রাফায়েল যখন স্কুল অব এথেন্স ফ্রেস্কো তৈরি করেন, তখন রোমে রেনেসাঁ চলছে পুরোদমে। চিত্রকর্মে হাজির থাকা ৫৮ জন ব্যক্তির দর্শন ও সংস্কৃতি কমবেশি গ্রিক। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল ফ্রেস্কোর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন। প্লেটো আকাশের দিকে ইশারা করছেন আর অ্যারিস্টটল পৃথিবীর দিকে। অন্য অধিকাংশের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত নয়। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয় সামনে ডান দিকে জ্যামিতিক তত্ত্ব বোঝাচ্ছেন ইউক্লিড এবং তার পাশে মুকুটধারী ব্যক্তি টলেমি। চিত্রিত সব ব্যক্তিরা রাফায়েলের সময়ের অন্তত হাজার বছর আগে বেঁচে ছিলেন। ফ্রেস্কোর বাঁ দিকে একজন পাগড়িধারী ব্যক্তি পিথাগোরাসের কাঁধের ওপর ঝুঁকে তার লেখা দেখছেন। তিনি হলেন মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও রাফায়েলের সময়ের মধ্যে হাজার বছরের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র ব্যক্তি। এ সময়ে আরবরা পৃথিবীর বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির পুস্তক আরবি ভাষায় রচনা করে গ্রিক জ্ঞানের অগ্রগতিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন।
গণিতে ইউক্লিড, জ্যোতির্বিদ্যায় টলেমি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্যালেন ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তারা নিজ নিজ বিষয়ের কাঠামো ও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেছিলেন। রেনেসাঁ যুগে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালির সালের্নোতে আনা হয় গ্যালেনের লেখা, আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ করা হয়। পালেরমোতে আনা হয় টলেমি ও ইউক্লিড। ক্রুসেডের সময় সিরিয়া থেকেও উদ্ধার হয় হারিয়ে যাওয়া ধ্রুপদি জ্ঞান। এভাবে গ্রিক ভাষা থেকে বিলুপ্ত হওয়া সে জ্ঞান লালিত ও পরিপুষ্ট হয়েছে বাগদাদ, কর্ডোবা ও কায়রোর মতো শহরে। তারপর সম্ভব করেছে ইউরোপের আলোকায়নকে। মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবনের আগে প্রতিটি পুস্তকই হাতে লেখা হতো, তাই প্রতিটি অনুলিপি আলাদা ছিল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ভুল নিয়ে। জটিল পাঠ্য ঐতিহ্যের গবেষণা ইতিহাসের একটি আলাদা শাখা। কীভাবে মানুষ গ্রহ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছিল, কীভাবে তারা তাদের তত্ত্বগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করেছিল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করেছিল, তা আবিষ্কার রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধকর।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে ভূমধ্যসাগরীয় দুনিয়া ছিল অন্য রকম। রোমে তখন অস্ট্রোগোথিক রাজা। কনস্টান্টিনোপলের বসফরাসের তীরে চেষ্টা করছেন রোমের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের। পারসিক সম্রাট পরিকল্পনা করছেন সীমান্তে চলমান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপের। বলতে গেলে পরিবর্তন, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ দুনিয়া। নগরীগুলো সংকুচিত হচ্ছে, সঙ্গে পুড়ছে গ্রন্থাগারগুলো। পরিস্থিতি জ্ঞান সংরক্ষণ বা জ্ঞান অন্বেষণের পক্ষে সহায়ক ছিল না। ফলে প্রাচীন সংস্কৃতির বিশাল অংশগুলো সময়ের দীর্ঘ যাত্রায় হারিয়ে গেছে। এস্কাইলাসের ৮০টি নাটকের মধ্যে টিকে আছে মাত্র সাতটি, সফোক্লিসের ১২০টির মধ্যে সাতটি ও ইউরিপিডিসের ৫২টির মধ্যে ১৮টি টিকে আছে বর্তমানে। হারিয়ে গেছেন আরো অনেক লেখক।
পঞ্চম শতাব্দীর শেষদিকে স্টোবাইউস নামে এক ব্যক্তি ১ হাজার ৪৩০টি কবিতা ও গদ্য উদ্ধৃতির একটি বিশাল সংকলন তৈরি করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৩১৫টি কাজ এখনো বিদ্যমান। বাকি সব হারিয়ে গেছে। বিজ্ঞান কিছুটা ভালো অবস্থায় ছিল, তবু গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো যেমন গ্যালেনের On Demonstration, থিওফ্রাস্টাসের On Mines ও আরিস্টার্কাসের হেলিওসেন্ট্রিক তত্ত্ব নিয়ে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে। ইউক্লিড, টলেমি ও গ্যালেনের লেখাগুলোর টিকে থাকা পাঠগুলো কয়েক হাজার বছরের চর্চার ফল। তাদের ধারণাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের লেখক ও অনুবাদকদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। আরব বিশ্বের পণ্ডিতদের দ্বারা রূপান্তর ও প্রসারিত হয়েছিল।
সম্রাট ডোমিটিয়ান পুড়ে যাওয়া গ্রন্থাগারগুলো ঠিক করার জন্য প্রচুর চেষ্টা ও অর্থ ব্যয় করেছেন। হারিয়ে যাওয়া বইগুলো খুঁজে বের করেছেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় লেখকদের পাঠিয়েছিলেন সেগুলোর অনুলিপি ও সংশোধন করার জন্য। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের যা অবশিষ্ট ছিল, তা ছিল অনেকটা সংকুচিত অবস্থায়। সম্রাট আনাস্তাসিয়াসের রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল। পূর্ব ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের বিভাজন তখন স্পষ্ট। বাইজেন্টাইন সম্রাট আশা করেছিল তারা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অন্তত কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই তার সব অর্জন হারিয়ে যায়। ষষ্ঠ শতাব্দীর খ্রিস্টধর্ম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মগুলো হাঁটছিল বিলুপ্তির পথে।

চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে ভূমধ্যসাগরের চারপাশে বই উৎপাদন কমে গিয়েছিল। বড় শহরগুলোয় কিছু বাণিজ্যিক বই উৎপাদন অব্যাহত ছিল। তবে সেটা আগের তুলনায় অনেক ছোট আকারে। অধিকাংশ বই ব্যক্তিগতভাবে অনুলিপি করা হতো। ধর্মনিরপেক্ষ বই উৎপাদন প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। বিপরীতে মঠের ধর্মীয় লেখা ব্যাপকভাবে বাড়ে। নতুন নতুন ধর্মীয় সাহিত্য প্রচলিত হয়। ক্যাসিওডোরাস ইতালির দক্ষিণ উপকূলে পারিবারিক ভিটায় ভিভারিয়াম নামক একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেখানে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ধ্রুপদি পাঠক্রমের বিভিন্ন বিষয় যেমন বক্তৃতা, যুক্তিবিদ্যা, গাণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা ও সংগীত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভিভারিয়ামে সঠিক মান ও পদ্ধতি অনুসরণ করে পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শুরু হয়, যা পরে মধ্যযুগের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি গঠন করে। ক্যাসিওডোরাস ও বোয়েতিয়াস ছিলেন সে সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট পণ্ডিত। বোয়েতিয়াস ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি গ্রিক গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে প্রাচীন জ্ঞানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বন্দি হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। যদিও ক্যাসিওডোরাস গ্রন্থ উৎপাদন এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে শিক্ষার বৃহৎ অংশটি মঠের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ধর্মীয় পাঠক্রমই প্রধান হয়ে ওঠে।
পঞ্চম শতাব্দীর আগে ‘কোডেক্স’ বা বইয়ের প্রচলন তেমন দেখা যায়নি। এটি প্যাপিরাসের পরিবর্তে পার্চমেন্ট (প্রক্রিয়াজাত পশুর চামড়া) থেকে তৈরি হতো। মুসলিম বিশ্বে কাগজকলগুলো কয়েক শতাব্দী আগেই প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য পশ্চিম ইউরোপে এগুলো চতুর্দশ শতাব্দীর আগে পৌঁছায়নি। প্যাপিরাস কয়েক শতাব্দীর জন্য টিকে থাকতে পারে, তবে এটি নিয়মিত কপি করতে হতো। পার্চমেন্ট টিকিয়ে রাখার জন্য সঠিক পরিবেশে রাখা হতো। মুক্ত থাকতে হতো আর্দ্রতা, পোকামাকড় বা আগুন থেকে। এভাবে প্রতিটি গ্রন্থের ভাগ্য নির্ধারণ হতো লাইব্রেরির বাইরে বা ব্যক্তিগত বাড়িতে যা ঘটছে, তার ওপর। প্রাচীন যুগে রাজনীতি, সমাজ ও ধর্মীয় জীবন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যা প্রভাব ফেলেছিল জ্ঞানের সংরক্ষণে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ধীরে ধীরে জনসাধারণ থেকে সরিয়ে মঠের নিঃশব্দ পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পারগামনে আসক্লেপিয়াসের মন্দিরে প্রাচীন গ্যালেন তার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সে শহরে দুই লাখের মতো বইয়ের একটি লাইব্রেরিও ছিল। আর্দ্রতা রোধ ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছিল। পারগামনের পতন তৃতীয় শতাব্দীতে ভূমিকম্প ও গথ আক্রমণের মাধ্যমে ত্বরান্বিত হয়েছিল। খ্রিস্টধর্ম শহরে আগমন ঘটানোর পর অনেক গির্জার নির্মাণ শুরু হয়। এফেসাস ছিল একটি সমৃদ্ধ বন্দর শহর, যেখানে অবস্থিত বিখ্যাত আর্তেমিসের মন্দির ছিল প্রাচীন পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের মধ্যে একটি। ১১৭ খ্রিস্টাব্দে রোমান সিনেটর সেলসাসের সম্মানে সেখানে একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। চমৎকার ভবনটি ১২ হাজার স্ক্রল ধারণ করতে সক্ষম, যা আলেকজান্দ্রিয়া ও পারগামন ছাড়া তৃতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ ছিল। ২৬৮ খ্রিস্টাব্দে গথদের আক্রমণে ভেতরের অংশটি ধ্বংস হয়ে গেল, তবে এর মহিমান্বিত বাহ্যিক অংশটি দশম শতাব্দী পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল।
গ্রেকো-রোমান ঐতিহ্য থেকে হারিয়া যাওয়া জ্ঞান রেনেসাঁর ইউরোপে ফিরে আসে। এ দীর্ঘ সময়ে ধ্রুপদি জ্ঞান সংরক্ষণ করেছে আলেকজান্দ্রিয়া, বাগদাদ, কর্ডোবা ও টলেডোর মতো শহর। গ্রিক ভাষা থেকে বিলুপ্ত হওয়া জ্ঞান আরবি ও লাতিন ভাষায় ঘুরেফিরে এসেছে। মানবজাতির জ্ঞানচর্চার ইতিহাস যেন এক দীর্ঘ সমুদ্র সফরের মতো। এ শহরগুলো বাতিঘর হিসেবে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক








