকা ও দুবান সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ভারতীয় গ্রন্থাবলি এবং মুসা প্রমুখ ফারসি গ্রন্থাবলিকে আরবিতে অনুবাদ করেন। তিনি অনুবাদকদের প্রতি মাসে ৫০০ দিনার পারিশ্রমিক দিতেন। বিশেষ করে হুসাইন বিন ইসহাককে পুস্তকের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা দিতেন। প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞান ও দর্শন তিনি সমগ্র পৃথিবীতে অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। দায়িত্ব ছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত বাইতুল হিকমাহ ও তার প্রধান তৎকালীন নামকরা পণ্ডিত হুসাইন বিন ইসহাকের ওপর। তিনি শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে বাগদাদকে ইউরোপীয় অনুকরণের ধাঁচে নিয়ে আসেন। হুসাইন বিন ইসহাকের নেতৃত্বে বাইতুল হিকমায় অনুবাদ কার্যাবলি চলত বিরামহীন। তিনি নিজে গ্রিক ভাষায় শিক্ষালাভ করে গ্রিক অঞ্চল থেকে পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের কাজে নিয়োজিত হন এবং এসব আরবিতে অনুবাদন করেন। এছাড়া বায়তুল হিকমার অন্য অনুবাদকরা ক্ল্যাসিক্যাল যুগের প্রমুখ মনীষীদের বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলি এবং বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর মূল্যবান গ্রন্থাদি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। এ সময় লিউকের পুত্র কোস্টারের মাধ্যমে গ্রিক, সিরীয় ও ক্যালডীয় স্বতন্ত্র বিভিন্ন শাস্ত্রের বিকাশ লাভ ঘটে। খলিফা আল মামুন ইয়াহিয়া বিন আল-মনসুর, সিন্দ বিন আলী নামক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদকে মানমন্দিরের পরিচালক পদে নিয়োগদান করেন। তারা সে সময় পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে ইউরোপীয়দের ধারণা ভুল প্রমাণ করেন। তারা পৃথিবীর আকৃতি, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, বিষুব রেখা, অক্ষাংশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য আবিষ্কার করেন। মুসলমানদের নভোমণ্ডলের এ জ্ঞান পরবর্তীকালের বিজ্ঞানচর্চায় অনেক গুরুত্ব বহন করেছে।

81

বনু মুসার আঁকা ল্যাম্পের ডায়াগ্রাম ছবি: দ্য ম্যাপ অব নলেজ

জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ছাড়াও বাগদাদ নগরী বিখ্যাত হয়ে আছে সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব চর্চায়। বাগদাদের রাজদরবারে সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হতো। ফারসি কবিতার জনক কবি আব্বাস হাদিস শাস্ত্রবিদ ইমাম বুখারি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও দার্শনিক আল-কিন্দি খ্যাতনামা গণিতজ্ঞ ও ভূগোলবিদ মুহাম্মদ বিন মুসা, চিকিৎসাবিদ ইউহান্না বিন মোসওয়াহ বাগদাদের রাজদরবারকে অলংকৃত করেন। বাগদাদ নগরীর শাসক আব্বাসীয় যুগের খলিফা আল-মনসুর ও খলিফা হারুন অর রশিদ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন খলিফা মামুনের চেষ্টায় তা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের এ সাফল্য বিজ্ঞান বা সাহিত্যের কোনো বিশেষ শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তা বুদ্ধিবৃত্তির সর্বক্ষেত্রে প্রসার লাভ করেছিল।

অষ্টম থেকে শুরু হওয়া জ্ঞান চর্চার ধারা বাগদাদ নগরীতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু আব্বাসীয় বংশকে একসময় শত্রুদের বিরাগভাজনে পরিণত হতে হয়। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলদের নিষ্ঠুরতার শিকারে পরিণত হয় আব্বাসীয়রা। এরপর মঙ্গোলরা বাগদাদে প্রবেশ করে নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। হামলায় বাগদাদের বিখ্যাত বাইতুল হিকমাহ গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়। খলিফাসহ শহরের অসংখ্য বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়। ফলে শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে। এ অবরোধকে ইসলামী স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়। বাগদাদ নগরীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সমৃদ্ধ শিক্ষাদীক্ষাও স্তিমিত হয়ে যায়।

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়