আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দামেস্কের ক্ষমতা নিল আব্বাসীয়রা। আগে থেকেই হত্যার প্রস্তুতি ছিল সদ্য বিগত উমাইয়া রাজবংশের সবাইকে। ৭৫০ সালের ঘটনা। কোনো রকমে ছোট ভাই ও ভৃত্য বদরকে সঙ্গে নিয়ে দেশত্যাগ করেন উমাইয়া রাজপুত্র আবদুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। ছোট ভাইটা পথিমধ্যে ধরা পড়ে এবং মারা যায়। আবদুর রহমান ভৃত্য বদরকে নিয়ে কখনো দৌড়ে এবং কখনো সাঁতরে সামনে চলতে থাকেন। এভাবে মিসর ও মরক্কো ঘুরে তিনি পা রাখেন আইবেরিয়ান উপদ্বীপে, আরবদের কাছে অঞ্চলটি আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত। ৭১১ সালে স্পেনসহ গোটা আইবেরীয় উপদ্বীপ জয় করেছিলেন তারিক বিন জিয়াদ ও মুসা বিন নুসায়ের। দামেস্কের মসনদে তখন খলিফা আল ওয়ালিদ। পাঁচ দশক আগে জয় করা পৃথিবীর আরেক প্রান্তে পা রেখে যেন নতুন দুনিয়া খুঁজে পেলেন আবদুর রহমান।
মুসলমানরাই যে প্রথমে স্পেনের এ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এমন না। গ্রিক ও ফিনিশীয়রা সেখানে শহর নির্মাণ করেছিল। স্পেনের বাণিজ্য তখন থেকেই ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ২১৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পেনের মাটিতে পা রাখে রোমানরা। শাসনের সুবিধার কথা চিন্তা করে রোমানরা গোটা উপদ্বীপকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করেছিল। কর্ডোবা, মেরিদা ও তারাগোনা ছিল সে সময়ের প্রধান তিন কেন্দ্র। ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে স্পেন থেকে আসা স্বর্ণ, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু। দীর্ঘ শাসনের পর রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সুর বাজতে থাকে চতুর্থ শতকে। আলগা হতে থাকে স্পেনে রোমানদের অধিকারও। সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে ভিজিগথরা।
রোমান-পরবর্তী ভিজিগথরা ছিল অভিজাত সমাজের মতো। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এল। রোমানদের আমলে স্ফীত হয়ে ওঠা ব্যবসা ক্রমে কমে যেতে থাকল। সংকুচিত হতে থাকল সেখানকার সংস্কৃতি। সত্যি বলতে স্পেনে ভিজিগথ শাসন ছিল অনেকটাই অনুল্লেখযোগ্য। এজন্য স্পেনের ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা ভিজিগথদের ‘ইনভিজিগথ’ বলে অভিহিত করেন। এমন সময়েই ৭১১ সালে আরবরা প্রবেশ করে আইবেরীয় উপদ্বীপে। এর মধ্য দিয়েই নতুন যুগের সূচনা ঘটে স্পেনে। ফলে আবদুর রহমান যখন ৭৫৫ সালে আন্দালুসিয়ায় পা রাখলেন, তার জন্য যতটা দরকারি ছিল এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল, স্পেনের জন্যও দরকার ছিল একজন শক্তিশালী শাসক।
আবদুর রহমান আইবেরীয় উপদ্বীপের মাটিতে পা রেখেই কর্ডোবাকে নিজের মতো করে সাজাতে শুরু করেন। গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি নেন রোমান কায়দা। সিরিয়া ছিল তার পিতৃভূমি। সে পিতৃভূমিকে তিনি কখনো ভোলেননি, তার নিদর্শনও দেখা যায় তার কার্যক্রমে। তৈরি হতে থাকে মসজিদ থেকে মাদ্রাসা। তার সময়ের স্থাপনাগুলোয় রোমান, সিরীয়, ভিজিগথ ও আইবেরীয় স্থানী ধ্যানধারণার সমন্বয় ছিল। আবদুর রহমানের পর থেকে বাগদাদ, কায়রো ও মরক্কো থেকে আরব বিশেষজ্ঞ পাড়ি জমাতে থাকে আন্দালুসিয়ায়। আবদুর রহমান যখন ৭৮৮ সালে মারা যান, ততদিনে কর্ডোবা বাণিজ্য ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়ে গেছে।
কর্ডোবা ক্রমে বাগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুই শহরের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল জটিল। কিন্তু জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়েও চলেছে প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন সংস্কৃতির ধারণায় লেনদেন হয়েছে। বাগদাদকেন্দ্রিক চিন্তাধারা জিব্রাল্টার প্রণালি ঘুরে পা রেখেছে কর্ডোবায়। সম্ভবত সাংস্কৃতিক লেনদেনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ জিরয়াব। জিরয়াব একজন পারসিক গায়ক, যিনি আব্বাসীয় দরবারেই বসবাস করেছেন দীর্ঘদিন। ৮২২ সালে তিনি কর্ডোবায় চলে যান। জিরয়াবের মধ্য দিয়ে আন্দালুসিয়ার সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। তিনি কেবল সংস্কৃতি না, নতুন ফ্যাশনেরও প্রবর্তন করেন। জিরয়াবের মতো অনেক সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক, কবি, চিকিৎসক ও ধর্মতাত্ত্বিক বাগদাদ ত্যাগ করে চলে যান কর্ডোবায়।
৮২০ সালের মধ্যেই কর্ডোবায় মুতাজিলা মতবাদ পরিচিত হয়। সে মতবাদ তারাই নিয়ে যায়, একসময় যারা বাগদাদে বসবাস করতেন। স্পেনের পণ্ডিতরাই দেখান, গ্রিক যুক্তিবিদ্যা মুসলিম প্রেক্ষাপটে দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে সহযোগিতা করতে পারে। প্রথম দার্শনিক মুহম্মদ বিন মাসাররা আল জাবালি তাদের মধ্যে একজন। জাবালির পিতা বসরা থেকে কর্ডোবা যান। সঙ্গে নিয়ে যান বিপুল বই। কর্ডোবায় মুতাজিলা চিন্তার প্রবেশ প্রাচীন গ্রিক চিন্তাধারার প্রসার ও পরিবর্ধনে নতুন প্রাণ দিলেন যেন। বাগদাদ যেমন খলিফা আল মামুনের আমলে ঝকমক করে উঠেছিল, কর্ডোবায় তেমনটাই পেয়েছিল তৃতীয় আবদুর রহমান এবং দ্বিতীয় হাকিমের আমলে। আবদুর রহমান নিজে বিদ্বান ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। স্পেনীয় সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন বহু সংস্কৃতির সমাবেশকে। ফলে দ্রুত শুরু হয়েছে আরবি ভাষায় জ্ঞানচর্চার বহুমাত্রিক উদ্যোগ। এমনকি তরুণ খ্রিস্টানরাও আরবি ভাষা ও কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। রচনা ও অনুবাদ করতে শুরু করে দার্শনিক প্রবন্ধ। নতুন এ প্রজন্ম পরিচিত হতে থাকলেন মোজারেব নামে। এদিকে ভিজিগথ আমলে আন্দালুসিয়ার ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন চলেছে। মুসলিম আমলেও ইহুদিরা ছিল কর্ডোবার বড় অংশজুড়ে। নতুন শাসনে তারা স্বাধীনতা পেয়ে জ্ঞানচর্চায় নিজেদের লিপ্ত করে। একদিকে বাগদাদ ও কায়রো থেকে আসা পণ্ডিত ও অন্যদিকে স্পেনের মুগ্ধ তরুণ ইহুদি ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী অনুবাদে যুক্ত হয়। নবম শতক থেকেই অনুবাদ বাড়তে থাকে। অ্যারিস্টটল, প্লেটো, টলেমি, গ্যালেন ও ইউক্লিডসের বইয়ের ব্যাখ্যা হতে থাকে। কর্ডোবায় তখন স্বর্ণযুগ, লাইব্রেরিতে বেশুমার বই। ধনী মানুষ বাজারে বই কিনতে বের হয়। নিজেদের তাক সাজিয়ে রাখে। আব্বাস ইবনে নাসিহ মিসর ও ইরাক থেকে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের জন্য কর্ডোবায় বই নিয়ে এসেছিলেন।
কর্ডোবার জ্যোতির্বিদ্যাকে এগিয়ে নেন আল মাজরিতি। মাজরিতি বড় পরিসরে টলেমি থেকে প্রভাবিত ছিলেন। তিনি টলেমির আলমাজেস্ট সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রাখতেন। অনুবাদ করেন তার লেখা প্লানিসফেরিয়াম। অনুবাদের আরবি কপি পরে হারিয়ে গেছে যদিও, কিন্তু সে আরবি থেকে যে লাতিন অনুবাদ হয়, তা টিকে আছে। তিনি ও তার ছাত্র আল সাফার অ্যাস্ট্রোল্যাব নিয়ে গবেষণা করেন, পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত তা ব্যবহার হতো। তার ছাত্র আল সামিহ ইউক্লিডের ইলিমেন্ট বইয়ের ব্যাখ্যা লিখেন। মাজরিতির চারপাশে বেশ কয়েকজন চিন্তক ও পণ্ডিত ঘিরে ছিল। তারা প্রভাব বিস্তার করেন। তার পরবর্তী প্রজন্মের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সে সময় বড় পরিসরে টলেমি ও তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।
ইহুদি পণ্ডিত হাসদাই ইবনে শারপ্রুত প্রথম জীবনে দরবারি চিকিৎসক ছিলেন। তিনি আবদুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি ইউরোপীয় জ্ঞানের সঙ্গে কর্ডোবার জ্ঞানের সমন্বয়ে ভূমিকা রাখেন। পুরনো আরবি অনুবাদও সংগ্রহ করতে থাকেন। বাগদাদে বসে হুনায়ন ইবনে ইসহাক বেশকিছু গ্রিক পুস্তকের আরবি অনুবাদ করেন। সেগুলোও পৌঁছে যায় কর্ডোবায়। তারা অনুবাদের কাজ শুরু করেন। সুবিধার জন্য রাজকীয়ভাবে যোগাযোগ করা হয় বাইজেন্টাইনের সঙ্গে। সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে বাইজেন্টাইনের মঙ্ক নিকোলাস পর্যন্ত অনুবাদের জন্য সচেষ্ট হন। ক্রমে দীর্ঘ গ্রিক রচনা কর্ডোবায় অনূদিত হয় আরবিতে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে পুস্তকগুলো কর্ডোবায় প্রাপ্ত আরবি থেকেই ফ্রেন্স, ইতালীয়, জার্মান, ইংরেজি ও স্প্যানিশে অনূদিত হয়। সেখানে ছিল সব ধরনের বই। উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে কর্ডোবা যুগের প্রধান রচনা ডি ম্যাটারিয়া মেডিকা। আন্দালুসিয়ান পণ্ডিতরা প্রায় তিন হাজার উদ্ভিদের নাম ও তাদের বৈশিষ্ট্য পুস্তকটিতে সংকলন করেছেন। একইভাবে হিপোক্রেটাস ও গ্যালেনের রচনা অনূদিত হতে থাকে। কর্ডোবার দুই ভাই উমর ও আহমাদ কর্ডোবা ছেড়ে বাগদাদে গিয়ে ১০ বছর বসবাস করেছেন কেবল গ্যালেন ও পড়ার জন্য। তারা পড়াশোনা করেন বাগদাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানী সাবিত ইবনে সিনানের তত্ত্বাবধানে। তারা পরে কর্ডোবায় ফিরে দরবারি চিকিৎসকে পরিণত হন এবং খ্যাতি অর্জন করেন। আবুল খালাফ ইবনে আব্বাস আল জাহরাভি চিকিৎসাশাস্ত্রের এক মহীরুহ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তার লেখা কিতাব আল তাসরিফ ইউরোপে শতাব্দীর পর শতাব্দী পঠিত হয়েছে। কিতাব আল তাসরিফের অবস্থান ছিল আল-রাজির লেখা হাওয়ি ও ইবনে সিনার লেখা কানুন ফিত তিব্বি বইয়ের পাশে।
খলিফা হাকিম ৯৬১ সালে মসনদে আসীন হন। তিনি রাজকীয় লাইব্রেরির সংস্কার করেন। তার ভাইয়ের সংগ্রহ তত্ত্বাবধানেই কাজ করত ৫০০ মানুষ। লাইব্রেরিয়ান প্রায় চার লাখ বই ক্যাটালগ করেছেন। তিনি ৪০৪ খণ্ডের সিরিজই তৈরি করেন বইয়ের নাম আর বিবরণ লিখে। অন্য লাইব্রেরিগুলোয়ও ছিল বিপুল পরিমাণ বই। এটা বেশ বিস্ময়ের যে কর্ডোবায় লিপিকার হিসেবে একটা স্বতন্ত্র পেশা ব্যাপক প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন বই লিপি করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। প্রতি বছর ৭০-৮০ হাজার বই তৈরি হতো। সে সময়ের ইউরোপের সবচেয়ে বড় বইয়ের বাজার ছিল কর্ডোবা।
যতটা উজ্জ্বল ছিল কর্ডোবার আলো, ততটাই দ্রুত নিভে যেতে থাকে। আল হাকিম ৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন, সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হতে থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা। টলেমি, গ্যালেন ও ইউক্লিডের লেখাপত্রও পরবর্তী শাসকদের রোষানলে পড়ে। কর্ডোবার চিন্তকরা চলে যেতে থাকেন সেভিল, গ্রানাডা, সারাগোসা ও টলেডোর দিকে। কর্ডোবায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলা জারি হয়েছে, তার যাত্রা থেমে যায়নি। দ্বাদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়ায় দুজন চিন্তক জন্ম নেন, প্রথমজন ইবনে মায়মুন ও দ্বিতীয়জন ইবনে রুশদ। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের অ্যারিস্টটলীয় জ্ঞানের উদ্ধারে ভূমিকা পালন করেছেন। তারা দুজনেই আলোকিত হয়েছেন কর্ডোবার আলো থেকেই।
ক্রমে খ্রিস্টানরা দখল করে নিতে থাকে আন্দালুসিয়া। ১৪৯২ সালে শেষ রাজ্য গ্রানাডাও হাতছাড়া হয়। মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় স্পেনের মাটি থেকে। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যায় অনেক জ্ঞানী। কিন্তু ততদিনে ইউরোপও এগিয়েছে। তারা আরবি থেকে লাতিন ও লাতিন থেকে ইউরোপের অন্য ভাষায় অনূদিত করে ধ্রুপদি জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ইউরোপে শুরু হয় আলোকায়ন পর্ব। ইউক্লিডের ইলিমেন্টস, টলেমির আলমাজেস্ট ও গ্যালেনের লেখাপত্র কর্ডোবায় এসেছিল প্রাচ্য থেকে। তার বড় অংশ টলেডোতে চলে যায়। পরে সেগুলোই লাতিনে অনূদিত হয়। এভাবে ধ্রুপদি জ্ঞানের আলো আরবদের হাতে লালিত হয়ে ইউরোপেরে আলোকায়নকে সম্ভব করে তুলল।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








