২০১৩ সাল। মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হলেন। নিষিদ্ধ করা হয় তার দল মুসলিম ব্রাদারহুড। পরের বছর প্রায় ৫৫০ কর্মীকে দেয়া হলো মৃত্যুদণ্ড। মোহাম্মদ মুরসিরও ফাঁসি হলো ২০১৫ সালে। তার পরও এখন পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরে টিকে আছে জোরেশোরেই। এর আগেও দেশটিতে কয়েক দফা নিষিদ্ধ হয়েছে দলটি; ফের এসেছে রাজনীতির মাঠে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলিম ব্রাদারহুডের ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত ।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গণতন্ত্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত না। কয়েকটি ইসলামপন্থী দল গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে কেউ গণতন্ত্রকে ইসলামী শুরার সমতুল্য হিসেবে মেনে নেয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের নীতিমালা দ্বিতীয় ঘরানায়। ব্রাদারহুডের বক্তৃতা প্রায়ই গণতান্ত্রিক দিকগুলোয় বেশি গুরুত্ব দেয়। সেক্ষেত্রে একটা দ্বিধা থাকে বলে মনে করেন মিসরের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক আশরাফ আল শরিফ। তিনি তার দ্য মুসলিম ব্রাদারহুড অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব পলিটিক্যাল ইসলাম ইন ইজিপ্ট প্রবন্ধে লিখেছেন, ব্রাদারহুডকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নাগরিকদের নির্দিষ্ট মূল্যবোধ আরোপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে এমন জনপ্রিয় দলকে বলপ্রয়োগ করে রাজনীতি থেকে দূরে রাখাও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। ২০১১-১৩ সাল পর্যন্ত মিসরের ঘটনাগুলো থেকে দেখা গেছে দিনশেষে ‘ইসলামিজম’ জনগণের উদ্বেগ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ। সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কর্তৃত্ববাদ। মিসরে ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক আধুনিকতাকে একত্র করতে সক্ষম, এমন একটা পরিবেশের অভাব। আশরাফ আল শরিফ দাবি করেছেন, ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা গণতন্ত্রকে নিজেদের পরিবেশে পুনর্গঠিত করা। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ইসলামপন্থীদের নিজস্ব শক্তি ব্যয় করা দরকার ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলোকে স্থানীয় ভাষায় সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে। তারা ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিষয়ে তাদের আগেকার বিষয়গুলোই ধরে রাখতে পারত। রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ককেও পুনর্ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
আশরাফের ভাষ্যমতে, ইসলামপন্থী ও অ-ইসলামপন্থীদের একত্র করতে আদর্শের ওপর কাজ করার প্রয়োজন হবে। গণতান্ত্রিক সমঝোতা, ধর্মীয় পুনর্ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তির প্রতি ধর্মের সঠিক অবস্থান পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এটা সম্ভব। গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মিসরে আদর্শিক দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দূর করতে হবে পারস্পরিক অবিশ্বাসের রাজনীতি। বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামপন্থীদের পৃথক দায় রয়েছে এবং তাদের বাদ দেয়া হবে ব্যর্থতা। আল আজহারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধর্মীয় সংস্কার প্রক্রিয়ায় একটি মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি স্পষ্ট যে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্নে ইসলামবাদীদের মধ্যে আরো বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কারের প্রয়োজন।
শরিফ মনে করেন, গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী দলগুলোর বক্তব্যে ধর্মের ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং গণতান্ত্রিক ইসলামী আন্দোলনগুলো ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি তাদের ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখবে। সেটাকে রাখবে জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে। সংগঠনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা, বাইরের সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং ধর্মীয় প্রচারণা ও রাজনীতির পৃথককরণও দরকার। সত্যি বলতে গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী আন্দোলন ইউরোপের গণতান্ত্রিক খ্রিস্টধর্মীয় দলগুলোর মুসলিম সংস্করণের মতো হতে পারে। হতে পারে একটি সাংস্কৃতিকভাবে রক্ষণশীল আন্দোলন, যা ঐক্যমূলক গণতান্ত্রিক নিয়মের মধ্যে ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করে। দুর্ভাগ্যবশত এমন মধ্যপন্থী ইসলামী নেতাদের অভাব রয়েছে, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারে। আল-ওয়াসাত পার্টি তিন বছর ধরে অনেকটাই নতজানু। একসময়ের প্রতিশ্রুতিশীল স্ট্রং ইজিপ্ট পার্টি এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট আদর্শ এবং একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ভিত গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার ইসলামপন্থী দলগুলো শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর চাপ এবং শক্তিশালী অইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে বিকশিত হয়েছে। মরক্কোর সুবিধা ছিল রাজতন্ত্র, যা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বহুত্ববাদকে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম। কিন্তু মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা সফলতা দেখাতে পারেনি। ব্রাদারহুডের ধর্মতাত্ত্বিক, সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এতটাই জটিল ছিল যে এটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির আগে যে অবস্থানটি ব্রাদারহুডের ছিল, তা আর তারা ধরে রাখতে পারছে না। বৃহত্তর পরিসরে বললে ইসলামী রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ইসলামপন্থীর কল্পনায় বেঁচে থাকবে। মিসরের বৃহত্তর জনগণের কাছে আবেদন থাকবে কিনা, তা নির্ভর করবে নেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
মিসরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আশাব্যঞ্জক মনে করেন না বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, রাষ্ট্রে ইসলামপন্থীদের প্রতি বিরোধিতা এবং সমাজের ইসলামী প্রকল্পের প্রত্যাখ্যান ব্রাদারহুড ও ইসলামপন্থী তরুণদের আরো চরম অবস্থানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটা বহুত্ববাদকে সমৃদ্ধ করার চেয়ে বেশি বিভাজন সৃষ্টি করেছে। মিসরে কর্তৃত্ববাদিতা এবং রাজনৈতিক ও আদর্শিক শূন্যতার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক মিসর বা ইসলামবাদের স্বাস্থ্যকর বিকাশের জন্য শুভ ইঙ্গিত দেয় না। মুবারকের পতনের পর ইসলামপন্থীদের আধিপত্য বিস্তার মিসরের নতুন গণতান্ত্রিক শাসনের স্বপ্নকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তবে সমানভাবে সত্য হলো পুরনো রাষ্ট্র কর্তৃক ইসলামপন্থীদের দমন থেকে সৃষ্ট ক্ষতিগুলোও গণতন্ত্রের স্বপ্নে ছাই ঢেলে দিয়েছে। মিসর ইসলামবাদের প্রতি ঘৃণার মাধ্যমে একনায়কত্বকে ন্যায্যতা দিতে পারে।
দ্য মুসলিম ব্রাদারহুড অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব পলিটিক্যাল ইসলাম ইন ইজিপ্ট প্রবন্ধের উপসংহারে আশরাফ লিখেছেন, এখন পর্যন্ত ব্রাদারহুড ও ইসলামপন্থী মূলধারার বেশির ভাগ অংশই সহিংসভাবে রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রয়েছে। হয় সেটা সামাজিক মূলধারায় অংশগ্রহণের জন্য তাদের স্বার্থের কারণে বা তাদের সম্পদের অভাবে। তবে আঞ্চলিক রাজনীতির পতন এবং দেশীয় অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ অবস্থান সম্ভবত টেকসই হবে না। মিসরের ইসলামপন্থীরা বিশেষ করে ব্রাদারহুড সাধারণত ইসলামিক স্টেটের চরমপন্থাকে ঘৃণ্য মনে করতে পারে। অথচ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংস্কারবাদী ইসলামীকরণের ধ্রুপদি মডেল ভেঙে পড়েছে। লিবিয়া, ইরাক ও সিরিয়ায় জিহাদি মডেলগুলো ২০১৩ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ে হতাশ মিসরীয় ইসলামপন্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে। তারা সরে যেতে পারেন চরমপন্থার দিকে। যদি সহিংস চরমপন্থী ইসলামবাদের প্রবণতা দমনও করা যায়, ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক মডেল এখনো টেকসই নয়।
সাধারণভাবে ইসলামপন্থীরা নিকট ভবিষ্যতে মিসরের রাজনীতিতে একটি শক্তি হিসেবে রয়ে যাবে বলে মনে করেন শরিফ। ব্রাদারহুডের ভাগ্যে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। পুরনো রাষ্ট্র ও ব্রাদারহুড সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয় ব্রাদারহুডের সম্পূর্ণ নির্মূলকরণ, নয়তো তাদের বিজয়ী প্রত্যাবর্তন ঘটতে পারে। তবে যতটা অবাস্তব ইসলামপন্থীদের ফিরে আসার স্বপ্ন, তেমনই অসম্ভব মিসরে রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে ইসলামকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও। ব্রাদারহুড-পরবর্তী রাজনীতির উত্থানে প্রয়োজন হবে পুরনো রাষ্ট্রের একনায়কত্বের অবসান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ধর্মীয় সংস্কারের প্রচেষ্টা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রত্যাবর্তন। এ সবকিছুই নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব নয়। মিসরের বর্তমান অস্থিরতা—সামাজিক দ্বন্দ্ব, মেরুকরণ ও সহিংসতা ইসলামপন্থীদের সংহতকরণের সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে শাসন ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর ছায়া ফেলেছে। ভেতরের জড়তা থেকে বের হতে না পারলে ব্রাদারহুডের জন্য ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হিসেবেই থাকবে।
সাফকাত সায়েম: লেখক
(আশরাফ আল শরিফের The Muslim brotherhood and the future of political islam in Egypt প্রবন্ধ অবলম্বনে)








