ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ চলছে খাবার নিয়ে। জানতে চাওয়া হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত। তিনি বললেন, ‘আমি কখনো এর ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবিনি, তবে সব মিলিয়ে আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে তিনটি ভালো জিনিস পেয়েছি। প্রথমত, ইংরেজি সাহিত্য। তাদের শেকসপিয়ার, মিল্টন, বেকন, স্যার ওয়াল্টার স্কট এবং অন্যান্য যে সাহিত্য আমরা পেয়েছি, তা ছোট নয়। দ্বিতীয়ত—বরফ। গরমের দিনে বরফের টুকরো দেয়া পানির পাত্র যে প্রশান্তিদায়ক এবং তৃতীয়ত—রুটি।’ তার বক্তব্য শুনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন। সাহিত্যের সঙ্গে বরফ ও রুটির তুলনা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তবে তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, ‘তোমরা হাসতে পারো! কিন্তু বলো তো আমাদের দেশে এমন রুটির মতো কিছু ছিল কি? দুধের সঙ্গে এক টুকরো রুটি শুধু পেট ভরায় না, এটি রোগও দূর করে। আমি মনে করি, তারা আমাদের যে নতুন খাবারগুলো খেতে শিখিয়েছে, তার মধ্যে রুটি সর্বশ্রেষ্ঠ।’
বিদ্যাসাগর প্রতি রাতে দুধ ও রুটি খেতেন। সে সময় রুটি এখানকার খাদ্য সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯১০ সালে চুনীলাল বোসের মতো লেখকরা রুটিকে একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। যদিও ১৮৯৯ সালে স্বামী বিবেকানন্দ ‘দি ইস্ট অ্যান্ড দি ওয়েস্ট’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধে রুটি খাওয়ার নিন্দা করেছিলেন। তিনি সেখানে অভারতীয় ও অস্বাস্থ্যকর হিসেবেই দেখেছেন। তাকে অনুসরণ করেই ১৯০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কর্মফল’ গল্পে ইউরোপীয় আচার-আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস অনুকরণের সমালোচনা করেছিলেন। গল্পের প্রধান চরিত্র সতীশ ইউরোপীয় কায়দায় রুটি ও বিস্কুট খায়। ফলে একটা প্রশ্ন তৈরি হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বাংলায় রুটির আগমন কীভাবে। বিদ্যাসাগর যে রুটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা সম্ভবত ডবল রুটি। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশদের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ডবল রুটির ইতিহাস। ফরাসি কিংবা পর্তুগিজদের সঙ্গে যুক্ত পাউরুটির গল্প। নানরুটির ইতিহাস মধ্য এশিয়া থেকে মুসলিম শাসকদের আগমনের সঙ্গে।
প্রসঙ্গক্রমে পারসিক কবি হাফিজের গল্প সামনে আনা যেতে পারে। হাফিজ দিনে বেকারিতে কাজ করতেন আর রাতে করতেন পড়াশোনা। তিনি জীবিত থাকতেই কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সমকালীন দুনিয়ায়। তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের সঙ্গে। হাফিজ তাকে উপঢৌকন হিসেবে লেখাও পাঠান। কবি হাফিজের রুটি তৈরি ও বাংলায় সুলতানের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা একটি বিশেষ দিক সামনে আনে। প্রথমত, মধ্য এশিয়া থেকে বাংলায় আসা সুলতানদের খাদ্যাভ্যাস। মধ্য এশিয়ার খাদ্যাভ্যাসে রুটি থাকার খবর হাফিজের শতবর্ষ আগে উমর খৈয়ামও বলে গেছেন নিজের কবিতায়। আফগান, তুর্কি, পারসিক ও আরবদের খাদ্যাভ্যাসে রুটি থাকার প্রমাণ পুরনো। অন্যদিকে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে আসা সুফিদের ভূমিকা প্রমাণিত। খাবার হিসেবে তুলনামূলক সহজ ও কম পচনশীল হওয়ায় ইবাদতপ্রেমী সুফিরা রুটিকে অগ্রাধিকার দিতেন। এভাবে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যাস ও সুফিদের অগ্রাধিকার নিয়েই বাংলায় রুটির বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শবে বরাতকে রুটি-তাওয়া বলা হয়। তাওয়া ফারসি শব্দ। রুটির সঙ্গে ভারত ও মধ্য এশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস খুঁজতে গেলে ইন্দো-পারসিক কবি আমির খসরু প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। খসরুর বিখ্যাত স্মৃতিকথায় নান-ই-তুনুক ও নান-ই-তানুরি শব্দ উদ্ধৃত আছে। প্রথমটির মানে হালকা রুটি এবং দ্বিতীয়টি তন্দুর। সুলতানি ও মোগল আমলে অভিজাতরা কাবাব ও কিমা দিয়ে নান খেতেন সকালে। মোগল আমলে নান তৈরির শিল্প ছিল একটি সম্মানজনক দক্ষতা, যা কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
রুটি শব্দটি সংস্কৃত। উৎস যেখানেই হোক, ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ ভারতে রুটির ইতিহাসকে আরো পেছনে নিতে চান। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা ছিল কৃষিপ্রধান। অর্থাৎ তাদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ এবং কৃষিপণ্য। বিশেষ করে হরপ্পার অধিবাসীরা গম, বাজরা ও শাকসবজি চাষ করত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রমাণ মেলে গমভিত্তিক এক ধরনের সোজা রুটি তৈরির। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় রুটি খাওয়া হতো, সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে তাদের সংযোগ ও খাদ্যাভ্যাসে রুটি থাকা অসম্ভব না। ষোড়শ শতাব্দীর আওয়াধী কবি তুলসিদাসের রচনায় রুটির কথা পাওয়া যায়। একই শতকের কবি ভবপ্রকাশের চিকিৎসা গ্রন্থেও রুটি শব্দের উল্লেখ আছে। দশম থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত কন্নড় সাহিত্যেও রয়েছে রুটি প্রসঙ্গ। রুটি ব্যবসায়ী এবং ভ্রমণকারীদের জন্য আদর্শ খাবার। কারণ এটি দীর্ঘ সময় ধরে তাজা থাকতে পারে। পেট পূর্ণ করে এবং মাংস, শাকসবজি ও তরকারি দিয়ে খাওয়া যায়। পাশাপাশি সহজে বহনযোগ্যও ছিল। মধ্য এশিয়ার দীর্ঘ বাণিজ্যপথ সিল্ক রোডের মাধ্যমে যখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য যুক্ত, তখন মুসাফির ও ব্যবসায়ীরা সঙ্গে খাবার বলতে রুটিই বুঝতেন। ভারত ও বাংলা অঞ্চল যেহেতু সিল্ক রোডের বাইরে ছিল না; ফলে এখানেও রুটির ইতিহাস অনেক পুরনো হওয়াই স্বাভাবিক।
আজকে যাকে পাউরুটি বলা হয়, তার ইতিহাস ভারতের জন্য চারশ বছরের বেশি না। এখানে পাউরুটির আগমন ঘটে ব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে। বিশেষ করে বাংলায় পাউরুটি আসে ফরাসিদের কল্যাণে। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চন্দননগরে ফোর্ট দ্য অরলিন্স স্থাপন করেছিল। সঙ্গে এনেছিল ফরাসি মদ ও পনির। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সাধারণ সাদা রুটি, যা বাংলায় পাউরুটি নামে পরিচিতি পায়। গোয়ায় যদিও দাবি করা হয় ‘পাউ’ শব্দটি পর্তুগিজ ‘পাঁও’-এর গোয়া সংস্করণ, বাংলায় সেটা ব্যতিক্রম। এখানে মনে করা হয় ফরাসি শব্দ ‘পাঁ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ রুটি। গোয়ায় রুটির পরিচয় ঘটে পর্তুগিজদের মাধ্যমে। উৎসটাই ভালোভাবে নথিভুক্ত। যেহেতু ময়দা ভারত বা গোয়ায় সহজলভ্য ছিল না, তাই পর্তুগিজরা আটা ব্যবহার করত। খামিরের পরিবর্তে তারা ব্যবহার করত টডি। টডি হলো গোয়া অঞ্চলের খেজুরের রস। আর টডি ব্যবহার করা হতো ফারমেন্টিং এজেন্ট হিসেবে। ওভেনের পরিবর্তে একটি গরম পৃষ্ঠযুক্ত যন্ত্র ব্যবহার করে রুটি বানানো হতো। ময়দা মেশানোর পর সেটি ফারমেন্ট হয়ে ফুলে উঠতে দেয়া হতো। তারপর সেটি গলিয়ে রোল বা গোল আকারে গড়ানো হতো। তারপর রাখা হতো কোনো গরম পৃষ্ঠের ওপর। সাধারণত ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে পাউরুটি হয়ে যেত। গোয়ার রুটি আজও আলাদা। এটি সাধারণ রুটির তুলনায় কম ফুলে ওঠে। খানিকটা আঠালোও থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগিজরা বিভিন্ন ধরনের রুটি তৈরি করেছে—পকেটের মতো পোই, শক্ত খোসাযুক্ত উন্ডো, রিং-আকৃতির কাকন এবং নরম বর্গাকৃতির কাট্রে পাউ। প্রচলিত এক গল্প থেকে জানা যায় যে পর্তুগিজ যাজক মিশনারিরা ক্যাথলিক গোয়ানদের জীবিকা নির্বাহের একটি উপায় হিসেবে রুটি তৈরি করা শেখানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম উপকূল ধরে যাত্রা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বর্তমান মুম্বাই পৌঁছায়। এর ফলাফল হিসেবে তৈরি হয়েছিল সেই পাউ, যা কিমা পাউ এবং বোম্বের বিখ্যাত ভাডা পাউতে ব্যবহৃত হয়। যেখানেই ঔপনিবেশিকরা বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছিল, সেই স্থানগুলোয় রুটির একটি সংস্করণ স্থানীয় হয়ে উঠেছিল। কানপুরে ১৭৭৩ সালে বানারস চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর ব্রিটিশরা একটি সামরিক ছাউনি এবং বাণিজ্য পোস্ট স্থাপন করে। তাদের সঙ্গে এল ডবল রুটি। ডবল রুটি এক ধরনের বানের রুটি। ডবল বলা হতো কারণ বেক করার সময় এটি আকারে দ্বিগুণ হয়ে যেত। একটি চ্যাপ্টা কাবাব সদ্য বেক করা বানের মধ্যে রাখা হয়, সঙ্গে থাকে সবুজ মরিচের চাটনি এবং আচারযুক্ত পেঁয়াজ। এটি ছিল বিদেশী ও ভারতীয় স্বাদের নিখুঁত সংমিশ্রণ এবং রান্নার এক অনন্য উদাহরণ।
সুলতানি, মোগল ও ঔপনিবেশিক আমল পার করে দক্ষিণ এশিয়ায় রুটি এখন অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও উত্তর ভারতের প্রদেশগুলোয় রুটি প্রধান খাবার। বিচিত্র উপাদানে তৈরি হয় বিচিত্র স্বাদের সব রুটি। আধুনিক হরিয়ানাকে বলা হয় রুটির ভূমি। হরিয়ানা কৃষিপ্রধান হওয়ার কারণে রুটিও উৎপাদন হয় প্রচুর পরিমাণে। গম, বজরা ও বরবটির মতো নানা ধরনের শস্য দিয়ে রুটি প্রস্তুত হয়। আজও ঢাকা, কলকাতা, দিল্লি ও করাচির মতো শহরের চুলায় প্রতিদিন প্রস্তুত হয় রুটি। এখানকার নদী ও পানির মতো রুটিও মানুষের সঙ্গে এতটাই আপন হয়ে আছে যে সুকান্ত ভট্টাচার্য অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারেন, ‘পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








