গ্রেকো-রোমান আমলের ধ্রুপদি জ্ঞান আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে আলোকিত করেছিল বাগদাদ ও কর্ডোবাকে। সেখানকার পণ্ডিতদের যত্নে নেয় পরিমার্জিত ও বিবর্ধিত রূপ। শহরগুলোর রাজনৈতিক পতনের পর কিন্তু সে আলো নিভে যায়নি। তলেদো, সালেরনো ও পালেরমো হয়ে ভেনিসকে সমৃদ্ধ করেছে। শুরু করেছে ইউরোপের রেনেসাঁ পর্ব। হারিয়ে যাওয়া গ্যালেন, টলেমি ও ইউক্লিডের উত্তরাধিকার সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

কর্ডোবার বৌদ্ধিক তৎপরতা যখন সংকুচিত হয়ে আসছিল, সেখানকার চিন্তকরা চলে যেতে থাকেন সেভিল, গ্রানাডা, সারাগোসা ও তলেদোর দিকে। ক্রমে ক্যাথলিক শাসনে আবদ্ধ হয় আন্দালুসিয়া। তারা আরবি থেকে প্রথমে লাতিন ও লাতিন থেকে ইউরোপের অন্য ভাষায় অনূদিত করে ধ্রুপদি জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ইউক্লিডের এলিমেন্টস, টলেমির আলমাজেস্ট ও গ্যালেনের লেখাপত্র কর্ডোবায় এসেছিল প্রাচ্য থেকে। তার বড় অংশ তলেদোতে চলে যায়। নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠে সালেরনো ও পালেরমো। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতেই সে আলো পরিণত রূপ লাভ করে।

১৫০০ সালের দিকে বৈশ্বিক জ্ঞানের প্রেক্ষাপটে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটে। ততদিনে শহরগুলো উঠে দাঁড়িয়েছে। সবার জন্য না হলেও স্কুল, গৃহশিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধনী ও আগ্রহী তরুণ, এমনকি কয়েকজন নারীর জন্যও শিক্ষার ঐতিহ্য চালু হলো। মুদ্রণযন্ত্র যোগাযোগে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ১৫০০ সালের মধ্যে ইউরোপের ২৮০টি শহরে মুদ্রণযন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রায় দুই কোটি বই উৎপাদন করেছে। এভাবে জ্ঞান হয়ে গেল আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সস্তা ও সহজলভ্য।

নতুন সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ ইউরোপের জন্য নতুন দুনিয়া উন্মোচন করে। পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ইংল্যান্ডের শহরগুলোয় মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে এল জ্ঞানীয় বিপ্লব। মুসলিম বিশ্ব এ নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সন্দিহান ছিল। মুদ্রণযন্ত্রকে গ্রহণ করতে তাদের কয়েক শতাব্দী লেগেছিল, যার ক্ষতি ছিল ব্যাপক।

ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় এ সময়ের বড় দিকটা ছিল পূর্ববর্তী জ্ঞানের পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতা আবিষ্কার। আন্দ্রেয়াস ভেসেলিয়াস তার গ্যালেনিক উপলব্ধি করেন, কিংবদন্তি চিকিৎসক গ্যালেন ভুল হতে পারেন। তার নিজস্ব শারীরস্থান জ্ঞান গ্যালেনের চেয়ে উন্নত ছিল। ভেসেলিয়াস ১৫৪৩ সালে তার গবেষণা প্রকাশ করেন De humani corporis fabrica শিরোনামে। এটি বৈজ্ঞানিক মুদ্রণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল। রবেলাইস ১৫৩২ সালে হিপোক্রেটিক পাঠ সম্পাদনা করেন। কোপারনিকাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল একদম ভিন্ন। তার লেখা De revolutionibus কখনই বেস্টসেলার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কোপারনিকাস টলেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কয়েক দশক অধ্যয়ন করেন। কোপারনিকাস গির্জার একজন ক্যানন ছিলেন, সমস্যাটি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার পদ্ধতি ছিল বিপ্লবী। তিনি টলেমির মহাবিশ্বটি পুরোপুরি পুনর্গঠন করেছিলেন। কোপারনিকাস তার নতুন মহাজাগতিক ব্যবস্থায় টলেমির জ্যামিতিক পরিকল্পনা ধরে রেখেছিলেন, যা গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা প্রদান করেছিল। সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব মানবতার স্থানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছিল; এটি মেনে নেয়ার জন্য বিশাল মানসিক ও আবেগিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন ছিল, যা রাতারাতি সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি তৎকালীন ধর্মীয় শিক্ষার বিরোধিতা করেছিল। বিপ্লবী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো ক্রমে পরিবর্তন শুরু করে পরে ধীরে ধীরে পরীক্ষা পরিমার্জনা ও দীর্ঘ সময়ের মধ্যে গৃহীত হয়। ইউরোপীয় জ্ঞানীয় যাত্রায় পরবর্তী পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন জোহানেস কেপলার। তিনি টাইকো ব্রাহের ডাটা ব্যবহার করে টলেমির বৃত্তাকার কক্ষপথে গ্রহের নিয়মিত গতির তত্ত্ব পরিত্যাগ করে উপবৃত্তাকার গতি মেনে নেন। এটি সৌরজগতকে বোঝার ক্ষেত্রে বিশাল অগ্রগতি।

রেনেসাঁর সময়ে প্রত্যেকটি শহরের নিজস্ব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র ছিল। তবে এগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় ছিল, যা বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও গবেষণার বিকাশ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও পাঠ্য সরবরাহ এবং মেধাবী ও উৎসাহী ব্যক্তিদের দল নিবিষ্ট থেকেছে জ্ঞানচর্চায়। বিভিন্ন জাতীয়তা ও ধর্মের প্রতি সহনশীলতার পাশাপাশি ছিল অন্তর্ভুক্তির পরিবেশ। এ ধরনের সহযোগিতা ছিল বিজ্ঞান বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি না থাকলে অনুবাদ, জ্ঞানের সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করা এবং এক ঐতিহ্যের ধারণাকে অন্যের সঙ্গে একীভূত করার কোনো সুযোগ থাকত না। যারা এ সহযোগিতাকে সম্ভব করেছিলেন, তারা ছিলেন এ কাহিনীর নায়ক, তারা ছিলেন সেসব মানুষ, যারা অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, অসাধারণ ধারণা এবং তত্ত্বগুলো আবিষ্কার, সংরক্ষণ ও প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

বাগদাদের জ্ঞানাগার বা সালেরনোর মেডিকেল স্কুলের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই বর্তমানে। অন্যান্য শহরে শুধু ধূলিধূসরিত ধ্বংসাবশেষ বা ছায়াচ্ছন্ন ক্যাথেড্রাল প্রাঙ্গণগুলো রয়ে গেছে। এমনকি ভেনিসের ঐতিহ্যও ম্লান। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের বাইরে সেসব নগরীর জ্ঞানচর্চা আজকের দিন পর্যন্ত সভ্যতাকে টেনে এনেছে। সে সময় বিভিন্ন স্থানে সংগৃহীত ও পড়া হয়েছিল রাজকীয় গ্রন্থাগার, ক্যাথেড্রাল চ্যাপেল, শ্রেণীকক্ষ, উদ্যান ও পর্যবেক্ষণাগারে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানমন্দির নির্মাণ হয়েছিল, উদ্যানগুলোয় বোটানিক্যাল বাগান রোপণ করা হয়েছিল, বক্তৃতা হল ও গ্রন্থাগারগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তবে তারা সাধারণত শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্র ছিল না। পণ্ডিতরা নিজেদের গবেষণার কেন্দ্র স্থাপন করেছিল। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের বড় বড় অগ্রগতি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তিগত স্থানে ঘটেছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব যখন গতি লাভ করছিল, তখন সহযোগিতা সহজতর করার জন্য প্রতিষ্ঠান ও সমাজ গড়ে উঠেছিল এবং সেগুলো বিকাশমান বৈজ্ঞানিক শাখাগুলোর সরকারি আস্তানায় পরিণত হয়েছিল। একটি বইয়ের সংগ্রহ প্রায়ই এমন জায়গাগুলোর কেন্দ্রে ছিল এবং কিছু সংগ্রহ এত বিখ্যাত ছিল যে তারা অবাধে গবেষণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছিল। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্যালেনিক চিকিৎসাশাস্ত্র ও টলেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক দিক অবমূল্যায়িত এবং প্রতিস্থাপিত হয়, কিন্তু ইউক্লিডের ক্ষেত্রে এটি কখনো ঘটেনি। Elements ছিল মৌলিক গণিতের পাঠ্যপুস্তক, যা সব প্রধান ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত ও ছাপা হয়েছিল।

ভাষার ব্যবহার বাড়লেও জ্ঞানী সমাজের সর্বজনীন ভাষা হিসেবে লাতিনের অবস্থান অটুট ছিল দীর্ঘদিন। অনেকে আশা করেছিলেন গ্রিক ভাষায় মুদ্রণ জনপ্রিয় হবে, কিন্তু যথেষ্টসংখ্যক লোক গ্রিক ভাষা জানত না, ফলে বেশির ভাগ ছাপাখানার জন্য এটি বাণিজ্যিকভাবে সম্ভবপর ছিল না। বই বিক্রির অবকাঠামোর উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বই সংগ্রহ করা সহজতর হয়ে ওঠে, ফলে জ্ঞানের বিনিময়ও সহজ হয়। যখন মুদ্রিত পৃষ্ঠা ক্রমাগতভাবে নাজুক পাণ্ডুলিপির জায়গা নিতে শুরু করে, তখন জ্ঞান আরো মানসম্পন্ন ও নির্ভুল হতে থাকে। এছাড়া গ্রন্থসূচি, বিষয়সূচি, চিত্র, চিত্রণ ও টীকা—পাঠ্য বিষয়বস্তুগুলোর সংযোজন জ্ঞানকে আরো সহজলভ্য করে তোলে, সে ধারাবাহিকতা আজও দৃশ্যমান।

রেনেসাঁ যুগের আবিষ্কারগুলো পূর্ববর্তী শতাব্দীর চিন্তা, অনুসন্ধান ও লেখার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যা ধারাবাহিকভাবে জ্ঞানের প্রবাহ তৈরি করেছিল। পৃষ্ঠায় বন্দি হওয়া এ বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ এবং বিভিন্ন সময়ে আলোকিত করেছিল। একবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিকোণ থেকে পেছনে তাকালে দেখা যায় এ জ্ঞানের উত্থান-পতন, দ্রুততার ও স্থবিরতার সময় যে ধারণাগুলো প্রত্যাখ্যাত এবং হারিয়ে গিয়েছিল, আবার কয়েক শতাব্দী পরে পুনরাবিষ্কৃত ও পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। এ পথ সহজ কিংবা সোজা ছিল না। সাম্প্রতিক শতাব্দীতে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে রূপান্তর করেছে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে একজন ডাচ চশমা প্রস্তুতকারক ও তার পুত্র একটি বৃত্তাকার নলকের মধ্যে আবদ্ধ করে প্রাথমিক মাইক্রোস্কোপ তৈরি করেন। ১০০ বছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী আন্তোনি ভ্যান লিউয়েনহুক ধারণাটি গ্রহণ করেন এবং প্রথম কার্যকর মাইক্রোস্কোপ তৈরি করেন। তিনি ৫৫০টি পৃথক লেন্স তৈরি করেন এবং একটি নলকের মধ্যে স্থাপন করেন; এটি ২৭০ গুণ বাড়ানোর ক্ষমতা দেয়, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মাইক্রোব, খামিরে বুদবুদ ও রক্তকণিকাগুলো দেখতে পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেই সম্প্রতি আবিষ্কৃত টেলিস্কোপটি গ্রহণ করেন, সেটিকে অভিযোজিত করেন এবং রাতের আকাশের দিকে নির্দেশ করেন। তার দীর্ঘকালের তারাবাজির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষের চোখের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব হয় এবং মহাবিশ্ব নিজেকে আরো বিস্ময়কর বিশদে প্রকাশ করে। এরপর থেকে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী যন্ত্র আমাদের মহাকাশের ঠাণ্ডা অন্ধকারে এবং চাঁদ ও গ্রহগুলোর পৃষ্ঠে আরো গভীরে দেখতে সাহায্য করেছে। এ উদ্ভাবন পর্যবেক্ষণের ক্ষমতাকে ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ায়। কিন্তু যত বেশি আমরা দেখি, তত বেশি প্রকাশিত হয়। মানবসভ্যতায় জ্ঞানচর্চা এগিয়ে চলছে, সে সফরে আলেকজান্দ্রিয়া, বাগদাদ, কর্ডোবা, তলেদো, সালেরনো ও ভেনিসের পৃথক পৃথক অংশ রয়েছে। যেন জ্ঞানের যাত্রায় শহরগুলো একেকটা স্টেশন। মানবসভ্যতার একেকটা বাতিঘর।

আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা